প্রথমবারের মতো শাসনক্ষমতায় এসে কী চ‍্যালেঞ্জে পড়বেন নতুন প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রশ্নটি সাধারণত পরিচিত মুখের মধ্যেই ঘোরাফেরা করেছে। ভোটের আগে কে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, এই প্রশ্নের উত্তরও নিশ্চিত থাকত। 

কিন্তু আসন্ন নির্বাচনে সেই চেনা সমীকরণ ভেঙে যাচ্ছে। মাঠে থাকা সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীদের কেউই কখনো সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হননি। বড় দল, বড় জোট সব আছে। নেই কেবল সংসদীয় অভিজ্ঞতা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বাস্তবতা বাংলাদেশকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে রাজনীতির নতুন এক সন্ধিক্ষণে।

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত তিনটি দল, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সবচেয়ে বেশি ২৮৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আছেন ২২৪টি আসনে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আছেন ২৫৩ আসনে। জাতীয় পার্টি (জাপা) প্রার্থী দিয়েছে ১৯২টি আসনে।

আর নবগঠিত দল এনসিপির প্রার্থী মাত্র ৩০টি আসনে। জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বে থাকা তরুণদের এই দল ‘নির্বাচনি জোট’ বেঁধেছে জামায়তে ইসলামীর সাথে।

সংখ্যার হিসেবে বিএনপি সবচেয়ে বড় শক্তি। সে কারণেই দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও সংসদ সদস্য ছিলেন না কখনো। ফলে প্রধানমন্ত্রী হলে সংসদীয় রাজনীতিতে তিনি হবেন পুরোপুরি নতুন মুখ।

একই চিত্র জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও। দলটির আমীর শফিকুর রহমানও আলোচনায় আছেন সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।

জামায়াত এবারের নির্বাচনে বড় পরিসরে অংশ নিচ্ছে, জোট রাজনীতিতেও তারা সক্রিয়। কিন্তু শফিকুর রহমান নিজেও কখনো সংসদ নির্বাচনে জয়ী হননি।

আরেকটি নামটি উঠে আসছে এনসিপি থেকে। মাত্র ৩০টি আসনে প্রার্থী দিলেও জামায়াতের জোটসঙ্গী হিসেবে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাবা হচ্ছে।

তরুণ নেতৃত্ব, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট এবং ‘নতুন রাজনীতি’র ভাষ্য– সব মিলিয়ে নাহিদ ইসলাম আলোচনায় থাকলেও সংসদীয় অভিজ্ঞতার দিক থেকে তিনিও সম্পূর্ণ নতুন।

এই তিনজনের যেকোনো একজন প্রধানমন্ত্রী হলে সেটি হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। কারণ তিনজনের কেউই আগে কখনো সংসদ সদস্য ছিলেন না।

সংখ্যার অঙ্কে আরও দুইটি দলের নাম আসে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় পার্টি।

ইসলামী আন্দোলন যেহেতু ২৫৩টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে কাগজে-কলমে সরকার গঠনের দৌড়ে এই দলকেও রাখতে হয় । সেক্ষেত্রে দলটির নায়েবে আমির রেজাউল করিম প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। কিন্তু তিনিও কখনো সংসদ নির্বাচনে জয় পাননি।

ব্যতিক্রম জাতীয় পার্টি। দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের এর আগে সংসদ সদস্য ছিলেন, ছিলেন শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সদস্যও। যদিও সেই সম্ভাবনা বলতে গেলে একেবারেই নেই, তবে সরকারপ্রধান হলে তিনিও হবেন অনভিজ্ঞ।

অর্থাৎ, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর যেই দলের নেতৃত্বেই সরকার গঠন করা হোক না কেন, বাংলাদেশ এবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাবে এক নতুন মুখকে।

পরিচিত অধ্যায়ের শেষ

স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর, ১৯৯১ থেকে ২০২৪, এই দীর্ঘ সময়জুড়ে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাই ঘুরেফিরে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই সময়কে অভিহিত করা হত ‘ব্যাটল অব দ্য বেগমস’ বলে।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে একই ধরনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দেশ শাসন করেছে। আসন্ন নির্বাচনে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

এর অর্থ দাঁড়ায় অনভিজ্ঞ হাতেই রাষ্ট্রক্ষমতা যাওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। ফলে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সামনে।

বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন এই অনভিজ্ঞতা বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

আমলাতন্ত্রের ছায়া

নতুন এই রাজনৈতিক বাস্তবতা ভবিষ্যতের জন্য সংকট তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ।

“ব্যুরোক্রেসি যদি আপারহ্যান্ডে থাকে তাহলে প্রভাব বিস্তারের আরেকটা সুযোগ পেয়ে যায়।

“এমনিতে আমাদের প্রশাসন পুরোপুরি আমলা নির্ভর। রাজনীতিবিদরা যদি প্রশাসনের অলিগলি সম্পর্কে কম জানেন। আমলাদের উপর, সচিবদের উপর তাদের নির্ভরতা বেড়ে যায়। সচিবরা তাদেরকে ভুল বোঝায়, এই সংকটটা তৈরি হয়,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

যিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন তার অভিজ্ঞতা না থাকলেও বড় দলগুলোতে প্রচুর সংসদীয় রাজনীতিতে অভিজ্ঞ মানুষ রয়েছে জানিয়ে আলতাফ পারভেজ বলেন, “অভিজ্ঞতাহীনতার একটা সমস্যা হলো, তখন তাদের আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হবে। এবং আমলারা সুযোগটার জন্য অপেক্ষা করে।”

তবে এই সংকট কাটানোর ব্যাপারে আশাবাদী আলতাফ পারভেজ।

তিনি বলেন, “যারা রাজনৈতিকভাবে বিচক্ষণ, প্রজ্ঞাবান হয়, অভিজ্ঞতা কম হলেও তারা পরিস্থিতিটা বুঝে নেন। তাদের যদি জেদ থাকে যে আমলাদের উপর নির্ভর করব না।পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা করে একটা টিম গড়ে তুলবো। যারা আগে থেকে আগে থেকে প্রশাসন পরিচালনায়ও অভিজ্ঞ, তাদের পরামর্শ নেব। তাহলে হয়তো এটা এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।”

শক্তিশালী নেতৃত্ব প্রয়োজন

নৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়া জরুরি মন্তব্য করে আলতাফ পারভেজ বলেন, “আমলাদের যদি বুঝানো যায় যে আমরা দুর্নীতি করব না, আমরা অনভিজ্ঞ হতে পারি; কিন্তু আমরা দুর্নীতি করবে না, এবং দুর্নীতি সহ্য করব না। রাজনীতিবিদরা ওই বার্তা দিতে পারছে কিনা সেটা হলো গুরুত্বপূর্ণ।”

তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী মনে করেন অনভিজ্ঞতা দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। 

আলাপ-কে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে রাষ্ট্র পরিচালনা সবসময়ই চ্যালেঞ্জের।

“বাংলাদেশে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমবার হয়তো এসেছেন। কিন্তু তার লিডারশিপ দিয়ে, পলিটিকালি কীভাবে সেগুলো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সেটা আমরা ক্ষমতায় আসার পর বুঝতে পারবো,” বলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই অধ্যাপক।