ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের জন্য ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। ইশতেহারে বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিগত ১৭ অক্টোবর ২০২৫ জুলাই সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে সেগুলো সে মতো বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
শুক্রবার বিকেলে ঢাকার হোটেল সোনারগাঁওয়ে এই নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে এবারই প্রথম ইশতেহার ঘোষণা করলেন তিনি।
এর আগে পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম এবং নবম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি। প্রতিটিতেই দলের নেতৃত্ব দেন বেগম খালেদা জিয়া এবং তিনিই প্রতিটি নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন।
ইশতেহারে প্রতিটি পরিবারের জন্য 'ফ্যামিলি কার্ড', 'ফ্যাসিস্ট আমলে' মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের আশ্বাস এবং বিগত সময়ে নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এবারের নির্বাচনি ইশতেহারকে পাঁচটি অধ্যায়ে ভাগ করেছে বিএনপি। সেগুলো হলো, রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন, ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার, অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন এবং ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি।
রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কারকে আবার পাঁচ ভাগে ভাগ করেছে বিএনপি। এর মাঝে আছে – গণতন্ত্র ও জাতিগঠন; মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থান; সাংবিধানিক সংস্কার; সুশাসন এবং স্থানীয় সরকার।
ইশতেহারের দ্বিতীয় অধ্যায়ের আলোচনা করা হয়েছে দারিদ্র্য নিরসন ও সামাজিক সুরক্ষা; নারীর ক্ষমতায়ন; কৃষক, কৃষি উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য; দেশব্যাপী কর্মসংস্থান; যুব উন্নয়ন; শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন; স্বাস্থ্যসেবা; শ্রম ও শ্রমিক কল্যাণ; বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ; বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী সামাজিক ব্যাধির সমস্যা; পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়ন; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ; প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ; পানিসম্পদ পরিকল্পনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিএনপির পরিকল্পনা কী তাই নিয়ে।
ইশতেহারের তৃতীয় অধ্যায়ে দলটি ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার নিয়ে কথা বলেছে। সেখানে ঠাঁই পেয়েছে, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ, বেসরকারি খাত উন্নয়ন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানখাত সংস্কার, পুঁজিবাজার সংস্কার ও উন্নয়ন, বাণিজ্য সহজীকরণ ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ শিল্পখাত. কারু ও হস্তশিল্প এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি যোগাযোগ ও পরিবহন খাত, সুনীল অর্থনীতি, সৃজনশীল অর্থনীতির উন্নয়ন এবং রাজস্ব আয় ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো।
অন্যান্য দুই অধ্যায়ে অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন, ধর্ম সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি নিয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
৪৮ পৃষ্ঠার এই ইশতেহারে উঠে এসেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতাম বিচার বিভাগের বিচারপতি নিয়োগ, জুলাই হত্যার বিচারসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছু।
গুরুত্ব পেয়েছে যেসব বিষয়
মুক্তিযুদ্ধ
ইশতেহার ঘোষণার সময় মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই আন্দোলন নিয়ে কথা বলেছেন তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, “বিএনপি যখন ৩১ দফা দেয়, তখন জুলাই সনদের বিষয়টি তখন ছিল না। জাতি গঠন ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন জরুরি। জুলাই সনদের অনেককিছুর সাথে ৩১ দফার মিল আছে।”
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “আমরা দেখেছি, এটিকে কীভাবে একটি পরিবারের বা দলের করার চেষ্টা করে হয়েছে। তাই নিরপেক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংগ্রহ করা প্রয়োজন।”
ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের তালিকা তৈরি, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিতকরণ, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানানো এবং স্মৃতি সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
আর জুলাই অভ্যুত্থানের ব্যাপারে বলা হয়েছে, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহিদদের নামে সরকারি স্থাপনার নামকরণ হবে। শহিদদের সহায়তা প্রদান ও কল্যাণে আলাদা বিভাগ তৈরির কথাও বলা হয়েছে ইশতেহারে।
সংবিধান
ইশতেহার ঘোষণার সময় সংবিধান সংস্কার নিয়ে তারেক রহমান বলেন, আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষ মুসলমান। তাই সংবিধান সংস্কারে তারা ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং ‘সর্ব শক্তিমান আল্লাহ'র প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ কথাটিকে যুক্ত করতে চায়।
বক্তব্যের সময় তিনি মনে করিয়ে দেন যে,বিএনপি বাংলাদেশের সংবিধানে আগেই এই দুটো বিষয় যুক্ত করেছিলো।
এ ছাড়া কোনো ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবে না এবং দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী যেন একই ব্যক্তি না হয় সেই বিষয়টি সংবিধানে যুক্ত করা হবে বলেও ইশতেহারে বলা হয়েছে।
নারী
বিএনপির নির্বাচনি প্রচারে বারবার ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলা হচ্ছিল। ইশতেহারেও সেই প্রসঙ্গ এসেছে।
ইশতেহার ঘোষণার সময় বলা হয়েছে, দেশের প্রতিটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে 'ফ্যামিলি কার্ড' দেওয়া এবং নারীর নামে হবে এই কার্ড দেওয়া হবে।
এ ছাড়া নারীদের স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং নীতি নির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে ইশতেহারে।
কর্মসংস্থান
কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে ইশতেহারে বলা হয়েছে, স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সাথে পাঁচ লাখ সরকারি শূন্য পদে কর্মচারি নিয়োগ; বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়ন করা, পেনশন ফান্ড গঠন ও বেকারভাতা চালু।
এ ছাড়া আইটি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।
নারী, পুরুষ ও প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে বৈষম্যহীন বেতন এবং সবেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি চালু করার পরিকল্পনা আছে তাদের।
ইশতেহারে বেকার ভাতা প্রদান ও সবার জন্য ইন্টারনেট সুবিধা প্রদানের কথাও বলা হয়েছে। যুব উন্নয়নের অংশ হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং ট্রেনিং দেওয়ার কথা জানিয়েছে বিএনপি।
গণমাধ্যম
ইশতেহারে সাংবাদিকদের কাজের সুরক্ষা এবং গণমাধ্যমের ওপর আগ্রাসন প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতিও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে 'স্বাধীন রেগুলেটরি বডি' গঠন এবং ৩০ দিনের মধ্যে অনলাইন অভিযোগ নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে।
পরিবেশ
ইশতেহারে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরে ৫০ কোটি গাছ রোপনের পরিকল্পনার কথা বলছে দলটি। এক্ষেত্রে তারা যে এলাকায় যেই গাছ ভালো জন্মায়, সেখানে তারা সেই গাছ রোপন করবে। যেমন, ঢাকার জন্য নিম গাছ।
পরিবেশ রক্ষায় থ্রি আর (রিসাইকেল, রিডিউস, রিইউজ) পলিসি বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়েছে।
কৃষি
কৃষকদের ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফ করতে চায় বিএনপি। কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, খামারিদের জন্য 'কৃষক কার্ড' দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ক্ষুদ্রঋণের এক বছরের কিস্তি সরকার থেকে পরিশোধ করা হবে এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে ইশতেহারে।
পাশাপাশি, দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পাশাপাশি নদী খনন করে নৌ পথে চলাচলেও উন্নতি আনার কথা বলা হয়েছে ইশতেহারে।
এ ছাড়াও ব্যাংকিং খাত ও স্বশস্ত্র বাহিনীকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখতে চায় বিএনপি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে অন্য দেশের সাথে বন্ধুত্ব করার কথা বলছে দলটি।
ইশতেহার ঘোষণার সময় তিস্তার পানি নিয়েও কথা বলেছেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, "পদ্মা, তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর পানি বন্টন নিয়ে অসুবিধা আছে। যাদের সাথে অসুবিধা আছে, তাদের সাথে বসে এই সমস্যার সমাধান করতে চাই। যাতে আমার দেশের মানুষ পানির ন্যায্য হিস্যা পায়।”
বিএনপি'র প্রধান ৯ প্রতিশ্রুতি
বিএনপির ইশতেহারে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হলো—
১. প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে 'ফ্যামিলি কার্ড' চালু করে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থ সেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে।
২. কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে 'কৃষক কার্ড'-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বীমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষিখাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পাবেন।
৩. দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবাসহ রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
৪. আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা ও 'মিড-ডে মিল' চালু করা হবে।
৫. তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণসহ মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
৬. ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।
৭. পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যামে ১০ হাজার কিলোমিটার নদী–খালখনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ১৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে।
৮. ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে।
৯. ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিষ্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন, ও 'মেড ইন বাংলাদেশ' পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা হবে।
বিএনপি বলছে, এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা।
"বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা— এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে"- বলা হয়েছে ইশতেহারে।