প্রিয় চালক, আর কত কান্না, আর কত দীর্ঘশ্বাসের কারণ হবেন আপনি?

প্রিয় চালক ভাই,

আপনি কী জানেন, আপনি যখন ড্রাইভিং সিটে বসেন, তখন আপনার পেছনের সিটগুলোতে বসে থাকে কারো আদরের সন্তান, কারো নির্ভরতার বাবা, কিংবা কারো স্নেহময়ী মা।

আজ যখন আপনাকে এই চিঠিটি লিখছি, তার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে বাগেরহাটের রামপালে ঘটে যাওয়া সেই হৃদয়বিদারক খবরটা কি আপনি শুনেছেন?

বরযাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাস যাচ্ছিল আনন্দ আর উল্লাস নিয়ে। সাব্বির আর কনে মিতুর বিবাহিত জীবনের শুরু হওয়ার আগেই একটি বাস মুহূর্তেই শেষ করে দিলো সব।

সাব্বির-মিতুসহ একই পরিবারের ১২ জন সদস্য এবং আপনাদেরই এক চালক ভাইসহ মোট ১৩ জন প্রাণ হারালেন। এই দুর্ঘটনা  মুছে দিয়েছে একটি গোটা পরিবারের নাম।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে তাদের স্বজনদের যে আহাজারি, তা কেবল একটি পরিবারের না, এই দেশের আর অনেক পরিবারের।

এই যে ১৩টি প্রাণ চলে গেল, এর দায় কি আমরা এড়াতে পারি? সাব্বির ও মিতুর সেই লাল শাড়ি আজ রক্তের রঙে একাকার হয়ে গেছে। আপনি কি অনুভব করতে পারেন সেই বৃদ্ধ বাবার কষ্ট, যিনি তাঁর পুরো পরিবারকে এক নিমেষে হারিয়ে ফেললেন? আপনার একটু নিয়ন্ত্রণ, একটু সাবধানতা কি পারত না এই আনন্দযাত্রাকে বিষাদে রূপ নেওয়া থেকে বাঁচাতে?

আপনার কি মনে পড়ে তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেনের কথা?

২০১৮ সালের এপ্রিলের এক তপ্ত দুপুরে আপনারই দুই সহকর্মীর রেষারেষি চলছিল রাজধানীর সার্ক ফোয়ারার কাছে। সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতার এক পর্যায়ে দুই বাসের চাপায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল রাজীবের হাত।

শরীর থেকে আলাদা হওয়া সেই হাতটি বাসের দরজায় ঝুলে ছিল দীর্ঘক্ষণ। রাজীবের ঝুলে থাকা সেই হাতের ছবি যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল, তখন পুরো বাংলাদেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

রাজীব কোনো সাধারণ ছাত্র ছিল না। খুব ছোটোবেলায় সে তার মাকে হারিয়েছিল, বাবাও ছিলেন নিরুদ্দেশ। নিজের দুই ছোট ভাইকে মানুষের মতো মানুষ করার এক অদম্য জেদ নিয়ে সে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল রাজীব।

সে শুধু একজন ছাত্র ছিল না, সে ছিল তার দুই এতিম ভাইয়ের পুরো পৃথিবী। কিন্তু বাসের 'আগে যাওয়ার' অসুস্থ জেদ রাজীবকে চিরতরে শেষ করে দিল।

হাসপাতালে যখন শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করল রাজীব, তখন আসলে মৃত্যু হয়েছিল এক সংগ্রামী তরুণের তিল তিল করে গড়া স্বপ্নের। আর অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল তার ছোট দুই ভাইয়ের ভবিষ্যৎ।

আপনি যখন ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ি চালান, তখন কি একবারও রাজীবের সেই ঝুলে থাকা হাতটির কথা মনে পড়ে? আপনার একটু ধৈর্যের অভাবে এমন হাজারো রাজীবের স্বপ্ন আজ রাস্তার ধুলোয় মিশে যাচ্ছে।

মীরসরাই ট্র্যাজেডির কথা কি ভোলা যায়? ফুটবল খেলা দেখে একটি মিনিট্রাকে ফিরছিল প্রায় ৮০ জন কিশোর। গাড়ি চালাতে চালাতেই ফোনে কথা বলতে বলছিলেন মিনিট্রাকটির চালক। তার এই ভুলে নিয়ন্ত্রণ হারায় সেই ট্রাক। উল্টে পড়ে যায় ডোবায়। প্রাণ হারায় ৪৫ জন। যার মধ্যে ৪২ জনই ছিল স্কুলছাত্র। মুহূর্তের সেই ভুল খালি করে দেয় ৪২ জন মায়ের বুক।

ইতিহাসের পাতা খুললে দেখা যায়, আপনার বা আপনার সহকর্মীদের সামান্য ভুল বা যথেচ্ছাচারের মাশুল দিতে হয়েছে এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদেরও।

এ দেশের চলচ্চিত্র জগতের নক্ষত্র তারেক মাসুদ কিংবা কিংবদন্তি সাংবাদিক মিশুক মুনীরকেও আমরা হারিয়েছি অভিশপ্ত এক সড়ক দুর্ঘটনায়। একটি ঘাতক বাস নিভিয়ে দিয়েছিলো আমাদের সংস্কৃতির উজ্জ্বল দুটি প্রদীপকে।

আমাদের ক্রিকেটের উজ্জ্বল নক্ষত্র মানজারুল ইসলাম রানাকে আমরা অকালে হারিয়েছি এই রাজপথে।

চালক ভাই, আমরা যখন খবরের কাগজে দুর্ঘটনার খবর পড়ি, তখন আমরা দেখি কেবল কিছু সংখ্যা। কিন্তু এই সংখ্যাগুলো আসলে এক একটি জ্যান্ত মানুষের হাহাকার।

আপনি কি জানেন ২০২৫ সালে আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭,৩৫৯ জন? তার আগের বছর ৭,২৯৪ জন। আর তার আগে বছর, মানে ২০২৩ সালে ৬,৫২৪ জন এবং ২০২২ সালে ৭,৭১৩ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন কালো পিচঢালা এই পথে।

একটি দুর্ঘটনা মানে কেবল একটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া নয়, অনেক সময় একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনের পথ বন্ধ করে দেওয়া। একটি সাজানো বাগান তছনছ করে দেওয়া।

আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনা শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, এটি একইসাথে একটি বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা।

আপনি শুনলে  হয়তো অবাক হবেন, বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বাংলাদেশের মোট জিডিপির প্রায় ২ থেকে ৫ শতাংশ ক্ষতি হয়। টাকার অঙ্কে যা বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

কিন্তু টাকার চেয়েও বড় ক্ষতি হলো সেই শূন্যস্থান, যা কোনো সম্পদ দিয়ে কোনোদিন পূরণ করা সম্ভব নয়।

চালক ভাই, আমি জানি আপনি সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন। হয়তো ঠিকমতো ঘুমানো বা বিশ্রামের সময়ও পান না অনেক সময়।

কিন্তু মনে রাখবেন, আপনি যখন স্টিয়ারিং ধরেন, তখন আপনার উপর ন্যস্ত থাকে অনেকগুলো মানুষের জীবনের আমানত। মাত্র কয়েক মিনিট আগে পৌঁছানোর জন্য দয়া করে রেষারেষি করবেন না। গাড়ি চালানোর সময় অমনোযোগী হবেন না। আপনার এক মুহূর্তের অসাবধানতা একটি পরিবারকে চিরতরে নিঃস্ব করে দিতে পারে।

আপনি যখন ড্রাইভিং সিটে বসেন, তখন আয়নায় একবার পেছনের মানুষগুলোকে দেখে নেবেন প্লিজ। ভাবুন তো, আপনার সিটের পেছনে আপনারই মা, আপনারই সন্তান কিংবা আপনারই প্রিয়জন বসে আছে। আপনি কি চাইবেন আপনার আপনজনের রক্তে রাজপথ ভিজে উঠুক? নিশ্চয়ই না। তাহলে অন্যের আপনজনকেও নিজের ভেবে একটু সতর্ক হয়ে গাড়ি চালান।

আপনার একটু সাবধানতা পারে একটি শিশুকে অনাথ হওয়া থেকে বাঁচাতে। একজন মাকে তার সন্তানহারা হওয়া থেকে রক্ষা করতে। আপনি চাইলে এই মৃত্যমিছিল থামাতে পারেন।

আপনার হাতের ওই স্টিয়ারিংটি যেন কারো জীবন থামিয়ে না দেয়, এই মিনতিটুকু কি রাখতে পারেন না?

রাজীবের সেই ঝুলে থাকা বিচ্ছিন্ন হাতের দিকে তাকিয়ে, সাব্বির-মিতুর না হওয়া সেই সংসারের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে হলেও আপনি একটু সাবধান হোন। আপনার যাত্রা যেন হয় স্বস্তির, কান্নার নয়।