মতামত

কারিনা কায়সারের মৃত্যু ও দুই ভাগে বিভক্ত ঘৃণার পৃথিবী

ঘৃণার পৃথিবীও দুই ভাগে বিভক্ত। সরকারি ঘৃণা আর বিরোধী ঘৃণা। আমজনতার তাই সিদ্ধান্ত নিতে হয় সে কোন ঘৃণার পক্ষে যাবে?

বহু বছর ধরে শুনে আসছি ভালবাসা আর ঘৃণা নাকি একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। সম্ভবত এখানে রাজনীতির ঘৃণাটাকে ধরা হয় নি। আমার ধারণা এই মুদ্রা দিয়ে লটারি করা হলে ভালবাসার পিঠটা পড়বে না ঘৃণার পিঠ‌ই বার বার ঘুরে ফিরে আসবে! যতই বলা হোক ক্ষমা মহৎ গুণ কিন্তু এর বিপরীতে ‘দেখে নেওয়ার’ ব্যাপারটাই সম্ভবত মৌলিক! আপনি যখন ক্ষমতায় তখন বিরোধীদের দেখে নেবেন আর বিরোধীরা যদি ক্ষমতায় আসে তখন আপনাকে বা আপনার দলকে দেখে নেবে - বাংলাদেশটা কখনো কি এই দেখাদেখির বাইরে ছিল?

এমন কী প্রেম, সেখানেও সমান ঘৃণা ও দেখে নেয়ার ব্যাপারটা আছে। ১৯১৫ সালে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা বাঙালির বহুল পঠিত দেবদাস উপন্যাসে প্রেম ভাঙ্গা ও বিয়ে ঠিক হয়ে যাবার পর দেবদাস বড়শীর লাঠি দিয়ে পার্বতীর কপাল ফাটিয়ে দিয়েছিল। এই যুগে দেখে নেয়ার নামে এসিড ছুঁড়ে মারার ঘটনাও দেদার আছে। যাকে একদা ভালোবাসা যায় ঘৃণার নামে তাকে হত্যাও করতে পারি আমরা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মহীরুহ’ হয়ে থাকা শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানকেও হত্যা করা হয়েছিল। বদনাম রটানো ও ঘৃণার চাষ ছাড়া খুন করা অসম্ভব।

‘যায় দিন ভালো আসে দিন খারাপ’ - এর সূত্র ধরে আগে কি এটা অনেক কম ছিল? ধরুন আওয়ামী লীগ নেতা কোরবান আলী সাহেব এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিলেন। তখন এক সাপ্তাহিক পত্রিকা মন্তব্য কলাম লিখেছিল যার শিরোনাম ‘এখন সবাই কোরবানালী!’ কোরবান আলী সাহেব যখন মারা যান তখন অবশ্য আওয়ামী লীগ বা বিএনপি দলীয় কোনো নেতা, কর্মী বা সমর্থক ‘আলহামদুলিল্লাহ’ শব্দটি লেখেননি বা বলেননি। ভদ্রলোক বেঁচে থাকলে এবং এই সময় তার মৃত্যু হলে তিনি সীমাহীন ট্রলের শিকার হতেন। এ সময়ের রাজনীতির ঘৃণার ক্ষেত্রে সবাই হয়তো ‘কোরবানালী’ হয়ে যেত। ‌কারো মৃত্যুতে এখন ঘৃণার উল্লাসনৃত্য দেখা যায়। আমি হতাশ কারণ আমার মনে হয় আমরা এর বাইরে যেতে পারবো না!

গত কয়েক বছর ধরে রাজনীতির নামে নতুন একদল সমর্থকের দেখা মিলেছে যাদের কার্যক্রম দেখে মনে হয় তারা তাদের সমর্থিত দলের কাছে আত্মা বিক্রি করে দিয়েছে! এই আত্মা বিক্রির ব্যাপারটা সমর্থকদের যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার দেখে প্রথম সবার নজরে পড়ে। 

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী আমলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগের কারণে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে সমালোচনা কিংবা ঘৃণা ছড়ানোর পর্যায়টা‌ খানিক হলেও সীমাবদ্ধ ছিল। তার মানে এই না যে আমরা ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন ও তার অপপ্রয়োগ সমর্থন করছি। বেশিরভাগ সময় দেখা যেত ছদ্মনামে সিমকার্ড কিনে কিংবা বিদেশি কোনো নম্বর ব্যবহার করে সরকারের সমালোচনা কিংবা কখনো কখনো ঘৃণা ছড়ানো হতো।

করোনাকালীন সময়ে টেলিভিশন কর্মী রিফাত সুলতানা, যার যমজ বাচ্চা ছিল এবং নতুন আরেক কন্যা সন্তান জন্ম দিতে যেয়ে তিনি যখন মারা যান তখনো হাজারো মানুষ তার মৃত্যু নিয়ে ঘৃণা ছড়িয়েছিল। কেউ এই মৃত্যুকে ‘পাপের পরিনাম’ হিসেবে দেখে, কেউ কেউ বলে ওঠে ‘আলহামদুলিল্লাহ!’ যদিও রিফাত কোনো রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন না।

ইউনুস সরকারের আমলে ঘৃণা ছড়ানোর কাজটা জঘন্যতম পর্যায়ে পৌঁছে, শিল্পে রূপান্তরিত হয়। শত শত আইডি তখন ‘গুপ্ত’ থেকে প্রকাশ্যে চলে আসে আর পলাতক হয়ে যাওয়া আওয়ামী সমর্থকদের আইডি হয়ে যায় ‘গুপ্ত’।

অগ্নিকন্যা খ্যাত মতিয়া চৌধুরীর মৃত্যুর পরে তার সম্পর্কে সীমাহীন ঘৃণা ছড়ানো হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকার পরেও তাকে যথাযথ সম্মাননা দেয়া হয়নি। নির্দিষ্ট জায়গায় দাফন করা যায়নি। তার সম্পর্কে যোগাযোগ মাধ্যমে আসা মন্তব্যে ছিল পরিকল্পনামাফিক ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ। 

সাবেক মন্ত্রী দীপুমনি গ্রেপ্তারের পরেও একই ঘটনা চোখে পড়ে। এরই মাঝে কয়েকবার সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুর গুজব রটে। 

সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১৫ই মে রাতে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ফুটবলার কায়সার হামিদের কন্যা কন্টেন্ট নির্মাতা, অভিনেত্রী ও ভ্লগার কারিনা কায়সারের মৃত্যুর পরে যেমন করে তার মৃত্যুকে সমর্থন করে ঘৃণাসূচক পোস্ট ছড়ানো হয় প্রায় একইরকমভাবে তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুর গুজব রটার পরে তেমন ঘৃণা ও বিদ্বেষমাখা পোস্ট যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছিল! দল ছায়া হয়ে থাকে কিনা জানি না তবে দলের নামে আত্মা বিক্রি করা মানুষগুলোর কাজ এটা।

ঘৃণার আগে গালি দেয়ার জঘন্য ধরনটাও আলোচনায় এসেছে বহুবার। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কিংবা শেখ হাসিনার আমলেও গালি দেয়া পোস্ট তেমন হালে পানি পেত না। ইনকিলাব মঞ্চ, এনসিপি আর জামায়াত-শিবিরনির্ভর বটবাহিনী এই গালিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যায়। ওসমান হাদীর নিজের বক্তৃতা কিংবা মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান এমপির বাসার সামনে যেভাবে তাকে উদ্দেশ্য করে গালি দেয়া হয়েছে তার নিন্দা জানানোর ভাষাও আমাদের জানা নেই। 

ঠিক এর বিপরীত মেরুর আওয়ামী সমর্থিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একাধিক গ্রুপ কারিনা কায়সারের মৃত্যু নিয়ে ঘৃণা ও সীমাহীন বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। হয়তো পরাজয় ও অপমানিত হয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায়ের কাহিনীটা আওয়ামীরা ভুলতে বা মেনে নিতে না পারার কারণে ঘৃণাই এখন তাদের একমাত্র বিনোদন।

আসলে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো এবং গালি দেয়ার নামে যে জঘন্য রাজনৈতিক বৈরীতা আছে সেখানে আর যাই থাকুক মানুষের প্রতি ন্যূনতম সম্মান কিংবা একটুও দেশপ্রেম নেই।

মূলতঃ মুক্তিযুদ্ধ নির্ভর রাজনীতিকে বিতর্কিত করে ঘৃণার পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য‌ই এই ঘৃণার চাষ শুরু হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের পরপর নতুন সরকারের বিরোধিতা করার জন্য যে জাসদ গঠন হয়েছিল সেখানে মিশে গিয়েছিল জামায়াত, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামসহ স্বাধীন দেশে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী নিষিদ্ধ দলগুলো! এই নিষিদ্ধ দলগুলোই আসলে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বয়ান তৈরি করে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিল।

ইউনুস সরকারের আমলে এসে তারাই আবার সেই একই কাজ ভিন্ন ফর্মে শুরু করেছিলো, যা এখনো বহাল আছে। স্বাধীনতার পরে এবং শেখ হাসিনার ১৭ বছরের শাসনে তারা এ কাজ করেছিল ‘গুপ্ত’ হয়ে। একই কাজ আওয়ামী  ঘরানার মানুষ এখন করছে গুপ্তভাবেই, ক্ষমতা থেকে বিদায়ের গল্পটা ভুলতে না পেরে।

আসলে ঘৃণার রাজ্যে পৃথিবী হিংসাময়। ভালোবাসার 'শবটাকেও' তাই এখন কবর থেকে উঠিয়ে প্রয়োজনে গাছের সাথে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। হিংসা আর বিদ্বেষের নামে, ধর্মের নামে, বিরোধী মতের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর নামে যে আগুন জ্বালানো হচ্ছে, সে আগুনে পুড়ে যাচ্ছি আমি, আমরা এবং আমাদের সোনার বাংলাদেশ। 

কায়সার হামিদ কন্যা, নির্মাতা, ভ্লগার ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সার জানলো না বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোর এই কালে তার জন্য দুই ফোঁটা চোখের জল ফেলা মানুষেরও অভাব ছিল না এই দেশে! রবিবার তার মরদেহ দেশে ফেরার কথা রয়েছে। 

কারিনার মৃত্যুতে কাঁদছে মানুষ, কাঁদবে মানুষ! ঘৃণা যেখানে নিয়তি, কান্না সেখানে একমাত্র ভালোবাসা।

 

[মতামত কলামে প্রকাশিত লেখার দায়-দায়িত্ব একান্তই লেখকের, সম্পাদক এর জন্য দায়ী নন]