এবারের ফুটবল বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকরা হয়রানির শিকার হতে পারেন বলে সতর্ক করেছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। এক বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করে সংস্থাটি জানিয়েছে, সীমান্তে বা ভেন্যুর আশপাশে অভিবাসন কর্মকর্তাদের অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে পড়তে পারেন অন্য দেশ থেকে আসা সাংবাদিকরা। এমনকি হয়রানির ঝুঁকিও রয়েছে।
সাংবাদিকদের ঝুঁকির আশঙ্কা প্রসঙ্গে ইমেইলের মাধ্যমে জানতে চাওয়া হলে ফিফা আলাপ-কে জানিয়েছে, “২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ মানবাধিকার মানদণ্ড মেনেই হবে। একইসঙ্গে সকল অংশীজনের সম্পৃক্ততা থাকবে। যে কোনো অভিযোগ এলে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হবে; এ জন্য ফিফা আয়োজক দেশ ও শহরগুলোতে সাংবাদিকদের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে।”
সিপিজে’র তথ্যমতে, ফিফা প্রায় ৫০ হাজার সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীকে বিশ্বকাপের সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের জন্য অ্যাক্রিডিটেশন দিয়েছে। ২০২৬ সালের ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপের খেলা।
সিপিজে’র প্রধান নির্বাহী জোডি জিন্সবার্গ এক বিবৃতিতে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক মাসগুলোর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সাংবাদিকদের জানা উচিত ফিফার প্রেস ক্রেডেনশিয়াল সীমান্তে বা মাঠের রিপোর্টিংয়ে সবসময় সুরক্ষা দেবে না। আমরা দেখেছি অভিবাসন আইনকে সাংবাদিকতাকে স্তব্ধ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো অপরাধের কারণে নয়, বরং সাংবাদিকতার কারণে আটক, প্রবেশে বাধা বা বহিষ্কার করা হচ্ছে।”
বিভিন্ন দেশ থেকে আসা সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও লেখকরা আগেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি বা ভিসা বাতিলের শিকার হয়েছেন বলে দাবি সিপিজে’র।
সিপিজে’র কাছে জানতে চাওয়া হয় ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে এখন পর্যন্ত কতজন বিদেশি সাংবাদিক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। এমন প্রশ্নের জবাবে সিপিজে’র যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর ক্যাথরিন জ্যাকবসেন আলাপ-কে বলেন, “বেশ কিছু ঘটনা আমরা নথিভুক্ত করেছি। যেখানে আমরা দেখতে পেয়েছি- যুক্তরাষ্ট্রে অন্য দেশ থেকে কাজ করতে আসা সাংবাদিকরা এমন সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন যা আগের প্রশাসনগুলোর সময় দেখা যায়নি।”
কয়েকটি ঘটনার তথ্য তুলে ধরে ক্যাথরিন বলেন, জর্জিয়ার আটলান্টা এলাকায় কর্মরত সাংবাদিক মারিও গেভারার ঘটনা অন্যতম একটি উদাহরণ। আটক হওয়ার সময় তিনি বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। তারপরও তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ১০০ দিনের বেশি সময় রাখা হয়। পরে তাকে নিজ দেশ এল সালভাদরে ফেরত পাঠানো হয়।
“টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিল এলাকায় স্প্যানিশ ভাষার আরেক সাংবাদিকও আমাদের ধারণা অনুযায়ী তার প্রতিবেদনের জন্য, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) দ্বারা আটক হন। যদিও তিনি বৈধ কাগজপত্র ছাড়া দেশে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়”, আলাপ-কে জানান ক্যাথরিন।
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয় মেক্সিকোতেও দুর্নীতি বা মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদন করতে গিয়ে সাংবাদিকরা হয়রানি, হুমকি বা শারীরিক হেনস্তার মুখোমুখি হতে পারেন বলে নিজেদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে সিপিজে।
শুধু সিপিজে নয়, ফ্রান্সভিত্তিক মুক্ত গণমাধ্যম নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসও শঙ্কা জানিয়েছে। তাদের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ইতিহাসের সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে গেছে। একইসঙ্গে মেক্সিকো সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। এসব কারণে ফুটবল বিশ্বকাপে দায়িত্বে থাকা সাংবাদিকদের যেকোনো সংবেদনশীল প্রতিবেদনের মতোই প্রস্তুতি নিতে হবে।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ফিফা আলাপ-কে জানায়, “২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার মানদণ্ড মেনেই আয়োজন হবে। এই মানদণ্ডের মধ্যে টুর্নামেন্ট কভার করতে আসা সাংবাদিক কিংবা গণমাধ্যম কর্মীদের সুরক্ষাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যা মেনে চলতে ফিফা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
এছাড়াও ফিফা জানায়, তাদের (ফিফার) নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় কাজ করা দলটি ফেডারেল, অঙ্গরাজ্য, আদিবাসী ও পৌর কর্তৃপক্ষ, আয়োজক শহরের কমিটি, স্টেডিয়াম পরিচালনাকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসহ সব অংশীজনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। যেন নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিকল্পনা, সমন্বয় এবং বাস্তবায়ন করা যায়।
বিশ্বকাপে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ কেন?
গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় যুক্তরাষ্ট্রের র্যাংকিং ২০২৬ সালে পতন ঘটেছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের (আরএসএফ) তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে যেখানে তাদের র্যাংকিং ছিল ৫৭, সেখানে ২০২৬ সালে পতন হয়ে অবস্থান হয়েছে ৬৪।
ডনাল্ড ট্রাম্পের নানান উদ্যোগের কারণে গণমাধ্যম প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে বলে জানায় আরএসএফ। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, গণমাধ্যমের শীর্ষ পদে ট্রাম্প নিজের লোকদের বসানোর চেষ্টা করছেন।
এছাড়াও ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতিগত অবস্থানও গণমাধ্যমকে দুর্বল করে দিচ্ছে বলে মনে করছে সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার সংগঠন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে)।
তারা জানায়, গত বছর পেন্টাগন এক নতুন বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশ সীমিত করার ঘোষণা দেয়। পরে কিছু সংশোধন এনে জানায়, নতুন নিয়ম ভঙ্গ করলে প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল হতে পারে।
নতুন নিয়মে জানানো হয় কোনো ক্লাসিফাইড তথ্য এবং নিয়ন্ত্রিত তথ্য সাংবাদিকরা পাবেন না। এমন নিয়ম মানার সম্মতিপত্রও চাওয়া হয় সাংবাদিকদের কাছে। এও বলা হয়, যদি সাংবাদিকরা সম্মতিপত্র না দেন, তবে অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল হয়ে যাবে। এ ঘটনার পরপরই আলোচনায় আসে অবাধ তথ্য প্রবাহের বিতর্কটি। প্রতিবাদে অধিকাংশ পেন্টাগন সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা ভবন থেকে ওয়াকআউট করেন।
নতুন নীতির বিরুদ্ধে নিউইয়র্ক টাইমস একটি মামলা ঠুকে দেয়। যেখানে বলা হয় পেন্টাগনের এই নয়া নীতি যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্টকে লঙ্ঘন করছে। এক ফেডারেল বিচারক নিউইয়র্ক টাইমসের পক্ষে রায় দিলেও পেন্টাগন আপিল করে। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন আছে।
চলতি বছরের ৭ই এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, যেসব গণমাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান নিয়ে “ভুয়া খবর” প্রচার করবে, তাদের লাইসেন্স নবায়নের আগে “ঠিক পথে আসতে” হবে।
সাংবাদিকদের কেন হয়রানি করছে যুক্তরাষ্ট্র
গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিল করা হয় যুদ্ধকে কেন্দ্র করে। ওই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট ম্যাগাজিনে লেখা এক নিবন্ধে ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধ নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। পরে তিনি ছয় সপ্তাহ ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট কর্তৃপক্ষের হেফাজতে ছিলেন বলে জানায় সিপিজে। অর্থাৎ যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই মূলত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কঠোর হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনেকেই অভিযোগের আঙুল তুলে বলছেন, ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তরকে ব্যবহার করে স্বাধীন ও সমালোচনাকে সীমিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন এমন সাংবাদিকদেরই টার্গেট হচ্ছেন বেশি।
সিপিজে’র তথ্যমতে সম্প্রতি দুইজন সাংবাদিককে আটক করা হয়। যারা বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রাখা হয়। ওই দুই সাংবাদিক মূলত স্প্যানিশ ভাষায় অভিবাসন বিষয়ক রিপোর্টিং করতেন।
২০২৫ সালের ২৬এ অক্টোবর ব্রিটিশ বিশ্লেষক সামি হামদি সান ফ্রান্সিসকো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেশীয় ফ্লাইটে ওঠার সময় গ্রেপ্তার হন। এর দুই দিন আগে স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও আইসিই তার ভিসা বাতিল করে, যা তাকে জানানো হয়নি। দুই সপ্তাহ আইসিই হেফাজতে থাকার পর তিনি মুক্তি পান এবং যুক্তরাজ্যে ফিরে যান।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, ভিন্ন দেশ থেকে আসা সাংবাদিকরা যুক্তরাষ্ট্রে এসে যুদ্ধ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জড়িয়ে পড়তে পারে। আর সে কারণেই ফিফা কভার করতে আসা সাংবাদিকরা থাকবেন বিশেষ নজরদারির আওতায়।
সিপিজে’র যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ক্যারিবিয়ান-এর প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর ক্যাথরিন জ্যাকবসেন আলাপ-কে বলেন, বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনগুলো প্রায়ই বিক্ষোভ-সমাবেশ করার জন্য বিশেষ স্থান হয়ে পড়ে। মানুষ রাজনৈতিক ইস্যু বা নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরতে রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভকারীরা অনেক সময় এ ধরনের আয়োজনকে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ হিসেবেও ব্যবহার করেন।
আর এজন্য ক্যাথরিন মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রে এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের বাড়তি উপস্থিতি এবং সামরিকীকৃত ব্যবস্থার ব্যবহার হতে পারে। যেখানে কখনও কখনও কঠোর ভিড় নিয়ন্ত্রণ কৌশল হিসেবে বল প্রয়োগ করাও হয়েছে। এসব পরিস্থিতি সাংবাদিকদের জন্য কম নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে পারে। যার ধারাবাহিকতা থাকতে পারে আন্তর্জাতিক এই আয়োজনের সময়েও।
যদিও ফিফা আলাপকে নিশ্চিত করে বলেছে, মানবাধিকার নীতিমালায় গণমাধ্যম কর্মীদের অধিকার, সম্মান ও সুরক্ষায় ফিফা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ক্যাথরিন জ্যাকবসেনও বলেছেন, অন্য দেশ থেকে আসা সাংবাদিকরা যেন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে কাজ করতে পারেন। সে জন্য ফিফা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে আচরণগত মানদণ্ড ও প্রত্যাশা নির্ধারণ করা জরুরি। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং খেলার সময় সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
অন্যদিকে ফিফা জানায়, “২০১৮ সাল থেকে ফিফা মানবাধিকারকর্মী এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের জন্য একটি বিশেষ অভিযোগ ব্যবস্থা চালু করেছে। ফিফা-সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য যদি কারও অধিকার ক্ষুণ্ন হয় বলে কেউ মনে করেন, তাহলে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও ‘বৈধ সাংবাদিক’দের কাজে যেকোনো হস্তক্ষেপকে ফিফা গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে। একইসঙ্গে প্রয়োজন হলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনাও করবে।“
ফিফা আশাবাদী যে কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের চলমান প্রচেষ্টা টুর্নামেন্ট-সংশ্লিষ্ট সবার জন্য নিরাপদ, সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করবে।