জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনি ইশতেহারের অংশ হিসেবে দুর্নীতিবিরোধী একাধিক প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছে। এই প্রতিশ্রুতিগুলোর পর প্রশ্ন উঠেছে তা কতটা বাস্তবসম্মত ও কার্যকরী।
দলটির অফিসিয়াল টেলিগ্রাম চ্যানেলে এই পোস্টগুলো দেওয়ার পর তা ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। দলটির অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া পেজে এই পোস্টগুলো দেখা না গেলেও জামায়াতে ইসলামীর আঞ্চলিক বেশ কিছু পেজ থেকে এগুলো পোস্ট করা হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীদেরও এই ফটোকার্ডগুলো পোস্ট করতে দেখা গেছে।
পোস্টারগুলোতে দলটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত দুর্নীতিবিরোধী মনিটরিং সেল গঠন, রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের জবাবদিহি, সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে উন্মুক্ত করা এবং ডিজিটাল গভর্নেন্স চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ বাহিনী সংস্কার, সরকারি লেনদেন ডিজিটাল করা এবং দুর্নীতির তথ্যদাতাদের সুরক্ষার কথাও বলা হয়েছে।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলছেন, নির্বাচনের আগে এমন প্রতিশ্রুতি একদমই নতুন ব্যাপার। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরিকল্পনা ও তার বর্ণনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জামায়াত ও বিএনপি যা করছে সেটা একবারে নতুন। তাই তাদের ধন্যবাদ দেওয়া উচিত।
তবে প্রশ্ন উঠেছে এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর করা সম্ভব, নির্বাচনের আগে এগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব কী, আর বাস্তবায়নের পথে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে?
নির্বাচনে কী প্রভাব ফেলবে
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, “নির্বাচনের আগে অবশ্যই একটা প্রভাব বিস্তার করবে, কারণ বাংলাদেশ এত দুর্নীতিগ্রস্ত যে এই দুর্নীতি যারা অ্যাড্রেস করবে এবং কিছুটা হলেও প্রশমিত করবে তাহলে দেশের অর্ধেক সমস্যা কমে যাবে।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক এই অধ্যাপক বলেন, “আমাদের দুর্নীতিটা আমাদের সমস্ত রাষ্ট্রীয় যে কাঠামো সেই কাঠামোটাকে আপনার ওই যে উই পোকা খেলে, যে রকম জর্জরিত হয় সেরকম জর্জরিত হয়ে গেছি।”
এই ইশতেহার নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “জুলাই সনদে, যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্থের কথা বলা হয়েছিল, সেখানেও কিন্তু এটাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, সুতরাং তারা এই জুলাই সনদের যে আশা আকাঙ্ক্ষা সেটাকে অ্যাড্রেস করেছে।”
“আমি মনে করি। এটা একটা ভালো প্রভাব ফেলবে ভোটারদের ওপরে।”
তবে লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফাহাম আব্দুস সালাম মনে করেন, ভোটারদের ওপর তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না।
তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, চ্যাটজিপিটিকে যদি বলা হয় বাংলাদেশ চালাতে গেলে কী কী জিনিস লাগবে, চাটজিপিটি যা বলবে, ওগুলো ওখানে আছে।"
“ইটস ভেরি বেসিক, নন ডিসক্রিপ্টিভ,” যোগ করেন তিনি।
ফাহাম আব্দুস সালাম বলেন, “আমার কাছে মনে হয় না যে এত এভারেজ কথা বললে ভোটারদের মধ্যে ইমপ্যাক্ট পড়বে। কারণ এগুলো মানুষকে আশা দেখানোর জন্য যথেষ্ট না।”
“মানুষকে আশাবাদী করার জন্য আপনাকে আরও অনেক ফোকাসড, আরও অনেক পলিশড ভার্সন দরকার,” বলেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এটি বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে দিলারা চৌধুরী বলেন, “যারা স্বার্থগোষ্ঠী। যেমন ব্যুারোক্রসি, আর্মি এমনকি রাজনীতিবিদরাও, তারা তো নিজের অবস্থানটাকে ছেড়ে চাইবে না। সুতরাং চ্যালেঞ্জ হবে।”
তবে রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা যদি থাকে এবং সরকার যদি নিজে দুর্নীতিগ্রস্ত না হয় তাহলে এটা কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে বলে মনে করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
ইশতেহারে অনেক কথা বললেও পরে আর রাখা হয় না বলেও মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাস ভুলে যেতে পছন্দ করে মন্তব্য করে সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেছেন, “রাজনৈতিক দলই বলেন আর বুদ্ধিজীবী বলেন, সব ক্ষেত্রেই উনারা অনেক প্রতিশ্রুতি দেন। অনেক কিছু বলেন, সেটাকে কিন্তু ইপ্লিমেন্ট করা হয় না।”
দিলারা চৌধুরী বলেন, “অনেক সময় অসম্ভব একটা প্রতিজ্ঞা করেন, যেমন, শেখ হাসিনা বলেছিল দশ টাকা চালের কথা। তারপরে আপনার এখন বলছে যে এক কোটি লোকের চাকরি। এই প্রমিজগুলি করলে পরে বলতে হবে, আমরা কী করে এটা করব।”
জামায়াতের প্রতিশ্রুতি এগুলো থেকে আলাদা বলে মনে করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, “এই ইশতেহারে কিন্তু সেটা বলেছে তারা। জবাবদিহিতা থাকবে, সিসিটিভি থাকবে, অ্যাপ থাকবে- স্ট্র্যাটেজিগুলি তো তারা বলেছে।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে বলে মত দেন ড. দিলারা চৌধুরী।
“তারা এখন ওয়েল ইনফর্মড এবং কিছু হলে হাতে মোবাইলের সঙ্গে সেটাকে ছড়িয়ে দেয়, কোশ্চেন করে।”
তিনি বলেন, “সরকার যদি অ্যাকাউন্টেবল থাকে তাহলে বাস্তবায়ন সম্ভব। পৃথিবীর অনেক দেশেই পলিটিক্যাল উইল দ্বারা সম্ভব করা গেছে। এটাই জরুরি।”
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তারাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ইমেইল একাউন্ট নেই। গুগল মিট, জুম এমন কিছু নেই।
“প্রকিউরমেন্টের কথাতো অনেক পরে। আপনি যদি একজনকে একটা চাকরি দিতে চান, ভ্যাকেন্সি ক্রিয়েট করে। ওটা স্টাবলিশ করতে আপনার আট-নয় মাস সময় লাগে, সেখানে ই-প্রকিউরমেন্ট কতটা কাজে দিবে।”
“সাউন্ডস গুড, রিয়ালিটি চেক করা হয়েছে বলে আমার মনে হয় না”, উল্লেখ করে ফাহাম আবদুস সালাম বলেন, “মানুষের গোল তো থাকা উচিত এবং হু-নোজ হোয়াট হ্যাপেন, বাট আমি আপাতত লো হ্যাঙ্গিং ফুটের দিকে আগ্রহী। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ সমস্ত নন সেন্সিক্যাল যেই প্লান এটার ব্যাপারে খুব বেশি আশাবাদী না।”
একই সুরে কথা বলেছেন সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর। তিনি বলেন, “নিশ্চয়ই তারা এটাকে এক্সপার্ট দিয়ে করিয়েছেন। বাংলাদেশের বাস্তবতা নিয়ে তাদের নলেজ আছে, সবকিছু আছে। কিন্তু একসাথে সবকিছু করা বোধহয় সম্ভব হবে না।”
প্রতিশ্রুতির পোস্টারে বিস্তারিত বর্ণনার অভাব আছে মন্তব্য করে বর্ষীয়ান এই সাংবাদিক বলেন, “এটা অবশ্যই নতুন জিনিস। বিএনপি যা বলছে সেটাও, জামায়াত যা করছে সেটাও। তবে আমরা আশা করব তারা এটা বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু সাথে সাথে আমাদের বলতে হবে কীভাবে কোন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করবেন।”
“ফিন্যান্স কোথা থেকে আসবে? আপনারা কি ট্যাক্স জনগণে বাড়ায় দিয়া করতে চান, তাহলে তো মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে, পণ্যমূল্য বাড়বে”, বলেন সালাউদ্দিন বাবর।