বাংলাদেশ জন্মের পর থেকে সবশেষ দ্বাদশ নির্বাচন পর্যন্ত সিলেট-১ আসনে যে দল জয়ী হয়েছে শেষ হাসিও ছিল তাদের মুখেই। অর্থাৎ সিলেট যার, সরকার তার।
এ জন্যই কি বড় দলগুলো নির্বাচনি প্রচারণায় বেছে নেয় পীর-আউলিয়ার পুণ্যভূমি সিলেটকে?
যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির এই মিথ ভেঙে যেতে পারে যে কোনো নির্বাচনে।
তবে তার আগ পর্যন্ত, ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন থেকেই চলে আসছে ‘সিলেট যার সরকার তার’ ট্রেন্ড।
ইতিহাসে সিলেটের ব্যালট
১৯৭৩ সাল, বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন। সিলেট-১ এর সেই ব্যালট যুদ্ধে জয় পেয়ে ছিলেন আব্দুল হেকিম চৌধুরী। আর সরকার গঠন করেছিল তার দল আওয়ামী লীগ।
১৯৭৯ সাল, বাংলাদেশের দ্বিতীয় নির্বাচন। সৈয়দ রফিকুল হক নির্বাচিত হন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি থেকে। প্রথমবারের মতো সরকারে গঠন করে জিয়াউর রহমানের দল।
১৯৮৬ এবং ১৯৮৮, পরের দুই নির্বাচনে এই আসন ছিল জাতীয় পার্টির হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর কাছে। আর সে সময় রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের দখলে।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর ১৯৯১ সালের পঞ্চম এবং ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির ৬ষ্ঠ জাতীয় নির্বাচনে জয় লাভ করে সরকারে আসে খালেদা জিয়ার বিএনপি। এ দুই নির্বাচনেই সিলেট থেকে বিএনপির ব্যানারে জয় লাভ করেন খন্দকার আব্দুল মালিক।
আর ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২১ বছর পর রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফেরে আওয়ামী লীগ। সেবার এই আসনটি জেতেন আওয়ামী লীগের হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী।
এরপর ২০০১, ২০০৮ এবং ২০১৪ এই তিন নির্বাচনে, সিলেটের এই আসন থেকে জেতেন বিএনপির সাইফুর রহমান ও আওয়ামী লীগের আবুল মাল আবদুল মুহিত। সরকারও গঠন করেছিল তাদের দলগুলো। আর এ দুইজনই ছিলেন তাদের সময়ে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে।
তখন অনেকে বলতেন শুধু সরকারই নয়, সিলেট-১ আসন ঠিক করে দেশের অর্থনীতি।
২০১৮ এবং ২০২৪ এর নির্বাচনে এই আসনে আবুল কালাম আব্দুল মোমেন জয় লাভ করেছিলেন আওয়ামী লীগ থেকে। পেয়েছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
১৯৭৩ থেকে ২০২৪, গত ৫১ বছর সিলেটের ব্যালট এ ভাবেই আভাস দিয়ে যাচ্ছে। তাই আসছে নির্বাচনেও মহাগুরুত্বপূর্ণ এই আসন।
মিথ-বাস্তবতার রাজনীতি
'৩৬০ আউলিয়ার পুণ্যভূমি' সিলেট থেকে প্রচারণা শুরু করলে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে- বিএনপি, আওয়ামী লীগের মতো বড় দলগুলো ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে গত কয়েক দশক ধরেই মেনে চলছে এই মিথ।
এই জয়যাত্রার আভাস নাকি মেলে সিলেটের জনসভায় মানুষের বিপুল উপস্থিতি থেকে। যা পরে দেশজুড়ে একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক আবহ তৈরিতেও কাজ করে।
যদিও এবার ভোটের মাঠে নেই আওয়ামী লীগ। প্রচারণাতেও নেই তারা।
তবে আসন্ন নির্বাচনে সিলেট থেকেই ধানের শীষের পক্ষে প্রচারণা শুরু করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ঐতিহ্য ধরে রেখে ২২এ জানুয়ারি, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও তার প্রথম নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করবেন সিলেট শহরে হয়রত শাহ জালাল (র.) এবং খাদিমনগরে হয়রত শাহ পরাণের (র.) মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে।
এর মানে ‘সিলেট যার সরকার তার’ এই মিথ থেকে সরেনি বিএনপি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, “বরাবরের মতো এবারও সিলেট থেকেই নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করবে বিএনপি।”
মাজার জিয়ারতের পর সিলেটের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদরাসা মাঠে জনসভায় অংশ নেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সে সময় পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে বিএনপির সকল প্রার্থীদের।
সিলেট-১ আসনে এবার বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন প্রয়াত এমপি খন্দকার মালিকের ছেলে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
নির্বাচনে সিলেটের রাজনৈতিক ইতিহাস ও তারেক রহমানের প্রচারণার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে মুক্তাদির বলেছেন, “সিলেট শুধু একটি বিভাগীয় শহর নয়, বরং রাজনৈতিক ইতিহাস ও আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এখান থেকেই নির্বাচনি প্রচার শুরু করার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে নতুন বার্তা পৌঁছে দিবেন তারেক রহমান।”
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক, আলতাফ পারভেজ সিলেটভিত্তিক প্রচারণাকে দেখছেন ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অংশ হিসাবে।
তিনি আলাপকে বলেন, “এটা একটা প্রথা যার সঙ্গে ধর্মভিত্তিক একটা সম্পর্ক আছে। এটা অনেকটা ধর্মকে রাজনীতিকভাবে কাজে লাগানো।”
আর নির্বাচনে সিলেট যার, সরকার তার এই মিথ যে কোনো নির্বাচনে ভেঙে যেতে পারে বলেও মনে করছেন তিনি।
তিনি আলাপকে বলেছেন, “বাংলাদেশের নির্বাচনে কোনো আসনে জেতার সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়া, এটা বিজ্ঞানসম্মত নয়। এখন বড় দল হিসেবে বিএনপি হয়তো সিলেটের আসনে ভালো, আমি ঠিক জানি না। কিন্তু আমার মনে হয় এই মিথ যে কোনো সময় ভেঙে যেতে পারে।”
ঐতিহাসিক সত্য হোক কিংবা রাজনীতিতে ধর্মের মিশেল, যতদিন এই ট্রেন্ড না ভাঙছে, তত দিন বলতেই হচ্ছে- বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-১ যার শেষ হাসি তার।