রম্য

মহাজাগতিক ফুটবল যুদ্ধ, ‘ভাবী কূটনীতি’ ও বিশ্ব রাজনীতির খিচুড়ি

রাশিয়া-ইউক্রেন এবং ইরান-আমেরিকা-ইসরাইল যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বনেতারা যখন চিন্তায় চুল ছিঁড়ছেন, ঠিক তখনই ঢাকার নাখালপাড়ার রহিম মিয়া এবং চায়ের দোকানদার মন্টু ভাই এক মহা-ভূরাজনৈতিক সংকটে অবতীর্ণ হয়েছেন। চায়ের কাপে ঝড় তুলে মন্টু ভাই ঘোষণা করলেন, “নেইমার যদি এবার কাপ না নেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আসবে না!”

পাশে বসা আর্জেন্টিনা ভক্ত রহিম মিয়া তার হাফখাওয়া বনরুটি টেবিল ঠুকে বললেন, “আরে রাখো তোমার নেইমার! মেসি এবার যা খেলবে, তাতে আমেরিকার ট্রাম্প তো দূর, হোয়াইট হাউজের সিকিউরিটি গার্ডও ভড়কে যাবে।”

বিশ্বকাপ এলেই আমাদের চারপাশের চেনা পৃথিবীটা কেমন যেন একটা আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে রূপ নেয়। ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার এই ভক্তকুলের কাছে ফুটবল কোনো খেলা নয়; এটা হলো জীবন-মরণ, ইজ্জত এবং সর্বোপরি—পাড়ার মোড়ের বিরিয়ানির দোকানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লড়াই।

ইরান, আমেরিকা ও ফুটবলীয় পারমাণবিক চুক্তি

এদিকে আন্তর্জাতিক মহলে এক নতুন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। বিশ্বস্ত সূত্রে খবর (মানে পাড়ার ইসমাইল মিয়ার ফেসবুক স্ট্যাটাস), ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার চলমান স্নায়ুযুদ্ধ নাকি আসলে কোনো রাজনৈতিক যুদ্ধই নয়!

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট গোপনে আর্জেন্টিনার ভক্ত আর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মনে-প্রাণে ব্রাজিলের সাম্বা নৃত্যের কদর করেন। ইরান যখনই কোনো নতুন মিসাইল পরীক্ষা করে, আমেরিকা তখনই নিষেধাজ্ঞা দেয়, কারণ আমেরিকা নিশ্চিত, ওই মিসাইলের ভেতরে ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের গোপন ব্লু-প্রিন্ট লুকানো আছে।

ইসরাইল আবার এই দ্বন্দ্বে থার্ড পার্টি হিসেবে ঢুকে পড়েছে। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, “যতক্ষণ না আর্জেন্টিনা তাদের ডিফেন্স লাইনে আয়রন ডোম বসাচ্ছে, ততক্ষণ মধ্যপ্রাচ্যে কোনো যুদ্ধবিরতি হবে না।” ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি হোয়াইট হাউজে ফিরে যাওয়ার আগেই গোপনে ম্যারাডোনার একটা জার্সি কিনে রেখেছেন, যদি কোনোভাবে আর্জেন্টিনার ভোট ব্যাংক কাজে লাগানো যায়!

এমনকি জাতিসংঘে এবার এক বিশেষ প্রস্তাব উঠতে যাচ্ছে—"যে দল ট্রফি জিতবে, আগামী চার বছর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তাদের সমর্থক দেশগুলোই ডমিনেট করবে।"

প্রতিবেশি দেশের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ও ফুটবলের সাইড-ইফেক্ট

আমাদের এই ফুটবলের হাওয়া সীমান্ত পেরিয়ে ওপারেও লেগেছে। ভারতের রাজনীতিতে এখন নতুন এক দলের আবির্ভাব ঘটেছে, যার নাম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা কেজেপি (KJP)। এদের মূল এজেন্ডা হলো—ফুটবলকে ভারতের জাতীয় খেলা ঘোষণা করা এবং যারা ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা সাপোর্ট করবে, তাদের ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচ স্প্রে দিয়ে দেশছাড়া করা। কেজেপি-র প্রধান এক নির্বাচনি জনসভায় গরম গরম ভাষণ দিয়ে বললেন, “ভাই ও বোনেরা, মেসি-নেইমাররা আমাদের দেশের জিডিপি বাড়াচ্ছে না। আমাদের দেশের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে গলি ফুটবলে! যারা লাতিন আমেরিকার দালালি করছে, তারা আসলে তেলাপোকার মতো অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা দেশদ্রোহী!” ফলশ্রুতিতে, কলকাতার বাজারে এখন আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের জার্সি কিনতে গেলে ককরোচ মারার লিকুইড ফ্রি দেওয়া হচ্ছে।

পাড়ার ভাবীদের ‘রান্নাঘর কূটনীতি’

ফুটবলের এই মহাজাগতিক যুদ্ধ এবার ড্রয়িংরুম পেরিয়ে রান্নাঘরেও হানা দিয়েছে। রহিম মিয়ার স্ত্রী আর্জেন্টিনার অন্ধ ভক্ত, আর পাশের বাসার মন্টু ভাইয়ের স্ত্রী ব্রাজিলের হলুদ জার্সির দিওয়ানা।

খেলা শুরুর আগে দুই ভাবীর মধ্যে কোল্ড ওয়ার শুরু হয়ে যায়। আর্জেন্টিনা গোল খেলে রহিম মিয়ার কপালে জোটে শুধু ‘ডাল-ভাত আর ভর্তা’, কারণ ভাবীর মন খারাপ। আর ব্রাজিল যদি হেরে যায়, তবে মন্টু ভাইয়ের কপালে রাতের খাবারই জোটে না; ভাবী তখন ‘মাথাব্যথার’ অজুহাতে লাইট বন্ধ করে শুয়ে থাকেন। পাড়ার কাঁচাবাজারের বিক্রেতারাও এখন চালাক হয়ে গেছে—ব্রাজিল জিতলে পরদিন হলুদ রঙের পাকা আমের দাম ডাবল, আর আর্জেন্টিনা জিতলে নীল-সাদা ইলিশ মাছের দাম আকাশচুম্বী!

পাড়ার মোড়ে মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি

বিশ্বের পরাশক্তিরা যখন অস্ত্র প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, আমাদের পাড়ার ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ফ্যানরা তখন বাঁশের লাঠি আর প্লাস্টিকের পতাকার দৈর্ঘ্য নিয়ে পরমাণু চুক্তির চেয়েও জটিল আলোচনায় ব্যস্ত। ব্রাজিল সমর্থকদের যুক্তি: “আমাদের পাঁচটা স্টার আছে। আকাশে তারা কয়টা? পাঁচটা! সুতরাং, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পুরোটাই ব্রাজিলের।”

আর্জেন্টিনা সমর্থকদের পাল্টা যুক্তি: “আরে রাখো তোমার স্টার! আমাদের মেসি যেভাবে গোল দেয়, ওটা দেখলে স্বয়ং আইনস্টাইনও তার আপেক্ষিকতার সূত্র পরিবর্তন করতেন। আসলে ইতিমধ্যে দুই দলের ফ্যানরাই নিজ নিজ বাড়ির ছাদে এত বড় বড় পতাকা লাগিয়েছেন যে, ওপর দিয়ে যাওয়া বিমানগুলোর পাইলটরা কনফিউজড হয়ে যাচ্ছেন। এক এয়ারলাইন্সের পাইলট তো ভুলেই গিয়েছিলেন তিনি ঢাকা ল্যান্ড করছেন নাকি সরাসরি বুয়েনস আইরেসে চলে এসেছেন!

শেষ কথা

কাপ কার? বিশ্বকাপের এই ট্রল, ঝগড়া আর ফেসবুকের কমেন্ট সেকশনের যুদ্ধ দেখে মনে হয়, আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল যদি কাপ নাও পায়, আমাদের বাঙালি ফ্যানদের জন্য আলাদা একটা 'ট্যাবলেট কাপ’ দেওয়া উচিত। কারণ, খেলার পর যে দলের হার হবে, সেই দলের সমর্থকদের হাই ব্লাড প্রেসার আর ডিপ্রেশন সামলাতে পাড়ার ফার্মেসিগুলোর ট্যাবলেট শেষ হয়ে যাবে। তাই আসুন, ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ করুক আর ককরোচ জনতা পার্টি তেলাপোকা মারার স্প্রে রেডি করুক, আমরা বাঙালিরা মনের সুখে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে কামড়াকামড়ি চালিয়ে যাই। দিনশেষে কাপ যারাই পাক, চায়ের দোকানের মন্টু ভাইয়ের বাকির খাতা কিন্তু অপরিবর্তিতই থাকবে!