মিম থেকে আন্দোলন: দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুব্ধ তরুণদের নতুন রাজনীতি

দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের নিয়ে গত দুই দশকে সবচেয়ে বেশি যে কথাটি বলা হয়েছে তা হলো এই তরুণরাই একদিন বদলে দেবে এই অঞ্চলের অর্থনীতি।

বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ইন্টারনেট আর উচ্চশিক্ষার সুযোগ,সব মিলিয়ে এই প্রজন্মকে দেখা হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হিসেবে।

কিন্তু সেই সম্ভাবনার গল্পের পাশাপাশি আরেকটি গল্পও তৈরি হয়েছে।

আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে তরুণরা বেশি শিক্ষিত, তারা পৃথিবীর সঙ্গে বেশি যুক্ত। অন্য দেশের মানুষের জীবন, সুযোগ আর সম্ভাবনা তারা খুব সহজেই দেখতে পাচ্ছে।

কিন্তু সেই তুলনায় তাদের সামনে সুযোগের দরজা ততটা খোলেনি।

ডিগ্রি থাকলেই চাকরি মিলছে না। বছরের পর বছর পরীক্ষার প্রস্তুতি নিলেই সাফল্য নিশ্চিত হচ্ছে না। প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত থাকলেই অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। আর রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে এখনো অনেক সময় দরকার হয় পরিচিতি, পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা পুরোনো ক্ষমতার নেটওয়ার্ক।

প্রত্যাশা আর বাস্তবতার মধ্যে ফারাকটা ক্রমেই বেড়ে চলছে। আর সেখান থেকেই তৈরি হচ্ছে ক্ষোভ।

শ্রীলঙ্কার 'আরাগালায়া’, বাংলাদেশ ও নেপালের ছাত্র-তরুণদের আন্দোলন, আর এখন ভারতের ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির উত্থান, ঘটনাগুলো এক নয়। প্রত্যেকটির পেছনে আলাদা কারণ আছে, আলাদা রাজনৈতিক বাস্তবতা আছে।

তবু তাদের মধ্যে একটি মিল চোখে পড়ে।

তরুণদের একটি অংশ ক্রমেই সেসব প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছে, যেগুলো তাদের ভবিষ্যত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু তাদের কথা খুব একটা শোনে না।

ভারতের সিজেপি এই পরিবর্তনের সবচেয়ে অদ্ভুত উদাহরণগুলোর একটি।

একটি ডিজিটাল স্যাটায়ার থেকে তৈরি হওয়া এই আন্দোলন খুব অল্প সময়ের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে রাজপথে এসেছে। তার ভাষা কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দলের মতো নয়। 

কিন্তু ক্ষোভটা বাস্তব। আর সেখানেই সিজেপির গুরুত্ব। এটি শুধু ভারতের বেকার তরুণদের একটি আন্দোলন নয়। ডিজিটাল যুগে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণরা কীভাবে ক্ষোভ তৈরি করছে, তা ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং এক জায়গায় জড়ো হচ্ছে, সিজেপি তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

যে ভবিষ্যতের কথা বলা হয়েছিল

তরুণদের আন্দোলন শুধু অভাব-অনটন থেকে তৈরি হয় না। অনেক সময় ক্ষোভ তৈরি হয় তখন, যখন মানুষকে বছরের পর বছর একটি ভবিষ্যতের কথা বলা হয় কিন্তু সেটা আর বাস্তবে পরিণত হয় না।

ভারতের লাখ লাখ তরুণের কাছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা সেই বাস্তবতারই একটি বড় উদাহরণ।

বছরের পর বছর পড়াশোনা। পরিবারের টাকা খরচ। অনেকের ক্ষেত্রে ঋণ করে কোচিং। তারপর কোনো প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা বাতিল কিংবা প্রশাসনিক গাফিলতিতে সবকিছু আবার শূন্য থেকে শুরু।

এই অভিজ্ঞতা শুধু ভারতের নয়।

দক্ষিণ এশিয়ার নানা দেশে তরুণদের সামনে পড়াশোনা, চাকরি আর সামাজিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার পথ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

তরুণদের বলা হয়েছিল, শিক্ষা আর দক্ষতা অর্জন করলে সামনে খুলে যাবে সম্ভাবনার দরজা। একটি ভালো চাকরি, আর্থিক স্বনির্ভরতা এবং নিজের মতো করে জীবন গড়ে তোলার সুযোগ, এই ছিল সেই প্রতিশ্রুতির সারকথা।

কিন্তু বাস্তবতা অনেকের জন্য ভিন্ন।

ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই। বছরের পর বছর পরীক্ষার প্রস্তুতি আছে, কিন্তু পরীক্ষার প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা নেই। প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ আছে, কিন্তু সেই সংযোগ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে না।

তাই প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যায়’ তা নয়।

অনেক তরুণের প্রশ্ন বরং, ‘এত কিছু করার পরও যদি সামনে এগোনোর পথ না খোলে, তাহলে এরপর কী?’

এই হতাশা একদিনে তৈরি হয়নি। কিন্তু যখন প্রতিষ্ঠানগুলো সেই হতাশার কোনো উত্তর দিতে পারে না, তখন ক্ষোভ জমতে থাকে।

আর সেই ক্ষোভ সবসময় মিছিল বা স্লোগান হয়ে প্রকাশ পায় না।

কখনো তা আসে একটি মিম হয়ে।

কখনো একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট হয়ে।

কখনো একটি অনলাইন কমিউনিটি হয়ে।

আর কখনো সেই অনলাইন কমিউনিটিই রাস্তায় নেমে আসে।

মিম যখন রাজনৈতিক পরিচয় হয়ে ওঠে

সিজেপি এখানেই প্রচলিত রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর থেকে আলাদা।

ডিজিটাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজিস্ট অভিজিৎ দিপকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন শুরু থেকেই প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষা এড়িয়ে গেছে। ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামকে ব্যঙ্গ করে তৈরি নাম, বিদ্রূপাত্মক ভাষা এবং নিজেদের ‘অলস ও বেকারদের কণ্ঠ’ হিসেবে তুলে ধরা, সবকিছুর মধ্যেই ছিল প্রচলিত রাজনীতিকে নিয়ে ব্যঙ্গ।

কিন্তু সেই স্যাটায়ারের পেছনে ছিল বাস্তব ক্ষোভ।

নতুন প্রজন্মের রাজনীতি বোঝার জন্য এই জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ।

আগের দিনের রাজনৈতিক আন্দোলন তৈরি হতো দলীয় কার্যালয়, মিছিল, পোস্টার, আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ আর প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বকে ঘিরে।

এখন সেই ছবিটা বদলাচ্ছে।

একটি মিম কয়েক ঘণ্টায় লাখো মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। একটি মজার নাম তৈরি করতে পারে পরিচয়ের অনুভূতি। একটি অনলাইন গ্রুপ এমন মানুষদের এক জায়গায় আনতে পারে, যারা কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়ার কথা ভাবেনি।

সিজেপি সেই নতুন বাস্তবতারই একটি উদাহরণ।

দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের একটি অংশ ক্ষমতাসীন দলগুলোর ওপর যেমন আস্থা হারাচ্ছে, তেমনি প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোকেও খুব একটা বিশ্বাস করছে না।

তাদের কাছে রাজনীতি অনেক সময় একই চক্রের মতো; নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি, ক্ষমতায় যাওয়ার পর বাস্তবতা, তারপর আবার হতাশা।

এই অবিশ্বাসের জায়গাতেই মিম ও ডিজিটাল সংস্কৃতি নতুন রাজনৈতিক ভাষা হয়ে উঠছে।

মিম এখন শুধু হাসির বিষয় নয়।

এটি ব্যঙ্গের ভাষা।

ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা।

কখনো কখনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ভাষাও।

যখন অনলাইনে ক্ষোভ রাজপথে নামে

অনলাইনে জনপ্রিয় হওয়া আর বাস্তবে রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠা এক কথা নয়।

অনেক ভাইরাল আন্দোলন কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হারিয়ে যায়। সিজেপির গুরুত্ব বাড়ে তখনই, যখন এটি সামাজিক মাধ্যমের ডিজিটাল পর্দা থকে বের হয়ে রাস্তায় নেমে আসে।

সংসদ অভিমুখে মিছিল, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহার এবং প্রায় ১৮০ জন আহত হওয়ার খবর আন্দোলনটিকে নতুন মাত্রা দেয়।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার।

ইন্টারনেট আর রাজপথ এখন আলাদা দুটি জগত নয়।

একটি আন্দোলন সামাজিক মাধ্যমের পর্দায় শুরু হতে পারে। কিন্তু তার পেছনের ক্ষোভ খুব দ্রুত বাস্তব মানুষের জমায়েতে পরিণত হতে পারে।

সিজেপির পেছনে কোনো পুরোনো রাজনৈতিক সংগঠন নেই। নেই দেশজুড়ে দলীয় কার্যালয়ের নেটওয়ার্ক কিংবা বহু বছরের সাংগঠনিক কাঠামো।

তার শক্তি এসেছে অন্য জায়গা থেকে—একটি অভিন্ন ক্ষোভ, একটি অভিন্ন ভাষা এবং এই অনুভূতি থেকে যে, অনেক মানুষ আলাদা আলাদা জায়গায় থেকেও একই সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

এই ধরনের আন্দোলন প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য কঠিন। কারণ এখানে কোনো একটি কেন্দ্র নেই, যাকে নিয়ন্ত্রণ করলেই আন্দোলন থেমে যাবে। কোনো একটি নেতাকে গ্রেপ্তার করলেই সংগঠন ভেঙে পড়বে না।

আন্দোলনটি একই সময়ে সামাজিক মাধ্যমে, মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে এবং রাজপথে থাকতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার একই গল্প?

সিজেপি শ্রীলঙ্কার ‘আরাগালায়া’ নয়। বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন বা নেপালের তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গেও এর সরাসরি তুলনা করা যায় না।

শ্রীলঙ্কায় আরাগালায়া তৈরি হয়েছিল ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে। বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল সরকারি চাকরি, সুযোগের বণ্টন ও রাজনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্ন। নেপালে তরুণদের ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি হতাশা।

তবু সবগুলো ঘটনার মধ্যে একটি মিল আছে।

তরুণদের একটি অংশ মনে করছে, তাদের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে।

তরুণরা আগের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে বেশি সংযুক্ত। তারা অন্য দেশের মানুষের জীবন দেখতে পারে। নিজের সুযোগের সঙ্গে অন্যদের সুযোগের তুলনা করতে পারে। দুর্নীতি, বেকারত্ব আর প্রশাসনিক ব্যর্থতার গল্প কয়েক সেকেন্ডে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।

ইন্টারনেট শুধু তথ্যের গতি বাড়ায়নি। ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার গতিও বাড়িয়েছে।

নতুন রাজনীতির কেন্দ্রে অবিশ্বাস

সিজেপি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন।

হয়তো আন্দোলনটি একসময় হারিয়ে যাবে। হয়তো আরও প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে ঢুকে পড়বে। হয়তো রাস্তায় তৈরি হওয়া শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাবে রূপ দিতে পারবে না।

কিন্তু এর গুরুত্ব কেবল টিকে থাকার ওপর নির্ভর করে না।

সিজেপি একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অনলাইনে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্ম রাজনীতির নিজের ভাষা তৈরি করছে। সেই ভাষা দ্রুত, অনেক বিদ্রূপাত্মক এবং শাসকদের প্রতি অনেক বেশি সন্দিহান।

এই প্রজন্ম সবসময় কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে চায় না। কোনো প্রতিষ্ঠিত নেতাকে অনুসরণ করতেও আগ্রহী নয়। অনেক সময় তারা কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের চেয়েও বেশি একত্রিত হয় একই রকম অভিজ্ঞতা ও ক্ষোভের জায়গায়।

তাদের আন্দোলন শুরু হতে পারে একটি মিম দিয়ে।

কিন্তু সেই মিমের পেছনে থাকতে পারে বছরের পর বছর বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রস্তুতি, অপেক্ষা আর হতাশা।

দক্ষিণ এশিয়ার তরুণরা কোনো একক আদর্শে একত্রিত নয়। তাদের দাবি এক নয়। তাদের রাজনৈতিক বাস্তবতাও এক নয়।

তবু তাদের মধ্যে একটি সন্দেহ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, তাদের জীবন নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থাগুলো হয়তো তাদের কথা মাথায় রেখেই তৈরি হয়নি।

এই সন্দেহের উত্তর না মিললে প্রতিক্রিয়াটি সবসময় কোনো রাজনৈতিক ইশতেহার হয়ে আসবে না।

কখনো তা আসবে একটি মিম হিসেবে।

তারপর একটি হ্যাশট্যাগ।

তারপর একটি ভিড়।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে প্রশ্নটি এখন আর তরুণরা ক্ষুব্ধ কি না তা নয়।

প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি সেই ক্ষোভকে তখনই বুঝতে পারবে, যখন সেটি একটি মিম? নাকি অপেক্ষা করবে যতক্ষণ না সেই মিম রাজপথে নেমে আসে?