নির্বাচনি প্রচারে কথার লড়াই আর প্রতিশ্রুতির পসরা

পাল্টাপাল্টি কথার লড়াই আর প্রতিশ্রুতির পসরায় শুরু হলো নির্বাচনি প্রচারণা। সরগরম হয়ে উঠেছে রাজনীতির ময়দান।

নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে আগেই। এবার রাজপথ, মঞ্চ আর স্লোগানে ফিরেছে রাজনীতি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণার প্রথম দিনেই মাঠে নেমেছে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো।

সিলেটে জনসভার মধ্য দিয়ে নির্বাচনি যাত্রা শুরু করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর ঢাকায় জনসমাবেশ দিয়ে প্রচার শুরু করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আর জোটসঙ্গী এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

মাঠে নেমেছে নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোও। আশা, প্রতিশ্রুতি আর আশঙ্কার আবহে শুরু হয়েছে ভোটের রাজনীতির আনুষ্ঠানিক অধ্যায়।

বিএনপি

২২এ জানুয়ারি প্রথম প্রহরেই প্রচার শুরু করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। রাত ১২টা ১ মিনিটে নির্বাচনি থিম সং রিলিজ করে দলটি।

ঢাকার গুলশানে লেকশোর হোটেলে ‘থিম সং’ উদ্বোধন করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব রুহুল কবির রিজভী। 

বৃহস্পতিবার সকালে সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে নির্বাচনি জনসভায় যোগ দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। বেলা ১২টা ২৮ মিনেটে মঞ্চে ওঠেন তারেক রহমান। বক্তব্য রাখেন ২৩ মিনিট।

তিনি স্লোগান দেন, “যেমন দিল্লি নয়, তেমন পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ। সবার আগে বাংলাদেশ।” তারেক রহমানের সাথে সমস্বরে স্লোগান দেয় সমর্থকরা।

তারেক রহমান বলেন,‘‘আগামী ১২ তারিখে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়ে একটি কথা আমি বলতে চাই,  ইনশাল্লাহ আগামী দিনে বিএনপি সরকার গঠন করলে আমরা নবী করিম (সা.) ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে ইনশাল্লাহ দেশকে পরিচালনা করব।”

তিনি বলেন, “আপনারা সকলেই সাক্ষী দিলেন, দোজখের মালিক আল্লাহ, বেহেস্তের মালিক আল্লাহ, এই পৃথিবীর মালিক আল্লাহ, কাবার মালিক আল্লাহ। আরে ভাই যেটার মালিক আল্লাহ, সেটা কি অন্য কেউ দেয়ার ক্ষমতা রাখে? রাখে না। তাহলে কি দাঁড়ালো? নির্বাচনের আগেই একটি দল এই দিব, ওই দিব বলছে, টিকিট দিব, বলছে না? যেটার মালিক মানুষ না সেটার কথা যদি সে বলে, শেরেকি করা হচ্ছে হচ্ছে না। যার মালিক আল্লাহ, যার অধিকার শুধু আল্লাহর একমাত্র, সব কিছুর ওপরে আল্লাহর অধিকার। কাজেই আগেইতো আপনাদেরকে ঠকাচ্ছে, নির্বাচনের পরে তাহলে কেমন ঠকান ঠকাবে আপনাদেরকে বোঝেন এবার।”

‘‘যারা এই দেশ থেকে পালিয়ে গেছে তারা যেভাবে আপনাদের ভোট ডাকাতি করেছিল, ঠিক একইভাবে আবার সেই ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে… দেখেছেন  আপনারা? দেখেছেন সেই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে”, যোগ করেন তিনি।

দেশের ভেতরে তাদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, “৫ আগস্ট বাংলাদেশের জনগণ প্রমাণ করে দিয়েছে যে ঐক্য থাকলে ঐক্যবদ্ধভাবে আসলে যে কোন ষড়যন্ত্রকে বাংলাদেশের মানুষ প্রতিহত করতে পারে। পারবেন আপনারা প্রতিহত করতে? ইনশাআল্লাহ।”

তারেক রহমান বলেন, “দেশকে আমরা স্বৈরাচার মুক্ত করেছি। আমরা গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু করেছি। এখনো সেই যাত্রা শুরু হয়নি। ১২ তারিখে ধানের শীষকে নির্বাচিত করার মাধ্যমে গণতন্ত্রের সেই যাত্রা শুরু হবে।”

জনসভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন। মঞ্চে তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমানসহ বিএনপি প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

তারেক রহমান ছাড়াও নিজ নিজ এলাকায় বিএনপির একাধিক প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রচার শুরু করেছেন। 

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেছেন ঢাকা–৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেন। তিনি বাংলাবাজারে পথসভা করেন। পথসভায় এলাকাবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, তাদেরই সন্তান হিসেবে তিনি এসেছেন। একটা সুযোগ চাচ্ছেন।

গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সংগঠক ও ঢাকা-১৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী সানজিদা ইসলামও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি প্রচার শুরু করেছেন। মিরপুরের শাহ আলীর মাজার থেকে প্রচার শুরু করেন তিনি।

জামায়াতের প্রচার

বিকালে মিরপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে জনসমাবেশ করে জামায়াতে ইসলামী। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে লড়ছেন জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান।

সমাবেশে জামায়াতের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও যোগ দেন। নাহিদ ইসলামকে ‘পাল্লাকলি’ প্রতীক তুলে দেন জামায়াত আমীর।

শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা সব শরীককে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দিচ্ছি। শুধু নাহিদ ইসলামকে দিচ্ছি অন্য প্রতীক। তাদের প্রতীক শাপলা কলি। আমাদের দাড়িপাল্লা। তাই তাকে দিলাম পাল্লাকলি।”

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “সন্ত্রাস মাদক এই এলাকায় দীর্ঘদিন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে আমরা তার নিখুঁত চিত্র তুলে আনার চেষ্টা করছি।”

ভোটে জিতলে গ্যাস সংকট সমাধানের আশ্বাস দেন তিনি।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা শুনছি বিভিন্ন কার্ড দেওয়া হবে। ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে, কৃষক কার্ড দেওয়া হবে। আমরা চাই, কার্ড দেওয়া হোক, জনগণ সুবিধা পাক।”

“কিন্তু এই কার্ড জনগণ পর্যন্ত পৌঁছাবেতো? ২০০০ টাকার কার্ড নিতে এক হাজার টাকা ঘুষ দেওয়া লাগবে নাতো?”, প্রশ্ন তোলেন নাহিদ।

শুক্র ও শনিবার তিনি উত্তরাঞ্চল সফরে যাবেন ডা. শফিকুর রহমান। সেখানে পঞ্চগড় জেলা দিয়ে উত্তরাঞ্চলের প্রচার শুরু করবেন তিনি।

এনসিপি

জামায়াতের সমাবেশে যাওয়ার আগেই এনসিপি’র আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন নাহিদ ইসলাম। দুই জাতীয় নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও গত ডিসেম্বরে শহিদ হওয়া ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করে দলটি।

পরে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ পদযাত্রা বের করে এনসিপি। শাহবাগ মোড় হয়ে রমনা পার্কের সামনের সড়ক দিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদের নেতৃত্বে এই পদযাত্রায় ছিলেন দলের মুখ্য সমন্বয়ক ও ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন, ঢাকা-৯ আসনে দলের প্রার্থী জাবেদ রাসিন, ঢাকা-২০ আসনের প্রার্থী নাবিলা তাসনিদ, জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় নেতা ফরহাদ সোহেলসহ অনেকে।

নাহিদ বলেন, “গণভোটে সারা বাংলাদেশের মানুষকে আমরা আহ্বান জানাচ্ছি, গণভোটে আপনারা “হ্যাঁ” ভোট দিন। গণভোটে “হ্যাঁ” ভোটের মাধ্যমে সংস্কারের যাত্রাকে অব্যাহত রাখুন।”

নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ আচরণ করছে না বলে অভিযোগ করেন নাহিদ। তিনি বলেন, তারা (ইসি) একটি বিশেষ দলকে বিশেষ ধরনের সুবিধা দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ আচরণ দাবি করেন তিনি।

আরও যারা প্রচারে

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বৃহস্পতিবার নিজ গ্রাম চরলহনিয়ার বাড়িতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের শহীদদের জন্য আয়োজিত দোয়ায় অংশ নেন।

ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করে সিপিবি ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনি প্রচার শুরু করে। উদ্বোধন করেন সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে  আলোচিত নাম ডা. তাসনিম জারা। এনসিপি থেকে বেরিয়ে ফুটবল প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন তিনি।

প্রচার চালাতে বেশ কয়েকটি স্কুলে যান তাসনিম জারা। এছাড়া বাজারে গিয়ে ক্রেতা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে দোয়া ও ভোট চান।

এ সময় তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, “আমি তাসনিম জারা। এই আসনে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করছি। আমার মার্কা ফুটবল।”

তবে প্রচার না চালিয়ে নির্বাচন কমিশনে যান বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, “আমার প্রচার মাঠে থাকার কথা, কিন্তু বাধ্য হয়েই আমি আজকে ঢাকায় এসেছি। কারণ আমার কাছে মনে হয়েছে প্রশাসন এবং পুলিশের যতটা নিরপেক্ষ থাকবার কথা, ততটা নিরপেক্ষ নয়।”

তিনি অভিযোগ করেন, “আমার কর্মীদের বাড়িঘরে হামলা করা হয়েছে। তাদেরকে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে, মাথা ফাটানো হয়েছে, বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয় নাই।”

২০২৫ সালের ১২ই ডিসেম্বর নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা। এক মাস ১০ দিন ধরে চলে মনোনয়ন জমা, যাচাই-বাছাই ও চূড়ান্ত ঘোষণা। ১২ই ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার আগ পর্যন্ত চলবে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা।