বাংলাদেশে ধর্মীয় লেবাসধারী অপরাধীদের দিন বোধহয় ভালো যাচ্ছে না। অন্তত ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে অপরাধের অভিযোগ চাপা দিয়ে পার পাওয়ার দিন যে আগের মতো নেই, টঙ্গীর সাম্প্রতিক চড়ের ঘটনা সেই বিষয়টি সামনে এনেছে।
সাত বছরের এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদ্রাসার এক উপাধ্যক্ষকে চড় মেরেছেন শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমি। চড়টি অভিযুক্ত শিক্ষকের গালে পড়লেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে, এর আওয়াজ পৌঁছেছে আরও অনেক দূর।
মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নতুন নয়। বছরের পর বছর এসব অভিযোগ উঠেছে। সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, মামলা হয়েছে, সামান্য হলেও অপরাধীর সাজা হয়েছে। কিন্তু এবার একটি চড়কে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের একটি বিস্ফোরণ ঘটেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই শাহজালাল রুমিকে সুপার হিরোর মর্যাদা দিচ্ছেন। তাকে তারা ‘থাপ্পড়ম্যান’ বলে অভিহিত করছে। আবার একদল মানুষ শাহজালাল রুমিকে নিন্দা-মন্দও করছেন। তাকে মব সৃষ্টিকারী বলছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে ট্রল, পাল্টা ট্রল। ধর্মীয় সংগঠনের নেতারাও প্রতিবাদ করেছেন। কেউ অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচার চেয়েছেন, কেউ শিক্ষককে মারধর ও মাদ্রাসায় হামলার অভিযোগের বিচার দাবি করেছেন।
এই বিতর্কের মধ্যে একটি প্রশ্ন অবশ্য ক্রমেই আড়ালে চলে যাচ্ছে। সাত বছরের শিশুটির মানসিক অবস্থা আসলে কী! এমন ট্রমার পর সে কতটা স্বাভাবিক রয়েছে?
রুমি তার সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার জন্য মাদ্রাসায় পাঠিয়েছিলেন। যে বিশ্বাস থেকে তিনি সন্তানকে শিক্ষকের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, সেই বিশ্বাসের জায়গাতেই আঘাত এসেছে। এই বিশ্বাসভঙ্গের ক্ষোভকে শুধু একজন ব্যক্তির তাৎক্ষণিক রাগ হিসেবে দেখলে পুরো ঘটনাটি বোঝা যাবে না।
আমার কাছে চড়টি তাই অন্য একটি বার্তাও বহন করছে। ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে অপরাধের অভিযোগ চাপা দেওয়ার যে প্রবণতা রয়েছে, তার বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের প্রকাশ।
এটাই বাংলার চড়। আইনি হিসাব পরে। আগে বার্তাটি বুঝতে হবে।
অবশ্য আইনি হিসাব পরে বলার অর্থ আইনকে অস্বীকার করা নয়। চড় মারা আইনসম্মত বিচার নয়। কিন্তু একটি ঘটনার সামাজিক তাৎপর্য বোঝার জন্য শুধু দণ্ডবিধির ধারাই যথেষ্ট নয়।
চড়ের পরে যে প্রশ্ন
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, অভিযুক্ত শিক্ষক শিশুটির সঙ্গে অশালীন আচরণের কথা স্বীকার করেছিলেন। এরপর রুমি তাকে চড় মারেন। পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে। আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। অভিযোগটি এখনো বিচারাধীন।
ঘটনার পর রুমিকে নিয়েও শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। তার বিরুদ্ধে মব সৃষ্টি ও মাদ্রাসায় হামলার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে রুমি দাবি করেছেন, তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। মামলা তুলে নিতে এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
রুমি পরে ভিডিও বার্তায় বলেছেন, তিনি আলেম সমাজ বা মাদ্রাসার বিরুদ্ধে নন। তিনি একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির আচরণের প্রতিবাদ করেছেন এবং এখন আইনি প্রক্রিয়াতেই এগোবেন।
ধর্মীয় অঙ্গনের প্রতিক্রিয়াও একরকম নয়। কেউ শিশুটির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। কেউ শিক্ষকের গায়ে হাত তোলা ও মাদ্রাসায় হামলার প্রতিবাদ করেছেন। কেউ দুটি দাবিই তুলেছেন।
কিন্তু এই বিতর্কের ভেতরে শিশুটির নিরাপত্তা, তার মানসিক অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা আলোচনা হচ্ছে?
আমরা একজন বাবার চড়ের ভিডিও দেখেছি। কিন্তু শিশুটি কী অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেটি কি জানতে চেয়েছি?
এতিম শিশুর পক্ষে কে চড় মারবে?
রুমি অন্তত সন্তানের অভিযোগ শুনেছেন। মাদ্রাসায় গিয়েছেন, প্রতিবাদ করেছেন, মামলা করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের অসংখ্য আবাসিক মাদ্রাসায় দরিদ্র পরিবারের শিশু রয়েছে। এতিম শিশুও রয়েছে। অনেকের খাবার, আশ্রয় ও শিক্ষার একমাত্র ভরসা প্রতিষ্ঠানটি।
তাদের কী হবে?
যে শিশুর বাবা নেই, মা দূরে থাকেন, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য নেই, সে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে কার কাছে? অভিযোগ করলে মাদ্রাসা থেকে বের করে দেওয়া হবে না তো? খাবার বন্ধ হবে না তো? মারধর করা হবে না তো?
এই প্রশ্নগুলো নিছক কল্পনা নয়।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতনের ৩৯টি নথিভুক্ত ঘটনার মধ্যে ২৩টি, অর্থাৎ প্রায় ৫৯ শতাংশ, মাদ্রাসায় ঘটেছে বলে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্যাতনের হার নয়, সংবাদে উঠে আসা নির্দিষ্ট কিছু ঘটনার হিসাব।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে ‘জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স’-এর সংবাদভিত্তিক পর্যবেক্ষণে ১২২ জন মাদ্রাসাশিক্ষার্থীকে ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার শিকার হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। মাদ্রাসার ভেতরে সংঘটিত ৭২টি ঘটনায় ১০৯ জন ভুক্তভোগীর তথ্য রয়েছে। ৬৫টি ঘটনায় ৮১ জন মাদ্রাসাশিক্ষক অভিযুক্ত হয়েছেন।
এগুলো আদালতে প্রমাণিত অপরাধের সংখ্যা নয়। কিন্তু অভিযোগের ব্যাপ্তি সম্পর্কে উদ্বেগ তৈরির জন্য যথেষ্ট।
সব মাদ্রাসা কিংবা সব শিক্ষককে একই পাল্লায় মাপার সুযোগ নেই। কিন্তু ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলেই অভিযোগগুলোকে বিশেষ সংবেদনশীলতার অজুহাতে আড়াল করারও সুযোগ নেই।
বরং যে প্রতিষ্ঠানের কাছে অভিভাবক সন্তানের নৈতিক শিক্ষা ও নিরাপত্তা প্রত্যাশা করেন, সেখানে এমন অভিযোগের গুরুত্ব আরও বেশি।
আইন আছে, নিরাপত্তা কোথায়?
বাংলাদেশে ছেলেশিশুর ওপর বলাৎকারের আইনি সংজ্ঞা স্পষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০২৫ সালে। ২০২৬ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধনের মাধ্যমে সেই বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ধর্ষণের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ শাস্তির আইন কঠোর।
কিন্তু শাস্তির আইন থাকা আর অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই শিশুকে রক্ষা করার ব্যবস্থা থাকা এক বিষয় নয়।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিটি মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা কমিটি, গোপন অভিযোগব্যবস্থা এবং জাতীয় পর্যায়ে তদারকি সেল গঠনের দাবিতে পাঁচটি মন্ত্রণালয়কে আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে।
একবার ভাবুন, একটি শিশু যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করবে কোথায়, সেটি নিশ্চিত করার জন্যও আইনি নোটিস পাঠাতে হচ্ছে!
অথচ অভিযোগের পর বিচার পাওয়ার পথটিও সহজ নয়।
রাজশাহীর একটি মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল ২০১৭ সালে। ২০২৬ সালের অক্টোবরে সেই মামলায় একজন সাবেক মাদ্রাসা পরিচালকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় হয়েছে। প্রায় নয় বছর লেগেছে বিচারিক রায় পেতে।
এই নয় বছরে শিশুটি কীভাবে বড় হয়েছে? সমাজ তাকে কীভাবে দেখেছে? সে কি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরেছে? তার শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নিয়েছে?
আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর জানি না।
অথচ অপরাধীর শাস্তির খবর প্রকাশের পর প্রায়ই ধরে নিই, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
নুসরাতের আগুন কি ভুলে গেছি?
এখানে নুসরাত জাহান রাফির কথা মনে পড়ে।
২০১৯ সালে ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছিলেন নুসরাত। অধ্যক্ষ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। মাদ্রাসার সুনাম নষ্ট করার অভিযোগও তোলা হয়।
এরপর নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।
নিম্ন আদালত ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। ২০২৬ সালের আগস্টে হাইকোর্ট দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন, চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন এবং দশজনকে খালাস দেন।
নুসরাতের ঘটনা দেখিয়েছিল, একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার নামে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে কত ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এখন প্রশ্ন, টঙ্গীর ঘটনায় যারা শিক্ষকের মর্যাদা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তারা শিশুটির নিরাপত্তার জন্য কী করছেন?
শিক্ষককে মারধরের প্রতিবাদ করা অবশ্যই অপরাধ নয়। কিন্তু কেউ যদি শিশুর অভিযোগ আড়াল করেন, সাক্ষীকে ভয় দেখান কিংবা তদন্তে বাধা দেন, তাহলে তাঁর ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আসতে হবে।
কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় অপরাধের অভিযোগ চাপা দেওয়া নয়, অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি নিশ্চিত করা।
মবের সঙ্গে বাংলার চড়ের পার্থক্য
বাংলাদেশে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে গত দশ বছরে বহু মানুষ হামলার শিকার হয়েছেন।
২০১৬ সালে রসরাজ দাস, ২০১৭ সালে টিটু রায়, ২০১৯ সালে বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য শুভ, ২০২১ সালে ঝুমন দাস, ২০২৪ সালে আকাশ দাস এবং ২০২৫ সালে দীপু চন্দ্র দাসের ঘটনাগুলো মনে করা যেতে পারে।
প্রত্যেকের ঘটনা এক নয়। কিন্তু ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে জনতার সহিংসতা, বাড়িঘরে হামলা কিংবা প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। দীপু চন্দ্র দাসকে তো জনতা পিটিয়েই হত্যা করেছে।
এখানে শাহজালাল রুমির চড়ের সঙ্গে একটি পার্থক্য রয়েছে।
ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ যাচাইয়ের আগেই জনতাকে সংগঠিত করা হয়েছে। রুমির ঘটনায় একজন বাবা নিজের সন্তানের ওপর নির্দিষ্ট অভিযোগের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন এবং আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন।
তবে এই পার্থক্য চড়কে আইনসম্মত করে না। আর টঙ্গীতে পরবর্তী মারধর ও হামলার অভিযোগ থাকলে সেগুলোরও বিচার হতে হবে।
ব্যক্তিগত ক্রোধ, সংঘবদ্ধ উসকানি এবং পরিকল্পিত গণসহিংসতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সেই পার্থক্য না বুঝলে আমরা একটি সামাজিক ঘটনার তাৎপর্যও বুঝতে পারব না।
বাংলার চড় কি আরও এগিয়ে যাবে?
শাহজালাল রুমির চড় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে আলোচনা চলছে, তার কতটা শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে, আর কতটা একজন ধর্মীয় লেবাসধারীকে চড় মারার সাহস কিংবা দুঃসাহস নিয়ে?
প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একজন অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষককে চড় মারার ভিডিও ভাইরাল হওয়া আর মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন নিপীড়ন বন্ধ হওয়া এক বিষয় নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল, পাল্টা ট্রল, ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিবাদ কিংবা রুমির পক্ষে জনসমর্থন, কোনোটিই একটি শিশুকে নিরাপত্তা দেওয়ার নিশ্চয়তা নয়।
এখানে ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রশ্নটিও রয়েছে।
বাংলাদেশে ধর্মীয় পরিচয় দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ সামাজিক মর্যাদার উৎস। একজন আলেম তার ধর্মীয় জ্ঞান ও অবস্থানের কারণে সম্মান পান। সেটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই সম্মান কি তার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ তোলার অধিকারও সীমিত করে দেবে?
একজন সাধারণ শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠলে বিচার হবে। একজন মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ উঠলেও বিচার হবে। দুই ক্ষেত্রেই প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধ নির্ধারিত হবে।
কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে যদি বলা হয়, শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ মানেই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অবমাননা, তাহলে সমস্যাটি অন্য জায়গায় চলে যায়।
তখন ধর্মীয় পরিচয় অপরাধের অভিযোগ থেকে সুরক্ষার বর্ম হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়।
আমার ধারণা, এই বর্মটির কার্যকারিতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।
তবে চড়টি যদি শুধু একজন অভিযুক্ত শিক্ষকের গালে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কয়েক দিন পর মানুষ ঘটনাটি ভুলে যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নতুন কোনো বিতর্ক খুঁজে নেবে।
কিন্তু চড়টি যদি প্রতিটি মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন, স্বাধীন অভিযোগব্যবস্থা, আবাসিক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, অভিযোগকারীর পরিচয় সুরক্ষা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি তৈরি করে, তাহলে এর সামাজিক অর্থ অন্য রকম হবে।
‘বাংলার চড়’ যদি কেবল ধর্মীয় লেবাসধারীদের চড় মারার সামাজিক অনুমোদন হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি আরেক ধরনের মব সংস্কৃতির জন্ম দিতে পারে। কিন্তু এটি যদি ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে অপরাধের অভিযোগ চাপা দেওয়ার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ হয়ে ওঠে, তাহলে তা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
একজন বাবা তার সন্তানের জন্য দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু যে এতিম শিশুর পাশে বাবা নেই, যে দরিদ্র শিশুর খাবার আর আশ্রয় নির্ভর করে মাদ্রাসার ওপর, তার হয়ে দাঁড়াবে কে?
বাংলার চড়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে এই প্রশ্নের উত্তরে।
চড়টির প্রতিধ্বনি যদি মাদ্রাসার প্রশাসন, ধর্মীয় নেতৃত্বের বোধোদয় না ঘটায় এবং রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা পর্যন্ত না পৌঁছায়, তাহলে সেটি ইতিহাসে নয়, ফেসবুকের টাইমলাইনেই হারিয়ে যাবে।
একজন বাবা চড় মেরেছেন। কিন্তু রাষ্ট্র কবে দাঁড়াবে?
লেখক: সাংবাদিক
[মতামত লেখকের নিজস্ব]