স্মৃতিচারণ

সুমন আমার বন্ধু না!

শামস সুমন আমার বন্ধু না। হয়তো হতেও চায়নি। বন্ধু হলে আমরা জানতাম গত তিন চার দিন সে কেন অফিসে যাচ্ছিল না। যখন জানা গেল তার খানিক পরেই তাকে ভর্তি করানো হয়েছিল হাসপাতালে। ফেরানো যায়নি। হয়তো সুমন জানতো ‘বেদনার সব কথা মানুষ বলে না’, সেও বলবে না! না বলেই চলে গিয়েছে সে অজানা ভূবনে। ‘হতে না পারার’ এই বেদনা কিংবা জীবনের কিছু ঘটনা অজানার আড়ালে রাখাই কি শেষমেষ ব্রত হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার?

সুমন অবশ্য সববিছু আড়াল করতে পারতো না। সে শিক্ষক হতে চেয়েছিল। সুন্দর উচ্চারণে কথা বলতো। আমি বলেছিলাম আমার দাদা শিক্ষক ছিলেন। আমার পাঁচ বোন শিক্ষক। সুমন তখন জানিয়েছিল সেও শিক্ষক হতে চেয়েছিল। সুন্দর করে তাই কথা বলা শিখেছিল। শিক্ষক না হয়ে ভালোই হয়েছে হয়তো! শিক্ষক হলে হয়তো আমার বা আমাদের সাথে দেখাই হতো না! আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে যারা সুন্দর করে দারুণ গলায় কথা বলতে পারে পরকালে তাদের কি কোনো পুরস্কার মেলে? সুমন অবশ্য একবার পুরস্কার পেয়েছিল। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘স্বপ্নপূরণ’ ছবিতে সে পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে পুরস্কার জিতেছিল। তার স্বপ্নপূরণ হয়েছিল কি না সেটা না জেনেই আমি বলেছিলাম সেলিব্রেট করতে। এরপর তিনমাস সে আমার মুখোমুখি হয়নি। কেন সেটা আজ আর না বলি। শুধু বলে রাখি সুমন শিক্ষক হতে চেয়েছিল। পারেনি!

রেডিওর কথা সে খুব বলতো। রেডিওর প্রতি ভয়াবহ দুর্বলতা ছিল সুমনের। ছোটকালে রেডিওতে যখন নাটক শুনতো মুরুব্বিরা, তখন সে ভাবতো বড় হয়ে সে একদিন রেডিওতে ঢুকবে। কেমনে বড় মানুষ ছোট্ট রেডিওর মধ্যে ঢুকে সেটা ভেবে অবাক হতো। এরপর রাজশাহী বেতারে সে নাটকের সাথে জড়ায়। ততদিনে সে নাটকের সাথে জড়িত অনেকের কথাই জানতে পেরেছে। বড় সুমনের ছোট্ট রেডিওতে ঢোকা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সে আমাকে একদিন দুঃখ নিয়ে বলেছিল সে রেডিওরও কিছু হতে পারেনি! আমি স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম সে একটা বেসরকারি রেডিওতে শীর্ষপদে কাজ করে। সুমন আমাকে ধরা গলায় কবিতা শুনিয়েছিল-অমলকান্তি রৌদ্দুর হতে চেয়েছিল!’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে সুমন কবিতার সাথে জড়িয়েছিল। আবৃত্তি সংগঠন ‘স্বনন’ এর সাথে ছিল অনেক দিন। দিলখোলা হাসি হেসে কবিতা আবৃত্তি করতো। একবার নাজিম হিকমত আবৃত্তি করে বলেছিল-‘আমার সঙ্গে কবরে যাবে এক অসমাপ্ত গানের বেদনা’! আমি জানতে চেয়েছিলাম তাহলে এই হাসির উদ্দামতা কেন? সে বলেছিল গানের কথা-‘এমনও হাসি আছে বেদনা মনে হয়!’ সুমন কবিতার সাথে থাকতে চেয়েছিল। পারেনি। সে আবৃত্তিকার হতে পারতো। শিক্ষক না হবার মতো সে আবৃত্তিকারও হতে পারে নি। হয়তো সুমন অনেক কিছু আড়াল করে খানিকটা একা থাকতে চেয়েছিল।

সুমন একাও থাকতে পারেনি। মিছিলে যাওয়া শিখেছিল। একা একা কখনো মিছিল হয়? নব্বই এর উত্তাল গণ-আন্দোলনে অনেকের সাথে সুমনও ছিল। তখন থেকে দেশটা তার খুব আপন মনে হয়েছিল। সে এই দেশেই থাকতে চেয়েছিল। ‘বড়প্রেম শুধু কাছেই ডাকে না দূরেও ঠেলিয়া দেয়’-শেষমেষ কি পরিবার থেকে সে দূরে সরে যাচ্ছিল? আমরা সেই কারণ না খুঁজি। শুধু জানিয়ে রাখি রেডিওই তাকে রাজশাহী থেকে ঢাকা এনেছিল। ঢাকা রেডিওতে নাটক সহ আরও অনেক ‘কণ্ঠ’কাজে জড়িয়েছিল সে। কিন্তু সরকারি রেডিওর কিছু হতে পারেনি কিংবা হতে চায়নি সুমন। সে অমলকান্তি হয়ে যাচ্ছিল!

যখন সে ‘বন্ধন’ এ জড়ায়নি তখন এবং জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘বন্ধন’ এ অভিনয়কালীন সময়ে আমি সুমনের সাথে ‘দূরগত এক বন্ধনে’ জড়াই। এরপর বন্ধন পেরিয়ে সুমন আরো অনেক নাটকে অভিনয় করেছে হোক সেটা ‘রাতের অতিথি’,‘অতন্দ্র প্রহর’,‘অনুরাগ’ বা ‘যদি ভালোবাসো’র মতো নাটক। আমি যে টেলিভিশনে কাজ করি সেখানের অগনিত নাটকেও অভিনয় করেছে সুমন। একদিন জানতে চেয়েছিলাম (গত বছরে) অভিনয়ে কম দেখছি মনে হয়! সুমন বলেছিল-‘আমার মনে হয় আমি আনফিট হয়ে গেছি! আমি একালের যেসব নাটক দেখি, তার পান্ডুলিপি,তার ডায়ালগ, তার ড্রেস, এমন কী ডায়ালগ থ্রোটাও অনেক সময় নিতে পারি না। মঞ্চ থেকে আসা বা রেডিও থেকে আসা কন্ঠ নির্ভর এই আমি কোনো ভালোবাসা খুঁজে পাই না এসব নাটকে’।

জানি না সুমন এমন ভেবেছিল কি না যে সে অভিনয়েরও কেউ না! যদিও বহু আগে থেকে সে চলচ্চিত্রেও কাজ শুরু করেছিল। প্রচলিত কিংবা ভিন্নধারার ছবিতেও তাকে অনেক দেখা গেছে। প্রিয়বন্ধু তৌকীর আহমেদের ‘জয়যাত্রা’, খালিদ মাহমুদ মিঠুর ‘জোনাকির আলো’ বা বাদল খন্দকারের ‘বিদ্রোহী পদ্মা’তে যেমন অভিনয় করেছিল সুমন তেমনি পি এ কাজলের ‘চোখের দেখা’, নায়করাজ রাজ্জাকের ‘আয়না কাহিনী’ বা গুলজারের ‘মন জানে না মনের ঠিকানা’তে অভিনয় করেছিল সুমন। চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া সুমন চলচ্চিত্রেরও কেউ হতে পেরেছে কি না জানতে চাইনি। 

জানতে চেয়েছিলাম তার আসলে কী হয়েছে। সুমন সম্ভবত আমার বন্ধু হতে চায়নি। সে তেমন করে বলেনি নিজের কথা বা পরিবারের কথা। স্বভাবজাত হাসিটাও ছিল না তেমন। সন্ধ্যার পর আমি হাঁটি গ্রীণরোড পান্থপথ লাগোয়া ‘পানি ভবন’ এর ভেতর। সুমন সেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতো কখনো সখনো। তারপর আমরা হেঁটে হেঁটে যেতাম আশে পাশে কিংবা আমার বাসায়। নিজেকে লুকোনোর এক পর্যায়ে আমারও মনে হয়েছিল সুমন অনেক কিছু ‘না পারা’ বা ‘না হতে চাওয়া’র মতো আমারও বন্ধু হতে চায়নি। সব দুঃখ হৃদয়ে জমা রাখা ঠিক না। হৃদয় চৌচির হয়ে যায়। আমার মনে হয় সুমনেরও তাই হয়েছে। 

হৃদয় চৌচির হবার পরে সুমন চলে গেছে। সুমন দেশ ছেড়ে কোথাও যেতে চায়নি। এই একটা আশা তার পূর্ণ হয়েছে। সে দেশেই মারা গেছে, চিরঘুমেও থাকবে এই দেশের মাটিতে। সে অমলকান্তি হয়েছে? সে কি অসমাপ্ত এক গানের বেদনা নিয়ে এই পৃথিবী ছেড়েছে? শিক্ষক, আবৃত্তিকার, বাচিক শিল্পী, অভিনেতা, রেডিওর কর্মকর্তা এমন কি আমার বন্ধু কোনটা হয়েছে শেষমেষ? আমি এই প্রশ্নের উত্তর জানি না। 

শুধু জানি আমি একটু হলেও বন্ধুত্বহীন হয়ে গেছি।

সুমন আর কখনো পানি ভবনের গেটে অপেক্ষা করবে না! জানি না সুমন যেখানে গিয়েছে সেখানকার নাটক আর চলচ্চিত্রের জগৎটা কেমন। জানি না সেখানেও প্রভাত ফেরি হয় কি না। পহেলা বৈশাখের ভোরে কেউ রমনা বটমূলে যায় কি না। সেখানেও দরাজ গলায় কেউ কবিতা আবৃত্তি করে কি না! আমি কোনোদিন সেখানে গেলে সুমনের সাথে আমার দেখা হবে কি না।

দেখা হলে জানতে চাইবো সুমন তুই কি কখনো আমার বন্ধু ছিলি?