জামায়াতের সাথে জোট করে কি এনসিপির ‘রাজনৈতিক মৃত্যু’ হলো

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে নবীন কিন্তু আলোচিত রাজনৈতিক দল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের হাতেই জাতীয় নাগরিক পার্টির জন্ম।

তাই নতুন এই দলটিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীষণ আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। দলটির নেতৃত্ব সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, ইনসাফ, মধ্যপন্থা ও প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল।

কিন্তু যাত্রা শুরুর পর থেকেই নবীন এই দলটিকে নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা চলছে। দিন যত গড়িয়েছে ততই বেড়েছে।

তরুণ নেতাদের কথা ও কৌশলে বারবার অবস্থান বদল আর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে এনসিপিকে নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি কখনই।

ফলে তাদের ঘোষিত নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিয়ে জনগণের মধ্যে সংশয় ছিল শুরু থেকেই, সেই সংশয় আরো স্পষ্ট হল এনসিপি ও জামায়াতের জোট গঠনের খবরে। এমনকি দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যেও যে এসব নিয়ে আলোচনা ছিল তা স্পষ্ট হয়েছে তাজনূভা জাবীনের ফেইসবুক পোস্টে।

কী লিখেছেন তাজনূভা

“আপনারা অনেকে ভাবছেন, হয়তো জামায়াতের সাথে জোটে ঐতিহাসিক কারণ বা নারী বিষয়ের কারণে আমার আপত্তি। এর চেয়েও ভয়ঙ্কর যে কারণ, সেটা হল যে প্রক্রিয়ায় এটা হয়েছে। এটাকে রাজনৈতিক কৌশল, নির্বাচনি জোট ইত্যাদি লেভেল দেয়া হচ্ছে। আমি বলব এটা পরিকল্পিত। এটাকে সাজিয়ে এ পর্যন্ত আনা হয়েছে।”

জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপিকে ঘিরে নিজের স্বপ্নের মৃত্যুতে ক্ষোভ আর হতাশা স্পষ্ট তাজনূভা জাবীনের ফেইসবুক পোস্টে।

রবিবার দুপুরে এনসিপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক পদে থাকা এই নেত্রী। এর আগে পদত্যাগ করেছেন তাসনিম জারা ও মীর আরশাদুল হক।

তাজনূভা জাবীন ফেইসবুকে লিখেছেন, “এরা নিজেদের মধ্যে রাজনীতি করতে এতো ব‍্যস্ত এরা কখনো দেশের জন‍্য নতুন একটা মধ‍্যপন্থার বাংলাদেশপন্থী রাজনীতি করতে পারবে না।”

তাজনূভা জাবীন প্রশ্ন তুলেছেন, “যেখানে এনসিপিকে বলাই হয় জামায়াতের আরেকটা দোকান, তাহলে কেন এনসিপি আগে নিজের স্বকীয়তা, নিজের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন‍্য জামায়াতকে বেছে নিতে মরিয়া হয়ে যাচ্ছে? তিনজন মন্ত্রী ছিল না ক্ষমতায়? পারে নাই তো।”

পদত্যাগের কথা জানিয়ে দেওয়া পোস্টে যারা এই দেশ, এই সংসদই চায়নি তাদের সমঝোতায় এমপি হওয়া বা তাদের নেতৃত্ব মেনে নিতে পারবেন না জানিয়ে তাজনূভা জাবীন বলেন, "পুরো জুলাইকে নিয়ে রাজনৈতিক কৌশলের নাম করে তুলে দিচ্ছে জামায়াতের হাতে।"

২৮এ ডিসেম্বর এনসিপি’র সাথে নির্বাচনি জোটের ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতের আমীর শফিকুর রহমান।

জামায়াতেই ভরসা রাখল এনসিপি

মধ্যপন্থার রাজনীতির ঘোষণা দিয়ে গঠিত দল এনসিপির সাথে জামায়াতে ইসলামীর জোট নিয়ে গুঞ্জন ছিল আগে থেকেই। সিদ্ধান্ত না হলেও দুই দলের মধ্যে আলোচনা ঠিকই ছিল।

জামায়াতের নেতৃত্বাধীন আট দলে যোগ দেওয়ার গুঞ্জন উঠলে তা ১৩ই সেপ্টেম্বর বিবৃতি দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে এনসিপি। তখন তারা বলেছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে তারা আলোচনা করছে।

তবে সেই আট দলের জোট যখন পাঁচ দফা দাবিতে যৌথ আন্দোলন শুরু করে তখন তাতে সংহতি জানায় এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী।

এনসিপি প্রধান নাহিদ ইসলাম ও আরেক নেতা সারজিস আলম একাধিকবার ৩০০ আসনে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন।

কিন্তু সম্প্রতি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদেরের ফেইসবুক পোস্ট থেকে জামায়াত-এনসিপির জোট ফের আলোচনায় আসে।

২৫এ ডিসেম্বর তিনি ফেইসবুকে লিখেছেন, “তারুণ্যের রাজনীতির কবর রচিত হতে যাচ্ছে। এনসিপি অবশেষে জামায়াতের সাথেই সরাসরি জোট বাঁধতেছে। সারা দেশে মানুষের, নেতা–কর্মীদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে জলাঞ্জলি দিয়ে গুটিকয়েক নেতার স্বার্থ হাসিল করতেই এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।”

তার মতে, “এর মধ্য দিয়ে কার্যত এনসিপি জামায়াতের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।”

একের পর এক পদত্যাগ

শনিবার ক্ষোভ আর হতাশার মিশেলে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েই এনসিপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন ডা. তাসনিম জারা।

তিনি লিখেছেন, “আমার স্বপ্ন ছিল একটি রাজনৈতিক দলের প্ল্যাটফর্ম থেকে সংসদে গিয়ে আমার এলাকার মানুষের ও দেশের সেবা করা। তবে বাস্তবিক প্রেক্ষাপটের কারণে আমি কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

তবে ‘বাস্তবিক প্রেক্ষাপট’ নিয়ে কোনও ব্যাখা দেননি তাসনিম জারা। ঢাকা-৯ আসন থেকে এনসিপির মনোনয়নও পেয়েছিলেন তিনি।

যেদিন জামায়াতের সাথে এনসিপির জোটের গুঞ্জন প্রায় সত্য বলে পরিণত হতে যাচ্ছে সেদিনই পদত্যাগ করলেন তিনি। এনসিপি ছেড়ে এখন এই আসন থেকে স্বতন্ত্রভাবে লড়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন তিনি।

এর আগে বৃহস্পতিবার ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে পদত্যাগ করেছেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব মীর আরশাদুল হক।

ফেইসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “আমি এই মুহূর্তে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলাম। চট্টগ্রাম-১৬ সংসদীয় আসনে (বাঁশখালী) এনসিপির হয়ে আমি নির্বাচন করছি না।”

আরশাদুল হক স্পষ্টতই লিখেছেন এনসিপি ঘিরে তার স্বপ্ন ও সম্ভাবনার ইতি ঘটেছে।

“যে স্বপ্ন ও সম্ভাবনা দেখে এনসিপিতে যোগ দিয়েছিলাম, তার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই”। 

পোস্টের এক অংশে তিনি লেখেন, “অস্থিরতা তৈরি করা, পবিত্র ধর্ম ইসলামকে ব্যবহার করে সমাজে বিভাজন তৈরি করা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির একটি প্রবণতা বর্তমানে বাংলাদেশে লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷ একটা গোষ্ঠী বা চক্র নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য দেশকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে চাচ্ছে।”

তাসনিম জারা ও আরশাদুল হক জামায়াতের সাথে জোট উল্লেখ করে কিছু না লিখলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তবে তাজনূভা জাবীন ঠিকই তার ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। লিখেছেন, “যারা এনসিপি ছাড়ছি তারাই এনসিপির বলা নয়া বন্দোবস্তের রাজনীতি করেছি। কিন্তু ছাড়তে হচ্ছে আমাদের।”

_(Tanjela)_Cards (63)

 

যেভাবে ধূসর হল এনসিপি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণদের গড়ে তোলা রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিয়ে যে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছিল, সময়ের সাথে সাথে তা ফিকে হতে শুরু করেছে।

পরিবার কেন্দ্রিক রাজনীতির ইতি টেনে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল তরুণদের এই দলটি, তা শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের সরকার বিরোধী আন্দোলনের সামনে থেকে যে তরুণরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের হাতে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক দল এনসিপি প্রথম থেকেই উঠে এসেছিল রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। দলটি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও ছিলো বিপুল। 

দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক দলের শীর্ষে কিংবা সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তরুণদের আগে কখনও দেখা যায়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হন অভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। পরে যুক্ত হন মাহফুজ আলমও। যারা ছিলেন শেখ হাসিনার সরকার বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা।

ওই সময় থেকেই এই তরুণদের নিয়ে একটি রাজনৈতিক দল গঠন ছিল আলোচনায়।

২০২৫ সালের ২৮এ ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি। উপদেষ্টার পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দলের প্রধান হন নাহিদ ইসলাম।

মুনতাসিরের বিদায়ে শুরু

বহুত্ববাদী রাজনীতির আশ্বাস দিয়েও দল গঠনের শুরুর দিকে বাদ দেওয়া হয় এনসিপি নেতা মুনতাসির রহমানকে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় তিনি এলজিবিটিকিউ অ্যাক্টিভিস্ট।

এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে যুগ্ম সদস্যসচিব পদে মুনতাসির রহমানের নাম প্রকাশ হওয়ার পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। 

সে সময় দলটির দুই অন্যতম প্রধান নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলম ফেইসবুকে প্রায় একই ধরনের পোস্ট করেন। তারা লেখেন রাজনীতির আগে তাদের পরিচয় তারা মুসলমান। স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থি কোনও রাজনীতি এনসিপি করবে না।

মুনতাসির রহমান দলের দুই শীর্ষ নেতার এমন পোস্টে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন বলে জানান আলাপকে। তিনি মনে করেন, তাকে দল থেকে বাদ দেওয়া দলগত সিদ্ধান্ত ছিল না।

এলজিবিটিকিউ ইস্যুতে তার অবস্থান সম্পর্কে দলের লোকজন আগে থেকে জানতো কি-না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “অনেকেই জানতো”। তিনি বলেন, “সামাজিক মাধ্যমে যে সমালোচনার জোয়ার বয়ে যাচ্ছিলো তা সিরিজ হামলার মতো ছিলো। আমার পরে তাসনিম জারা, শওকত আলী এটার শিকার হয়েছে, সেই এলজিবিটিকিউ ইস্যু নিয়ে। তুহিন খান এবং মাজহারুল ইসলামকে নাস্তিক বলে ট্যাগ দেওয়া হয়েছে। দল ওদেরটা সামলাইলো কিন্তু আমারটা সামলাইলো না।”

_(Tanjela)_Cards (62)

আরো যত সমালোচনা

দল গঠনের পর থেকেই একের পর এক অভিযোগ উঠতে শুরু করে এনসিপির বিভিন্ন নেতাকর্মীদের নামে। নানা কারণে আলোচনায় ছিলেন দলের দুই মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম আর হাসনাত আব্দুল্লাহ। ২০২৫ সালের এপ্রিলে তারা দুর্নীতি দমন কমিশনে গেলে তাদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। যদিও দুজনই ব্যক্তিগত কাজে দুদকে গিয়েছিলেন বলে গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন।

এনসিপির আরেক যুগ্ম সদস্য সচিব ছিলেন গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। পাঠ্যবই ছাপানোর কাজে দুর্নীতি-অনিয়ম এবং জেলা প্রশাসক নিয়োগে অবৈধভাবে হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

দল গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই সাময়িকভাবে বহিস্কার করা হয় তাকে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ফেইসবুকে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। যাতে এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইমামুর রশিদ ইমনকে একজন নারীর কাছ থেকে সাত লাখ টাকা নিতে দেখা যায়।

সেই নারী একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ছিলেন। ব্যবসায়িক স্বার্থে তদ্বিরের জন্য টাকা দিয়েছিলেন বলে স্বীকারও করেছিলেন তিনি।

শুরু থেকে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানিয়ে এসে শেষ পর্যন্ত নিজেদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠায় তুমুল সমালোচনার মুখে পড়ে দলটি।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে এনসিপি নেতা ইমামুর রশিদ বলেছিলেন, ডোনেশন বাবদ সেই টাকা দিয়েছিলেন ঐ নারী।

দলের শীর্ষ নেতারা তাকে অনৈতিকভাবে সাহায্য না করায়, অসৎ উপায়ে এ ভিডিও ধারণ করেছেন বলে জানিয়েছিলেন এই নেতা। 

২০২৫ সালের মার্চে নিজ এলাকায় গাড়িবহর নিয়ে শোডাউন করায় সমালোচনার মুখে পড়েন সারজিস আলম। সমালোচনা করেন খোদ দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তাসনিম জারা।

সিনিয়র সাংবাদিক আরশাদ মাহমুদ বলেন, “যখন তাদের দেখলাম বড় বড় প্রাডো গাড়ি, পাজেরো গাড়ি বহর নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে, তখনই আমার একটা খটকা লাগলো যে এরা এ সমস্ত গাড়ি কোথায় পাচ্ছে? কে দিচ্ছে এই গাড়ি?”

তখন জনগণের মনেও এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এসব প্রশ্নের উত্তরে সারজিস হাসনাতরা যখন বললো আমাদের বড় ভাইরা আমাদের দিচ্ছে, তো প্রথম কথা হলো যে এই বড় ভাই কারা? তারা তোমাদেরকে এ সমস্ত গাড়ি কেন দিচ্ছে?”

যেকোনও সাহায্যের বিনিময়ে তো এসব ‘বড় ভাইরা’ কিছু না কিছু চাইবে বলেও মনে করেন আরশাদ মাহমুদ। তার মতে, যেহেতু প্রধান উপদেষ্টা বরাবরই বলে আসছেন ছাত্ররাই তাকে ক্ষমতায় বসিয়েছে, অর্থাৎ এনসিপির সাথে সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে।

“সরকার থেকে এনসিপির শুভাকাঙ্ক্ষীরা কিছু সুযোগ সুবিধা পেতে পারে, যেকোনও ক্রিমিনাল অফেন্স কিংবা দুর্নীতি থেকে দায়মুক্তি পেতে পারে। দুর্নীতির শুরু সেখান থেকেই”, বলছিলেন এই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক।

এনসিপির সাবেক নেতা মুনতাসির মাহমুদও সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, “ছাত্র উপদেষ্টারা জুলাইকে বিক্রি করে দিয়েছে।”

এনসিপির মহাসচিব আখতার হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন তিনি। তিনি বলেন, “বিভিন্ন জেলায় পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) নিয়োগ দিতে ৫০ লাখ করে টাকা দাবি করেছেন আখতার হোসেন।”

এর আগে দলের সাথে বনিবনা না হওয়ায় মুনতাসির মাহমুদকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিলো।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে পদত্যাগ করে এনসিপির দায়িত্ব নিলেও, অন্য দুই সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলম উপদেষ্টা পদে থেকে যান।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে এই দুই উপদেষ্টার পদত্যাগের আগে তাদের বিরুদ্ধেও ছিল বিস্তর অভিযোগ। 

তাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক অনিয়মের অভিযোগ ছাড়াও স্বজনপ্রীতি ও স্বার্থের দ্বন্দ্বমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথা জানিয়েছিলেন দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থা টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।

 _(Tanjela)_Cards (64)

সাংবাদিক আরশাদ মাহমুদ বলেন, ‘যখন তাদের নামে বিভিন্ন ধরণের দুর্নীতির খবর আসতে থাকলো, তারা টাকা পয়সা নিচ্ছে, নিয়োগ বদলি বাণিজ্য, এগুলোর মধ্যে জড়িয়ে গেছে, স্বাভাবিকভাবে তখনই নানান ধরণের সন্দেহ দেখা দিলো এবং এদের প্রতি মানুষের যে আশা ছিল, তারা অনেকটাই আশাহত হলো।”

কথা হয়েছিলো লেখক ও গবেষক মোবাশ্বার হাসানের সাথে, তিনি বলেন, ‘এনসিপির লিডাররা বিশেষ করে নাহিদ ইসলাম, তার কিন্তু একটা ইমেজ ছিল, নাহিদ অ্যাজ অ্যা পার্সন, নাহিদ অ্যাজ অ্যা লিডার, নাহিদ অ্যাজ অ্যা পার্সন হু লেড দ্য রেজিস্ট্যান্ট মুভমেন্ট।”

শুরু থেকেই নিজেদের মধ্যপন্থি ও বহুত্ববাদী আদর্শের ধারক দাবি করে আসছিলো এনসিপি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আর চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক দর্শনই হবে তাদের রাজনীতির মূল ভিত্তি।

এনসিপির ভাষ্য ছিল কর্তৃত্ববাদবিরোধী রাজনীতি দিয়েই রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব। ফলে তাদের নিয়ে জনগণের প্রত্যাশার পারদ ছিল তুঙ্গে।

তবে জনগণের আশা ভরসা ম্লান হতে থাকে, যখন একের পর এক সমালোচনার মুখে পড়তে থাকেন দলটির নেতাকর্মীরা।

শুধু সাধারন মানুষ কেন, খোদ দলের কেন্দ্রীয় নেতারাই যখন একের পর এক দল ছাড়ছেন তখন বিভাজন স্পষ্ট করে তাজনূভা জাবীন ফেইসবুকে লিখেছেন, “মানুষ যে এনসিপির দিকে তাকিয়ে আছে, এনসিপিকে এটা সেটা ভেবে, এনসিপি ওটা না।”

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক আরশাদ মাহমুদ বলছিলেন, “আমার নিজেরও খুব আশা ছিলো তাদের নিয়ে, কিন্তু আমার আশা ভঙ্গ হলো। কারণ সরকারের অংশ না হয়েও এনসিপি নেতাকর্মীরা অনেক সরকারি সুবিধা ভোগ করেন, যা দেখে মানুষ ভাবলো এদের মূল উদ্দেশ্য ভালো না”। 

_(Tanjela)_Cards (70)

গণঅভ্যুত্থানের পরেই পথ হারিয়েছে এনসিপি

রাজনীতিতে গুনগত পরিবর্তনের কথা দিয়েছিলো এনসিপি। তবে গঠনের পর থেকেই একের পর এক সমালোচনার মুখে পড়তে থাকে দলের নেতাকর্মীরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনীতি করতে গেলে যে কৌশল ও পরিপক্বতা দরকার তা তাদের মধ্যেই নেই। যে কারণে শুরুতেই নতুন দলটিকে ঘিরে নানা বিতর্ক দেখা যাচ্ছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর বলছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দলের এক সমন্বয় সভায় সাংগঠনিকভাবে দলের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ জানান খোদ এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

রবিবার দেওয়া ফেইসবুক পোস্টে তাজনূভা জাবীন বলেন, “এরা নিজেদের মধ্যে রাজনীতি করতে এতো ব‍্যস্ত এরা কখনো দেশের জন‍্য নতুন একটা মধ‍্যপন্থার বাংলাদেশপন্থী রাজনীতি করতে পারবে না।”

সিনিয়র সাংবাদিক আশরাফ কায়সারের কাছে প্রশ্ন ছিল এনসিপির হাল অবস্থা নিয়ে। তিনি বলছিলেন, “অভ্যুত্থানের পর থেকেই তাদের যে রাজনৈতিক গতিধারা, তারা যে রাজনীতির কথা মুখে বলেছে, যেভাবে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম সাজিয়েছে, তাদের কোনও কোনও প্রার্থী প্রচলিত রাজনৈতিক ধারায় ক্যাম্পেইন করেছে এলাকায় গিয়েছে সব দেখে আমরা হতাশ হয়েছি।”

“মনে হচ্ছে এনসিপি পথ হারিয়েছে। এনসিপি মুখে বলছে নয়া বন্দোবস্ত। কিন্তু কাজে আসলে প্রচলিত রাজনীতির আরকেটা ক্ষুদ্র শক্তি হিসাবে বাজারে আসতে চাচ্ছে”, যোগ করেন তিনি।

এখনও এনসিপিতেই আছেন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। তবে জামায়াত ইস্যুতে তিনিও তার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

সামান্তা বলেন, “বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্ভরযোগ্য মিত্র না। তার রাজনৈতিক অবস্থান বা দর্শনসহ কোন সহযোগিতা বা সমঝোতায় যাওয়ায়, এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে বলে আমি মনে করি।”

জামায়াতের সঙ্গে এই জোট নিয়ে আপত্তি জানিয়ে দলের প্রধান নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন সদস্য। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো ধরনের জোট এনসিপির নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন নেতারা।

চিঠিতে বিগত এক বছর ধরে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠনের বিভাজনমূলক রাজনীতির উদাহরণ তুলে ধরে তারা বলেন, “জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সে সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ প্রশ্নে তাদের অবস্থান, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও আমাদের দলের মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।”

_(Tanjela)_Cards (65)

লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ বলছেন, “আপনি যদি নির্মোহভাবে দেখেন, এনসিপির পাওয়ারে আসলে দক্ষিণপন্থি ডেভিয়েশান ছিলো আগে থেকেই, মানে এক ধরনের দক্ষিণপন্থি ওরিয়েন্টেশন থেকেই তারা রাজনীতিতে এসেছিলো।”

তিনি বলেন, “এটা ঘটেছে গত ১৫ বছর যে মুক্তিযুদ্ধের নামে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদের কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিলো, বিভিন্ন সংগঠনকেতো কাজ করতে দেওয়া হতো না। ফলে তরুণদের মধ্যে একটা লিবারেল ভ্যালুসের প্রতি, ডেমোক্রাটিক ভ্যালুসের প্রতি, ঐ ধারার রাজনীতির প্রতি একটা বিরক্তি ধরে গিয়েছিলো।”

আলতাফ পারভেজ বলছিলেন, “তারা ঐ ওরিয়েন্টেশন থেকে, একটা ডানপন্থি ওরিয়েন্টেশন থেকে আওয়ামী বিরোধিতা করেছিলো। এই বাস্তবতাটাকে সবাইকে মানতেই হবে। তাহলে এখন আবার অভ্যুত্থানের পরে যেহেতু ঐ রাজনীতির ওরিয়েন্টেশন থেকে সরকার ফেলে দেয়া যতটা সহজ, দেশকে একটা গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাওয়া মোটেই সেরকম সহজ নয়। তারা রাজনৈতিকভাবে দিশাহীন অবস্থায় ছিলো।”

জামায়াতে ইসলামীর সাথে এনসিপির জোট নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেছেন, “এনসিপি যে আশাবাদী রাজনীতি শুরু করেছিল, বহুত্ববাদের কথা বলেছিল, সেই আশাবাদের জায়গা থেকে সরেই গেল।”

এই জোটের ফলে এনসিপির রাজনৈতিক স্বতন্ত্রতাও নষ্ট হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।

অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, “এখানে আদর্শিক কোনো লক্ষ্য নেই, ক্রমাগত তা ফিকে হয়ে যাচ্ছে।”

জামায়াতের সাথে আসন ভাগাভাগি নিয়ে লেখক ও গবেষক মোবাশ্বার হাসান বলেন, “নাহিদ উইল লুজ হিজ ওউন আইডেন্টিটি। গণঅভ্যুত্থানের নেতা নাহিদ থেকে এনসিপির নাহিদ এবং তারপর জামায়াত-এনসিপির নাহিদ। তার জন্য এটা লিমিটেশন। তার ব্যপ্তিটা কমে যাবে।” 

তাদের মধ্যে ক্ষমতায় যাওয়ার একটা তাড়া আছে, এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, “লং গেমটা হয়তো তারা খেলতে চাননি।”

_(Tanjela)_Cards (66)

এটাই ছিল পরিকল্পনা?

এনসিপি নেত্রী তাজনূভা জাবীন অভিযোগ করেছেন, এনসিপি জামায়াতের জোট পরিকল্পনা করেই এতদূর নিয়ে আসা হয়েছে। ফেইসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “আমি বলব এটা পরিকল্পিত। এটাকে সাজিয়ে এ পর্যন্ত আনা হয়েছে।”

একই মত সিনিয়র সাংবাদিক আশরাফ কায়সারের। তিনি বলেন,“আগেও দেখবেন সমালোচকরা বলছিল এনসিপি জামায়াতের সৃষ্টি এবং নতুন নামে বাজারজাত করার চেষ্টা হচ্ছে। ষোলো মাস পরে ঘটনা কিন্তু সেই জায়গায়ই যাচ্ছে।”

আলতাফ পারভেজও বলছেন, “তারা মধ্যপন্থি, গণতান্ত্রিক রাজনীতির কথা বলেছে। কিন্ত কখনই দলের ভেতর থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে রাজনীতি করেনি।”

এনসিপি থেকে সদ্য পদত্যাগ করা নেত্রী তাজনূভা জাবীন ফেইসবুকে আক্ষেপ করে লিখেছেন, “ওই পুরোনো ফাঁকা বুলির রাজনীতি করতে হলে পুরোনো দলই করতাম, নতুন কেন?”

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ধরনের অবস্থান তৈরি করতে না পারা প্রসঙ্গে আরশাদ মাহমুদ বলেন, “যখনই এরা দেশের থেকে নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখে, তখনই আর উঠে দাঁড়াতে পারে না।”

“মানুষের মনে সন্দেহ জাগে যে এরা তো অন্য কিছু না, এরা ট্রাডিশনাল (প্রথাগত) যেসমস্ত রাজনৈতিক দল আছে, ওরাও দুর্নীতি করে, এরাও দুর্নীতি করে। এই কারণেই আর এই রাজনৈতিক দলগুলো উঠে দাঁড়াতে পারে না”, যোগ করেন তিনি।

আরশাদ মাহমুদ বলেন, “অন্যান্য ট্রাডিশনাল রাজনৈতিক দলগুলো থেকে মানুষ এদেরকে আর পার্থক্য করতে পারলো না, তারা মনে করলো এরা কোনো মধ্যপন্থি না, থার্ড ফোর্স হিসেবে ইমার্জ করার যে সুযোগটা ছিলো, সেটা এরা নিজের কার্যকলাপেই নষ্ট করলো।”

সাংবাদিক আশরাফ কায়সার বলছিলেন, “এনসিপির সম্ভাবনা ছিল বড় রাজনৈতিক পক্ষ হিসাবে আসার। এনসিপি সেই জায়গায় রাজনীতিকে নিয়ে যেতে পারেনি। এ হতাশার সর্বশেষ পরিণতি স্বাধীনতাবিরোথী, ধর্মীয় রাজনীতির বাহক জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট।”

“এটা এনসিপির রাজনৈতিক মৃত্যু”, যোগ করেন তিনি।

গবেষক আলতাফ পারভেজ বলছিলেন, “আমি বলবো যে এনসিপি যে জামায়াতের সাথে গেলো, এটা যতটা না নির্বাচনি লক্ষ্য তার থেকে বড় লক্ষ্য হলো নির্বাচন পরবর্তী রাজনীতি। বিশেষ করে এনসিপি এবং জামায়াতের যারা মুরুব্বি, এদের পেছনেতো আরও নানা শক্তি আছে।”

আলতাফ পারভেজ শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “আমার মনে হয়, তারা আরেক দফা রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, কিন্তু সেটা ডানপন্থির ধারা বা পাটাতন থেকে, ক্ষমতার রাজনীতির জায়গা থেকে।”

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ-বিএনপি বাইনারির বিপরীতে ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো বাইরে সাধারন মানুষের প্রত্যাশা ছিল এনসিপি মধ্যপন্থি ও বাংলাদেশপন্থি দল হিসাবেই নিজেদের গড়ে তুলবে।

যে দলটি হবে সমাজের সব ধরনের মানুষের জন্য একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।

কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, সেই সম্ভাবনা মাঠেই মারা গেছে।

এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী ১০ই নভেম্বর ফেইসবুকে লিখেছিলেন, “বন্ধু, তোমার লাল টুকটুকে স্বপ্ন আর পতাকা একটি সিটের বিনিময়ে বিক্রি করে দিও না”।

কে, কিসের বিনিময়ে, কী বিক্রি করলো, কী কিনলো? এই প্রশ্নই ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।