আমেরিকায় বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখা যে কারণে ব্যয়বহুল

বত্রিশ বছর পরে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছে ফিফা বিশ্বকাপ, কিন্তু উন্মাদনার বদলে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে খেলা দেখার খরচ। টিকেটের দাম এতোটাই আকাশচুম্বী যে, নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানিকে রীতিমতো ফিফার সঙ্গে আলোচনা করে ৫০ ডলারে ১,০০০ টিকেটের ব্যবস্থা করতে হয়েছে, যেন সাধারণ মানুষের পক্ষেও সম্ভব হয় খেলা দেখা।

টিকেটের দাম আসলে কতো? অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ভাষ্যমতে, মে মাসের শুরুতে অবিক্রিত টিকেটের সর্বনিম্ন দাম ছিল ৩৮০ ডলার। কেপ ভার্দে বনাম সৌদি আরবের ম্যাচের টিকেটের দাম শুরু ১৭০ ডলার থেকে, গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন দাম সেটিরই। ফাইনালের টিকেটের দাম শুরুই হচ্ছে সাত হাজার ডলারের বেশি থেকে। ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বের ছয় ম্যাচের মধ্যে তিনটির ক্ষেত্রেই টিকেটের দাম হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। সর্বনিম্ন দাম ৭৫৬ ডলার (ব্রাজিল বনাম হাইতি)।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের টিকেটের সর্বোচ্চ দাম ছিল ২২০ ডলার, ফাইনালের ক্ষেত্রে যেটি বেড়ে দাঁড়ায় ১,৬০৭ ডলারে। সেই সঙ্গে কাতারের বাসিন্দাদের জন্য ১১ ডলার থেকে টিকেট কেনার সুযোগ ছিল, যা মাঠে দর্শক টেনে এনেছিল সহজেই। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের টিকেটও ছিল সাধারণ দর্শকের নাগালের মধ্যেই, গ্রুপ পর্বের টিকেটের দাম শুরু হয়েছিল ৭৯ পাউন্ড থেকে।

তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপে টিকেটের দাম এত বেশি কেনো? ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো যা বলেছেন, তার সারমর্ম হচ্ছে যস্মিন দেশে যদাচার। 

তিনি বলেন, “আমাদেরকে দেখতে হবে আমরা কোন বাজারে আছি। আমরা এমন একটি জায়গায় আছি, যেখানে বিনোদনের বাজার সবচেয়ে উন্নত, তাই আমাদেরকে এখানের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টিকেটের দাম নির্ধারণ করতে হবে।”

টিকেটের দাম বাড়তি হওয়ার মূল কারণ ফিফার এই ‘আমেরিকান’ পদ্ধতি। টিকেটের দাম নির্ধারণ করতে ফিফা ব্যবহার করেছে ডায়নামিক প্রাইসিং, অর্থাৎ চাহিদা অনুযায়ী ঠিক করা হয়েছে দাম। আর যেহেতু চাহিদা প্রচুর, সেহেতু দামও বেড়েছে তরতর করে।

তবে, টিকেটের দামই দর্শকদের মাথাব্যথার একমাত্র কারণ নয়। ২০২২ বিশ্বকাপের সময় দর্শকদের জন্য গণপরিবহণ, যেমন মেট্রো, ফ্রি করে দিয়েছিল কাতার সরকার, যেটি পাওয়া যাবে না যুক্তরাষ্ট্রে। বস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে যাতায়াতের জন্য বাস চালু করছে সেখানকার বিশ্বকাপ কর্তৃপক্ষ, কিন্তু সেই বাসে প্রতি সিটের জন্য দর্শকদের গুনতে হবে ৯৫ ডলার। ম্যাসাচুসেটস বে ট্রান্সপোর্টেশন অথরিটি জানিয়েছে, বস্টন থেকে স্টেডিয়ামে যেতে ট্রেনে খরচ হবে ৮০ ডলার, যা সাধারণ সময়ের তুলনায় চার গুণ। নিউ জার্সির ট্রানজিট ব্যবহার করে স্টেডিয়ামে যেতে-আসতে গুণতে হবে ৯৮ ডলার।

তার উপর যোগ করতে হবে ভিন্ন ভিন্ন শহরের ভিন্ন ভিন্ন গণপরিবহন ব্যবস্থা। ফিলাডেলফিয়া, আটলান্টা, এবং সিয়াটলে বেশ ভালো ট্রানজিট ব্যবস্থা থাকায় সেখানে দর্শকদের জন্য ব্যাপারটি তুলনামূলকভাবে সহজতর হবে, কিন্তু বাকি শহরগুলোতে স্টেডিয়ামে সরাসরি যাওয়ার জন্য থাকছে না গণপরিবহন। স্যান ফ্র্যান্সিসকোর সান্তা ক্লারায় লিভাই স্টেডিয়ামে যেতে হলে ট্রেনে যাওয়া যাবে, কিন্তু মূল শহর থেকে সেই ট্রেনে পৌঁছাতে হলে পেরুতে হবে বেশ কয়েকটি ধাপ। করতে হবে আলাদা আলাদা যাতায়াতের উপায়। মায়ামিতেও একবার নিতে হবে ট্রেন, তারপর আলাদা শাটলে করে পৌঁছাতে হবে মাঠে। লস অ্যাঞ্জেলসে যদিও নয়টি রুট নির্ধারণ করা হয়েছে দর্শকদের স্টেডিয়ামে পৌঁছে দিতে, সেই পথ নিতে গেলেও ধরতে হবে ভিন্ন ভিন্ন বাস, কিংবা হাঁটতে হবে অনেক পথ।

তবে যে মাঠে সবচেয়ে বেশি খেলা, সেই ডালাসের আরলিংটনেই সবচেয়ে বড় সমস্যা যাতায়াতে। টিকেট থাকলে এটিএনটি স্টেডিয়ামে পৌঁছুতে আপনার আগে ট্রেনে করে পৌঁছাতে হবে একটি স্টেশনে, সেখান থেকে বাসে করে আপনাকে নিয়ে যাওয়া হবে স্টেডিয়ামে।

তাই হোটেল ভাড়া এবং টিকেটের খরচ মেটানোর পরও, দর্শকদের গাঁটের পয়সা ঢালতে হবে ট্যাক্সি কিংবা উবার ভাড়া করে কেবল স্টেডিয়ামে পৌঁছুতে। এবং যেহেতু ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’-এর দেশ, খেলার দিন তাই সেগুলোর দাম বাড়বে দ্রুত গতিতে।

এছাড়াও দর্শকদের বেশ খরচ করতে হবে বিমান ভাড়ার পেছনে, কারণ বাস কিংবা ট্রেনে করে এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে যাওয়াটা যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমন-ই খরুচে। ভেন্যুগুলোর দূরত্বও এমন, গাড়ি চালিয়ে যাওয়াটাও দুষ্কর হবে অধিকাংশ দর্শকের জন্য। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক ব্রাজিলের খেলা দেখতে যাওয়া কোনো দর্শককে। সেলেকাওদের প্রথম দুই ম্যাচ নিউইয়র্ক এবং ফিলাডেলফিয়াতে হওয়ায় শুরুতে একটু নিশ্চিন্ত থাকা গেলেও, শেষ ম্যাচের জন্য তাকে যেতে হবে প্রায় ১,২০০ মাইল দূরে মায়ামিতে। আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ কানসাসে, পরের দুটি ডালাসে, সেখানেও দূরত্ব কম হবার পরও ৫০০ মাইলের বেশি।

এসবের সঙ্গে যোগ করুন আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম। পুরো আমেরিকাজুড়েই তেলের দাম বেড়ে চলেছে প্রতি সপ্তাহেই। ফেব্রুয়ারিতেও গড়ে প্রতি গ্যালন তেলের দাম ছিল তিন ডলারের কম, সেটি এখন চার ডলার ছাড়িয়ে এগুচ্ছে পাঁচের দিকে, যার কারণে দাম বাড়বে ট্যাক্সি কিংবা উবারের তো বটেই, সঙ্গে খাবার এবং বিমানের টিকেটেরও।

এসব মিলিয়েই বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ দেখতে চাওয়ার খরচ। তবে খরচ বাড়ায় একমাত্র ক্ষতি হচ্ছে বিশ্বকাপেরই, কেননা মাত্র অল্প কিছু দিন বাকি থাকার পরও বিক্রি হয়নি সব ম্যাচের টিকেট, এমনকি বহুল সমর্থিত দলগুলোরও। এমনকি খেলা দেখতে যাওয়ার জন্য শহরগুলো যে গণপরিবহনের ব্যবস্থা করছে, সেখানেও নেমেছে ধস। 

দ্য অ্যাথলেটিক জানাচ্ছে, নিউ জার্সিতে খেলা দেখতে যাওয়ার ট্রানজিটের টিকেট বিক্রি হয়েছে ছয় শতাংশেরও কম। তাদের আরেকটি রিপোর্ট বলেছে, ২০৫টি হোটেলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যত রুম ভাড়া হবে বলে তারা আশা করেছিলেন, হয়নি তেমন, এবং আমেরিকান হোটেল অ্যান্ড লজিং অ্যাসোসিয়েশন ধরেই নিয়েছে, তাদের পরিকল্পনামাফিক আয় হচ্ছে না বিশ্বকাপ থেকে।

৪৮ দলের বিশ্বকাপ হওয়ায় দর্শক উন্মাদনা বেশি হবে বলেই আশা করছিল ফিফা, কিন্তু গন্ডগোলটা লেগে গেছে খরচে। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়ার পাহাড় ঠেলতে পারলেও, টাকার পাহাড় বয়ে বেড়ানোটা দুরূহ অধিকাংশ দর্শকের জন্য, তাই অনেকের পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না ইচ্ছা থাকলেও বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার। আর তাতেই আমেরিকায় বিশ্বকাপের উত্তেজনা মিইয়ে গেছে, ৩২ বছরের অপেক্ষার অবসান হওয়ার পরও।