এনসিপির সাম্প্রতিক অবস্থান কি নিছক রাজনৈতিক কৌশল? নাকি নির্বাচন কমিশনের ওপর কৌশলগত চাপ তৈরির প্রচেষ্টা? এই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত ‘পুনর্বিবেচনা’ করার ঘোষণা দেওয়ার পর এই প্রশ্ন আরও জোরালোভাবে আলোচনায় এসেছে।
দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, এনসিপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কিনা, তা ‘পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে’।
ভোটের ঠিক আগমুহূর্তে এমন বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
কারণ, জুলাই অভ্যুত্থানের পর তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এনসিপি অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা দলটি ভোটের মাঠে হিসাবনিকাশের অংশ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গড়ে তোলে এবং ২৭টি আসনে দলীয় প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে তাদের প্রার্থীরা।
আসিফ মাহমুদ কী বলেছেন?
প্রার্থীতা বাতিল আপিলের ওপর শুনানির শেষ দিন ছিল রবিবার।
এর আগের দিন ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে অভিযোগ থাকা প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এনসিপি। অভিযুক্তরা প্রার্থী হতে পারলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘অ্যাকশনে’ যাওয়ার ঘোষণা দেয় তারা।
আর রবিবার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয় ঘেরাও করে বিএনপির সহযোগি সংগঠন ছাত্রদল। তিন দাবিতে তারা বিক্ষোভ করে।
এই অবস্থার মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রার্থীদের আপিল শুনানি শেষ করে ইসি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। এতে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগে মনোনয়ন বাতিল হওয়া কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি প্রার্থীতা ফিরে পান।
আবার একইদিনে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় ইসি।
এসব নিয়ে রবিবার রাতে সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ বলেন, “আমরা এই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব কিনা, এটাও পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে বলে আমরা মনে করছি।”
“আমরা দেখলাম যে, নির্বাচন কমিশনে শুনানি চলাকালে ল পয়েন্টের বাইরেও, প্রেশার পয়েন্ট, ইমোশনাল পয়েন্ট, ড্রামা পয়েন্ট- অনেক পয়েন্টের ভিত্তিতে আজকে জাজমেন্ট দেওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এবং পুরো জিনিসটা এক ধরনের নাটকের মতো মঞ্চায়িত হয়েছে।”
সাবেক এই উপদেষ্টার বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ সুস্পষ্ট। কিন্তু ভোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ’পুনর্বিবেচনা’ করার ঘোষণা কি যৌক্তিক?
“এটা একটা কৌশল হতে পারে। তারা (ভোটে) না যাওয়া পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করা আসলে ঠিক না। দেখা যাক তারা শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্তে যায়,” বলেন ইসি’র সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি।
তিনি বলেন, “আমার কাছে মনে হচ্ছে, এই ধরনের কথাবার্তা পলিটিক্যাল, তিন দলইতো নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে কথা বলেছে। এটা একটা তাদের কৌশল হতে পারে কমিশনকে চাপে রাখার। এটা আমার দৃষ্টিতে তাই মনে হচ্ছে।”
চূড়ান্ত শুনানির দিন নির্বাচন কমিশনে যায় বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল, যেখানে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ছিলেন।
নির্বাচন কমিশনকে চাপে রাখার কৌশল পুরোনো
ভোটের আগে নির্বাচন কমিশনকে চাপে রাখার নানা কৌশল নেয় রাজনৈতিক দলগুলো, যা বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসের পুরোনো কৌশল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন কমিশনের আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ বলে দাবি করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রবিবার তিনি বলেন, “ইসি অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ করছে। ইসির কতিপয় কর্মকর্তাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আমরা অভিযোগ পেয়েছি যে, তারা কোনো একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষে কাজ করছেন।”
এদিকে জামায়াতে ইসলামীও ইসিকে নিয়ে অভিযোগ তুলছে।
গত ৯ই জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বিদ্যমান নেই।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষক খান রবিউল আলম বলেন, “আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধানতম যে স্বভাব, সেই স্বভাবটা হচ্ছে- তারা ক্ষমতায় যাবে, এটা নিশ্চিত হতে চায়। ইলেকশনের ফ্রি, ফেয়ার ও ক্রেডিবলের এজেন্ডার সঙ্গে তারা এই জিনিসটাকে মিলিয়ে দেখে।”
“তারা যদি মনে করে, আমি ক্ষমতায় যেতে পারব না, অথবা ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারব না, অথবা অ্যাটলিস্ট একটা সিগনিফিকেন্ট অবস্থা আমি নিতে পারব না—ততক্ষণ পর্যন্ত তারা এই ধরনের কথা বলতেই থাকে।”
খান রবিউল আলম বলেন, “এটা সজীব ভূঁইয়াই যে বলছেন, তা নয়। বিএনপিও যদি মনে করে যে, একটু আনসারটেইন তার ক্ষমতায় যাওয়া, তখন তারাও একই ধরনের কথা বলবে।
“অর্থাৎ এই কথাগুলোর মধ্য দিয়ে তারা ক্ষমতায় যাওয়ার নিশ্চয়তাটা পেতে চায়। কিন্তু একটা ডেমোক্রেটিক সিস্টেমে যদি ইলেকশন হয়, তাহলে ইলেকশনের আগেই ক্ষমতায় যাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়াটাতো খুব কঠিন একটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।”
এই বিশ্লেষক মনে করছেন, বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি, তিনটি রাজনৈতিক দলকেই তিনি পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন যে, সবাই তাদের অবস্থান মূলত উদ্বিগ্ন।
“তারা কনসার্ন যে, তারা ক্ষমতায় যেতে পারবে কিনা, সরকার গঠন করতে পারবে কিনা। যখন তাদের মনে হয় একটু কমফোর্টেবল, তখন তাদের ডেলিভারিটাও হয় একটু কমফোর্টেবল। যখন তারা একটু ডিসকমফোর্টেবল হচ্ছে, তখন তাদের ডেলিভারিটাও ডিসকমফোর্টেবল হচ্ছে।”
এছাড়াও ‘নির্বাচন কমিশনকে চাপে রাখা’র জন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ‘দোষারোপের পদ্ধতি’ অনুসরণ করে বলে মনে করেন রবিউল আলম।
“কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে আমরা লেভেল প্লেয়িং, ক্রেডিবল এবং স্থিতিশীল একটা নির্বাচনের দিকে যেতে পারছি কিনা, সেই প্রশ্নটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়,” যোগ করেন তিনি।