দ্য ক্রাইসিস ম্যান ফর বাংলাদেশ

এখন তো বলাই যায়, লিটন কুমার দাস বাংলাদেশের ক্রিকেটে সেই নাম, যাকে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে দলের বিপদের সময়। ব্যাট হাতে তিনি নামেন, আর ভাঙা ইনিংসে আবারও প্রাণ ফেরার আশা জাগে। অনেকের কাছে তিনি প্রতিভাবান, কারও কাছে অপূর্ণ সম্ভাবনার গল্প। তবে কঠিন সময়ে দলের জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়ার যে ক্ষমতা, সেটাই লিটনকে আলাদা করে দিয়েছে।

লিটন দাসের শুরুটা ছিল আশাজাগানিয়া। অভিষেক ম্যাচেই বড় কিছু করেননি, কিন্তু ভারতের বিপক্ষে ৪৫ বলে ৪৪ রানের ইনিংসটি বুঝিয়ে দিয়েছিলো তার ভেতরে বিশেষ কিছু আছে। পরের ম্যাচেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে করেন ৫০। তখনই মনে হয়েছিলো, বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন এক ব্যাটার উঠে আসছে, যিনি শুধু সুন্দর শট খেলবেন না, দায়িত্বও নিতে পারবেন।

আজ লিটন দাস বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের অন্যতম প্রধান মুখ। তবে তার ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান দেখলে হয়তো পুরো গল্পটা বোঝা যাবে না। ৯৩ ইনিংসে ৬টি শতক, ১৯টি অর্ধশতক আর গড় ৩৫। সংখ্যাগুলো মাঝারি মানের মনে হতে পারে। কিন্তু এই শতকগুলোর পেছনের পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায়, কেন তাকে আলাদা করে দেখা হয়।

প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির জন্যই তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ছয় বছর। এর আগে ছিলো ৭০, ৯৪ আর ৯৫ রানের আক্ষেপ। কিন্তু একবার শতকের দরজা খুলতেই লিটন যেন বারবার নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন দলের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোতে।

গত পাঁচ-ছয় বছরে বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে নিয়মিত জিততে শুরু করেছে। বিশেষ করে মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে নিউজিল্যান্ডকে হারানোর পর দল বুঝতে শিখেছে, শুধু স্পিন সহায়ক উইকেট নয়, বিদেশের কঠিন কন্ডিশনেও জেতা সম্ভব। কিন্তু একটি পুরনো সমস্যা থেকেই গেছে। টপ অর্ডারের ধস। আর সেই ধস সামলানোর কাজটিই বহুবার করতে হয়েছে লিটন দাসকে।

২০২১ সালে চট্টগ্রামে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ যখন ৪৯ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বিপদে, তখন লিটন একাই লড়াইটা চালিয়ে যান। তিনি আউট হন ১২১ রান করে, দলের স্কোর তখন ২৫৫ রানে ৫ উইকেট। সেই ইনিংস বাংলাদেশকে ম্যাচে ফেরার স্বপ্ন দেখিয়েছিলো।

এরপর ক্রাইস্টচার্চে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আসে আরেকটি শতক। সেদিন দলের অন্য ব্যাটাররা খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। বাংলাদেশের মোট রান ছিল ২৭৮, তার মধ্যে লিটনের একারই ১০২। কঠিন কন্ডিশনে সেই ইনিংস তার টেকনিক আর মানসিক দৃঢ়তার বড় প্রমাণ হয়ে আছে।

২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও একই দৃশ্য। বাংলাদেশ তখন ২৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বিপর্যস্ত। সেখান থেকে মুশফিকুর রহিমকে নিয়ে দারুণ জুটি গড়েন লিটন। তিনি করেন ১৪১ রান। আউট হওয়ার সময় দলের স্কোর ২৯৬ রানে ৬ উইকেট। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ তোলে ৩৬৫ রান। সেই ইনিংসেও ছিল ধৈর্য, সৌন্দর্য আর দায়িত্ববোধের মিশেল।

তবে এই টেস্টের আগে লিটনের সবচেয়ে স্মরণীয় ইনিংস ছিলো রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে। বাংলাদেশ তখন মাত্র ২৬ রানে হারিয়েছে ৬ উইকেট। সেখান থেকে লিটন খেলেন ১৩৮ রানের অসাধারণ এক ইনিংস। তিনি আউট হন দলের ২৬২ রানের সময়। সেই ইনিংস শুধু একটি ম্যাচই বাঁচায়নি, সিরিজ জয়ের ভিতও গড়ে দিয়েছিলো।

আর এবারও তিনি দেখালেন কেন তাকে এখন বাংলাদেশের ‘ক্রাইসিস ম্যান’ বলা হচ্ছে। চাপের মুহূর্তে ব্যাট হাতে তার শান্ত থাকা, ফাঁকা জায়গা খুঁজে রান নেওয়া, আর সেই আলতো টোকায় চার মেরে শতক পূরণ করা যেন তার পুরো ক্যারিয়ারের প্রতিচ্ছবি। নিখুঁত, দৃষ্টিনন্দন এবং ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

লিটন দাসের ক্যারিয়ারে হয়তো আরও অনেক বড় ইনিংস আসবে। পরিসংখ্যানও বদলাবে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত একটাই থাকবে। দল যখন সবচেয়ে বেশি চাপে, তখনই তিনি সবচেয়ে বেশি ভরসা দেন।