ঈদ গেলো, চ্যাম্পিয়নস লীগ গেলো, এখনও বিশ্বকাপের রং লাগেনি বাংলাদেশে

ঢাকার পোস্তগোলা থেকে গুলিস্তান, মিরপুর থেকে শাহবাগ। ফুটবল বিশ্বকাপের আগে এই সড়কগুলোতে চোখে পড়তো আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল কিংবা অন্যান্য দলের রঙিন পতাকা। ছাদে, বারান্দায়, দোকানের সামনে কিংবা অলিগলিতে বিশ্বকাপের আমেজ জানান দিতো বড় বড় ব্যানার আর সমর্থকদের পতাকা।

কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের কয়েকদিন আগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। এখনও তেমনভাবে চোখে পড়ছে না বিশ্বকাপের পতাকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন। প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে কি আগের মতো বিশ্বকাপ উন্মাদনা আর নেই?

‘আগের মতো উত্তেজনা নেই’

অনেকেই মনে করছেন আগের তুলনায় বিশ্বকাপ নিয়ে উৎসাহ কমে গেছে।

খন্দোকার সাজিদ আহমেদ লিখেছেন, “আগে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার এক মাস আগে থেকেই মানুষের মধ্যে যে উত্তেজনা কাজ করতো, এবার সেটা তুলনামূলক অনেক কম।”

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন জিষ্ণু চক্রবর্তী। তিনি লিখেছেন, “এই কয়েকদিনে চারটা জেলা ঘুরলাম, কিন্তু উল্লেখযোগ্যভাবে পতাকা দেখলাম না।”

অনেকে মনে করছেন, বিশ্বকাপের ঐতিহ্যবাহী ‘পতাকা সংস্কৃতি’ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

উদয় সিনা মন্তব্য করেছেন, “জার্সি ভালোই দেখা যাচ্ছে শহরে এমনকি গ্রামেও। তবে পতাকা টাঙানোর চর্চাটায় বিগত বছরগুলাতেই ছেদ পড়েছে। এবার আরও বেশি পড়েছে।”

অর্থনৈতিক বাস্তবতা কি কারণ?

কিছু মন্তব্যে উঠে এসেছে অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টিও। সালেহ আহম্মদ লিখেছেন, “এবার দেশের পাবলিকের পকেটে টাকা নাই।”

যদিও এই দাবির পক্ষে কোনো পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হয়নি, তবে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, উৎসবমুখর পতাকা টাঙানো বা বাড়তি খরচের বিষয়গুলো এখন আগের মতো অগ্রাধিকার পাচ্ছে না।

ক্লাব ফুটবলের উত্থান

বিশ্বকাপের জনপ্রিয়তা কমেছে কি না, সে প্রশ্নে আরেকটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন কয়েকজন সমর্থক।

বিধান চৌধুরী লিখেছেন, “আগের মতো ক্রেজ নাই। কারণ অনেকে এখন ক্লাব ফুটবল দেখে। অবশ্য কাপ শুরু হলে ক্রেজ বাড়বে।”

গত এক দশকে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের ব্যাপক সম্প্রচার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের তরুণ দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। ফলে চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের অপেক্ষা আগের তুলনায় কম অনুভূত হতে পারে বলে মনে করেন অনেকে।

‘সব আলোচনা এখন ফেসবুকে’

কেউ কেউ মনে করছেন, উন্মাদনা কমেনি, বরং তার প্রকাশের ধরন বদলে গেছে।

মো. সামরাত হোসেনের ভাষায়, “এখন যত আলোচনা সব ফেসবুকে।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সমর্থনের প্রকাশ অনেকাংশেই অনলাইনে চলে গেছে। আগে যেখানে বাড়ির ছাদে বা রাস্তায় পতাকা টাঙিয়ে দল সমর্থন করা হতো, এখন অনেকেই তা করছেন প্রোফাইল ছবি, ভিডিও বা রিলের মাধ্যমে।

এই প্রসঙ্গে সাইখ সাজ্জাদ আহমদ ফাহিম মন্তব্য করেছেন, “পতাকার চেয়ে রিল বানানোতে ফোকাস করতেছে।”

তবে সবাই যে উন্মাদনা কমে গেছে বলে মনে করছেন, তা নয়। অনেকের মতে, সময় এখনও আসেনি।

মোহনা হোসেন লিখেছেন, “ঈদের ছুটির পর পুরা আমেজ পাওয়া যাবে মনে হয়।”

জুয়েল মারাকের মন্তব্য, “ঈদ তো মাত্র গেল। কয়টা দিন অপেক্ষা করেন।”

একই ধরনের মত দিয়েছেন আনিসুর করিম, জাহেদুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান শাওন। তাদের ধারণা, ঈদের ব্যস্ততা কাটলে এবং বিশ্বকাপ আরও কাছে এলে সমর্থকদের উৎসাহ দৃশ্যমান হবে।

রাজধানীতে পতাকার উপস্থিতি কম হলেও দেশের কিছু এলাকায় বিশ্বকাপের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন।

তাওসিফ হোসেন খান লিখেছেন, “গ্রামে শুরু হয়ে গেছে দেখলাম।”

বাংলাদেশে বিশ্বকাপ উন্মাদনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শহর ও গ্রামের সমান অংশগ্রহণ। অতীতে দেখা গেছে, অনেক গ্রামে কয়েকশ ফুট দীর্ঘ পতাকা কিংবা সমর্থকদের মিছিল জাতীয় সংবাদেও জায়গা করে নিয়েছে।

বিশ্বকাপ সংস্কৃতির পরিবর্তনের পেছনে প্রজন্মগত পরিবর্তনের কথাও উঠে এসেছে মন্তব্যে।

সুমন মণ্ডল লিখেছেন, “জেনারেশন পাল্টে গেছে ভাই। বিশ্বকাপের সময় মিছিল হতো আগে, মুড়ি-চানাচুর খেতাম।”

এই মন্তব্যে ফুটে উঠেছে এক ধরনের নস্টালজিয়া। যেখানে বিশ্বকাপ ছিল শুধুমাত্র খেলা নয়, বরং পাড়া-মহল্লার সামাজিক আয়োজনেরও অংশ।

উন্মাদনা কি সত্যিই কমেছে?

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে বাংলাদেশের রাস্তায় পতাকার সংখ্যা কম দেখা গেলেও, তা বিশ্বকাপের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার প্রমাণ কিনা, সে প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থনের স্থানান্তর, ক্লাব ফুটবলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং ঈদ-পরবর্তী সময়- সব মিলিয়ে এবারের চিত্র ভিন্ন হতে পারে।

তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বিশ্বকাপের প্রথম বাঁশি বাজার পরই বাংলাদেশে ফুটবল উন্মাদনা নতুন মাত্রা পেতে পারে। তখন হয়তো মিরপুর, শাহবাগ কিংবা গুলিস্তানের আকাশেও আবার উড়তে দেখা যাবে পরিচিত নীল-সাদা কিংবা হলুদ-সবুজ পতাকা।