মতামত

টিকার সংকট: মৃত্যু রোগে নয়, অবহেলায়

এপ্রিলের প্রথম ১৭ দিনেই আনুমানিক ১৭৩ জন শিশু মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এই ঘটনা টিকা আবিষ্কারের আগের কোনো অন্ধকার যুগের নয়। এটি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের ঘটনা। কেন্দ্রীয় গুদামে ছয়টি অপরিহার্য টিকার মজুদ শূন্য। হামের টিকা নেই। বিসিজি নেই। পাঁচটি রোগ ঠেকানোর পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা নেই। 

অন্যদিকে, ইউএসএআইডি’র মতো আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাও তাদের বার্ষিক অনুদান নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিয়েছে। যে বাংলাদেশ এক সময় পোলিও নির্মূল করেছিল, যার টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) দক্ষিণ এশিয়ায় মডেল হিসেবে পরিচিত ছিল- সেই বাংলাদেশ এখন শিশুদের টিকা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। কোথাও কোনো একটা বড় ভুল হয়ে গেছে।

সত্যি বলতে, এখানে অনেকগুলো ভুল একসঙ্গে ঘটেছে। যা আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল এবং চাইলেই ঠেকানো সম্ভব ছিল। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল-প্রতিটি হাসপাতাল থেকে শিশুর লাশের খবর আসছে। মোট কথা, দেশের প্রতিটি বিভাগেই হাম ছড়িয়ে পড়েছে, যা আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে সংক্রমণ তীব্র হওয়ার পর বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে মোট ২১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ১৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে সন্দেহভাজন রোগী হিসেবে এবং ৩৭ জনের মৃত্যু ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া রোগীর তালিকায় রয়েছে। সারা দেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ২১ হাজার ৪৬৭ জন এই রোগে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। যার মধ্যে ৩ হাজার ১৯২ জনের সংক্রমণ ল্যাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। বিভাগীয় পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে ৯ হাজার ২৭৪ জন, যা দেশের মোট আক্রান্তের প্রায় অর্ধেক। তবে প্রাণহানির দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে রাজশাহী বিভাগ, যেখানে সর্বোচ্চ ৬২ জন মারা গেছেন। বরিশাল বিভাগে জনসংখ্যার অনুপাতে সংক্রমণের হার বেশি হলেও সেখানে মৃত্যু হয়েছে ২ জনের।

অন্যদিকে রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা এখন পর্যন্ত তুলনামূলক কম। চট্টগ্রাম বিভাগেও সংক্রমণ ২ হাজার ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পগুলোর বাসিন্দারাও রয়েছেন।

একটি কার্যকর ব্যবস্থা যেভাবে ভেঙে পড়ল

বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে আগের সরকারের ওপর দায় চাপিয়েছেন। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্তই বিপদ ডেকেছে। অর্থাৎ অর্থায়নের পুরনো কাঠামো হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়াই এই সংকটের মূল কারণ। সত্যিটা সম্ভবত এই দুয়ের মাঝখানে। কিন্তু দায় ভাগাভাগি করে এগিয়ে গেলে আসল সমস্যাটা ঢাকা পড়ে যায়। এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দায় নিয়ে রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুড়ি হতে পারে। সমস্যার সমাধান হবে না। বাঁচবে না শিশুর জীবন। কেননা আসল সমস্যাটা গভীরে। আসল সমস্যা হলো কাঠামোগত।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের টিকাদান ব্যবস্থা বিদেশি সাহায্যের ওপর টিকে ছিল। কিন্তু বিদেশি সাহায্য যখন কমে আসছে, তখন নিজস্ব অর্থে টিকা কেনা বা কোল্ড চেইন বজায় রাখার জন্য যে শক্তিশালী প্রস্তুতি থাকা দরকার ছিল, সেটি হোঁচট খেয়েছে। তার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন তাদের স্বাস্থ্য সহায়তা এক ধাক্কায় প্রায় ৯৩ শতাংশ কমিয়ে দেয়, তখন তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ময়মনসিংহের কোনো এক গ্রামে হামে ধুঁকতে থাকা শিশুর ওপর। বিশ্বের বড় বড় দেশের অর্থনৈতিক হিসেব-নিকেশের বলি হচ্ছে আমাদের শিশুরা।

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ব্যাহত হয়। ২০২৫ সালের মার্চে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রাম বাতিল করে দেয়। কয়েক দশক ধরে এই কর্মসূচির মাধ্যমেই বিদেশ থেকে টিকার টাকা আসতো। অভিযোগ আছে, পুরনো ব্যবস্থা বন্ধ করার আগে পর্যাপ্ত বিকল্প চিন্তা করা হয়নি। ফলে বিদেশি অর্থায়ন যেমন কমেছে, দেশের বাজেট থেকেও প্রয়োজনীয় টাকা বরাদ্দ করা সম্ভব হয়নি।

এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে কেনাকাটার জটিলতা। অর্ধেক টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে আর অর্ধেক টেন্ডারের মাধ্যমে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টিকা কেনার জন্য ৮৪২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। টাকা ছাড় হলেও অনুমোদন আটকে যায়। ফলে হাম-রুবেলার টিকা গুদামে শেষ হয়ে যায়। ২০২৫ সালের এপ্রিলের জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরুই হয়নি। ২০২৬ সালের শুরুতে দেশের অনেক জায়গায় শিশুরা একটিও টিকা পায়নি। জানুয়ারি থেকে রেশনিং শুরু হয়, চুপচাপ।

পাশাপাশি আছে মাঠপর্যায়ের অবহেলা। গত এক বছরে স্বাস্থ্য সহকারীরা তিনবার ধর্মঘটে গেছেন। এমনকি যে কর্মীরা (ভ্যাকসিন পোর্টার) প্রতিদিন জীবন হাতে নিয়ে দুর্গম এলাকায় বরফ-ভরা বক্সে টিকাকেন্দ্রে টিকা পৌঁছে দেন, তারা নয় মাস ধরে বেতন পাননি।  ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার এলেও ক্ষতি অনেক হয়ে গিয়েছিল। ৫ এপ্রিল জরুরি ক্যাম্পেইন শুরু হয়, কিন্তু অনেক শিশুর জন্য ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। এটি কেবল প্রচারণার ব্যর্থতা নয়। এটি পুরোপুরি সুশাসনের অভাব।

‘অনীহা’ নয়, সংকটটা সেবার অভাব

এই সংকটকে কেবল সরবরাহ-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে একটা বড় সত্য মিস হয়ে যায়। আক্রান্ত শিশুদের দুই-তৃতীয়াংশ হামের একটি ডোজও পায়নি। এরা ভুল তথ্যে বিভ্রান্ত পরিবারের সন্তান নয়। এরা সেই পরিবারের সন্তান যেখানে স্বাস্থ্যকর্মী কখনো পৌঁছাননি, যেখানে টিকা আসেনি, যেখানে রাষ্ট্র শিশুর কাছে পৌঁছানোর আগেই, পৌঁছে গেছে রোগ। অর্থাৎ মায়েরা ইউটিউবে ভিডিও দেখে টিকা দেওয়া থেকে বিরত থাকেনি। বরং এরা এমন সব বস্তি বা দুর্গম এলাকায় থাকে যেখানে স্বাস্থ্যকর্মীরা পৌঁছাতে পারেননি বা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে টিকা নেই। যখন একজন মা দেখেন যে তার সন্তানকে কেন্দ্রে নিয়েও টিকা দেওয়া যাচ্ছে না, তখন তিনি সিস্টেমের ওপর আস্থা হারান। একে কুসংস্কার বললে ভুল হবে। এটি মূলত একটি অকেজো ব্যবস্থার ওপর তাদের বাস্তব ক্ষোভ।

আমরা বহুদিন ধরে টিকা না নেওয়ার কারণ খুঁজি মানুষের ‘অজ্ঞতায়’। সমাধান খুঁজি আরো বেশি প্রচারণায়। আরো রঙিন পোস্টারে। কিন্তু মানুষের বিশ্বাস পোস্টারে ফেরে না। ভেবে দেখা যাক, উত্তরবঙ্গের একজন মায়ের কথা। যিনি বলছেন টিকায় তার ভরসা নেই। তিনি কি সত্যিই অযৌক্তিক? নাকি তিনি এমন একটি ব্যবস্থাকে দেখছেন যে ব্যবস্থা বারবার তাকে হতাশ করেছে? তাকে বোঝানোর উপায় আরো বেশি বিজ্ঞাপন নয়। উপায় হলো সেই ভরসাটুকু ফিরিয়ে দেওয়া। যা আমরা নিজেরাই ভেঙে ফেলেছি। বিশ্বাস গড়তে সময় লাগে। ভাঙতে লাগে না।

আর সেই ভারসা ভাঙার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে যোগাযোগ। সাম্প্রতিক এই বিপর্যয মোকাবিলায় যোগাযোগেও বড় ভুল হয়েছে। মার্চে হাম বাড়তে থাকলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সময়মতো কোনো খবর বা সতর্কতা দেওয়া হয়নি। ফেসবুক-টিকটকে গুজব ছড়িয়ে পড়ে- টিকা বন্ধ্যাত্ব ঘটায়, হামের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা বেতন আর টিকার অভাবে হতাশ হয়ে পড়েন। তারা গ্রামে-শহরে সঠিক কথা বলতে পারেননি। বাবা-মায়েরা জানতেন না দুই ডোজ টিকা কেন দরকার বা হামের প্রথম লক্ষণ কী। আগের দিনের মতো স্থানীয় মানুষের সঙ্গে বিশ্বাস গড়ে তোলার বদলে উপর থেকে চুপচাপ থাকা হয়েছে। ফলে সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। গুজব আর অবিশ্বাস বেড়েছে।

রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে শিশুদের জীবনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। টিকা কর্মসূচি ছিল শিশুদের রক্ষার হাতিয়ার। কিন্তু ক্রয়ের জটিলতায় দুর্বল শিশুরা টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এতে অনেক শিশু অকারণে মারা গেছে। এটা ন্যায়সঙ্গত নয়। টেন্ডার নিয়ে আলোচনা করতে করতে শিশু মৃত্যু ঘটানো ঠিক নয়। সবচেয়ে গরিব পরিবারের শিশুরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পরিবর্তনের পথ: সাত দফা প্রস্তাব

জরুরি টিকাদান অভিযান চলছে। ভালো কথা। কিন্তু এটা প্রলেপ মাত্র। বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হয়তো সাময়িক বিপদ কাটাবে। ক্ষতটা সারাতে হলে গোড়ায় হাত দিতে হবে। স্থায়ী সমাধান পেতে হলে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার খোলনলচে বদলাতে হবে:

প্রথমত, টিকার ব্যবস্থাকে রাজনীতির বাইরে রাখতে হবে। সরকার বদলালেই যেন টিকার গুদাম খালি না হয়। নির্বাচন কমিশনের মতো একটি স্বতন্ত্র সংস্থা দরকার- যার নিজের বাজেট থাকবে, যার কাজ কোনো মন্ত্রীর সিদ্ধান্তে থামানো যাবে না।

দ্বিতীয়ত, সংকটের আগেই মজুদ নিশ্চিত করতে হবে। জরুরি তহবিল গঠন করতে হবে। বিদেশিদের সাহায্যের অপেক্ষায় না থেকে অন্তত ছয় মাসের টিকার মজুদ নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ আপদকালীন তহবিল গঠন করা উচিত। আইন করে ঠিক করে দিতে হবে- দেশে সবসময় অন্তত ছয় মাসের টিকার মজুদ থাকতে হবে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার এটাই প্রাথমিক পাঠ।

তৃতীয়ত, মাঠের কর্মীদের ন্যায্য মজুরি দিতে হবে। নয় মাস বেতন না পেয়ে যে বাহক টিকা বহন করবেন না, তাকে দোষ দেওয়া যায় না। মাঠের মানুষ না পেলে টিকা মানুষের কাছে পৌঁছায় না- এই সহজ কথাটা নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে। টিকা বহনকারী বা স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন মাসের পর মাস আটকে রাখাটা অপরাধের শামিল। তাদের পাওনা দ্রুত পরিশোধের জন্য আইনি গ্যারান্টি থাকতে হবে।

চতুর্থত, বাংলা ভাষায় স্বাস্থ্যবিষয়ক ভুল তথ্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বের সাথে বিনিয়োগ করতে হবে। এই সংকটের ডিজিটাল মাত্রাটি কম আলোচিত। বাংলাদেশ ২০২৪ সালে টিকায় ১৬ কোটি ডলার ব্যয় করেছে, অথচ আনুমানিক ২০ শতাংশ টিকা নষ্ট হয়ে যায় ক্ষতি, অনুপযুক্ত সংরক্ষণ বা অব্যবহৃত ডোজ বাতিলের কারণে। একই সময়ে, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে বাংলায় স্বাস্থ্য-বিষয়ক ভুল তথ্য ব্যাপকভাবে ছড়াচ্ছে- কার্যত কোনো প্ল্যাটফর্ম-স্তরের মডারেশন ছাড়াই। বাংলায় মেটার কনটেন্ট পরিচালনা বিনিয়োগ ইংরেজির তুলনায় নগণ্য। সরকারকে প্রধান প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে বাধ্যতামূলক কনটেন্ট পরিচালনা চুক্তি করতে হবে, প্ল্যাটফর্ম অপারেটিং লাইসেন্সকে বাংলায় মডারেশন-সক্ষমতার সাথে শর্তযুক্ত করতে হবে এবং ডিজিএইচএসের অধীনে একটি স্বতন্ত্র বাংলা স্বাস্থ্য-গুজব দ্রুত প্রতিক্রিয়া ইউনিট গড়তে অর্থায়ন করতে হবে।

পঞ্চমত, মানুষের কথা শুনতে হবে। স্বাস্থ্য বিভাগ কেবল প্রচার চালালে হবে না, মানুষের অভিযোগ শোনার ব্যবস্থাও করতে হবে। সেবা যদি সহজ এবং সম্মানজনক হয়, তবেই মানুষ নিজের তাগিদে কেন্দ্রে আসবে।

ষষ্ঠত, দেশে টিকা তৈরির পথ খুলতে হবে। বাংলাদেশ প্রায় সব টিকা বিদেশ থেকে আনে। বিদেশি সাহায্য কমলে বা বন্ধ হলে কী হয়- এই সংকট সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। দেশীয় ওষুধ কোম্পানিকে কাজে লাগিয়ে অন্তত হামের টিকা দেশে তৈরি শুরু করতে হবে। এটা দীর্ঘমেয়াদি কাজ। কিন্তু শুরুটা এখনই করতে হবে। দেশি প্রতিষ্ঠানের সাথে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে দেশে টিকা উৎপাদনের পথে হাঁটতে হবে। সব সময় আমদানির ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ।

সপ্তমত, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী কাঠামোকে সত্যিকারের দ্বিমুখী যোগাযোগের জায়গায় পরিণত করতে হবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য যোগাযোগ কাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ একমুখী- এটা সম্প্রচার করে, প্রচারণা চালায়, প্ররোচনা দেয়। প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে শোনে না। ইপিআইয়ের বিদ্যমান কমিউনিটি যোগাযোগ-পয়েন্টগুলোকে কাজে লাগিয়ে- কিন্তু সেগুলো পুনর্নকশা করে কাঠামোবদ্ধ প্রতিক্রিয়া-ব্যবস্থা, অভিযোগের প্রক্রিয়া এবং অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনার সুযোগ যুক্ত করে- একটি জাতীয় কমিউনিটি স্বাস্থ্য সংলাপ কর্মসূচি গড়ে তুললে টিকা-সংকোচের তথ্য নিছক রোগ-নির্ণয়ের কৌতূহল থেকে বাস্তব নীতি-সংকেতে পরিণত হবে।

পোলিও বা ধনুষ্টঙ্কার নির্মূল করে বাংলাদেশ একসময় বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেই সাফল্যই যেন আমাদের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা মনে করেছি ব্যবস্থাটি এমনিতেই টিকে থাকবে। ময়মনসিংহ বা রাজশাহীতে হামে মারা যাওয়া শিশুগুলো কেবল কোনো পরিসংখ্যান নয়। তারা আমাদের প্রশাসনিক খামখেয়ালি আর অদূরদর্শিতার বলি। আমরা যদি এখনো আইন করে টিকাদান ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত না করি, তবে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক যেকোনো ধাক্কায় শিশুদের এই লাশের মিছিল বারবার ফিরে আসবে। গুজবের চেয়ে দ্রুত যদি আমাদের সেবা না পৌঁছায়, তবে যে রোগ আমরা ৩০ বছর আগে জয় করেছিলাম, সেই হামেই আমাদের ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যাবে।

লেখক: জনস্বাস্থ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, সিনিয়র লেকচারার, মিডিয়া স্টাডিজ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ