মতামত

রাষ্ট্র পরিচালনা কি ‘ফাটাকেষ্ট’র অ্যাকশন ছবির মতো

ভারতের বাংলা সিনেমায় ফাটাকেষ্ট নামে একটি সিক‍্যুয়েল আছে- ‘এমএলএ ফাটাকেষ্ট’ এবং ‘মিনিস্টার ফাটাকেষ্ট’। এই চলচ্চিত্রগুলোতে মিঠুন চক্রবর্তী মূলত ‘ফাটাকেষ্ট’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। চরিত্রটি ছিলো একজন লড়াকু, প্রতিবাদী ও সাধারণ মানুষের পক্ষে থাকা নেতার প্রতীক। তার বিখ্যাত সংলাপ, “মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে।”

সিনেমায় ‘ফাটাকেষ্ট’ ঘটনাচক্রে মন্ত্রী হয়ে যান। তারপর থেকেই তিনি একাই একশো। দুর্নীতি দেখলে পেটান, অনিয়ম দেখলে ধমকান, অপরাধী দেখলে শায়েস্তা করেন। আইনকানুন, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, তদন্ত কমিটি—এসবের জন্য তার সময় নেই। তিনি নিজেই আইন, নিজেই আদালত, নিজেই রায় কার্যকরকারী বাহিনী। প্রয়োজনে একাই পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র!

বাংলাদেশের মন্ত্রীদের দিকে তাকালে মাঝে মাঝে মনে হয়, মন্ত্রিত্ব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের অনেকের ভেতরেও একটি করে ফাটাকেষ্ট জেগে ওঠেন। পার্থক্য শুধু এই যে, সিনেমার ফাটাকেষ্ট চিত্রনাট্য মেনে চলেন, আর আমাদের ফাটাকেষ্টরা চলেন সংবাদ শিরোনামের তাল মেনে।

আওয়ামী লীগ আমলে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে প্রায়ই দেখা যেতো সড়ক পরিদর্শনে। সঙ্গে লটবহর, ক্যামেরা, সাংবাদিক, কর্মকর্তাদের দীর্ঘ সারি। কোথাও রাস্তা খারাপ, কোথাও কাজের গতি কম, কোথাও ঠিকাদারের গাফিলতি—ব্যস, শুরু হয়ে গেলো ধমকাধমকি। কখনো প্রকৌশলীকে বরখাস্তের হুমকি, কখনো ঠিকাদারকে তিরস্কার, কখনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার কড়া নির্দেশ। ক্যামেরার সামনে তার ক্ষুব্ধ মুখভঙ্গি দেখে মনে হতো, দেশের সড়কব্যবস্থার যাবতীয় দুর্ভোগের সমাধান বুঝি আজই হয়ে যাবে।

সেই আমলে আরও দেখা গেছে, বিভিন্ন মন্ত্রী-নেতা কখনো বাজারে গিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণের হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, কখনো সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকদের ধমকাচ্ছেন, কখনো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের গতি বাড়াতে কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন। কোথাও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তদন্ত, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের চেয়ে তাৎক্ষণিক হুঁশিয়ারির দৃশ্যটাই অনেক সময় বেশি চোখে পড়তো। ক্যামেরার সামনে কড়া কথা, পেছনে পুরোনো ব্যবস্থা—বাংলাদেশের প্রশাসনিক নাট্যমঞ্চে এই দৃশ্যের পুনঃপ্রদর্শনী বহুবার হয়েছে।

এরপর এলো অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তখনও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলমের মধ্যে দেখা গেলো ফাটাকেষ্টসুলভ তৎপরতা। রাতবিরাতে থানায় হাজির, পুলিশি কার্যক্রম পরিদর্শন, গভীর রাতে সংবাদ সম্মেলন। মনে হতো, অপরাধীরা ঘুমাতে গেলেও উপদেষ্টা মহোদয় ঘুমাতে পারবেন না। পুলিশ কী করছে, থানা কীভাবে চলছে—সবকিছুর ওপর তার সরাসরি নজরদারি। যেন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে প্রতিটি থানায় একজন করে উপদেষ্টা বসিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

এই ধারাবাহিকতায় এখন বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শনেও সেই ফাটাকেষ্ট-পর্বের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালের বেহাল দশা, চিকিৎসাসেবার সংকট, ব্যবস্থাপনায় গলদ—এসব দেখতে মন্ত্রী মহোদয় নিজেই হাজির। তার পরিদর্শনে হাসপাতালের কর্মচারীদের ব্যস্ততা বাড়ে, কর্মকর্তাদের মুখে উদ্বেগের ছাপ পড়ে, আর ক্যামেরার সামনে তৈরি হয় কর্মতৎপরতার একটি চমৎকার দৃশ্য।

তবে ফাটাকেষ্ট-চর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক। মাদক নির্মূলের অভিযানে তিনি নিজেই যদি পিস্তল হাতে মাঠে নেমে পড়েন, তাহলে তো আর কথাই নেই! প্রশাসন, পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগ—সবাইকে পাশে রেখে মন্ত্রী মহোদয় নিজেই যেন অ্যাকশন সিনেমার নায়ক। পেছনে আবহসংগীত থাকলেই দৃশ্যটি সম্পূর্ণ হতো: ‘ঢিসুম! ঢাসুম! মাদক নির্মূল অভিযান!’ জসিমের সিনেমার সেই মারপিটের দৃশ্য যেন এবার বাস্তবের রাজনীতিতে নতুন করে শুটিং হচ্ছে।

মন্ত্রী নন, যেন আগুনের গোলা! অপরাধীরাও বুঝি ভাবছে, পুলিশের হাত এড়ানো গেলেও সিনেমার নায়কের হাত থেকে রেহাই নেই। তবে একটি ছোট্ট প্রশ্ন থেকেই যায়: মন্ত্রী মহোদয় যদি পিস্তল হাতে অপরাধী ধরতেই ব্যস্ত থাকেন, তাহলে পুলিশকে রাখার দরকার কী? আর পুলিশ যদি নিজের দায়িত্বই ঠিকমতো পালন না করে, তাহলে মন্ত্রীর হাতে পিস্তল তুলে দেওয়ার আগে সেই ব্যর্থতার হিসাব নেওয়া হচ্ছে না কেন?

অবশ্য এই ফাটাকেষ্ট-প্রবণতা কোনো একটি দল, সরকার বা মন্ত্রীর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। ক্ষমতার চেয়ারে বসলে অনেকেরই মনে হয়, রাষ্ট্রের সব সমস্যার সমাধান বুঝি তাদের ব্যক্তিগত বীরত্বের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। রাস্তা খারাপ? মন্ত্রী ছুটবেন। হাসপাতালের সেবা খারাপ? মন্ত্রী ধমক দেবেন। থানায় কাজ হচ্ছে না? মন্ত্রী মধ্যরাতে হাজির হবেন। মাদক নির্মূল হচ্ছে না? মন্ত্রী পিস্তল হাতে নামবেন।

রাষ্ট্র পরিচালনা যেন পরিণত হয়েছে এক বিশাল অ্যাকশন ছবিতে। আর মন্ত্রিসভা হলো তার নায়কনির্ভর কাস্টিং। প্রতিটি সমস্যার জন্য একজন করে নায়ক আছেন, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়—সেই প্রশ্নটি যেন চিত্রনাট্য থেকে বাদ পড়েছে।

আসলে একটি মন্ত্রণালয় চালানো আর একটি সিনেমার অ্যাকশন দৃশ্য পরিচালনা করা এক জিনিস নয়। সিনেমায় নায়ক এক ঘুষিতে পাঁচজনকে কুপোকাত করেন, দশ মিনিটে দুর্নীতির অবসান ঘটান, আর শেষে দর্শকের হাততালি নিয়ে বাড়ি ফেরেন। বাস্তব রাষ্ট্রে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা বদলাতে লাগে স্বচ্ছ নিয়োগ, কার্যকর নজরদারি, স্বাধীন তদন্ত, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, দ্রুত বিচার এবং নিয়মিত জবাবদিহি। এখানে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে কাজ হয় না; লাগে প্রতিষ্ঠান, নীতি ও ধারাবাহিকতা।

মন্ত্রী যদি হাসপাতাল পরিদর্শন করে ত্রুটি ধরেন, সেটি ভালো। কিন্তু সেই ত্রুটি দূর করার ব্যবস্থা না করে শুধু কর্মকর্তাকে ধমক দিলে লাভ কী? সড়ক পরিদর্শনে গিয়ে ঠিকাদারকে হুমকি দেওয়া সহজ; বরং এমন চুক্তি, নিরীক্ষা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা করা কঠিন, যাতে নিম্নমানের কাজ করে ঠিকাদার পারই না পান। থানায় গিয়ে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া সহজ; এমন ব্যবস্থা গড়া কঠিন, যাতে নাগরিককে ন্যায়বিচার পেতে মন্ত্রীর ফোনের অপেক্ষায় থাকতে না হয়।

একজন ভালো মন্ত্রীর সাফল্য এই নয় যে, তার আগমনে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। সাফল্য হলো, তিনি না থাকলেও তারা নিয়ম মেনে কাজ করবেন। মন্ত্রী পরিদর্শনে গেলে হাসপাতাল পরিষ্কার থাকবে—এটি সাফল্য নয়; প্রতিদিন হাসপাতাল পরিষ্কার থাকবে, সেটিই সাফল্য। মন্ত্রী রাস্তায় নামলে ঠিকাদার তটস্থ হবেন—এটি সাফল্য নয়; মন্ত্রী না নামলেও ঠিকাদার নিম্নমানের কাজ করার সাহস পাবেন না, সেটিই সাফল্য।

সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্র কোনো মন্ত্রীর ব্যক্তিগত অ্যাকশন-স্টুডিও নয়। মন্ত্রী আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা তদারক করবেন, নিজে আইনের বিকল্প হয়ে উঠবেন না। অপরাধ দমনের নামে ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত তার কাজ। পিস্তল হাতে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে হয়তো এক দিনের শিরোনাম পাওয়া যায়; কিন্তু একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারলে বহু বছরের আস্থা অর্জন করা যায়।

তাই মন্ত্রী মহোদয়দের প্রতি বিনীত নিবেদন: ফাটাকেষ্ট হওয়ার এত শখ থাকলে আগে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে সিনেমায় যোগ দিন। সেখানে চিত্রনাট্য অনুযায়ী অপরাধীকে ধমকান, প্রয়োজনে দু-চার ঘা বসান, শেষে নায়কোচিত ভঙ্গিতে ক্যামেরার দিকে তাকান। দর্শক হাততালি দেবে, প্রযোজক খুশি হবেন, আর আপনার জনপ্রিয়তাও বাড়বে।

কিন্তু মন্ত্রিত্বে থেকে ফাটাকেষ্ট সাজলে সমস্যা আছে। কারণ এখানে হাততালির চেয়ে বেশি জরুরি মানুষের নিরাপত্তা, ধমকের চেয়ে বেশি জরুরি জবাবদিহি, আর নায়কোচিত উপস্থিতির চেয়ে বেশি জরুরি কার্যকর প্রশাসন।

মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে মন্ত্রীকে ফাটাকেষ্ট হতে হয় না।

আর যে রাষ্ট্রে প্রতিটি সমস্যার সমাধানে মন্ত্রীকেই নায়ক হয়ে মাঠে নামতে হয়, সেখানে প্রশ্নটা শুধু এই নয়—মন্ত্রী কতটা সাহসী। প্রশ্ন হলো, তার অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রযন্ত্রটি আসলে কতটা সচল!

লেখক: রম্যলেখক

[মতামত লেখকের নিজস্ব]