মুভি রিভিউ

বনলতা সেন: জীবনানন্দের কবিতার মতো ভিন্নধারার এক ছবি

জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতোই বিশুদ্ধ ঘরানার এক ছবি বনলতা সেন । বনলতা সেন আসলে কে—রহস্যময় এই প্রশ্নের রহস্যঘেরা এক ছবিও বনলতা সেন

উনপঞ্চাশ বাতাস -এর পরে মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের দ্বিতীয় ছবি। জীবনানন্দ দাশের কবিতার বিশ্লেষণ কিংবা কবিতা দৃশ্যায়নের এক সময়বন্দী ছবি বনলতা সেন ; কাব্য, রূপক ও প্রতীকধর্মী এক আলো ছায়াময় ছবি।

সময়বন্দী এক কবির জীবনের টানাপোড়েন, স্মৃতি,অন্তর্গত বেদনা, নিঃসঙ্গতা কিংবা বোধের এক কবিতাধর্মী ছবিও বনলতা সেন

তবে ঠিক কবি জীবনানন্দের বায়োপিক নয়। পুরো ছবিতে কাব্যধর্মী বিষন্নতা আর বনলতা সেনের পরিচয় বৃত্তান্ত যেমন আছে তেমনি কবি জীবনানন্দের জীবনের টানাপোড়েন, কাব্য সমালোচনা, তার কবিতায় অন্যান্যদের প্রভাব, রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা কিংবা বুদ্ধদেব বসুর খানিক প্রেরণা, সংসারের গঞ্জনা, প্রেম, বিয়ে কিংবা বিষন্নতা নিয়ে ট্রামের নীচে যাওয়া সব ফ্রেমবন্দী করার চেষ্টা আছে এই ছবিতে।

আছে বোধ,রহস্যময়তা, আলো-আঁধারি কিংবা রাতের নির্জনতা, চিল,সারস বা পেঁচার ডাক, আছে ঘাই হরিণীর বেদনা, ইঁদুর-শূকরের ঝাঁক, আছে বিস্তর প্রকৃতিময়তা।

চলচ্চিত্রটিতে বনলতা সেনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মাসুমা রহমান নাবিলা, মিলু বা জীবনানন্দের চরিত্রে খায়রুল বাশার, স্ত্রী লাবণ্য গুপ্তের চরিত্রে মায়মুনা মম, মহীনের চরিত্রে সোহেল মণ্ডল, প্রেমিকা শোভনার চরিত্রে রুপন্তী আকিদ, লীনা নাগ এর ভূমিকায় নাজিবা বাশার, কবি বুদ্ধদেব বসুর চরিত্রে শরীফ সিরাজ, রবীন্দ্রনাখের চরিত্রে গাজী রাকায়েত বনলতা বন্দোপাধ্যায় এর চরিত্রে প্রিয়ন্তী উর্বী,মুনিয়ার চরিত্রে সুমাইয়া পারভীন খুশিসহ আরো অনেকেই অভিনয় করেছেন বনলতা সেন  ছবিতে।

এই ছবিতে মনে রাখার মতো অভিনয় করেছেন প্রায় সবাই। তবে মাসুমা রহমান নাবিলা, খায়রুল বাশার, সোহেল মণ্ডল, নাজিবা বাশার, মম এবং রুপন্তীর কথা আলাদা করে বলা যায়।

২০২১-২২ অর্থবছরে অনুদানপ্রাপ্ত এই ছবির চিত্রনাট্য, গল্প বিন্যাস, সম্পাদনা ও পরিচালনায় ছিলেন মাসুদ হাসান উজ্জ্বল।

রেড অক্টোবর প্রযোজিত এই ছবির চিত্রগ্রহণে ছিলেন হৃদয় সরকার। শুটিং হয়েছে কলকাতা,নওগাঁ,নাটোর, রাজশাহী পুরান ঢাকা সহ একাধিক লোকেশনে।

এই ছবিতে তিনটি গানের কথা আলাদা ভাবে বলা যায়। খালি গলায় একটা রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহৃত হয়েছে ছবিতে।

বাপ্পা মজুমদার ও শাহান কবন্ধের লেখায় “এখানে কেউ নেই” শিরোনামের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন বাপ্পা মজুমদার। জীবনানন্দের গান থেকে অনুপ্রাণিত “দুজনে” শিরোনামের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন দোলা রহমান।

‘বনলতা সেন’ কবিতাটি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল ১৯৩৫ সালে, কবিতার বইতে অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল ১৯৪২ সালে।

কালের মিথ, নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির গ্র্যাজুয়েট, নাকি পরিচিত কেউ অথবা গণিকা ছিলেন কি-না বনলতা সেন—সেই জিজ্ঞাসা বারবার এসেছে ছবিতে। রহস্যময়তা এখানে প্রধান।

আছে আমাকে খুঁজনা বহুদিন, হায় চিল সোনালি ডানার চিল, আট বছর আগের একদিন কবিতার মরিবার হলো তার সাধসহ আরও কয়েকটা কবিতার রূপকধর্মী দৃশ্যায়ন।

চোখে লাগার মতো দৃশ্যায়ন—হরিণ, চিল, পেঁচা, ইঁদুর কিংবা শূকরের পালসহ দৃশ্য সহজেই এই ছবির আলাদা বৈশিষ্ট্য।

ভিন্নধর্মী ছবিরও কিছু ভিন্নদিকও আছে। আলাদা আলাদা কবিতার পোট্রেট ভাবা হলেও কোথাও একটা বিচ্ছিন্নতা বোধ আছে।

যোগসূত্র মেলে না এমন কথাও মনে হতে পারে কারো কারো। রূপক ও প্রতীকধর্মী দৃশ্যগুলোর চিত্রায়নে পুনরাবৃত্তি মনে হতে পারে । নেই কবির বাবা কিংবা জীবানান্দের ছেলে-মেয়েদের কথা। সামান্যই আছে কবির মাতা কবি কুসুমকুমারী দেবীর কথা।

তবু বাংলা ছবির অগ্রযাত্রায় ভিন্নধর্মী কবিতাময় এক ছবি বনলতা সেন , যার ভাষা স্পষ্টতই আলাদা। মহাকালের ভাবনা, মিথ আর বৌদ্ধদর্শনের প্রতি কবি জীবনানন্দের দুর্বলতা, বাংলার প্রকৃতির সবচেয়ে বিশুদ্ধ প্রেমিকের উপস্থাপনের এমন ছবিও ঈদে মুক্তি পেতে পারে যা প্রচলিত ছবির একবারে বিপরীত মেরুর ঘরানার।

মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালিত বনলতা সেন  ছবির টিমকে তাই আলাদা অভিনন্দন জানানো যেতে পারে।

 

জয় হোক বাংলা ছবির!