ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এবারকার বিক্ষোভের মূল কারণ অর্থনৈতিক অসন্তোষ। ইরানিয়ান রিয়ালের ব্যাপক পতন আর তার সাথে আসা উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে দেশটির নাগরিকদের এখন নাভিশ্বাস উঠেছে।
প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সংস্কার পরিকল্পনাগুলো দীর্ঘ মেয়াদে তো দূরের কথা, স্বল্প মেয়াদেও দেশটির অর্থনীতির উপর চাপ বাড়াবে বলেই আশঙ্কা। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত জনগণকে শান্ত করতে এখন কেবল নগদ সহায়তা বা মূল্যস্ফীতি কমানোর আশ্বাস যথেষ্ট না।
রিয়ালের মান পড়ে যাওয়াতে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে হয়েছে আকাশচুম্বী। আর তাই ২৮ ডিসেম্বর তেহরান থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন খুব দ্রুতই অন্য সব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রিয়ালের মান পড়ে যায় ১৬ শতাংশ। যা আগের বছরের তুলনায় কমেছে ৮৪ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ খাবার কিনতে গুনতে হয় এখন প্রায় দ্বিগুণ টাকা।
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে ইরানের এই পরিস্থিতি। ২০১১ সালে ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসার পর বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যায় দেশটির এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যায়।
চলতি শতাব্দীর শুরুতে ইরানের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ থেকে ৯ শতাংশ- নিষেধাজ্ঞার পর কমে তা ৩ শতাংশের নিচে নেমে আসে।
তেল বিক্রি কমে যাওয়ায় বেড়ে যায় বাজেট ঘাটতি আর সেজন্য ইরান সরকার বাধ্য হয় নোট ছাপাতে- ফলাফল মুদ্রাস্ফীতি আর মূল্যস্ফীতি।
ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিতে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আসে চলমান বিক্ষোভ। গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় অবকাঠামোর হিসেবে খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি না হলেও এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে পেজেশকিয়ান প্রশাসন যে দুর্বল তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে, এমন দাবি করতে থাকলেও বিপদ ধেয়ে আসছিল। রিয়ালের মান কমায় এমনিতেই বিনিয়োগ কম ছিল। তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আরও হামলা চালাতে পারে এমন শঙ্কায় তা আরও কমে যায়।
এর মাঝে পেজেশকিয়ানের অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রচেষ্টা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে করের উপর নির্ভরতা বাড়াতে চেয়েছিলেন পেজেশকিয়ান।
২০২৬ সালের বাজেটে মোট রাজস্বে করের অংশ ৪২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫৭ শতাংশ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়, যা ইরানের তেল বিক্রি থেকে আয় আরও কমে আসারই ইঙ্গিত দেয়। সরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধির যে হার প্রস্তাব করা হয়, তাও ছিল ৪৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতির তুলনায় অর্ধেকেরও কম।
পরে অবশ্য প্রস্তাবিত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয় এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ করা হয়। তবে ততদিনে কৃচ্ছ সাধনের বার্তা পৌঁছে গেছে ইরানি জনগণের কাছে।
আর ব্যয় সংকোচনের মতো ব্যাপার বেশিরভাগ সময়ই এমন পরিস্থিতে কাজে আসে না। ইরানের বাস্তবতায় তা বুমেরাং হয়েছে কারণ সরকারি দুর্নীতি নিয়ে তীব্র জনঅসন্তোষ, তার উপর রয়েছে সমাজের একাংশের প্রকাশ্য বিলাসী জীবনযাপন।
মাল্টিপল কারেন্সি এক্সচেইঞ্জ রেইট বা বহুমুদ্রা বিনিময় পদ্ধতির কারণে ইরানের অর্থনীতি যে রূপ নিয়েছে তাতে দেশটির অনিয়ন্ত্রিত বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়েছে।
মাল্টিপল কারেন্সি এক্সচেইঞ্জ রেইট বলতে বোঝায়, একটি দেশের মুদ্রার বিপরীতে একই বিদেশি মুদ্রার একাধিক দাম থাকা। অর্থাৎ একই দিনে, একই দেশে, একই ডলারের জন্য এক খাতে এক দাম আর অন্য খাতে আরেক দাম কার্যকর থাকে।
সাধারণত প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি, জ্বালানি, ওষুধ বা কৌশলগত খাতের জন্য বিনিময় হার কম নির্ধারণ করা হয়। ডলার বা ইউরোর মতো মুদ্রা কার কাছে কী কাজে লাগবে তার ওপর ভিত্তি করে দাম বদলে যায়।
তবে এতে অর্থনীতিতে বড় ধরনের বৈষম্যও তৈরি হয়। যারা কম দামের মুদ্রা পাওয়ার সুযোগ পান, তারা সহজেই বাড়তি মুনাফা করতে পারেন। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ও ছোট ব্যবসায়ীরা বেশি দামে মুদ্রা কিনতে বাধ্য হন। ফলে কালোবাজার, দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি এবং আয়ের বৈষম্য বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ইরানের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।
২০১১ সালে যেখানে প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেল তেল বিক্রি হতো, নিষেধাজ্ঞার পর ২০১৯ সালে তা নেমে আসে মাত্র তিন লাখ ব্যারেলে। সেই ঘাটতি পূরণ করতে ইরান তার অপ্রতুল বৈদেশিক মুদ্রার একটা অংশ খরচ করতে থাকে সাধারণ ইরানিদেরকে নিষেধাজ্ঞার খড়গ থেকে বাঁচাতে।
তবে তা খুব একটা কাজে আসেনি। যা হয়েছে তা হলো, এই নীতির অপব্যবহার আর বিদেশে অর্থ পাচার। অনেক ব্যবসায়ীই সেই অর্থ দিয়ে নিত্যপণ্য আমদানি না করে, খরচ করেছে বিলাসী পণ্যের পেছনে। কেউ বা করেছেন বিদেশ সফর, অনেকে আবার সেই বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি করে দিয়েছে।
এরপর ইরান সরকার আরেকটু কঠোর হয়- চালু হয় নিয়ন্ত্রিত বৈদেশিক মুদ্রা বাজার। শুধুমাত্র নিবন্ধিত রপ্তানিকারকদের সরকারি নজরদারিতে বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়। আর তা বাজারদরের চেয়ে কম দামে।
প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের প্রবল চাপের মুখে পড়ার ভয়ে ইরান সরকার বরাবরই মাল্টিপল কারেন্সি এক্সচেইঞ্জ রেইট বিলোপ করতে অনাগ্রহী ছিল।
তবে পেজেশকিয়ান সেই কঠিন সিদ্ধান্তটি নিতে চেয়েছিলেন। ইরানের সবচেয়ে দৃশ্যমান দুর্নীতির উৎসকে নির্মূল করতে তার এই পদক্ষেপ ক্ষুব্ধ করে এক পক্ষকে। আর হয়তো তাই ধর্মঘটে চলে যায় তেহরানের ‘গ্র্যান্ড বাজার’-এর ব্যবসায়ীরা, যেই বিক্ষোভ পরে ছড়িয়ে পড়ে জনগণের মাঝেও।
ওই ধর্মঘট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও, সংস্কারপন্থীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ- রক্ষণশীলরা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সংস্কারের পথ রুদ্ধ করছে। তবে এই আন্দোলন দ্রুতই এমন এক তীব্র সংকটে রূপ নিয়েছে, যে এখান থেকে বের হয়ে আসার পথ খুঁজছে এখন দুই পক্ষই।
ইরানের এই সংকট যতটা রাজনৈতিক, ততটাই অর্থনৈতিক। রাজস্ব আয় বাড়ানো, বাজেট ঘাটতি কমানো এবং টাকা ছাপানোর ওপর নির্ভরতা কমানোর মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতে পারে। তবে স্বল্প মেয়াদে এই সংস্কারের খেসারত দিতে হবে অর্থনীতিকেই।
বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার উপর থেকে ভর্তুকি তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের দামে। এতে এমন কিছু পণ্যের মূল্য হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিবে। একই সঙ্গে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে জনগণকে স্বস্তি দিতে প্রতিটি পরিবারকে মাসে ১ কোটি রিয়াল (৭ ডলার) নগদ সহায়তার স্কিম চালু করেছে সরকার তার কাছে থাকা রিজার্ভের বিপরীতে। সহায়তার এই পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৫০ টাকা।
এরই মধ্যে ৮ কোটি পরিবারের ব্যাংক হিসেবে এই অর্থ জমা করেছে সরকার। অবশ্য ধনীদের বাদ দিয়েছে পেজেশকিয়ান সরকার।
তবে এই কর্মসূচিতে বিক্ষোভ শান্ত হবে কি না, তা এখনও বলা যাচ্ছে না।
এর আগে ২০২২ সালে ইরানে দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থানের কারণটা ছিল সোজাসাপ্টা। ‘উইমেন, লাইফ, ফ্রিডম’ নামে সেই আন্দোলনের শুরুটা দেশটির ‘মোরাল পুলিশ’-এর হেফাজতে ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর। সেই তরুণীর অপরাধ ছিল ‘ঠিকভাবে হিজাব না পরা।’
বিশ্লেষকদের মতে, সেই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল হিজাব আইন নিয়ে সরকারকে তার অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য করা।
হিজাব আইন কার্যত আর আগের মতো কঠোরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। ইরানের শহরগুলোতে প্রকাশ্যে হিজাব না পরে চলাফেরা করা নারী ও কিশোরীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সংস্কারের সুফল এখনো অনিশ্চিত। হয়তো তার আনা পরিবর্তনের ফল দীর্ঘমেয়াদে মিলতে পারে, কিন্তু বছরের পর বছর অর্থনৈতিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষের কাছে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
বাস্তবতা হলো, ইরান সরকার নিকট ভবিষ্যতে বিনিময় হার স্থিতিশীল করা বা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার কোনো বিশ্বাসযোগ্য আশ্বাসও দিতে পারছে না তার জনগণকে।
এই মুহূর্তে দ্রুত অর্থনৈতিক স্বস্তি আনতে পারে এমন পদক্ষেপ একটাই- ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেলা, অন্তত ঘোষণাটুকু দেওয়া। কিন্তু তাও ইরানের নেতৃত্বের জন্য অনেক বেশি কঠিন।
তা ছাড়া ইসরায়েলের কোনো প্রতিশ্রুতির প্রতিই আস্থাশীল নয় সাধারণ ইরানিরা; বিশেষ করে, গাজায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ, সিরিয়ায় দখলদারিত্ব এবং গত বছর ইরানে ব্যাপক বোমাবর্ষণের পর। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিও তাদের আস্থা নেই। ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপরও ভরসা রাখতে পারছে না ইরানিরা।
সব মিলিয়ে ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কেবল অর্থনৈতিক হতাশার প্রতিফলন নয়, এর ভেতরে রয়েছে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ওপর অবিশ্বাস। আর ঠিক এই কারণেই এবারকার আন্দোলন সহজে দমে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।
লেখক:
জাভেদ সালেহি-ইসফাহানি
অর্থনীতি বিষয়ক অধ্যাপক, ভার্জিনিয়া টেক
রিসার্চ ফেলো, ইকোনমিক রিসার্চ ফোরাম
(প্রজেক্ট সিন্ডিকেট-এ প্রকাশিত আর্টিকেলের অবলম্বনে)