আওয়ামী লীগের প্রতি সুর কেন নরম মির্জা ফখরুলের

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস গত তিন দশক ধরে বন্দি ছিল নির্দিষ্ট ছকে। যেখানে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মুখ দেখাদেখি বন্ধতো বটেই, এমনকি আক্রমণাত্মক এবং বিষোদগারপূর্ণ বক্তব্য ছিল রাজনীতির নিয়মিত অনুষঙ্গ।

‘শত্রু নির্মূল’ করার যে সংস্কৃতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেকড় গেড়েছিল, ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে সেখানে একধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

বিশেষ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

বাংলাদেশের চিরাচরিত রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দলের পতন মানেই বিরোধী দলের জন্য ‘বিজয় উৎসব’ আর পরাজিত পক্ষের জন্য ‘দেশত্যাগ’ বা ‘কারাবরণ’।

গত ১৫ বছরে বিএনপির নেতাকর্মীরা হাজার হাজার মামলার শিকার হয়েছেন, জেল খেটেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতির স্বাভাবিক নিয়মে বিএনপির ভাষা এখন হওয়ার কথা ছিল প্রতিশোধের। কিন্তু মির্জা ফখরুল হাঁটছেন উল্টো পথে।

তিনি বারবার বলছেন, “আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতি চাই না।” 

নিজ এলাকা ঠাকুরগাঁওয়ের প্রতিটি নির্বাচনি জনসভায় তিনি আওয়ামী লীগের তৃণমূলকর্মীদের উদ্দেশে বলছেন, “আপনাদের ভয়ের কিছু নেই, আপনারা এ দেশেরই নাগরিক।”

সুর নরম বিএনপি’র ‘ঘোরশত্রু’ আওয়ামী লীগেরও। 

দলটির নেত্রী ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি ভারতীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন বিএনপি যদি সরকার গঠন করে, তবে তিনি দলটিকে আহ্বান জানাবেন আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে ‘প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্র’ ফিরিয়ে আনতে।

“বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার অবদান অনস্বীকার্য,” জি ২৪ ঘন্টাকে ইমেইলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মঙ্গলবার এই কথা বলেছেন শেখ হাসিনা। 

রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তর নাকি সাময়িক কৌশল?

‘শত্রুকে’ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিএনপি মহাসচিবের এই ভাষা বাংলাদেশের ‘জিরো-সাম গেম’ রাজনীতিতে বিরল ঘটনা হলেও বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা এটিকে ‘রাজনৈতিক কৌশল’ হিসেবেই দেখছেন।

তাদের মতে ‘চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে’ রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিকরা জনগণের সমর্থন অথবা সহানুভূতি আদায়ের জন্য এ ধরনের বক্তব্য দিয়েই থাকে।  

এই মুহূর্তে এমন বক্তব্য দেওয়ার একটা কৌশলগত বার্তা আছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ।

মির্জা ফখরুল ভোট টানতে বলে থাকতে পারেন। কী হিসেবে বলেছেন জানি না তবে প্রিন্সিপালি আমি মনে করি, (আওয়ামী লীগের) যারা অন্যায় করেছে তাদের বিচার হবে কিন্তু অ্যাজ অ্যা হোল সবার বিচার করা ঠিক নয়,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

গেল ২৩এ জানুয়ারি বিএনপি মহাসচিব ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনি জনসংযোগের সময় বলেন,“আমরা (আওয়ামী লীগের) কর্মী-সমর্থকদের জানাতে চাই, আপনারা বিপদে পড়বেন না। আমরা আছি আপনাদের পাশে। যারা অন্যায় করেছে, তাদের শাস্তি হবে। যারা অন্যায় করেনি, তাদের কোনো শাস্তি হতে দেব না।”

খালেদা জিয়া ও বিএনপি নিয়ে শেখ হাসিনার মঙ্গলবারের বক্তব্যকে ‘আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্যাটার্নে নতুন মোড়’ হিসেবে অভিহিত করে আলতাফ পারভেজ যোগ করেন, “এই ধরনের বক্তব্য যদি তার কাছ থেকে ধারাবাহিকভাবে আসতে থাকে তাহলে সেটা অবশ্যই আশার কথা।”

তবে ‘রাজনৈতিক কৌশলের’ ব্যাপারটাও একদম উড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি। “নির্বাচনের পর রাজনৈতিক এনগেজমেন্ট বিএনপি’র সাথেই করতে হবে ভেবেও তিনি (শেখ হাসিনা) এই কথা বলে থাকতে পারেন।”

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ খান রবিউল আলমের মতে মির্জা ফখরুলের এই ধরনের বক্তব্যের পেছনে আছে ‘ভোটের সমীকরণ’।

“প্রো-ইসলামিক ফোর্সের ভোটের যেহেতু পোলারাইজেশন হয়েছে, তাই এখন ভোটারদের সহানূভুতি টানতে কৌশল হিসেবে এটি বেছে নেওয়া হয়েছে,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

রবিউল আলম মনে করছেন যখনই প্রতিপক্ষের কোন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়, তখনই ‘সিমপ্যাথি গ্যাদার’ করার জন্য এই ধরনের বক্তব্য আসছে।

“এই সবই আসলে সমর্থন বাড়ানোর স্ট্র্যাটেজি,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

গবেষক আলতাফ পারভেজ অবশ্য কিছুটা আশাবাদী। তার মতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা ‘শত্রুতার চক্র’ চলতে থাকে।

বাংলাদেশে প্রতিশোধের চক্র বন্ধ হওয়া উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, “মির্জা ফখরুল যদি এই অর্থে বলে থাকেন তবে সেটা ঠিক আছে।” 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও সাবেক সাংবাদিক সাহেদ আলম অবশ্য বলছেন জামায়াতে ইসলামী “অনেক আগে থেকেই” আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে আসছে ভোট বাড়ানোর জন্য।

“পার্থক্য এটাই, যে তিনি (মির্জা ফখরুল) ব্যাপারটা খোলাখুলি ভাবে বলছেন,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

আওয়ামী লীগের ‘দৃশ্যমান ও অদৃশ্য’ সমর্থন এবারের নির্বাচনে অনেক কিছুই নির্ধারণ করতে পারে মন্তব্য করে সাহেদ আলম বলেন, “এই ভোট কখনো বলা হয় ১৭ শতাংশ আবার কখনো বলা হয় ২৫ শতাংশ। তাই সরাসরি এদেরকে আস্থায় নেওয়ার চেষ্টাতো চলবেই।”

বাংলাদেশে আর কখনোই আওয়ামী লীগের মতো ‘শত্রুকে নির্মূল’ করে দেওয়ার রাজনীতি ফিরে আসবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সেটারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে মির্জা ফখরুলের সাম্প্রতিক বক্তব্যে।”

“বিএনপি একটি লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক বা উদারপন্থী গণতান্ত্রিক দল আর এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে দলটি বার্তা দিচ্ছে যে, তারা দেশের সব মতের মানুষকে ধারণ করতে সক্ষম,” আলাপ-কে বলেন সাহেদ আলম।

বিএনপি মহাসচিবের এই সহমর্মী রাজনীতি আসন্ন নির্বাচনে কতোটা ফলপ্রসূ হবে তা সময় বলে দেবে। তবে তিনি যে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বয়ান বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তা স্পষ্ট।