মতামত

নৌকাবাইচ থেকে বাউল: সংস্কৃতির পথে বারবার কেন ‘তৌহিদী জনতা’

 

“আমার ময়ূরপঙ্খী নাও

ধীরে চালাও সোনার তরী রে

ওরে আইজকে আমরা বাইচ খেলিবো ইছামতি নদীরে...”

ভাদ্র কিংবা আশ্বিনের কাঁচাসোনা রোদে যখন নদীর বুক টইটম্বুর থাকে, তখন গায়েনের হাঁক আর কাঁসার ঝংকারে মুখরিত হয়ে ওঠে দুই কূল। সারিবদ্ধ মাঝিদের টানটান পেশি, আকাশে একযোগে উঁচিয়ে ধরা শত বৈঠা, আর জলের বুক চিরে বিদ্যুৎবেগে ধাবমান দীর্ঘাকৃতির নাও, নৌকাবাইচ যেন বাংলার জলজ জীবনের এক মহাকাব্যিক প্রতিচ্ছবি। নৌকার গলুইয়ে দাঁড়িয়ে গায়েনের ছন্দময় তাল, তার সাথে তালে তাল মিলিয়ে হাঁক ছাড়ে মাঝিকুল, আর তীরের হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে  অবিরাম উল্লাস। জলতরঙ্গের এই উচ্ছ্বাস শুধু এক জলক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বয়ে চলা এক বহমান উৎসব, যৌথ শ্রমের গান এবং আত্মিক আনন্দের লোকজ দলিল।

জল আর পলি দিয়ে গড়া এই বাংলায় নদী কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত নয়, নদী আমাদের অস্তিত্ব। এই পলিগঠিত ভাটি জনপদের জীবন, জীবিকা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি সবই নদীর স্রোতের সাথে ওতপ্রোতভাবে বাঁধা। নদী এ দেশের মানুষকে কেবল অন্ন দেয়নি, দিয়েছে তার অবিনাশী গান ও জীবনদর্শন। এ ভূখণ্ডের সংস্কৃতির গভীরে তাকালে দেখা যায়, এখানকার ধর্ম, আনন্দ ও ক্রীড়া সবই নদীকেন্দ্রিক। সারি-ভাটিয়ালির সুর, গল্প-উপন্যাস কিংবা কবিদের পঙ্ক্তিমালা- সবখানেই জলের ছোঁয়া। নদী এ দেশের সাহিত্য সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে পরম মমতায়। আর বর্ষা শেষ হলে গ্রামবাংলার উন্মুক্ত জলাশয়ে নৌকা বাইচ আয়োজন সেই গ্রাম বাংলার মানুষের সামাজিক পুনর্মিলন ও উৎসবের অন্যতম বড় অনুষঙ্গ।

ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলালে দেখা যায়, সামন্তযুগীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেই মূলত এ দেশে বাইচের নৌকার প্রচলন হয়েছিল। মোগল আমলে কিংবা নবাবী যুগে নৌসেনাদের শরীরচর্চা ও যুদ্ধকৌশল তীক্ষ্ণ রাখতে এ ধরনের নৌ-মহড়ার আয়োজন করা হতো। পরবর্তী সময়ে কালক্রমে সামরিক সেই চর্চা স্থানান্তরিত হয় বাংলার লোকজ আনন্দে। কৃষিভিত্তিক সমাজে ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে ফসল কাটার পর কিংবা বন্যাপরবর্তী সময়ে গ্রামীণ মানুষ যখন একটু অবসরের সুযোগ পেত, তখন ‘ময়ূরপঙ্খী’, ‘পঙ্খীরাজ’, ‘সোনার তরী’ বা ‘তুফান’ এর মতো বাহারি নামের নৌকা নিয়ে মেতে উঠতো বাইচের উৎসবে। নদী যেখানে যোগাযোগের মূল ধমনি, সেখানে জীবিকার বাহনই হয়ে ওঠে সংস্কৃতির বাহন।

বাংলায় নৌ-শিল্পকে কেন্দ্র করে যুগ যুগ ধরে গড়ে উঠেছে বিশেষায়িত বন্দর, বাজার এবং একদল দক্ষ ও অভিজ্ঞ কারিগর। অঞ্চলভিত্তিক নদী ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে এ দেশের জেলাগুলোতে বাইচের নৌকার গড়ন ও নকশাতেও ফুটে ওঠে অপূর্ব ভিন্নতা। যেমন ঢাকা, ময়মনসিংহ ও গফরগাঁও অঞ্চলে ব্যবহৃত ১৫০ থেকে ২০০ ফুট দীর্ঘ ‘কোশা’ নৌকা অত্যন্ত সরু ও সোজা ধাঁচের, যা শাল বা শীল কড়াই কাঠে তৈরি। আবার টাঙ্গাইল ও পাবনায় ব্যবহৃত গতিময় ‘ছিপ’ নৌকার পেছনের অংশ পানি থেকে প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু হলেও সামনের দিকটা পানির সাথে মিশে থাকে এবং তাতে চুমকির কারুকাজ শোভা পায়। অন্যদিকে সিলেট, কুমিল্লা ও আজমিরিগঞ্জে প্রচলিত ‘সারেঙ্গি’ নৌকার মুখ হাঁসের মতো চ্যাপটা এবং কিছুটা প্রশস্ত। এ ছাড়া চট্টগ্রামের উপকূলে জাহাজের আদলে তৈরি ‘সাম্পান’ কিংবা ঢাকা-ফরিদপুরের চওড়া ‘গয়না’ নৌকা কেবল সুনির্দিষ্ট কাঠের নির্মিত জলযান নয়, বরং স্থানীয় কারিগরদের প্রযুক্তি ও নান্দনিক রুচির এক অমূল্য লোকশিল্প।

কালের বিবর্তনে সেই ঐতিহ্য স্তিমিত হয়ে এলেও এখনো স্বগৌরবে টিকে আছে নদীমাতৃক দেশের অন্যতম লোক সংস্কৃতির অন্যতম উৎসব নৌকা বাইচ। অথচ স্মরণাতীতকাল থেকে চলে আসা আমাদের লোকসংস্কৃতির এই অনবদ্য ঐতিহ্য আজ চরম সঙ্কটে। সম্প্রতি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সোনাই নদীতে দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক নৌকাবাইচ বন্ধের জন্য ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে একদল লোক দাবি জানিয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার চালানো ছাড়াও মসজিদে সভা করে তারা এই লোকজ উৎসব আয়োজনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা যে যুক্তিগুলো দাঁড় করাচ্ছে- যেমন বিশৃঙ্খলা, জুয়ার আশঙ্কা কিংবা পরিবেশগত ক্ষতি- তা অত্যন্ত হাস্যকর ও ভিত্তিহীন। যেকোনো বড় লোকসমাগমে স্থানীয় আইনি শৃঙ্খলা বজায় রাখা প্রশাসনের দায়িত্ব। বিচ্ছিন্ন কোনো বিশৃঙ্খলা বা অতীত দুর্ঘটনার দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর চলা একটি প্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী লোকজ উৎসব বন্ধ করে দেওয়া কোনো সুস্থ বা যুক্তিসঙ্গত সমাধান হতে পারে না।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে, তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? এগুলো কি কেবলই বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিবাদ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিকে মুছে ফেলার গভীর কোনো ষড়যন্ত্র? কেন বারবার এই ‘তৌহিদী জনতা’ নামের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর লোকেরাই প্রকাশ্য মঞ্চে অবতীর্ণ হয়? কেন বারবার সংস্কৃতির যে কোনো মেলবন্ধন বা আয়োজনের মুখোমুখি হলেই ধর্ম টেনে তাকে ‘অধর্ম’ বা ‘অসামাজিক’ বলে চিহ্নিত করে বন্ধ করে দেওয়ার পাঁয়তারা চলে?

একটু অতীতের দিকে তাকালেই এই ধারার পেছনের মূল নকশাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিয়ানীবাজারের নৌকাবাইচ কোনো একক ঘটনা নয়। বিগত কয়েক বছরে বিশেষত অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা দেখেছি কীভাবে ধর্মের নামে সংস্কৃতির উপর আঘাত করা হয়েছে। এ দেশের বাউল গান ও লালন মেলা বন্ধের পাঁতারা করা হয়েছে, বাউলদের চুল কেটে অপদস্থ করা হয়েছে। সুফি মাজারগুলোতে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে, গ্রামীণ যাত্রাপালা এমনকি শিল্পকলায়, মহিলা সমিতিতে মঞ্চনাটক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গত বছর নভেম্বরে মানিকগঞ্জে বাউলশিল্পী আবুল সরকারের ভক্তদের ওপর হামলার ঘটনা, সেপ্টেম্বরে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে ‘তৌহিদি জনতা’ পরিচয়ে নুরুল হক ওরফে ‘নুরাল পাগলা’ এর মরদেহ কবর থেকে তুলে পোড়ানোর ঘটনা, দিনাজপুর ও জয়পুরহাটে নারীদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ, মহিলা সমিতি মঞ্চে নাটক বন্ধ, নাটক ও চলচ্চিত্রের নারী তারকাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান বন্ধ, সবই ‘তৌহিদী জনতার’ ব্যানারে হয়েছে। প্রতিবারই এক অদৃশ্য বা দৃশ্যমান ‘মব’ ধর্মের রাজনীতি ব্যবহার করে আমাদের হাজার বছরের সেক্যুলার ও লোকজ সংস্কৃতির শেকড়ে আঘাত হেনেছে এবং সেই চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

এভাবে যদি ‘তৌহিদী জনতার’ নামে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর এই অন্যায্য ও আগ্রাসী আচরণ মেনে নেওয়া হতে থাকে, তবে বাংলাদেশ তার নিজস্ব আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলবে। ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশ কেবল একক কোনো গোষ্ঠী বা ধ্যানধারণার ভূমি নয়। এই দেশ বহু জাতি, বহু ধর্ম ও বহুবিধ বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান এবং নানা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ যুগে যুগে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিজস্ব লোকজ চর্চাকে টিকিয়ে রেখেছে। হাজার বছর ধরে যেখানে বাউলের একতারা, জারি-সারি গান আর নৌকাবাইচের উৎসব আমাদের একসাথে বাঁচতে শিখিয়েছে, সেখানে একদল ধর্মান্ধ গোষ্ঠী পুরো সমাজকে একমুখী ও গোঁড়া করার অপচেষ্টায় লিপ্ত।

এই আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে কেবল নৌকাবাইচ নয়, আমাদের যাত্রাপালা, পালাগান, চৈত্র সংক্রান্তি কিংবা নবান্নের উৎসবেও তালা ঝুলবে। আগামী প্রজন্ম নিজের ঐতিহ্য ভুলে এক সংস্কৃতিহীন, রুক্ষ ও কট্টর মানসিকতার দাস হয়ে গড়ে উঠবে।

এই সংকটকাল থেকে উত্তরণের জন্য জনগণ ও সরকার উভয় পক্ষকেই অত্যন্ত সচেতন ও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিয়ানীবাজারে প্রশাসন যেমন শক্ত থেকে নৌকাবাইচ নির্বিঘ্নে আয়োজন নিশ্চিত করেছে, তেমনি সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে, কোনো গোষ্ঠী নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারবে না। ধর্মের দোহাই দিয়ে লোকজ সংস্কৃতি কিংবা ঐতিহ্যবাহী মেলা-উৎসব বন্ধের অপচেষ্টাকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কেবল সরকারের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না। গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র সাধারণ মানুষ, তরুণ সমাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া লোকজ উৎসবগুলোকে নিজস্ব উদ্যোগে পুনরায় চালু করতে হবে।

বিদ্যালয় ও পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি নিউ মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে আমাদের আবহমান সংস্কৃতির নান্দনিকতা ও ইতিহাস তুলে ধরতে হবে, যাতে তরুণেরা নিজেদের শিকড় সম্পর্কে গর্ববোধ করে এবং বিভ্রান্ত না হয়।

রাষ্ট্রীয়ভাবে নদীগুলোর নাব্যতা বজায় রাখার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী বাইচ ও লোকক্রীড়াকে প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে, যাতে অর্থাভাবে বা প্রচারের অভাবে আমাদের ঐতিহ্য বিলুপ্ত না হয়ে যায়।

নদীর প্রবাহকে বাধা দিলে নদী শুকিয়ে যেমন প্রাণ হারায়, তেমনি লোকসংস্কৃতি স্তব্ধ হয়ে গেলে একটি জাতির আত্মাও মরে যায়। নদীর জলে যে বৈঠার ছন্দ বাজে, মাঝিদের কণ্ঠে যে গান শোনা যায়, তা এ দেশের বহুমাত্রিক ঐতিহ্যের প্রবহমান স্পন্দন। একটি গোষ্ঠীর অপচেষ্টায় অনবদ্য স্পন্দনকে কখনো স্তব্ধ হতে দেওয়া যাবে না। আজ যদি নিজস্ব উৎসব ও লোকজ সংস্কৃতির অধিকার রক্ষায় চিন্তায় ও রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তোলা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই পলিমাটির সুপ্রাচীন পরিচয়টি কেবল মানচিত্রে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তাই নদীকে জীবন্ত রাখতে এবং ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে বৈঠার এই যৌথ আঘাত অক্ষুণ্ণ রাখা প্রয়োজন; বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার এই লড়াইকে সর্বাত্মকভাবে বেগবান করে তোলাই এখন সময়ের দাবি। 

 

লেখক: সাংবাদিক

(মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব)