সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনটি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন হয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের এবং সরকার ও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব পালিয়ে যায়।
ওই আন্দোলনের মূল স্পিরিট ছিল বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ—যেখানে কোটা নয়, বরং মেধাই প্রাধান্য পাবে। যে কারণে ওই সময়ে ‘কোটা না মেধা’ স্লোগানটি বেশ জনপ্রিয় হয়। কিন্তু রক্তক্ষয়ী ওই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এমন সব পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো, যা মূলত আগের মতোই কোটা সিস্টেম ফিরিয়ে আনে। যার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে বর্তমান নির্বাচিত সরকারও। ফলে জনমনে এই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে, যদি কোনো না কোনোভাবে, সমাজ ও রাষ্ট্রের কোনো একটি বা একাধিক গোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্র বিশেষ সুবিধা বা কোটা পদ্ধতি জারিই রাখবে, তাহলে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের দেড় হাজার মানুষ কেন প্রাণ দিলো? অভ্যুত্থানের পরেও ‘কোটা না মেধা’—এই স্লোগান শুনতে হবে কেন?
১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের যেমন মুক্তিযোদ্ধা বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়, সেরকম ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে জুলাইযোদ্ধা নামে এবং তারা গেজেটভুক্ত। ফলে চব্বিশের অভ্যুত্থানের আগে যে মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা নিয়ে বিতর্ক ছিল বা বিতর্ক তৈরি করা হয়েছিল, অভ্যুত্থানের পরে এখন বিতর্ক হচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা বা কোটা নিয়ে।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়ে তাদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য রাষ্ট্র যে কিছু বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল, যেমন মাসিক ভাতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও সরকারি চাকরিতে তাদের সন্তানদের অগ্রাধিকার—সেভাবেই জুলাইযোদ্ধাদেরও মাসিক ভাতার আওতায় আনা হয়। শুধু তাই হয়, সরকারি চাকরি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতেও জুলাইযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। যা মূলত পুরোনো কোটা সিস্টেমেরই ধারাবাহিকতা।
গত ২৪ মার্চ জুলাই আন্দোলনে শহীদদের সন্তান এবং আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী ‘জুলাই শিক্ষার্থী যোদ্ধা’দের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
গত শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা না রাখার পরামর্শ দিয়েছিল ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোটা যুক্ত করার সুপারিশ করে বোর্ড। এ নিয়ে তুমুল সমালোচনা শুরু হলে মুক্তিযোদ্ধ কোটা রেখেই ভর্তি নীতিমালা চূড়ান্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
একদিকে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থানে আহত শিক্ষার্থী, শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের জন্য কোটা রাখার যে রাজনীতি, সেটিও খুব পরিষ্কার। অর্থাৎ কারা মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করে জুলাই কোটা চালু করতে চায়, সেটি না বোঝার কোনো কারণ নেই।
গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুরুতর আহতরা প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। সেইসাথে প্রতিটি শহীদ পরিবার এককালীন ৩০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পাবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি শহীদ পরিবারকে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা করে ভাতা প্রদান করা হবে। শহীদ পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যরা সরকারি ও আধাসরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার পাবেন বলেও সিদ্ধান্ত হয়। এর বাইরে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে আজীবন চিকিৎসা সুবিধা; উপযুক্ত মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশে দেশি বিদেশি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা এবং কর্মসহায়ক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন সুবিধা পাবেন বলেও জানানো হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে বাড়তি সুবিধা পাবেন গেজেটভুক্ত জুলাইযোদ্ধারা। এই করবর্ষের জন্য স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। তবে গেজেটভুক্ত জুলাইযোদ্ধাদের মধ্যে যারা কর প্রদানের জন্য উপযুক্ত, তাদের করমুক্ত আয়ের সীমা হবে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা। প্রসঙ্গত, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ টাকা।
প্রসঙ্গত, মুক্তিযোদ্ধারাও মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পান। তাদের সঙ্গে মিল রেখে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারগুলোকেও একই অঙ্কের ভাতা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাইযোদ্ধাদের করমুক্ত আয়ের সীমাও অভিন্ন করা হয়েছে। অর্থাৎ নানাভাবেই জুলাইযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধাদের কাতারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে—এমন অভিযোগও আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতি কোটা বাতিল করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ছেলে-মেয়েদের জন্য এখনও পোষ্য কোটা সংরক্ষিত আছে। এটি সাংঘর্ষিক। খেলোয়াড় কোটায় স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ বেশ পুরোনো। এই কোটাও সম্ভবত এখনও বহাল রয়েছে। সুতরাং এসব কোটাও বাতিল করা প্রয়োজন।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে (প্রথম বর্ষে) ভর্তির ক্ষেত্রে আবারও পোষ্য কোটা ফেরানোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। এর আগে জানুয়ারি মাসে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষক ও কর্মকর্তার সন্তানদের জন্য বরাদ্দকৃত পোষ্য কোটা পুরোপুরি বাতিল করে দিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়ক ও সাধারণ কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য ১ শতাংশ কোটা রাখার সিদ্ধান্ত নেয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ছয় বছর আগে ২০১৮ সালেই আন্দোলনের মুখে সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল সরকার। কিন্তু পরে উচ্চ আদালত ওই প্রজ্ঞাপনকে অবৈধ বলে রায় দেয়। এরকম বাস্তবতায় শুরু হয় চব্বিশের আন্দোলন—যা একপর্যায়ে রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে। তখন নানা ফোরাম থেকেই এটা বলা হচ্ছিল যে, সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা রাখার কোনো সুযোগ নেই। যৌক্তিকতাও নেই। জেলা কোটা পুরোপুরি তুলে দেয়া এবং নারী কোটা রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও তখন প্রশ্ন ওঠে। কেননা নারীরা এখন পাবলিক পরীক্ষা, সরকারি চাকরির পরক্ষীসহ সমস্ত প্রতিযোগিতায় পুরুষের সঙ্গে সমান দক্ষতায় এগিয়ে যাচ্ছেন। নারী বলে তারা পিছিয়ে থাকছেন—সেটি বলার সুযোগ নেই।
যদিও সংবিধানে সমাজের অনগ্রসর অংশকে এগিয়ে নিতে তাদের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক বিশেষ সুবিধা দেয়া যেতে পারে বলে উল্লেখ রয়েছে। মূলত এই নির্দেশনাটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, দলিতসহ সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য। সুতরাং, সব কোটা তুলে দেয়াও যৌক্তিক ও মানবিক নয়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য অনেক বেশি কোটা; সেইসাথে জেলা ও নারী কোটা এবং পোষ্য কোটা নিয়েই বেশি সমালোচনা হয়েছে। সেই কোটাই এখন কেন আবার জুলাইযোদ্ধা বা চব্বিশের অভ্যুত্থানে হতাহতদের জন্য চালু করা হবে?
ভবিষ্যতে কোনো সরকারের বিরুদ্ধে যদি গণআন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থান হয় এবং তাতে সরকারের পতন হয়, তাহলে ওই আন্দোলনের পরে গঠিত সরকারও কি আন্দোলনে হতাহতদের জন্য বিশেষ সু্বিধা চালু করবে বা তাদের জন্যও আরেকটি কোটা চালু করবে?
মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তানদের জন্য যে যুক্তিতে কোটা কিংবা সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধার যে নির্দেশনা সংবিধান দিয়েছে, তার সঙ্গে মিলিয়ে কোনো আন্দোলনে হতাহতদেরকেও গেজেটভুক্ত করে তাদের জন্য কোটা চালুর এই পদ্ধতি কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্নও জনমনে রয়েছে।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।