সোভিয়েত ইউনিয়নের এক শহরে রাতে কারফিউ শুরু হতে তখনো পাঁচ মিনিট বাকি। দুই পুলিশ রাস্তায় টহল দিচ্ছেন। হঠাৎ তাদের একজন এক পথচারীকে গুলি করে বসলেন। অন্যজন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ কী করলে, কমরেড? কারফিউ শুরু হতে তো পাঁচ মিনিট বাকি।’ উত্তর এলো, ‘লোকটাকে চিনি। ওর বাড়ি অনেক দূরে। পাঁচ মিনিটে পৌঁছাতে পারত না।’
সোভিয়েত কৌতুক বলে প্রচলিত এই গল্পের প্রাচীন লিখিত উৎস নিশ্চিত না হলেও বলা যায় পুঁজিবাদী কোনো প্রোপাগান্ডা থেকেই এটি তৈরি। তবে এর মধ্যে থাকা ব্যঙ্গটি স্পষ্ট। আইন ভাঙার আগেই মানুষকে অপরাধী ধরে নেওয়া, তারপর বিচারের কাজও নিজেই সেরে ফেলা।
১৭ই অক্টোবর ২০২৬। ঢাকার গেন্ডারিয়া। দয়াগঞ্জের ঘুণ্টিঘর রেলগেটের কাছে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমেছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এক হাতে মাইক, অন্য হাতে পিস্তল। সঙ্গে পুলিশ ও অন্যরা। কয়েকজনকে ধাওয়া করার দৃশ্য ভিডিও হয়ে ছড়িয়ে পড়ল তার ফেইসবুক পেজ থেকে। ইশরাকের দাবি, পুলিশের কাছে বহুবার জানিয়েও মাদকের বিরুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত ব্যবস্থা পাননি। অস্ত্রটি বৈধ, আত্মরক্ষার জন্যই হাতে নিয়েছিলেন।
তদন্তের বিষয়টি তাই খোলা থাকছে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রশ্নটি আরও বড়। একজন প্রতিমন্ত্রীকে নিজেই অস্ত্র হাতে মাদক কারবারি ধরতে যেতে হলো কেন?
মিঠুন চক্রবর্তীর ‘এমএলএ ফাটাকেষ্ট’ ছবিটির কথা মনে পড়ে। ২০০৬ সালের সেই ছবির সংলাপ, ‘মারব এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে’, এখনও জনপ্রিয়। ছবিটি ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছিল, প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী প্রায় সোয়া দুই কোটি রুপি নির্মাণব্যয়ের বিপরীতে আয় ছিল সাড়ে সাত কোটি রুপির মতো।
পরের বছর এসেছিল ‘মিনিস্টার ফাটাকেষ্ট’। ছবির সাফল্য শুধু মিঠুনের জনপ্রিয়তা নয়, এই উপমহাদেশের মানুষের মধ্যেই এই আকাঙ্ক্ষাটি রয়েছে যে, রাজনৈতিক চরিত্রে এমন একজন ব্যক্তিকে তারা দেখতে চান যিনি আদালত-পুলিশি জটিলতায় না গিয়ে নিজেই সমস্যার সমাধান করবেন।
ফাটাকেষ্টর সামাজিক জমি
ফাটাকেষ্ট জন্মায় নাগরিক আর রাষ্ট্রের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায়। থানা আছে, কিন্তু অভিযোগে কাজ হবে কি-না সংশয়। আদালত আছে, কিন্তু বিচার পেতে দীর্ঘ সময়। সরকারি অফিসে সেবা আছে, আবার ‘ভাইয়ের ফোন’ ছাড়া ফাইল এগোয় না বলেও অভিযোগ। ফলে সমাজ এমন একজনকে খোঁজে, যার কথায় সব কাজ হয়। বাংলাদেশে তিনি ‘বড় ভাই’, ভারতের কোনো এলাকায় ‘দাদা’ বা ‘বাহুবলী’।
ভারতের রাজনীতি নিয়ে মিলান বৈষ্ণবের ‘হোয়েন ক্রাইম পেইজ’ বইটি দেখিয়েছে, দুর্বল সরকারি প্রতিষ্ঠান থাকলে ভোটারদের একাংশ প্রভাবশালী ব্যক্তিকে বেছে নিতে পারেন, এমনকি সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলেও। কারণ তাদের কাছে প্রশ্ন শুধু কে আইন বানাবেন নয়, কে নিরাপত্তা বা সরকারি কাজটি আদায় করে দেবেন। উপমহাদেশে জনপ্রতিনিধির কাছে থানার কাজ, হাসপাতালে ভর্তি, চাকরির সুপারিশ, জমির সালিশ, সবই প্রত্যাশিত। ফলে ইশরাক পিস্তল হাতে নামলে অনেকে ভাবতেই পারেন, অন্তত কাজটা তো করছেন। তারা হয়তো প্রশ্নটিই করেন না, এটা এমপির কাজ কি-না।
অথচ আইনপ্রণেতা আর আইন প্রয়োগকারীর দায়িত্ব এক নয়। অপরাধ দমনের উদ্দেশ্য ন্যায়সংগত হলেও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার থাকে।
‘ভিজিল্যান্টিজম’ বলতে রাষ্ট্রের অনুমোদিত আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে নিজ উদ্যোগে অপরাধ দমন বা শাস্তির চর্চা বোঝানো হয়। ইশরাকের ঘটনাটি ঠিক সেটাই।
এমপির হাতে অস্ত্র: পূর্বনজির
বাংলাদেশের এমপিদের অস্ত্র নিয়ে বিতর্ক একেবারে নতুন নয়। ২০০১ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি মালিবাগে হরতাল চলাকালে আওয়ামী লীগের তৎকালীন এমপি ডা. এইচ বি এম ইকবালের নেতৃত্বাধীন মিছিল থেকে গুলির অভিযোগ ওঠে। চারজন নিহত হন। ইকবাল নিজে গুলি করেছেন, সেটি প্রতিষ্ঠিত নয়। ২০১৫ সালে গাইবান্ধার এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের গুলিতে শিশু সৌরভ আহত হওয়ার ঘটনা আলোড়ন তোলে। ২০২০ সালে বগুড়ার এমপি রেজাউল করিম বাবলুর পিস্তল হাতে ছবি সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৩ সালে বাঁশখালীর এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অস্ত্র হাতে দেখা যায়।
সব ঘটনার প্রকৃতি অবশ্য এক নয়। কোথাও গুলির অভিযোগ বা ঘটনা, কোথাও পিস্তল প্রদর্শনের ছবি। ইশরাকের ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচিত কারণ তিনি নির্বাচিত এমপি এবং সরকারের প্রতিমন্ত্রী, অথচ ব্যক্তিগতভাবে অস্ত্র নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে উপস্থিত। মাইকের ভাষা ‘আমি আছি’, পিস্তলের উপস্থিতি জানায় বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা। তিনি যে আত্মরক্ষার দাবি করেছেন, সেটি অস্বীকার না করেও প্রশ্ন তোলা যায়, রাষ্ট্রের হয়ে বলপ্রয়োগের সিদ্ধান্ত কে নেবেন?
হলিউডের ব্যবসাসফল সিনেমা ‘ডার্টি হ্যারি’ কিংবা ‘ডেথ উইশ’ থেকে ফিলিপাইনের দাভাও শহরের সাবেক মেয়র রদ্রিগো দুতার্তের বিতর্কিত অপরাধ দমনের ভাষ্য, বহু জায়গায় আইনের দীর্ঘ পথের বদলে একক কঠোর নায়কের আকর্ষণ দেখা যায়। দুতার্তে মেয়র থাকা অবস্থায় নিজে অপরাধীদের বিরুদ্ধে সহিংস অভিযানে অংশ নেওয়ার দাবি করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগও গুরুতর। ইশরাকের ঘটনার সঙ্গে সেসব অভিযোগ এক করে দেখার সুযোগ নেই। তুলনার বিষয় হলো নির্বাচিত ক্ষমতাধারীর ‘আমি নিজেই ব্যবস্থা নেব’ ভঙ্গিটি।
খোকার উত্তরাধিকার, ইশরাকের নিজস্ব রাজনীতি
ইশরাক সাদেক হোসেন খোকার বড় ছেলে। বীর মুক্তিযোদ্ধা খোকা ছিলেন বিএনপির সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও অবিভক্ত ঢাকার মেয়র। ১৯৯১ সালে শেখ হাসিনাকে নির্বাচনে পরাজিত করে আলোচিত হয়েছিলেন। পুরান ঢাকায় স্থানীয় সম্পর্ক ও সাংগঠনিক উপস্থিতি ছিল তার বড় রাজনৈতিক পুঁজি। ইশরাক সেই উত্তরাধিকারের সুবিধা পেয়েছেন, আবার নিজস্ব রাজনৈতিক সক্রিয়তাও গড়েছেন। জুলাই আন্দোলনে ঢাকায় ইশরাকের ভূমিকা ছিল অভাবনীয়। সম্মুখসারিতে থেকেই তিনি আন্দোলন করেছেন।
কিন্তু এলাকার ‘বড় ভাই’ আর একজন রাষ্ট্রীয় পদাধিকারীর চরিত্র এক করে দেখলে বিপদ আছে। খোকার সময়ের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্তরাধিকার গ্রহণ করা এক বিষয়, আর প্রতিমন্ত্রীর হাতে পুলিশি দায়িত্ব তুলে নেওয়া সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। পারিবারিক আস্থা ক্ষমতার সামাজিক ভিত্তি হতে পারে, আইনি ছাড়পত্র নয়।
আওয়ামী লীগের আমল এবং একজন ইশরাক
২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপস ৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৯৫ ভোট এবং বিএনপির ইশরাক ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫১২ ভোট পান। ঘোষিত ফল অনুযায়ী ব্যবধান প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার। নির্বাচনটি নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ছিল, বিএনপি ফল প্রত্যাখ্যান করে। ভোটার উপস্থিতিও ছিল প্রায় ২৯ শতাংশ। আওয়ামী লীগের ক্ষমতার সময় বিরোধী দল যে পরিবেশকে একতরফা বলে বর্ণনা করেছিল, সেখানে ইশরাকের দুই লাখের বেশি ভোট পাওয়া তার রাজনৈতিক উপস্থিতির উল্লেখযোগ্য প্রমাণ। যদিও সব ভোটই তার ব্যক্তিগত ভোট নয়। দলীয় সমর্থনও রয়েছে।
তার আগে ২০১৫ সালে ঢাকা দক্ষিণে বিএনপি-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাস ২ লাখ ৯৪ হাজার ২৯১ ভোট পেয়েছিলেন, আওয়ামী লীগের সাঈদ খোকন পেয়েছিলেন ৫ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৬। দুই নির্বাচনের পরিবেশ আলাদা, তাই সংখ্যার সরল তুলনায় জনপ্রিয়তার র্যাঙ্কিং হয় না।
২০২৫ সালের ২৭এ মার্চ নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল বাতিল করে ইশরাককে বিজয়ী ঘোষণা করে। গেজেট প্রকাশের পরও তার শপথ না হওয়ায় মে মাসে সমর্থকেরা নগর ভবনের সামনে অবস্থান ও বিক্ষোভ করেন। ‘জনতার মেয়র ইশরাক ভাই’ স্লোগান ওঠে। নগর ভবনের কাজও ব্যাহত হয়। এটি তার পক্ষে সংগঠিত কর্মীদের উপস্থিতি দেখিয়েছে, একই সঙ্গে নগরসেবাকে আন্দোলনের মূল্য দেওয়ার প্রশ্নও তুলেছে। শেষ পর্যন্ত তিনি অবশ্য মেয়রের দায়িত্ব পাননি।
ইশরাকের পদত্যাগ: ঢাকায় বিএনপির পরীক্ষা
সংসদ সদস্য হওয়ার প্রথম দিন থেকেই ইশরাক হোসেনের কপালটা বোধ হয় একটু খারাপ যাচ্ছে। ১৭ই ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যদের প্রথম দফার শপথ অনুষ্ঠানে তিনি দেরিতে পৌঁছান, ফলে শপথ নিতে হয় পরের দফায়। মেয়র হিসাবে শপথের দাবিতে যার সমর্থকেরা এত আন্দোলন করেছিলেন, এমপি হিসেবে তার শপথেও তাই সামান্য নাটকীয়তা জুটে গেল। তখন এটা ছিল হাসির খোরাক। কিন্তু ১৯এ অক্টোবরের ঘটনা আর রসিকতায় শেষ হয়নি।
ইশরাক ‘ফাটাকেষ্ট কাণ্ড’ ঘটিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর, ঢাকায় বিএনপির রাজনীতিতে একটা ‘গেম অব থ্রোনস’ ধরনের মোড় এসেছে।
মনোনয়নের লড়াই
এই আলোচনা শুধু ইশরাককে নিয়ে নয়। বিএনপির ভেতরে আরও কয়েকজন দাবিদার আছেন, আবার দলের বাইরে থেকেও চাপ আসছে।
১. দলের ভেতরের দাবিদার
মির্জা আব্বাস বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা, সাবেক মেয়র, ঢাকার দীর্ঘদিনের সংগঠক এবং ২০২৬ সালে ঢাকা-৮ থেকে নির্বাচিত এমপি। ১১ই মার্চ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত গুরুতর অসুস্থতার পর তার অস্ত্রোপচার হয় এবং বিদেশে দীর্ঘ চিকিৎসা চলে। ১৪ই অক্টোবর দেশে ফেরার পর উন্নতির খবর পাওয়া গেছে। তার রাজনৈতিক ভূমিকা বিচার করতে এই বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ, তবে অসুস্থতা মানেই রাজনৈতিক প্রভাব শেষ নয়।
আফরোজা আব্বাস শুধু তার স্ত্রী নন, তিনি জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি। ২০১৫ সালের সিটি নির্বাচনে স্বামীর পক্ষে মাঠে ছিলেন, আর ২০২৬ সালের জুনে জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান হন। ফলে আব্বাস পরিবারের সাংগঠনিক যোগাযোগও এই আলোচনার অংশ।
হাবিব-উন-নবী খান সোহেল যুগ্ম মহাসচিব। ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন। ২০০৮ সালে ঢাকা-৮ থেকে ৬৩ হাজার ৮৬০ ভোট পেয়েছিলেন। ২০১৮ সালে তিনি ঢাকা-৮ চেয়েছিলেন, কিন্তু মনোনয়ন পান ঢাকা-৯-এ, আর শেষ পর্যন্ত সে নির্বাচনে অংশই নেননি। অর্থাৎ আগের নির্বাচনেও তিনি একবার সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এবারও কি তাকে অন্য কাউকে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে, নাকি তার সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় আসবে?
ঢাকা দক্ষিণ সিটির বর্তমান প্রশাসক আবদুস সালামের নামও বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে বেশ জোরেসোরেই আলোচনায় রয়েছে। বরং প্রোফাইলে তিনি বিএনপির সবচেয়ে হেভিওয়েট প্রার্থী। কেননা তিনি অবিভক্ত ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব ছিলেন। পরে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। আবার ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন। এছাড়া অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র ছিলেন। অর্থাৎ ঢাকা শহর পরিচালনায় তার পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
২. দলের বাইরের চাপ ও ভোটের অঙ্ক
২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনে ঢাকার ফলাফল দেখলে বিএনপির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জের বিষয়টি বোঝা যায়। জেলার ২০টি আসনের ১৩টিতে বিএনপি এবং সাতটিতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট জয় পেয়েছে। ঢাকা দক্ষিণের সাতটি আসনের পাঁচটিতে বিএনপি জিতলেও তিনটিতে জয়ের ব্যবধান ছিল খুব কম। ঢাকা-৭ আসনে বিএনপি জিতেছে ৬ হাজার ১৮৩ ভোটে, ঢাকা-৮-এ মির্জা আব্বাস ৫ হাজার ২৩৯ ভোটে এবং ঢাকা-১০-এ বিএনপির প্রার্থী মাত্র ৩ হাজার ৩০০ ভোটে। অন্যদিকে ঢাকা-৪ আসনে জামায়াত জিতেছে ২ হাজার ৯২০ ভোটে এবং ঢাকা-৫-এ ৯ হাজার ১৫০ ভোটে। তুলনামূলক বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন ইশরাক। ঢাকা-৬ আসনে তিনি জিতেছেন ২৩ হাজার ১৫৩ ভোটে। ঢাকা-৯ আসনেও বিএনপির জয়ের ব্যবধান ৫৭ হাজারের বেশি। অর্থাৎ ঢাকা দক্ষিণের সাতটি আসনের পাঁচটিতেই জয়-পরাজয়ের ব্যবধান ১০ হাজার ভোটের কম।
ঢাকা উত্তরেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা কম হয়নি। ঢাকা-১১ আসনে এনসিপির নাহিদ ইসলাম বিএনপির প্রার্থীকে মাত্র ২ হাজার ৩৯ ভোটে হারিয়েছেন। ঢাকা-১২, ১৪, ১৫ ও ১৬ আসনে জয় পেয়েছে জামায়াত। এসব ফলাফল বলছে, রাজধানীতে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াত ও এনসিপিরও উল্লেখযোগ্য ভোট রয়েছে। তবে সংসদীয় আসনের সীমানা ও সিটি করপোরেশনের সীমানা পুরোপুরি এক নয়। জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে ভোটের সমীকরণও আলাদা হতে পারে। তাই এই হিসাব মেয়র নির্বাচনের ফলের পূর্বাভাস না দিলেও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে বিএনপির সামনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চিত্র স্পষ্ট করে।
মোটের ওপর ঢাকায় মেয়র নির্বাচন হলে বিএনপি দলীয় ও দলের বাইরের নানামুখী সমীকরণে কোণঠাসা হয়ে পড়তে পারে। আর রাজধানীতে প্রভাব হারানো মানে আগামী কয়েক বছরে সারা দেশে চাপে পড়া।
শুদ্ধি অভিযান কত দূর
দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর বিএনপি এমন সময়ে রাষ্ট্র চালাচ্ছে, যখন মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের চাপ, কর্মসংস্থান, প্রশাসনের আস্থা ও আইনশৃঙ্খলার মতো বহু জটিল সমস্যা সামনে। ক্ষমতায় এসে দল নিজের নেতাদেরও একই নিয়মের অধীন রাখতে পারবে কি-না, সেটাই এখন শাসনক্ষমতার পরীক্ষা।
এখানে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনাটা ভুললে চলবে না। মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও উচ্ছেদের অভিযোগে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পহেলা অক্টোবর পদত্যাগ করতে বলা হয়, আর ওই দিনই তার সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ। এই ঘটনার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এলো ইশরাকের মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ। দুটো ঘটনা কি বিএনপির ভেতরে নিয়ম প্রতিষ্ঠার সূচনা, নাকি বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়া? শুদ্ধি অভিযান বলতে শুধু পদত্যাগ করানো বোঝায় না, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনও বোঝায়।
ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদ নিয়ে কোনো সমঝোতার প্রশ্ন ওঠা রাজনৈতিক মহলে অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু এ ধরনের সমঝোতার প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে নেই। ঘটনাটির সরল ব্যাখ্যা হলো, ইশরাক নিজেই একটি বিতর্কিত কাজ করে ফেলেছেন এবং তার রাজনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হয়েছেন। তার পদত্যাগকে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বা কৌশলের অংশ বলা বাড়াবাড়ি হবে।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও নেই
প্রথম প্রশ্ন, বিএনপি কি ইশরাককে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মনোনয়ন দেবে? না দিলে তার সমর্থকদের অবস্থান কী হবে?
দ্বিতীয়ত, সোহেল কি আবারও সুযোগ ছেড়ে দেবেন? ২০১৮ সালের মতো এবারও সরে দাঁড়ালে সেটা তার সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার প্রতি দলের মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলবে।
তৃতীয়ত, অসুস্থ মির্জা আব্বাসের পরিবর্তিত সক্রিয়তা এবং আফরোজা আব্বাসের সংগঠন কতটা প্রভাব রাখবে?
চতুর্থত, পাটওয়ারী ও কায়েম পৃথকভাবে লড়বেন, নাকি সমঝোতা হবে?
সিনেমায় ফাটাকেষ্ট কিন্তু এমএলএ থেকে মন্ত্রী হয়েছিলেন। বাংলাদেশে ইশরাক কি তবে প্রতিমন্ত্রী থেকে মেয়র হবেন? উত্তর দেবে মনোনয়ন ও ভোট। সেখানে তার রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার পাশাপাশি জবাবদিহির প্রশ্নও থাকবে।
একটি জেনগল্প
জাপানের জেনগুরু হাকুইনের কাছে এক সামুরাই জানতে চাইলেন, ‘স্বর্গ আর নরক কি আছে?’ হাকুইন পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কে?’ ‘সামুরাই।’
গুরু বললেন, ‘এই চেহারা নিয়ে তোমাকে আবার কে সৈনিক রাখে!’
অপমানে সামুরাই তলোয়ার বের করতেই হাকুইন বললেন, ‘এই যে নরকের দরজা খুলল।’
সামুরাই থমকে তলোয়ার খাপে ঢুকিয়ে মাথা নোয়ালে গুরু বললেন, ‘এবার স্বর্গের দরজা খুলল।’
পল রেপস ও নিয়োগেন সেনজাকির সংকলিত ‘দ্য গেটস অব প্যারাডাইস’ গল্পটির শিক্ষা ক্রোধ আর সংযম নিয়ে। রাজনৈতিক পাঠে এখানেও আছে ‘ক্ষমতার সীমা’ চেনার প্রশ্ন।
বাংলাদেশের মতো ‘ফাটাকেষ্টইজম’-এর শক্ত সামাজিক চাহিদাসম্পন্ন দেশে, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুতর সীমাবদ্ধতার কথা ইশরাকের নিজের বক্তব্যেও উঠে এসেছে, সেখানে বিএনপি কি ব্যক্তিনির্ভর উদ্ধারকর্তার রাজনীতি থেকে প্রতিষ্ঠাননির্ভর শাসনে যেতে পারবে? পপুলিজমের এই সময়ে সে চেষ্টা করতে গিয়ে দলটিকে কতটা রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে, সেটিই দেখার বিষয়।
তন্ময় ইমরান একজন সংবাদকর্মী ও লেখক।
[মতামত লেখকের নিজস্ব]