নাজুক বয়ঃসন্ধি ও একটি মোবাইল ফোন: ঘরে ঢুকে পড়া অচেনা পৃথিবী

অপ্রতিমের মৃত্যুর খবরটি পড়ার পর থেকে বারবার কিছু প্রশ্ন, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা মনের ভেতরে উঁকি দিচ্ছে। সাথে একটি দৃশ্য আমার মতো অনেকের চোখের সামনে ভেসে উঠছে। একটি বয়ঃসন্ধিকালের শিশু, তার হাতে একটি মোবাইল ফোন, আর সেই ফোনকে ঘিরে তৈরি হয়ে যাওয়া এমন এক বিপদ, যার শেষ পরিণতি মৃত্যু।

ভাবা যায়, আমরা কেমন এক সমাজে বাস করছি? অপ্রতিমের মৃত্যুর পর অনেকেই ঘুরেফিরে কেবল তার হাতে থাকা আইফোনটিকেই যেন কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন। কিন্তু যে শিশুটির হাতে সেই ফোনটি ছিল, তার বয়স ছিল মাত্র তেরো। তার কৈশোরের সেই নাজুকতা, সেই বয়সের স্বাভাবিক কৌতূহল, নিজেকে আবিষ্কার করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, এসব নিয়ে আমরা খুব কমই কথা বলছি।

আমরা কি ভুলে গেছি, তেরো বছর বয়সটি এমন এক সময়, যখন অন্যের কথা শুনতে সবসময় ভালো লাগে না। নিজের পৃথিবীটাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। নিজের চোখে নিজেকেই কখনো কখনো নায়ক বলে মনে হয়?

এই আত্মবিশ্বাস, কৌতূহল, নতুন কিছু করার আকাঙ্ক্ষা, এমনকি কখনো ঝুঁকির প্রতি এক ধরনের অদ্ভুত আকর্ষণ। বয়ঃসন্ধির স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতারই অংশ।

যে বয়সে কোনো নতুন বা উদ্বেগজনক কাজও কখনো কখনো বিশ্বজয়ের মতো রোমাঞ্চকর মনে হতে পারে, সেই বয়সে একটি মোবাইল ফোন শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়। এটি হয়ে উঠতে পারে এক বিশাল অচেনা পৃথিবীর দরজা।

আর সেই দরজা দিয়ে কী ঢুকছে, শিশুটি সবসময় তা বুঝতে পারে না, এমনকি অনেকসময় বাবা-মাও পারেন না।

বয়ঃসন্ধিকালের এই নাজুকতার সঙ্গে যখন একটি স্মার্টফোনের সীমাহীন যোগাযোগক্ষমতা যুক্ত হয়, তখন তার সম্ভাব্য ঝুঁকি কতটা গভীর হতে পারে, অপ্রতিমের মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের নতুন করে তা ভাবতে বাধ্য করছে।

অপ্রতিমের মৃত্যু সংবাদটির সাথে সাথে পড়ছি অনেক কিছুই। অনেক অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। যেমন আমাদের সন্তানরা যখন মোবাইল হাতে ঘরের ভেতরে থাকে, তখন কি তারা সত্যিই ঘরের ভেতরে থাকে? নাকি তাদের সঙ্গে সঙ্গে একটি বিশাল, অদৃশ্য এবং অনেকাংশে অপরিচিত সামাজিক পৃথিবীও আমাদের ঘরে ঢুকে পড়ে? এই পৃথিবীর সাথে আমাদের শিশুরা তো দূরের কথা, আমরাই কি পরিচিত?

আমরা আমাদের সন্তানের হাতে অনেক সময় ফোন দেই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। কিন্তু এটা কিভাবে কখন আমাদের বাসায় অজানা অপরিচিত শত্রু প্রবেশের জন্য দরজা খুলে দিচ্ছে, তা টের পাই না।

নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থাতেও আছে আইসিটিসহ নানাবিধ পাঠ্যক্রম, যার জন্য সময়ের প্রয়োজনে ডিভাইস তাদের কাছে থাকে। ‘জরুরি হলে ফোন করবে,’ ‘স্কুল থেকে বের হলে জানাবে,’ ‘কোথায় আছো, লোকেশন পাঠাবে,’ 'বাসার খালা এসেছে?', ইত্যাদি কত কিছুর জন্য প্রয়োজন এই ফোনে।

এই ফোনতো সন্তানকে আমাদের আরও কাছে রাখছে, তাহলে ফোন না দিয়ে উপায় কী? কিন্তু আমরা কি একই সাথে এটাও ভাবছি কি-না যে, সেই একই ফোন-ডিভাইস তাকে আমাদের অজান্তে অন্য অনেক অজানা অপরিচিত মানুষের কাছেও নিয়ে যাচ্ছে?

এই দ্বৈততাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এখন ভাবার সবচেয়ে মোক্ষম সময়। কারণ, অপ্রতিম জীবন দিয়ে আমাদেরকে এই ভাবনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গেলো।

অপ্রতিমের হাতে যে আইফোনটি ছিল, তা নিয়ে অনেকেই আইফোনের গল্প বলছে। কিন্তু এটি এমন এক সময়ের বাস্তবতা, যখন একটি মোবাইল ফোন একই সঙ্গে আমাদের সন্তানকে পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করছে আবার পৃথিবীর অদৃশ্য বিপদকেও তার খুব কাছে নিয়ে আসছে।

বিষয়টি একটু ব্যাখা করি। মোবাইল একদিকে আমাদের সন্তানকে পরিবারের সঙ্গে যুক্ত রাখছে, অন্যদিকে আমাদেরই অজান্তে তাকে এমন সামাজিক নেটওয়ার্কের সঙ্গেও যুক্ত করতে পারে, যার কোনো সীমারেখা নেই। আসলেই নেই, ধরুন, একটি মেসেজ।

একটি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট।

একটি গ্রুপে যোগ দেওয়া।

একটি অনলাইন গেমের পরিচয়।

একটি কথোপকথন।

তারপর একটি বন্ধুত্ব।

এরপর হয়তো কয়েকদিন অপেক্ষার পর বাস্তব জীবনে সাক্ষাৎ।

সবকিছু এতো দ্রুত ঘটে যে অভিভাবক বুঝে ওঠার আগেই শিশুর 'সামাজিক পৃথিবী' অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। এদিকে আমরা হয়তো ঘরের দরজা বন্ধ করেছি শিশুর নিরাপত্তার কথা ভেবে, কিন্তু সন্তানের হাতে থাকা মোবাইলের দরজা খোলা রেখেছি শিশুর সামনে যে ‘তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ সাইবার পৃথিবী’তে পথ চলতে এবং সেখানে নিজেকে মোকাবিলা করতে জানতে হবে, তা এই ভেবে।

অপ্রতিমের আইফোন কি আসলে একটি প্রতীক?

একটি আইফোন নিঃসন্দেহে একটি দামি পণ্য। কিন্তু অপ্রতিমের ঘটনায় এটিকে শুধু একটি দামি মোবাইল হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা ধরা যাবে না।

এটি একই সঙ্গে আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, সামাজিক মর্যাদার প্রতীক এবং ভোগবাদী সংস্কৃতির একটি দৃশ্যমান চিহ্ন। আজকের এই ভোগবাদী সমাজে যার আইফোন নেই, একটা দামি বাইক নেই, কিংবা গাড়ি নেই, সে কোনো মর্যাদায় নেই। তাকে দেখে কেউ সালাম দেয় না, ভক্তি দেখায় না। নাটক, সিনেমা, টিকটক, ফেসবুক, ইউটিউব সব যোগাযোগ পরিসরে এখন ভোগবাদীদের জয়জয়কার।

এই সমাজের সেলেব্রিটি এখন সব টিকটকার, যারা নানাভাবে শিশু-কিশোরদের প্রভাবিত করে কি করে অল্প সময়ে ডিভাইস, বাইক, ইত্যাদির মালিক হওয়া যায়। আর এভাবেই আমাদের সমাজে শিশু-কিশোররা এখন সেই প্রতিযোগিতার অংশ।

যেমন কার ফোন ভালো? কার পোশাক দামি? কার ছবি বেশি ‘লাইক’ পেলো? কে কোন ব্র্যান্ড ব্যবহার করে? কে কোন রেস্টুরেন্টে যায়? কে কী দেখাতে পারে? কার কয়জন মেয়ে বন্ধু আছে, তাদের নিয়ে কে কোথায় কত সুন্দর জায়গায় নিয়ে টিকটক করতে পারে? ইত্যাদি।

ডিজিটাল পরিসর এই সামাজিক তুলনাকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে, অসুস্থ প্রতিযোগিতা দিনকে দিন তাদের মগজে স্থান করে নিচ্ছে, সরিয়ে দিচ্ছে তাদের নিজস্ব বিচার-বুদ্ধি ও পারিবারিক শিক্ষার পরিসরকে।

ফলে একটি ফোন আর কেবল ফোন থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে পরিচয়।

আর যখন কোনো 'বস্তু' পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন তার সামাজিক মূল্য তার অর্থনৈতিক মূল্যের চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে।

অপ্রতিমের মৃত্যুর ভয়াবহতা এখানেই।

এখানে অনেকেই ভাবতে পারেন, ‘আইফোন কেন এত দামি?’ 'কেন আইফোন দিতে হবে বাচ্চার হাতে?' এ বিষয়টি আসলে এতো সহজ নয়।

বরং এর চেয়ে আরও গভীর প্রশ্ন হলো, কোন সমাজে একটি শিশুর জীবনের চেয়ে একটি বস্তু বেশি কাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠতে পারে?

কিশোর গ্যাংকে শুধু রাস্তায় খুঁজলে চলবে না, আমরা ‘কিশোর গ্যাং’ বললেই রাস্তার ছবি কল্পনা করি। শুনেছি, এই হত্যাযজ্ঞের সাথে যুক্ত একজন নাকি সকালে অপ্রতিমকে নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছে, ওই বাসায় ঘুরেও এসেছে।

এসব তথ্যতো আরও মারাত্মক যে, এতো অল্প বয়সী ছেলেরা কী করে একটি পরিবারের সকল স্বপ্নকে থামিয়ে দিয়ে আবার সামাজিক সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে ভিকটিমের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনয় করে চলছে? কিশোরদের আচরণ এতো স্বাভাবিক হয় কী করে? কেমন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে তাহলে এই সমাজে? এতোটাই নির্বিকার, অপরাধবোধহীন, অসার, মানবিক বোধ বুদ্ধিহীন তারা?

আমাদের মনে হতে পারে, কোনো একটি রাস্তার ধারে কয়েকজন কিশোর একসঙ্গে ঘুরছে। মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে আড্ডা দিচ্ছে, কখনো মারামারি হচ্ছে, আবার কখনো অস্ত্রের ছবি।

কিন্তু আজকের কিশোরদের সামাজিক পৃথিবী শুধু রাস্তার নয়। ভয়ানক ব্যাপারটি হলো, তাদের একটি ‘ডিজিটাল পাড়া’ আছে।

সেখানে তারা বন্ধুত্ব করে, পরিচিত হয়, নিজেদের পরিচয় তৈরি করে, মতামত বিনিময় করে, প্রথমে কৌশলে আপনার সন্তানের পছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে গল্প করে জমিয়ে নেয় বন্ধুত্ব।  আর সেই ডিজিটাল পাড়ার বাসিন্দাদের অনেককেই আমরা বাবা-মায়েরা কখনো দেখেনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা জানিও না, সন্তান কার সঙ্গে কথা বলছে।

নৃবিজ্ঞান আমাদের একটি বিষয় শিখিয়েছে। মানুষকে বুঝতে হলে শুধু তার দৃশ্যমান আচরণ দেখলেই হয় না। তাকে ঘিরে থাকা সম্পর্কের জালটিও দেখতে হয়।

আজকের কিশোরদের ক্ষেত্রে সেই সম্পর্কের জাল আংশিকভাবে ডিজিটাল। তাই কোনো কিশোর কী করছে তা বুঝতে হলে শুধু তার স্কুল, পাড়া বা বন্ধুদের দেখলে হবে না। দেখতে হবে তার ডিজিটাল নেটওয়ার্ক। যেভাবেই হোক, ছলে-বলে-কলে-কৌশলে আপনাকে আমাকে দেখতেই হবে সেই নেটওয়ার্কে কারা কারা আছে, তাদের উদ্দেশ্য কী।

আজকের কিশোরদের সামাজিক পৃথিবী শুধু রাস্তার নয়। ভয়ানক ব্যাপারটি হলো, তাদের একটি ‘ডিজিটাল পাড়া’ আছে।

সবচেয়ে ভয়ংকর পরিবর্তন হচ্ছে এই সমাজের, এই মুহূর্তের। অপরিচিত মানুষ এখন খুব সহজেই পরিচিত হয়ে যায়। একজন মা হিসেবে এই জায়গাটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় দেখায়। আমরা সন্তানকে বলি, ‘অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলবে না’, ‘রাস্তায় কিছু খেতে দিলে খাবে না’ ইত্যাদি।

কিন্তু শিশুটি যখন মোবাইল ব্যবহার করছে, তখন অপরিচিত মানুষটি আর নিজেকে অপরিচিত হিসেবে পরিচয় দেয় না। সে হয়তো বলে, ‘আমি তোমার বন্ধু হতে চাই’, ‘আমরা একই গেম খেল’, ‘আমার সঙ্গে কথা বলো’, ‘তোমার একটা ছবি পাঠাও’, ‘বাবা-মাকে  আমার ব্যাপারে বলো না‘।

এই ‘বন্ধুত্বের’ মধ্যেই যে বিপদের শুরু হতে পারে, তা ১৩ বছরের নাজুক বয়সের কোনো শিশুর বুঝে উঠার কথা না।

অর্থাৎ শিশুর নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন শুধু অপরিচিত মানুষ নয়। অপরিচিতকে পরিচিত মনে হওয়ার সম্ভাবনাও। তাই শুধু সন্তানকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, তার বয়সের নাজুকতা, তার একাকিত্ব, তার সাথে ফেইক বন্ধুত্ব গড়ে তোলার চালাকি, নিজেকে এসব বন্ধুরূপী শত্রুর হাত থেকে বাঁচাতে না পারা। এই সবকিছুই আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে।

অপ্রতিমের ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন করছে, তার হাতে আইফোন কেন ছিল? সে কার সঙ্গে মিশতো? কেন একা বের হয়েছিল?

তার বাবা-মা কোথায় ছিলেন?

এই প্রশ্নগুলো তদন্তের প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু সামাজিক বিশ্লেষণে আমাদের সাবধান হতে হবে, যেন শেষ পর্যন্ত একটি শিশুর মৃত্যুর দায় শিশুটির জীবনযাপনেই চাপিয়ে না দিই।

এই সময়ের বাস্তবতায় একটি ফোন ব্যবহার করা কোনো অপরাধ নয়, আর আমরা চাইলেও সাইবার ওয়ার্ল্ড থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারবো না। আবার বন্ধু থাকাও অপরাধ নয়। বাড়ির বাইরে যাওয়াও অপরাধ নয়। আমরা যেন ভুলে না যাই যে, একটি শিশুর স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার আছে।

আমাদের দায়িত্ব হলো এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে সেই স্বাধীনতা তার জীবনের ঝুঁকি হয়ে না দাঁড়ায়।

সন্তানকে শুধু ‘ফোন কম ব্যবহার করো’ বললে হবে না, আমাদের অভিভাবকত্বের ভাষাটিও বদলাতে হবে, এমনকি কৌশলও।

‘ফোন নামাও।’ ‘ফোন বন্ধ করো।’ ‘কার সঙ্গে কথা বলছ?’ ‘পাসওয়ার্ড দাও।’

এসব প্রশ্নের পাশাপাশি বন্ধুর মতো করে আরও কিছু প্রশ্ন দরকার।

‘আজ অনলাইনে নতুন কারও সঙ্গে পরিচয় হয়েছে?’

‘কেউ কি তোমাকে এমন কিছু করতে বলেছে, যা তোমার অস্বস্তিকর লেগেছে?’

‘কেউ কি তোমাকে কোনো কথা গোপন রাখতে বলেছে?’

‘কেউ কি তোমার ছবি, ঠিকানা বা ব্যক্তিগত তথ্য চেয়েছে?’

‘কোনো বন্ধু কি তোমাকে এমন জায়গায় যেতে বলেছে যেখানে তোমার মন বলছে যাওয়া ঠিক হবে না?’

আমাদের অভিভাকত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, বিশ্বাস। সন্তানের সাথে যতো বেশি বিশ্বাস আর নির্ভরতার সম্পর্ক তৈরি করা যাবে, ততোই বোধহয় আমরা তৃতীয় পক্ষকে আমাদের মাঝে ঢুকে পড়া থেকে বিরত করতে পারি।

‘কিছু ঘটলে তুমি কি জানো যে কোনো ভয় ছাড়াই আমাকে বলতে পারো?’

এই শেষ প্রশ্নটির উত্তরই হয়তো সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ শিশুকে নিরাপদ রাখতে শুধু নজরদারি যথেষ্ট নয়। দরকার বিশ্বাস।

আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তিকে শত্রু বানিয়ে সমাধান হবে না। এই প্রজন্ম প্রযুক্তিকে শতভাগ নির্ভর করে চলতে বাধ্য। প্রযুক্তি ঘিরে ধরছে তাদের অক্টোপাসের মতো।

তাই, আমি প্রযুক্তিবিরোধী হবার উপায় নেই আমাদের। বরং ভাবতে হবে, প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে কতটা গভীরভাবে বদলে দিয়েছে, আর সেই বদলে যাওয়া সময়ে আমাদেরও যে বদলে যেতে হবে সন্তানদের নিরাপত্তার স্বার্থে, সেটিও মনে রাখতে হবে।

শিশু-কিশোরদের সঙ্গে বয়সে অনেক বড় ব্যক্তিদের সম্পর্ক ও নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে। কিশোর অপরাধকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না।

এর সঙ্গে যুক্ত সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া, বন্ধুত্বের নেটওয়ার্ক, অনলাইন যোগাযোগ এবং সামাজিক মর্যাদা ও ভোগের আকাঙ্ক্ষাকেও বুঝতে হবে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বাচ্চাদের প্রযুক্তির ব্যবহারকারী বানালেই হবে না। তাদের ডিজিটাল জগতের সচেতন নাগরিক হিসেবেও তৈরি করতে হবে।

ক্লাসে কিংবা বাড়িতে যেমন আমরা শিশুকে শেখাই কীভাবে রাস্তায় চলতে হয়, তেমনি শেখাতে হবে কীভাবে ডিজিটাল রাস্তায় চলতে হয়। যেমন আমরা বলি, অপরিচিত গাড়িতে উঠবে না, তেমনি বলতে হবে, অপরিচিত অনলাইন সম্পর্ককে ‘বাস্তব জীবনের’ নিরাপদ সম্পর্ক ধরে নেবে না। যেমন আমরা বিপদে পুলিশ বা বড়দের সাহায্য নিতে বলি, তেমনি ডিজিটাল বিপদেও কোথায় সাহায্য চাইতে হবে তা শেখাতে হবে।

আমাদের ঘর কি সত্যিই নিরাপদ? এই প্রশ্নটি আমাকে বারবার অস্বস্তিতে ফেলে। আমরা সন্তানকে ঘরে রাখি। দরজা বন্ধ করি। জানালা বন্ধ করি। তারপর নিশ্চিন্ত হই যে, আমরা নিরাপদ।

কিন্তু সন্তানের হাতে থাকা একটি স্ক্রিনের দিকে তাকাই না। সেই স্ক্রিনের ওপারে কারা আছে? কারা তার সঙ্গে কথা বলছে? কি গেইম খেলছে এবং কাদের সাথে? এসব কি নেশায় পরিণত হচ্ছে? কারা তাকে প্রভাবিত করছে? কারা তার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করছে? কারা তাকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করছে? কারা তার ব্যক্তিগত তথ্য জানছে? কারা তার দুর্বলতাকে ব্যবহার করতে পারে?

এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে আমরা কীভাবে বলবো যে, আমার সন্তান নিরাপদ?

অপ্রতিমের মৃত্যু একটি পরিবার এর সকল আশা আকাঙ্খাকে চুরমার করে দিয়ে গেল। আজ কেবল অপ্রতিমের বাবা মাই জানেন কতোটা ভারী পাথর তাদের উপর ভর করে আছে। সন্তান হারানোর বেদনা সইবার শক্তি দিক, এই দোয়া করি। এই মৃত্যু আমাদের শুধু কাঁদাবে না, প্রশ্নও করাবে।

কোনো একটি ঘটনা কখনো নিছক একটি ঘটনা নয়। একটি ঘটনা আমাদের সমাজের ভেতরের সম্পর্ক, মূল্যবোধ, ক্ষমতা ও পরিবর্তনের দিকে তাকানোর একটি জানালা খুলে দেয়।

জীবনের বিনিময়ে যে শিক্ষা অপ্রতিম আমাদের দিয়ে গেলো, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে সমাজের নেটওয়ার্কের বাইরে চলে যাওয়ার হাতছানি থেকে আমাদের শিশুদের রক্ষা করতে হবে।

অপ্রতিমের মৃত্যুকে কেবল একটি পুলিশি ঘটনা হিসেবে দেখলে আমরা বড় একটি শিক্ষা হারাবো। অপ্রতিম আর ফিরে আসবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যদি আমাদের শেখায় যে, সন্তানের নিরাপত্তা এখন শুধু ঘরের দরজা, স্কুলের গেট কিংবা রাস্তার নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। বরং তার হাতে থাকা ছোট্ট একটি ডিভাইসের ওপাশের পৃথিবীরও প্রশ্ন। এই ভয়াবহ মৃত্যুর ভেতর থেকে আমাদের একটি জরুরি সামাজিক শিক্ষা নিতেই হবে, আর তাহলো, আজকের পৃথিবীতে সন্তানের ঘরে শত্রু ঢোকার জন্য সবসময় দরজা খুলতে হয় না, কখনো কখনো শুধু একটি ডিভাইসই যথেষ্ট।

তাই দরজার সাথে সাথে ডিভাইসের দিকেও আমাদের সার্বক্ষণিক মনিটরিং রাখতে হবে। এই মোবাইলে আসক্তির জেরে কতো বয়স্ক আত্মীয় যে বাড়ির বা আশে-পাশের বয়ঃসন্ধিকালের শিশুদের ধর্ষণ, শারীরিকভাবে নির্যাতন ও বলাৎকার করছে, সেসব খবর আমরা প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমাদের শিশুদের ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে বড় করতে হবে, এর কোনো বিকল্প এই মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই।

বয়ঃসন্ধিকালের এই নাজুকতাকে, এই বয়সের স্বাভাবিক কৌতূহল ও ডিভাইসের প্রতি আকর্ষণকে আমরা অপরাধ হিসেবে না দেখে যদি তার বাস্তবতা ও ঝুঁকিগুলোকে বুঝতে শিখি, যদি আমাদের সন্তানদের সেই অনুযায়ী সচেতন করে তুলতে পারি, তবেই অপ্রতিম তার ছোট্ট জীবনের বিনিময়ে আমাদের জন্য যে কঠিন শিক্ষাটি রেখে গেলো, তার যথার্থ সদ্ব্যবহার হবে।

ওপারে ভালো থেকো, অপ্রতিম। তোমার এই অসময়ে চলে যাওয়া আমাদের আরও অনেক শিশুকে নিরাপদে বড় করে তোলার দায় যেন মনে করিয়ে দেয়।

(লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)