জুলাই আন্দোলনে নিহতের পরিবাররা কেমন আছে

সেদিন ছিলো ১৮ জুলাই, ২০২৪ সাল। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের আন্দোলন তখন রূপ নিতে শুরু করেছে শেখ হাসিনার পতনের প্রবল গণঅভ্যুত্থানে। 

সকাল দশটার পর ফাইয়াজের মোবাইল ফোন বেজে উঠলো। ফারহান ফাইয়াজ ছিলেন ঢাকার রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র।   

সেদিন সকালে ফাইয়াজকে ফোন করেছিলেন তার আরেক বন্ধু। ফোনের অপর পাশ থেকে বন্ধু জানালেন, তারা সবাই আসাদ গেইট এলাকায় জড়ো হয়ে আন্দোলনে যুক্ত হবেন। 

ফোন পেয়েই দ্রুত বিছানা ছাড়লেন ফাইয়াজ। মায়ের তৈরি করা নাস্তা সারলেন। বাইরে বের হতে চাইলে বাধা দিলেন মা। কিন্তু সেই বাধা উপেক্ষা করেই আসাদ গেইটের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলেন ফাইয়াজ। মাকে বলে গেছেন, “কিছু হবে না, দ্রুত ফিরে আসবো।” 

“এই তার শেষ বিদায়। দুপুর দেড়টা নাগাদ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে পরিবারের আদরের ছেলেটি গুলিবিদ্ধ হয়ে সিটি হাসপাতালে ভর্তি।” 

পুলিশের গুলিতে জুলাই আন্দোলনে নিহত ফাইয়াজের জীবনের শেষ মুহূর্তের কিছু স্মৃতি হাতড়ে আলাপ-কে এভাবেই বর্ণনা দিলেন তার খালা ও প্রিপারেটরি স্কুলের শিক্ষিকা ফারজানা আফরোজ মুনমুন।

তিনি জানান, ফাইয়াজের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে তারা দ্রুত ছুটে যান হাসপাতালে। অনেক বাধা পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছান গন্তব্যে। সেখানেই দেখতে পান ফাইয়াজের নিথর দেহ পড়ে আছে মাটিতে। 

“তখন ভাবতেই পারিনি আমাদের আদরের ফাইয়াজ আর নেই,” কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলেন তিনি। 

আবেগ সামলে মুনমুন জানালেন, সন্তান হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি ফাইয়াজের বাবা-মা। প্রায়ই অসুস্থ থাকেন তার মা। 

মুনমুন দাবি জানান, তাদের আদরের ছেলেটির বুক নিশানা করে যারা গুলি করেছিল, তাদের যেন উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত হয়। সেটা যেন অবশ্যই লোক দেখানো শাস্তি না হয়।  

ফারহান ফাইয়াজের হত্যাকাণ্ডের পরদিন ১৯এ জুলাই রক্তক্ষয়ী একটি দিনের সাক্ষী হয় ঢাকাবাসী। আন্দোলন ঘিরে দুপুরে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজধানী। 

সেদিন গোপিবাগের বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন কম্পিউটার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম। তাকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। 

নিহতের ছেলে রাইয়ান ইসলাম আলাপ-কে বলেন, “আমরা বাবার ফোন বন্ধ পাচ্ছিলাম। অনেক পরে প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি জানান, সেদিন এশার নামাজ পড়ে গোলাপবাগ মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় আচমকা বাবাসহ কয়েকজনকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়।” 

ছেলের সঙ্গে কম্পিউটার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম

“পরে আন্দোলনবিরোধী লোকজনসহ অন্যান্যরা তাকে পিটিয়ে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে এবং সবশেষ গুলি করে হত্যা করে। কিন্তু সুরতহাল রিপোর্টে শুধু পিটিয়ে জখম করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে,” বলেন তিনি। 

রাইয়ান ইসলাম বলেন, বাবাকে হারিয়ে তাদের পুরো পরিবার মানসিকভাবে চরম বিধ্বস্ত। এখনো ফিরতে পারেনি স্বাভাবিক জীবনে। 

“এক কথায় আমাদের জীবনে ছন্দপতন ঘটেছে,” এমনটা বলতে বলতে বাবা হত্যার বিচার দাবি করলেন তিনি।

একইদিন অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১৯এ জুলাই ঘটে আরেকটি ঘটনা। 

পেশায় গাড়ি চালক ছিলেন মোহাম্মদপুর এলাকার ভাড়া বাসায় থাকেন মোহাম্মদ হোসেন। পরিস্থিতির অবনতি দেখে গাবতলীতে ট্রাক রেখে বাসার উদ্দেশে রওনা হন হোসেন। 

সে সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমর্থক, পুলিশ এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয়দের ত্রিমুখী সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যান তিনি। চাঁদ উদ্যান এলাকায় হঠাৎ তার শরীরে বিদ্ধ হয় গুলি। মৃত্যু হয় মোহাম্মদ হোসেনের। 

ওই ঘটনায় ২০২৫ সালের ২৩এ নভেম্বর মোহাম্মদপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জগঠনের শুনানির জন্য আগামী ১৩ই অগাস্ট দিন নির্ধারণ করেছে আদালত। 

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ও আওয়ামী লীগের পতন

২০২৪ সালের জুলাই ও অগাস্টে  বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে ৫ই অগাস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরুতে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করেন। ১৬ই জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদের পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘অতিরিক্ত বল প্রয়োগ’-এর অভিযোগ ওঠে। 

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার দপ্তরের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুুলাই থেকে মধ্য অগাস্ট পর্যন্ত সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন। এদের মধ্যে পুলিশ রয়েছেন পুলিশ সদস্যও। 

এরমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ যাচাই-বাছাইকৃত তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে ৮৬৪ জন শহিদকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং গেজেট অনুযায়ী এই সংখ্যা ৮৪৪ জনের বেশি। 

আইনি পদক্ষেপ বাস্তবায়নে কত দূর?

জুলাই আন্দোলনে হতাহতদের ঘটনায় সারা দেশজুড়ে সহস্রাধিক মামলা হয়েছে।  একাধিক মামলায় রায়ও দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

ট্রাইব্যুনালে ৫৮টির মধ্যে ৬টি মামলার রায় হয়েছে। এসব মামলায় ৩৪৯ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৪৭ জন। রায়ের জন্য অপেক্ষমান একটি মামলা। দুটি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩০টি। সাক্ষ্য গ্রহণ ও অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে আছে ২০টি মামলা। 

৬টি মানবতাবিরোধী মামলার রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৬২ জন আসামির সাজা হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। 

ট্রাইব্যুনালে জমা পড়েছে আরও ৫৯০টি অভিযোগ, যার মধ্যে ১০৯টি তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। 

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম আলাপ-কে বলেন, “বর্তমান সরকারের সময় আমি চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর এসব মামলাগুলো যাতে আলোর মুখ দেখে, সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি।” 

তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৩টি এবং বিএনপি সরকারের সময় ৩টি মামলার রায় হয়েছে। ৩০টি মামলা বিচারাধীন, ৪টি মামলা রায়ের অপেক্ষায়, বাছাই করা ১৯০টি মামলার মধ্যে প্রায় সবকটিরই তদন্ত শেষ পর্যায়ে। 

এখন থেকে প্রতি মাসে কমপক্ষে দুই থেকে তিনটি মামলার রায় হবে বলেও জানান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।

জুলাইয়ের মামলায় যেসব আসামি এখনো গ্রেপ্তার হননি, তাদের ধরতে অভিযান চলছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। 

পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিটের একজন কর্মকর্তা বলেন, “জুলাই-অগাস্ট ঘিরে অনেক ভুয়া মামলা হয়েছে। অসৎ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জায়গায় করা এসব মামলা তদন্তে ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। আরো অনেক মামলা এখনো তদন্তাধীন আছে।” 

পরিবারগুলো যে সহযোগিতা পেয়েছে 

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার ও আহতের মাসিক সম্মানীর প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। ২০২৬ এর ১১ই জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী শহিদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের মাসিক ভাতার ঘোষণা দেন।

প্রস্তাব অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ হওয়া প্রত্যেকের পরিবারকে মাসিক ২০ হাজার টাকা করে সম্মানী ভাতা দেওয়া হবে। একই হারে ভাতা পাবেন সবচেয়ে গুরুতর আহত ‘এ’ ক্যাটাগরির যোদ্ধারাও।

এছাড়া ‘বি’ ক্যাটাগরির আহতদের ১৫ হাজার টাকা এবং ‘সি’ ক্যাটাগরির আহতদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে বিশেষ করসুবিধা দেওয়ার ঘোষণাও এসেছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে।

এর আগে ২০২৫ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি আহত ও শহিদ পরিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আর্থিক সহায়তা প্রদান শুরু করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। ২১ জুলাই শহিদ পরিবার ও ৭ জন আহতের মধ্যে আর্থিক চেক হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছিল প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। 

প্রতিটি শহিদ পরিবার এককালীন ৩০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পাওয়ার ঘোষণা তখন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা এবং ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে জুলাইয়ে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।  এর পাশাপাশি প্রতিটি শহিদ পরিবারকে প্রতিমাসে ২০ হাজার টাকা করে ভাতার কথাও বলা হয়।