জুনের ২৫ তারিখ। ক্যালেন্ডারের এই তারিখটা এলেই কেমন যেন একটা চেনা নীরবতা বুকের ভেতর এসে ভর করে। আমরা যারা 'আর্লি মিলেনিয়াল'—অর্থাৎ আশির দশকে শুরুর দিকে যাদের জন্ম আর নব্বইয়ের দশকে যাদের সোনালী শৈশব-কৈশোর কেটেছে—আমাদের বড় হয়ে ওঠার গল্পটা আজকের জেনারেশনের চেয়ে একদম আলাদা ছিল। আমাদের জেনারেশনের বাইরের পৃথিবীকে প্রথমবার এক ধাক্কায় চেনার পেছনে একটা নির্দিষ্ট সাউন্ডট্র্যাক ছিল। সেই সাউন্ডট্র্যাকের নাম মাইকেল জ্যাকসন।
স্মৃতিটা এখনো খুব পরিষ্কার। তখনো আমাদের দেশে ইন্টারনেটের জন্ম হয়নি। ডিশের লাইনও সবার ঘরে পৌঁছায়নি। বিটিভির পপ সংগীতের অনুষ্ঠান, ক্যাসেট প্লেয়ার আর ভিসিআর ক্যাসেটই ছিল আমাদের বাইরের দুনিয়ার গান চেনার একমাত্র ভরসা। ঠিক সেই সময়ে, আশির দশকের শেষের দিকে, একদিন একটা গান কানে এলো। গান শুরু হওয়ার ঠিক আগের সেই সাউন্ড এফেক্টটা—একটা কাঠের দরজা খোলার মড়মড় শব্দ, ভারী একটা পায়ের আওয়াজ, আর তারপরই হাড় কাঁপানো একটা নেকড়ের ডাক!
হ্যাঁ, থ্রিলার-এর কথাই বলছি।
আজকের দিনে ইউটিউব বা স্পটিফাইয়ের অ্যালগরিদমের চোখের সামনে সেকেন্ডের মধ্যে লাখ লাখ গান এনে ছুঁড়ে দেয়ার বাস্তবতায় হয়তো সেই রোমাঞ্চটা বোঝানো কঠিন। কিন্তু সেই সময়ে, বাংলাদেশের যেকোন শহরের একটা ড্রয়িংরুমে বসে ওই নেকড়ের ডাক আর ভারী বেসলাইনের গানটা শোনা কোনো সাধারণ অভিজ্ঞতা ছিল না। ওটা ছিল আমাদের একটা অন্য জগতে, একটা নিষিদ্ধ এবং তুমুল সিনেমাটিক দুনিয়ায় প্রবেশের টিকিট।
আমরা মিলেনিয়ালরা, যারা ওই সময় বড় হচ্ছিলাম, আমাদের কাছে মাইকেল জ্যাকসন কেবল একজন পপ তারকা ছিলেন না; তিনি ছিলেন আমাদের স্কুল ফাঁকি দেওয়া দুপুরের, আমাদের অডিও ক্যাসেটের ফিতা পেনসিল দিয়ে ঘোরানোর যুগের এবং আমাদের অবাধ্য কৈশোরের একচ্ছত্র সম্রাট।
কিন্তু আজ, ২৫এ জুন তার চলে যাওয়ার এতগুলো বছর পর, যখন আবার সেই গানগুলো শুনি, তখন মনের ভেতর একটা ভারী, জটিল দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। সময়ের দূরত্ব এখন আমাদের চোখ থেকে সেই রঙিন চশমাটা খুলে দিয়েছে।
সিকুইন বসানো চকচকে গ্লাভস আর চাঁদের বুকে হাঁটার মতো সেই বিখ্যাত ‘মুনওয়াক’-এর মোহগ্রস্ত আলো পেরিয়ে আজ যখন তাকাই, তখন মাইকেলের জীবনের এক অদ্ভুত দ্বিমুখী রূপ চোখে পড়ে। এক অবিশ্বাস্য চূড়ায় ওঠা, আর ঠিক তার সাথেই অতলান্ত এক মানবিক ট্র্যাজেডির গল্প। আর তার চেয়েও বড় কথা, মাইকেলের এই উত্থান আর পতন আসলে আমাদের নিজেদের ভেতরের এক নির্মম সত্যকে আয়নার সামনে এনে দাঁড় করায়।
একটি যুগের রূপকার: গ্যারি থেকে গ্র্যামি
মাইকেলের এই অবিশ্বাস্য ‘ট্রায়াম্ফ’ বা বিজয়ের গল্পটা বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরতে হবে। গল্পটা আসলে আমেরিকার ব্ল্যাক সংস্কৃতির শিকড় থেকে উঠে আসা এক লড়াইয়ের গল্প। আমেরিকার বর্ণবাদের ইতিহাসে ‘গ্রেইট মাইগ্রেশন’ বা কৃষ্ণাঙ্গদের স্থানান্তরের একটা বড় ভূমিকা আছে।
মাইকেলের বাবা, জো জ্যাকসন, আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল থেকে তার পরিবারকে নিয়ে এসেছিলেন ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গ্যারি নামের একটি শিল্পনগরীতে। ইস্পাত কারখানার সেই ধোঁয়া আর কঠোর পরিশ্রমের পরিবেশে জন্ম হয়েছিল ‘জ্যাকসন ফাইভ’ ব্যান্ডের। জো জ্যাকসন তার ছেলেদের ওপর যে কঠোর, প্রায় সামরিক কায়দায় পারফেকশনের জন্য চাপ দিতেন, তার পেছনে একটা নির্মম সত্য লুকিয়ে ছিল—আমেরিকায় একজন কৃষ্ণাঙ্গকে টিকে থাকতে হলে শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে দ্বিগুণ যোগ্য হতে হবে।
১৯৭৯ সালে যখন মাইকেল কিংবদন্তি সঙ্গীত প্রযোজক কুইন্সি জোন্সের সাথে তার একক অ্যালবাম অফ দ্য ওয়াল রিলিজ করলেন, তখন তিনি যেন সব শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে এলেন। আর ১৯৮২ সালের থ্রিলার তো ইতিহাসকে নতুন করে লিখল। আরএনবি, পপ, রক আর গসপেল মিউজিক জনরাগুলোকে এমন এক ছাঁচের মধ্যে তিনি ফেললেন, যা একাধারে ছিল গ্লোবাল, আবার একই সাথে ছিল খাঁটি ব্ল্যাক মিউজিক।
এক সময় আমেরিকার এমটিভি কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের গান চালাতো না। মাইকেল জ্যাকসন তার সিনেমাটিক শর্ট ফিল্ম (যেগুলোকে আমরা মিউজিক ভিডিও বলি) দিয়ে সেই বর্ণবাদের দেয়াল গুঁড়িয়ে দিতে বাধ্য করেছিলেন। মিউজিক ভিডিওকে সস্তা প্রচারণার হাতিয়ার থেকে শিল্পের এক সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন মাইকেল।
বিশ্বজুড়ে থ্রিলার অ্যালবামের প্রায় ১০ কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছিল। তিনি শুধু গান গাইতেন না, ছিলেন পুরোদমে একজন পারফর্মার; এন্টারটেইনার। নিখুঁত কোরিওগ্রাফি, স্টাইল—সবকিছু মিলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে চেনা মানুষ। গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের প্রথম আসল আইকন ছিলেন মাইকেল জ্যাকসন।
ট্র্যাজেডির অতল গহ্বর এবং ভাঙা শৈশব
কিন্তু এই বিশাল সাফল্যের ঠিক উল্টো পিঠেই জমা হচ্ছিল এক তীব্র অন্ধকার। মাইকেল জ্যাকসনের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো তার জীবদ্দশাতেই তার তিল তিল করে ভেঙে যাওয়া, যা আমরা সারা পৃথিবীর মানুষ লাইভ টেলিভিশনে বসে দেখেছি।
যে মানুষটা সারা জীবন নিজের হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে খুঁজে বের করার জন্য ‘নেভারল্যান্ড’ নামের এক রূপকথার রাজত্ব তৈরি করেছিলেন, সেই রাজত্বই এক সময় তার জন্য একটা অভিশপ্ত দুর্গ হয়ে দাঁড়াল।
ছোটবেলায় বাবা জো জ্যাকসনের কড়া শাসন আর নির্মম মারধরের কারণে মাইকেল কোনোদিন সাধারণ বাচ্চাদের মতো খেলতে পারেননি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পারেননি। বড় হয়ে তিনি যখন কোটি কোটি টাকার মালিক হলেন, তখন তিনি সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে বানাতে চাইলেন। নিজের বাড়িতে বানালেন চিড়িয়াখানা, থিম পার্ক, রাইড। কিন্তু সমাজ বা মিডিয়া এই একাকী, ট্রমাটাইজড মানুষটার ভেতরের ক্ষতটাকে বুঝতে চায়নি।
নব্বইয়ের দশক থেকে, আমরা যখন স্কুলে পড়ি, তখন থেকেই শুরু হলো তার সেই বিখ্যাত পতন। একদিকে তার গায়ের রঙের অদ্ভুত পরিবর্তন—যা পরে জানা যায় ‘ভিটিলিগো’ বা শ্বেতী রোগের কারণে হয়েছিল, একের পর এক প্লাস্টিক সার্জারি, লিসা মেরি প্রিসলির সাথে সেই অদ্ভুত বিয়ে—সবকিছু মিলে মিডিয়া তার নাম দিল ‘ওয়াকো জ্যাকো’ অর্থাৎ পাগলা জ্যাকসন।
আর আমাদের কৈশোরে আর তারুণ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এলো ১৯৯৩ এবং ২০০৩ সালে, যখন তার বিরুদ্ধে শিশু যৌন নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ আনা হলো। আদালত তাকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছিল, কিন্তু ততদিনে মাইকেল জ্যাকসন নামক সেই সোনালী মিথটি পুরোপুরি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে।
২০০৯ সালের সেই অভিশপ্ত জুনের দুপুরটা—আমার মতো মিলেনিয়ালরা অনেকেই তখন কেবল ক্যারিয়ার শুরু করেছে বা ইউনিভার্সিটি লাইফ পার করছে। লন্ডনে থেকে শুরু হতে যাওয়া দিস ইজ ইট নামের ৫০টি কনসার্টের এক মহাকাব্যিক সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মাইকেল। প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, সব কেলেঙ্কারি আর অপবাদের ঊর্ধ্বে উঠে ‘কিং অব পপ’ এখনো সিংহাসনেই আছেন।
রিহার্সালের যে ভিডিওগুলো পরে সামনে এসেছে, সেখানে দেখা গেছে ৫০ বছর বয়সেও তার সেই নাচ আর গলার ধার কমেনি। কিন্তু পর্দার পেছনের শরীরটা আর নিচ্ছিল না। তীব্র ইনসোমনিয়া বা অনিদ্রা আর নিখুঁত পারফরম্যান্স দেখানোর সেই আদিম মানসিক চাপ তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে তিনি ‘প্রোপোফল’এর মতো তীব্র ব্যাথানাশক ওষুধ ছাড়া ঘুমাতেই পারতেন না। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক, যিনি নিজের পেশাগত শপথ ভুলে মাইকেলকে প্রতিদিন সেই বিষের মতো ড্রাগের জোগান দিতেন, তার অবহেলাতেই শেষ হয়ে গেল একটি যুগ।
মৃত্যুর পর যখন তার ময়নাতদন্তের রিপোর্ট সামনে আসে, তা দেখে পুরো পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। পাঁচ ফুট ৯ ইঞ্চির সেই পপ সম্রাট, যিনি স্টেজে উঠলে লাখ লাখ মানুষ মূর্ছা যেত, মৃত্যুর সময় তার ওজন ছিল মাত্র ৬১ কেজি। শরীরে কোনো চর্বি ছিল না, পেটে খাবারের বদলে ছিল কেবল ওষুধের অবশিষ্টাংশ। মাথায় চুল না থাকায় পরতে হতো পরচুলা, ঠোঁটে ছিল গোলাপী ট্যাটু, আর পুরো শরীর জুড়ে ছিল শত শত সুই ফোটানোর দাগ।
যে মানুষটা ‘হিল দ্য ওয়ার্ল্ড’ গেয়ে পুরো পৃথিবীকে সুস্থ করার স্বপ্ন দেখাতেন, তিনি নিজে একা, মানসিকভাবে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় একটা নিঃসঙ্গ ঘরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।
আমাদের সংস্কৃতি এবং মাইকেলের আয়না
মাইকেলের জীবন-মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যা কোনো একজন মানুষকে প্রথমে দেবতার আসনে বসায়, তারপর পরম সুখে তার সেই দেবতারূপের পতন উপভোগ করে।
আমরাই মাইকেলকে সেই অসম্ভব পারফেকশনের সিংহাসনে বসিয়েছিলাম। তিনি একটু অদ্ভুত আচরণ করলে আমরাই ট্যাবলয়েডের পাতা গোগ্রাসে গিলতাম, আবার যখন তিনি আইনি লড়াইয়ে ভেঙে পড়তেন, তখন আমরাই সবচেয়ে বড় বিচারক সেজে বসতাম। এই দ্বিমুখী আচরণটা শুধু আমেরিকার ছিল না, আমাদের এই বাংলাদেশেও ছিল।
মনে আছে, ২০০৯ সালে যখন তার মৃত্যুর খবর ব্রেকিং নিউজ হিসেবে এল, তখন ঢাকার রাস্তাঘাটে, চায়ের দোকানে কী আলোচনা হচ্ছিল? কেউ বলছিলেন, “আহা, লোকটা অনেক বড় শিল্পী ছিল”, আবার কেউ খুব অবলীলায় বলে দিচ্ছিলেন, “ভালোই হইছে, লোকটার চরিত্র তো ভালো ছিল না।” কোনো একজন মানুষের ভেতরের ট্রমা, নিঃসঙ্গতা আর সিস্টেমের শিকার হওয়াটাকে আমরা খুব সহজেই একটা সাদা-কালো জাজমেন্টের ফ্রেমে বেঁধে ফেলি।
কিছুদিন আগেই সিএনএন-এর একটা পুরোনো ক্লিপ দেখছিলাম, যেখানে একজন কৃষ্ণাঙ্গ অ্যাক্টিভিস্ট মাইকেলের মৃত্যুর ঠিক পরপরই একটা দারুণ কথা বলেছিলেন: "আমি মাইকেল জ্যাকসনকে ভালোবাসতাম। আমি মাইকেল জ্যাকসনকে ঘৃণা করতাম। আমি তাকে যেমন ভীষণ শ্রদ্ধা করতাম, ঠিক তেমনি মাঝেমধ্যে তার কিছু কাণ্ডের জন্য নিজের ভেতর এক ধরনের লজ্জাও অনুভব করতাম।"
এই লাইনটাই বোধহয় আমাদের মতো মিলেনিয়াল ভক্তদের মনের আসল কথা। আমরা যারা তার গান শুনে বড় হয়েছি, আমরা জানি, থ্রিলার বা বিলি জিন -এর সেই অসামান্য প্রতিভাকে যেমন অস্বীকার করা যাবে না, ঠিক তেমনি তার জীবনের সেই অন্ধকার, বিতর্কিত আর ট্র্যাজিক অধ্যায়গুলোকেও মুছে ফেলা যাবে না। আমাদের এই দুই বৈপরীত্যকে একসাথে নিয়েই বাঁচতে হবে।
হলিউড বায়োপিক এবং অ্যালগরিদমের যুগে মাইকেল
আজকের এই ২০২৬ সালের দিকে তাকালে দেখা যায়, মাইকেল জ্যাকসন কিন্তু হারিয়ে যাননি। মৃত্যুর এত বছর পরেও তার এস্টেট প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার আয় করছে। আর এই তো কিছুদিন আগে হলিউডে মুক্তি পেয়ে গেল বায়োপিক ‘মাইকেল’ ।
এই সিনেমার প্রথম টিজার যখন ইন্টারনেটে রিলিজ হয়েছিল, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেটি ১১ কোটি ৬০ লাখেরও বেশি ভিউ পেয়েছিল! আর মুক্তির পর? বক্স অফিসে রীতিমতো সুনামি বইয়ে দিয়েছে সিনেমাটি। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯৬ কোটি ডলার আয় করে এটি ইতিমধ্যে ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে বেশি আয়কারী মিউজিক বায়োপিক হিসেবে রেকর্ড গড়েছে। পেছনে ফেলে দিয়েছে বোহেমিয়ান র্যাপসডি-এর মতো ব্লকবাস্টারকেও। এখন সিনেমাটি ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের ম্যাজিক্যাল ক্লাব ছোঁয়ার একদম দ্বারপ্রান্তে। ভাবা যায়?
আজকের দিনের টেলর সুইফট বা বিয়ন্সের মতো গ্লোবাল সুপারস্টারদের ডিজিটাল ট্রাফিক আর থিয়েটার কালেকশনকেও এক ধাক্কায় পেছনে ফেলে দিচ্ছেন দেড় দশকের বেশি সময় আগে মারা যাওয়া একজন মানুষ।
এর মানেটা কী? এর মানে হলো, এই ডিজিটাল যুগ, এই শর্ট আর রিলসের যুগে যেখানে প্রতিদিন নতুন নতুন ট্রেন্ড তৈরি হয় আর হারিয়ে যায়, সেখানেও আমরা মাইকেল জ্যাকসন নামের সেই মানুষটাকে ভুলে যেতে পারছি না। আমরা আজও সেই লুপের মধ্যেই আটকে আছি।
আজকের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি অনেক বেশি কর্পোরেট, অনেক বেশি এআই-নির্ভর। এখন একটা গান হিট করানোর জন্য কোটি টাকার পিআর ক্যাম্পেইন লাগে। কিন্তু মাইকেল যা তৈরি করেছিলেন, তা কোনো অ্যালগরিদম দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। তিনি তৈরি করেছিলেন একটা ‘গ্লোবাল পালস’।
আজও ঢাকার কোনো একটা গেট-টুগেদারে যখন হুট করে ‘ডোন্ট স্টপ টিল ইউ গেট এনাফ’ বেজে ওঠে, কিংবা জ্যামে আটকে থাকা বাসের জানালায় বসে কোনো মিলেনিয়াল যখন হেডফোনে ‘বিট ইট’ শোনে তখন মনে হয়, সময়টা যেন থমকে গেছে। এই গানগুলোর ভেতর একটা চিরন্তন শক্তি আছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে।
নেভারল্যান্ডের রাজপুত্রের বিদায়
আমাদের এই মিলেনিয়াল প্রজন্মের পেছনের খতিয়ান মেলাতে গেলে অনেক কিছুই ওলটপালট মনে হয়। শৈশবের সেই শান্ত ঢাকা শহরটা বদলে গেছে, ক্যাসেটের ফিতা পেনসিল দিয়ে ঘোরানোর সেই দিনগুলো হারিয়ে গেছে স্পটিফাইয়ের ভিড়ে। কিন্তু যখনই অলস কোনো সন্ধ্যায় থ্রিলার -এর সেই দরজা খোলার শব্দটা শুনি, মনের ভেতরের সেই স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাটা আবার জেগে ওঠে।
মাইকেল জ্যাকসনের জীবন আমাদেরকে উপলব্ধি করায় যে, সাফল্যের চূড়া আর চরম একাকীত্ব আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। মানুষ হিসেবে তিনি হয়তো পারফেক্ট ছিলেন না, তার জীবনে অনেক ভুল ছিল, অনেক অন্ধকার ছিল। কিন্তু সেই অন্ধকারের পেছনে যে এক অবুঝ, ভালোবাসা-বঞ্চিত শিশুর আর্তনাদ ছিল, তা আজ আর বুঝতে বাকি থাকে না।
পশ্চিমা দুনিয়া সবসময় সবকিছুকে খুব পরিষ্কারভাবে দেখতে চায়; হয় তুমি নায়ক, না হয় তুমি খলনায়ক। কিন্তু জীবন আসলে সাদা আর কালোর মাঝামাঝি একটা ধূসর ক্যানভাস। মাইকেল জ্যাকসন সেই ধূসর ক্যানভাসেরই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজিক হিরো।
কোনো জাজমেন্ট নয়, কোনো অন্ধ স্তুতিও নয়; একজন মিলেনিয়াল ভক্ত হিসেবে শুধু এটুকুই বলবো, তিনি আমাদের একটা জাদুকরী শৈশব দিয়েছিলেন। এক নিঃসঙ্গ, ভাঙাচোরা মানুষের ভেতরে যে কতটা ঐশ্বরিক আলো লুকিয়ে থাকতে পারে, মাইকেল জ্যাকসন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
নেভারল্যান্ডের সেই রাজপুত্র যেখানেই থাকুন, শান্তিতে থাকুন। আপনার সেই নেকড়ের ডাক আমাদের জেনারেশনের বুকের ভেতর চিরকাল প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে।
(জিয়াদ মুবাশ্বির ইসলাম, উপ সম্পাদক, আলাপ)