স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে “একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের ইশতেহার” ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী।
আটটি প্রধান ভাগ বা স্তম্ভ ঠিক করে ৪১ দফার এই ইশতেহারে ২৬ টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ৫টি করে বিষয়ে 'হ্যাঁ' ও 'না' এর বিষয়ে জানানো হয়েছে।
বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে এই অনুষ্ঠান শুরু হয়।
ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহারে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা, ৬৪ জেলায় মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন ও যুব কর্মসংস্থান এবং নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি দেন জামায়াতে আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনার পাশাপাশি ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য অর্জনের কথাও জানিয়েছে জামায়াত।
চিকিৎসা ‘গলার কাঁটা’ হবে না
ইশতেহারে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের নিচে শিশু, ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে প্রবীণদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। কর্মক্ষম বয়সিদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি অংশ রাষ্ট্র বহন করবে পাশাপাশি চালু করা হবে জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা, যাতে নাগরিকদের চিকিৎসা ব্যয়জনিত চাপ কমে।
শফিকুর রহমান জানান, এখনকার স্বাস্থ্য সেবার অবস্থা ভালো না। তবে তারা দায়িত্ব পেলে চিকিৎসা নিতে গিয়ে মানুষের ‘গলায় কাঁটা ঢুকবে না’।
তিনি বলেন, “৫ বছর পর্যন্ত বয়সি শিশুদের স্বাস্থ্য সেবা সরকার দায়িত্ব নিয়ে ফ্রি করে দেবে। যারা অবসরে চলে গেছেন তাদের পূর্ণ চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্র নিবে। আর মাঝের যে বয়স, এদের কিছু দায়িত্ব নেবে রাষ্ট্র, কিছু নেবে ব্যক্তি।”
বেকার ভাতা নয়
জামায়াতের ইশতেহারে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আইসিটি ভিশন ২০৪০-এর আওতায় প্রতি বছর ৫০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান।
শিক্ষিত বেকারদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জামায়াত আমির বলেন, “যুবকদের বেকার ভাতা নয় কাজ তুলে দেব। বেকার ভাতা অপমানের শামিল।
শিক্ষিত যুবক যুবতীদের বেকারত্বের যন্ত্রনায় হাহাকার কেন? এই দেশটাতো এমন হওয়ার কথা ছিল না প্রশ্ন তুলে জামায়াত আমীর বলেন, “সম্পদের অভাব আমি স্বীকার করি না। অভাব যদি সম্পদের হতো তাহলে সাড়ে ১৫ বছরে আমাদের দেশ থেকে সাড়ে ২৮ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হলো কীভাবে?”
কেবল এই অর্থই লুটপাটের অর্থ নয়, এর বাইরেও অনেক অর্থ রয়ে গেছে বলেও জানান তিনি।
নারী সম্মান ও কর্মসংস্থান
গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ কর্মসূচির কথাও বলা হয়েছে জামায়াতের ইশতেহারে।
এ সময় নারী শ্রমিকদের জন্য কর্মঘণ্টা পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
তার ভাষায়,“যে সময়টুকু নারী শ্রমিক কাজ করবেন, তার দায় নেবে প্রতিষ্ঠান। বাকি সময়ের দায়িত্ব নেবে রাষ্ট্র। মায়েরা সমাজ গড়ে দেন, তাদের সম্মান রাষ্ট্রকে দিতেই হবে।”
অনেক সময় আট ঘণ্টা চাকরি করতে পারবে না বলে অনেক নারী চাকরিটাই ছেড়ে দেন জানিয়ে আমীর বলেন, “আমরা তো সেখানে তাদের জন্য সহজ করে দিচ্ছি। যাতে চাকরি তার ছাড়তে না হয়। ওটাও লেগে থাকবে, সন্তানও তার গায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে।”
এছাড়া নারীদের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিনিধি মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলেও অঙ্গীকার করা হয়েছে ইশতেহারে।
মানবিক রাষ্ট্রের অঙ্গীকার
ইশতেহারটি আটটি প্রধান ভাগে বিভক্ত, যার মধ্যে রয়েছে- বৈষম্যহীন মানবিক রাষ্ট্র, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, স্বনির্ভর কৃষি, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, যুব নেতৃত্বে প্রযুক্তি বিপ্লব এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আজ আমি বিশাল এক দায়িত্বের ভার কাঁধে নিয়ে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি। এই দায়িত্ব জামায়াতের পক্ষ থেকে নয়। এ দায়িত্ব ওই সমস্ত মানুষের পক্ষ থেকে যারা স্বাধীনতার ৫৪ বছরে তিলে তিলে স্বপ্নের জাল বুনেছিলেন যে তারা একটি সাম্য ও ন্যায় ইনসাফের বাংলাদেশ পাবেন।”
জামায়াতের আমীর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, “আমাদের সংকট সম্পদের অভাব নয়, সংকট সততা, দায়বদ্ধতা ও দেশপ্রেমের। আমরা সেই সংকট কাটিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে চাই।”
আরও যত প্রতিশ্রুতি
জামায়াত ক্ষমতায় গেলে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ‘আমার টাকা আমার হিসাব’ নামে আর্থিক স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল প্রমিজ ট্র্যাকার চালুর কথাও বলা হয়েছে।
পাহাড় ও সমতলের ব্যবধান কমিয়ে আনতে নিজেদের অবস্থানও পরিষ্কার করেছে জামায়াত। শফিকুর রহমান বলেছেন, “পাহাড়ে আশান্তি আমরা আর দেখতে চাই না। পাহাড়-সমতলের ব্যবধান ঘুচিয়ে আমরা সমতল করতে চাই।”
পাহাড় রক্ষায় যে ১০ হাজারের অধিক সেনা সদস্য জীবন দিয়েছে এর পেছনে কারা আছে সেগুলো খুঁজে বের করে যৌক্তিক সমাধানেরও অঙ্গীকার করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র বিষয়ে জামায়াত সবার সঙ্গে মানবিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা জানিয়েছে।
আমীর বলেন, “আমরা বিশ্বের সকল সভ্য দেশের সঙ্গে মানবিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করতে চাই।”
‘জনতার অংশগ্রহণে’ ইশতেহার
জামায়াত জানায়, অ্যাপভিত্তিক ‘জনতার ইশতেহার’ কর্মসূচির মাধ্যমে পাওয়া ৩৭ লাখের বেশি জনমত, জনগণের প্রত্যাশা ও পরামর্শ বিশ্লেষণ করে এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে।
আমীর তার বক্তব্যে বলেছেন, “আমাদের ইশতেহার তৈরিতে আমরা, জনতার কাছে তাদের অভিপ্রায়, অভিমত, আকাঙ্ক্ষা এবং তাদের পরামর্শ আমরা চেয়েছি। এই ইশতেহার তৈরিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ আমাদেরকে তাদের মত দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।”
ক্ষমতায় গেলে এক সঙ্গে চলবেন জানিয়ে জামায়াত আমীর বলেন- “আমাদের স্লোগান হবে- ‘চল এক সাথে গড়ি বাংলাদেশ’।”