সর্বশেষ এমনটি ঘটেছিলো আজ থেকে প্রায় ৬৪ বছর আগে। পরপর দুই আসরে বিশ্বকাপের শ্রেষ্ঠত্বের স্মারক ঘরে তুলে নেয় বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি ব্রাজিল। ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় দলটি। এরকম নজির স্থাপন করতে পেরেছে আর মাত্র একটি দল ইতালি। এরও প্রায় দুই যুগ আগে ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে বিশ্বকাপের শিরোপা জেতে দেশটি। ছয় দশক পরে এসে এমন একটি সুযোগের মুখোমুখি ব্রাজিলের ‘চির প্রতিদ্বন্দী’ দল আর্জেন্টিনা।
ঠিক চার বছর আগে ২০২২ সালের মধ্য ডিসেম্বরে এক নাটকীয় ম্যাচে পরাক্রমশালী ফ্রান্সকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির নেতৃত্ব ও অসাধারণ নৈপুন্যে ৩৮ বছরের বিশ্বকাপ খরা কাটে দেশটির।
বিশ্বকাপের এবারের আসরেরও অন্যতম ‘হট ফেবারিট’ দলটি। বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিকাংশ খেলোয়াড় দিয়েই দল সাজিয়েছেন মাস্টারমাইন্ড কোচ আরেকজন লিওনেল। লিওনেল স্কালোনি। দলের পারফর্মম্যান্স, ফর্ম, আত্মবিশ্বাস, সবকিছু মিলিয়ে অনেকেই বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার হিসেবে মনোনীত করছেন গত আসরের বিজয়ী দলটিকেই।
কিন্তু সবকিছু পাশে রেখে এবারের বিশ্বকাপ জয়ের পথে অন্যতম এক অদৃশ্য বাধা রয়েছে আর্জেন্টিনার সামনে: ৩৪ বছর কিংবা তারও পুরোনো এক অভিশাপ। এই রোমাঞ্চকর ফুটবল মিথকে অনেকেই বলেন ‘ফিফা র্যাংকিং কার্স’ বা ‘ফিফা র্যাংকিংয়ের অভিশাপ’।
কাগজে কলমে এমনটি মনে হয় যে, বিশ্বকাপের ঠিক আগে ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকা দলটিই হয়তো টুর্নামেন্ট জেতার সবচেয়ে বড় দাবিদার। কিন্তু ফুটবল ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে সম্পূর্ণ উল্টো এবং চমকপ্রদ এক চিত্র। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে অফিশিয়াল 'ফিফা/কোকা-কোলা পুরুষ বিশ্ব র্যাংকিং' প্রবর্তনের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো দলই টুর্নামেন্ট শুরুর প্রাক্কালে র্যাংকিংয়ের ১ নম্বরে থেকে বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তুলতে পারেনি।
বিশ্বমঞ্চে মূল লড়াই মাঠে নামার ঠিক আগমুহূর্তে ফুটবলভক্তরা দেখলো এক অবিশ্বাস্য সমীকরণ। বিশ্বকাপের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ম্যাচে দুই ইউরোপীয় পরাশক্তি ফ্রান্স এবং স্পেন অপ্রত্যাশিতভাবে পয়েন্ট হারিয়ে বসেছে। অন্যতম হট-ফেভারিট ফ্রান্স সবাইকে চমকে দিয়ে আইভরি কোস্টের কাছে ২-১ গোলের ব্যবধানে হেরে গেছে। প্রথমার্ধে রায়ান চেরকির গোলে ফরাসীরা এগিয়ে গেলেও, দ্বিতীয়ার্ধে ওউমার ডিয়াকিটে এবং উইলফ্রেড জাহার গোলে দুর্দান্ত জয় তুলে নেয় আইভরি কোস্ট। অন্যদিকে শক্তিশালী স্পেনও পূর্ণাঙ্গ জয় পেতে ব্যর্থ হয়েছে। এশিয়ান পরাশক্তি ইরাকের সাথে ১-১ গোলে ড্র করে মাঠ ছাড়তে হয় তাদের। ম্যাচের প্রথমার্ধে ফেরান তোরেস স্পেনকে এগিয়ে নিলেও, দ্বিতীয়ার্ধে চমৎকার এক কাউন্টার অ্যাটাক থেকে গোল শোধ করে সমতায় ফেরে ইরাক।
শীর্ষে থাকা এই দুই দল একই সময়ে হোঁচট খাওয়ায়, বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা কোনো ম্যাচ না খেলেই তাদের টপকে লাইভ ফিফা র্যাংকিংয়ের ১ নম্বর স্থান পুনরুদ্ধার করেছে। পয়েন্ট টেবিলে যেখানে ১৮৭৪.৮১ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে আলবিসেলেস্তেরা।
ফলে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আর্জেন্টিনা এবার র্যাংকিংয়ের একদম চূড়ায় থেকেই বিশ্বকাপে পা রাখছে। তবে শীর্ষস্থান পাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি তাদের ঘাড়ে এখন চেপে বসল সেই ঐতিহাসিক ‘ফিফা র্যাংকিংয়ের অভিশাপ’!
গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বকাপের আগে ১ নম্বরে থাকা দলগুলোর ট্র্যাজিক পরিণতি ফুটবলপ্রেমী ও বিশ্লেষকদের রীতিমতো চমকে দিয়েছে। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক সেই ইতিহাস:
১৯৯৪ বিশ্বকাপ: টুর্নামেন্ট শুরুর আগে বিশ্ব র্যাংকিংয়ের শীর্ষে ছিল জার্মানি। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে সেবার তৃতীয় স্থানে থাকা ব্রাজিল ট্রফি জিতে নেয়।
১৯৯৮ বিশ্বকাপ: ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ব্রাজিল ১ নম্বরে থেকে ফ্রান্সে পাড়ি জমায়। তবে ফাইনালে স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় সেলেসাওদের।
২০০২ বিশ্বকাপ: এবার শীর্ষস্থান ধরে রেখে টুর্নামেন্ট শুরু করে ফ্রান্স। কিন্তু গ্রুপ পর্ব থেকেই তাদের বিদায় নিতে হয়, আর ২ নম্বর র্যাংকিংয়ে থাকা ব্রাজিল জিতে নেয় তাদের পঞ্চম শিরোপা।
২০০৬ ও ২০১০ বিশ্বকাপ: টানা দুটি বিশ্বকাপে ব্রাজিল ১ নম্বর দল হিসেবে মিশন শুরু করেও চূড়ান্ত সাফল্য পায়নি। ২০০৬ সালে ইতালি এবং ২০১০ সালে স্পেন বিশ্বসেরার মুকুট পরে।
২০১৪ বিশ্বকাপ: এই বছরটিতে র্যাংকিংয়ের শীর্ষস্থান নিয়ে কিছুটা ভিন্নমত থাকলেও, অফিশিয়াল ডেটা অনুযায়ী জার্মানি টুর্নামেন্ট শুরুর সময়ে শীর্ষে ছিল এবং তারাই শেষ পর্যন্ত ট্রফি জিতেছিল। এটিকে এই অভিশাপের একমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য করা হয়।
২০১৮ বিশ্বকাপ: জার্মানি আবারও ১ নম্বরে থেকে রাশিয়ায় বিশ্বকাপ মিশন শুরু করে। কিন্তু গ্রুপ পর্বের তলানিতে থেকে বিদায় নিয়ে জার্মানি এই অভিশাপের সত্যতা যেন আরও কঠোরভাবে প্রমাণ করে। সেবার চ্যাম্পিয়ন হয় ফ্রান্স।
২০২২ বিশ্বকাপ: কাতার বিশ্বকাপের আগেও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল র্যাংকিংয়ের ১ নম্বরে অবস্থান করছিল। তবে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই তাদের বিদায় নিতে হয় এবং লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা দীর্ঘ ৩৬ বছরের খরা কাটিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
কেন ১ নম্বর দলগুলো বিশ্বমঞ্চে এসে এভাবে খেই হারিয়ে ফেলে, তা নিয়ে ফুটবল বিশ্লেষকদের মাঝে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, র্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকার কারণে দলগুলোর ওপর এক ধরণের অতিরিক্ত মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও প্রত্যাশার পারদ তৈরি হয়। পাশাপাশি, প্রতিপক্ষ দলগুলোও বিশ্বের ১ নম্বর দলকে হারানোর জন্য বাড়তি পরিকল্পনা ও সর্বোচ্চ অনুপ্রেরণা নিয়ে মাঠে নামে।
লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা কি পারবে তিন দশকের এই চেনা ইতিহাস ও "র্যাংকিং অভিশাপ"-এর মিথ ভেঙে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে? নাকি এই অভিশাপের তালিকায় যুক্ত হবে আরও একটি নতুন নাম, তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে পুরো ফুটবল বিশ্ব।