ঢাকা-১৭ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এসএম খালিদুজ্জামানের ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ ও সেনা সদস্যের সঙ্গে আচরণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নির্বাচনমুখী রাজনীতিতে নতুন মাত্রার বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ঘটনাটি পরিকল্পিত কোনো নির্বাচনি কৌশল, নাকি একটি বিচ্ছিন্ন ও অনভিপ্রেত ঘটনা-এ প্রশ্ন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে তুমুল আলোচনা।
একই সঙ্গে উঠছে জামায়াত নেতার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন এবং নির্বাচনের মাঠে এই ঘটনার বাস্তব প্রভাব কতটা?
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় সাবেক সামরিক কর্মবর্তাদের একটি সংগঠন খালিদুজ্জামানকে প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার আলটিমেটাম দিয়েছে। ক্ষমা না চাইলে তাকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
এমন এক সময়ে এই বিতর্ক সামনে এলো, যখন আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে প্রার্থীরা ব্যস্ত প্রচার-প্রচারণা, জনসংযোগ ও প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতায়।
ঠিক সেই প্রেক্ষাপটে ঢাকা-১৭ আসনে জামায়াত প্রার্থীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই ঘটনাপ্রবাহ শুধু ব্যক্তি নয়, দলীয় অবস্থান ও নির্বাচনি কৌশল নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্কের অভিঘাত ভোটের সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ও পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনার ওপর।
কী ঘটেছিল
এসএম খালিদুজ্জামান ঢাকা সেনানিবাস এলাকায় অস্ত্রসহ প্রবেশের করলে চেকপোস্টে তাকে আটকে দেয় মিলিটারি পুলিশ।
আইনে না থাকায় মিলিটারি পুলিশ সদস্যরা ভিন্নপথ ব্যবহার করার পরামর্শ দেন। কিন্তু খালিদুজ্জামান ‘রুঢ় আচরণ’ শুরু করেন।
সেনাসদস্যের সঙ্গে তার আচরণের একটি ভিডিও মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে এই ঘটনা।
যদিও খালিদুজ্জামান দাবি করেছেন, ঘটনাটি কয়েকদিন আগে ঘটেছিল।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটিতে বারবার সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে তর্কে জড়াতে দেখা যায় খালিদুজ্জামানকে। সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, পক্ষপাতেরও অভিযোগ আনেন জামায়াত প্রার্থী।
খালিদুজ্জামানকে বলতে শোনা যায়, “পরিকল্পিতভাবে দেশটাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করছেন। দিজ ইজ টোটালি, কিছু অফিসারের জন্য সেনাবাহিনী বিতর্কিত হচ্ছে।”
“বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে আপনারা বিতর্কিত করছেন। প্রয়োজনে আমি সেনাপ্রধানের সঙ্গে কথা বলবো। এখানে যে দায়িত্বে আছেন, আপনি তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। কেন আমার গাড়ি আটকে রাখবেন?”
ভিডিওতে এক সেনাসদস্যকে বলতে শোনা যায়, “আমি তো আপনাকে যেতে নিষেধ করি নাই। আপনাকে বলেছি আপনি জাস্ট যান স্যার। কিন্তু আমাদের ক্যান্টনমেন্টে গান নিয়ে, অস্ত্র নিয়ে ঢোকা নিষেধ।”
এক পযায়ে খালিদুজ্জামানকে বলেন, “৫ আগস্টের পর অনেক সেনা অফিসার আমাদের পা ধরে ছিল। সময় সবার সবসময় এক যায় না।”
জামায়াত প্রার্থীর আচরণ নিয়ে প্রশ্ন
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়তেই নানা ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। জামায়াত প্রার্থীর আচরণ নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে। আবার সেনাসদস্যের বডি ক্যামে ধারণ করা ভিডিও কীভাবে সোশ্যায় মিডিয়াতে এলো তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ।
জামায়াতের প্রার্থীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার আলটিমেটাম দেয় সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন’ (ইএফএ)।
না হলে তাকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় পিএনজি (পারসোনা নন গ্রেটা- অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি) বা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার জোরালো দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
তবে এই দাবির সঙ্গে একমত নন নেত্র নিউজের সম্পাদক তাসনিম খলিল।
ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি বলেন, “ঢাকা-১৭ আসনে জামাতের প্রার্থী খালিদুজ্জামানকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় পিএনজি বা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছে এক্স-ফোর্সেস এসোসিয়েশন নামক অবসরপ্রাপ্ত ফৌজিদের একটি সংগঠন। ক্যান্টনমেন্ট ঢাকা-১৭ নির্বাচনী এলাকার একটি অংশ এবং সেখানে নির্বাচনী প্রচার করা খালিদুজ্জামানের গণতান্ত্রিক অধিকার। তার এই অধিকার কোনওভাবেই ক্ষুণ্ন বা খর্ব করা যাবে না।”
ঘটনাটি সামনে আসতেই দুঃখ প্রকাশ করেছেন এসএম খালিদুজ্জামান।
ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, “বেশকিছু দিন আগে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের গর্ব ও অহংকার, সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী সেনাবাহিনীর দায়িত্বরত সদস্যদের সঙ্গে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম নেয়।
“বিষয়টি ইতোমধ্যে সমাধান হওয়া সত্ত্বেও দুঃখজনকভাবে একটি স্বার্থান্বেষী মহল এই সমাধানকৃত ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা চালিয়ে পরিস্থিতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে।”
আল-জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ভিডিওটি পোস্ট করে লেখেন, “দেখুন একজন জামায়াত প্রার্থীর আচরণ। আইনের প্রতি তার কোনো শ্রদ্ধা নেই। সবাই জানেন যে সেনানিবাসে অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করা যায় না। তারপরও তিনি তা মানতে চান না।”
ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন আহম্মদ বলেন, “পৃথিবীতে যতগুলো সামরিক স্থাপনা, আপনার নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, কেপিআর- এগুলোতে চলাচলে বিধিনিষেধ থাকে। এখানে চাইলেই কেউ ঢুকতে পারবেন না।”
“চলাচলের স্বাধীনতা থাকতেই পারে, তার মানে এই না যে, যখন যেখানে খুশি যেতে পারবেন। সেনানিবাস তেমনই একটা এলাকা। এখানে চাইলেই অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করা যায় না,” আলাপ-কে বলেন তিনি।
সাবেক এই সেনাকর্মকর্তা মনে করেন, সেনাসদস্য দায়িত্বশীল পরিচয় দিয়েছে।
“এস এম খালিদুজ্জামান ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছেন। যার কারণে অনাকাঙ্খিত এই পরিস্থিতির সৃষ্টি। শান্তভাবে এই পরিস্থিতির সমাধান করা যেত।”
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কামরান রেজা চৌধুরী মনে করেন, খালিদুজ্জামানের এই তর্কে যাওয়াই ঠিক হয়নি।
“একজন এমপি পদপ্রার্থীরতো একটা সোলজারের সঙ্গে তর্কই করা উচিত না। এটা প্রটোকলে যায় না,” বলেন তিনি।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহম্মদ বাবরও তার আচরণের সমালোচনা করছেন।
“এটা হলো দায়িত্বহীনতা। অস্ত্র থাকবে শুধু সেনাবাহিনীর হাতে পুলিশের হাতে আনসারের হাতে বিজিবির হাতে -এদের হাতে। আমার আপনার যদি লাইসেন্স করা থাকত আমার ওন প্রটেকশনের জন্য, কিন্তু এটা নিয়ে তো ক্যান্টনমেন্টে ঢোকার কোন প্রয়োজন নাই,” আলাপ-কে বলেন তিনি।
সালাউদ্দিন বাবর বলেন, “ক্যান্টনমেন্ট ইজ এ ভেরি সিকিউর প্লেস। সেখানে তো আপনার অস্ত্র নিয়ে ঢোকা ঠিক না। এটা সে যেই হোক। আমি এটাকে সমর্থন করতে পারিনা।”
এই সাংবাদিক আরও বলেন, “এটিচিউড প্রমাণ করবে যে তারা দায়িত্বশীল কিনা। এই এটিচিউড আপনি যার কথা বললেন তিনি নিশ্চয়ই কোন রেন্সপনসেবল পারসন হতে পারেন না বলে আমি মনে করি।”
রাজনৈতিক কৌশল
খালিদুজ্জামানের এই আচরণ নির্বাচনি কৌশল হয়ে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন কামরান রেজা চৌধুরী।
তিনি বলেন, তার আসনের প্রতিপক্ষ তারেক রহমানকে সবাই চেনে। কিন্তু তিনি কোনো কেন্দ্রীয় নেতা না। এই ঘটনার পর সবাই তাকে চিনবে।
“সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা পারসেপশন আছে যে আর্মিরা যাকে সাপোর্ট করবে সেই জিতবে। এই আচরণ করে খালিদুজ্জামান বোঝাতে এই ঘটনার মাধ্যমে জনগণকে বোঝাতে পারেন, সেনাবাহিনী জাাময়াত অথবা অন্য কোনো দলকে সমর্থন করছে না,” বলেন সিনিয়র এই সাংবাদিক।
ভোটারদের ওপর প্রভাব
এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করেন সাবেক অবসরপ্রাপ্ত মেজর নাসির উদ্দিন। নির্বাচনে পরিবেশ বা নিরাপত্তায় এর কোনো প্রভাব পড়বে না বলেও মত দেন তিনি।
খালিদুজ্জামানের আচরণের কারণে জামায়াত ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মন্তব্য করেছেন সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর। তিনি বলেন, “এই এলাকায় অন্তত ওই সিটে তো ক্ষতিগ্রস্ত হবেই জামায়াত।”
তবে কামরান রেজা চৌধুরী বলেন, “নির্বাচনের ফল আসলে উনার একার ওপর নির্ভর করে না। ব্যক্তি প্রার্থী যতই ক্যারিশম্যাটিক হোক, দল হিসেবে জামায়াতের পারফরমেন্সই আসলে নির্ধারণ করবে নির্বাচনের ফল কী হবে।”
তিনি বলেন, “সবমিলে মনে হচ্ছে, এই ঘটনা সম্ভবত খালিদুজ্জামানের বিপক্ষেই যেতে পারে।”