খালেদা জিয়ার স্মরণসভায় সাংবাদিক হেনস্তা করা সালেহ উদ্দিনের আচরণ ‘অপেশাদার এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ’?

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভা শুরু হওয়ার আগে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিককে সরাসরি সম্প্রচারে থাকা অবস্থায় লাঞ্ছিত করার ঘটনার পর চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।

শুক্রবার সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠানস্থলে মঞ্চের কাছ থেকে লাইভ করছিলেন সময় টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি আহমেদ সালেহীন।

সেসময় হঠাৎ করেই আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন এসে তাকে প্রথমে ধাক্কা দেন এবং টেনে সরানোর চেষ্টা করতে থাকেন।

সালেহ উদ্দিনের আচরণকে নজিরবিহীন, পুরো ঘটনাটিতে ‘সম্মানসুলভ আচরণের ঘাটতি’ ছিল এবং ব্যাপারটা আরও ভালো ভাবে মিটিয়ে ফেলা যেতো বলে মনে করছেন সাংবাদিকরা।

কী ঘটেছিল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে সালেহ উদ্দিনকে বলতে শোনা যায়, “এখানে লাইভ হবে না। এখানে দায়িত্ব না, বলে দেওয়া হয়েছে তারপরও আসছেন।”

সে সময় আহমেদ সালেহীনকে বার বার বলতে শোনা যায়, ”আমরা লাইভে আছি।”

এক পর্যায়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে এগিয়ে আসেন বিএনপির বিভিন্ন সিনিয়র নেতা, মিডিয়া কমিটির সদস্যরা এবং উপস্থিত সাংবাদিকদের অনেকে।

আয়োজক কমিটি থেকে সংবাদকর্মীদের লাইভ করার ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি; তবে বিএনপির মিডিয়া সেল থেকে শায়রুল কবির খানের অনুরোধ ছিল ২.১৫ টার মধ্যে যেন লাইভ শেষ করে ফেলা হয় বলে জানিয়েছেন সময় টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি সালেহীন।

“আমরাও সেভাবেই কাজ করছিলাম। তখন ২টা বেজে ৫-৬ মিনিট হবে। আমিও আমার লাইভের শেষ দিকে ছিলাম। আর ২-৩ মিনিটের মধ্যেই শেষ হত। এর মধ্যেই উনি এসে এমন কাজ করলেন। অথচ এর ঠিক ৩০ সেকেন্ড আগেই আমাকে শায়রুল ভাই ইশারা দিয়েছেন। আমিও তাকে ইশারায় বলেছিলাম আমি শেষের দিকে,” আলাপ-কে শনিবার বলেছেন তিনি।

বিএনপি মিডিয়া সেলের সিনিয়র সদস্য শায়রুল কবির খান আলাপ-কে বলেন, “আমি মাইকে ঘোষণা দিয়ে অনুরোধ করেছিলাম, ২টা ৩০ মিনিট শোকসভা শুরু হবে। তাই অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য ও গাম্ভীর্য বজায় রাখার জন্য ২টা ১০ মিনিট পর্যন্ত আমরা ওখানে ছবি নিব, কাজ করব। এরপর নিজ নিজ জায়গা থেকে অনুষ্ঠান কভার করার অনুরোধ করেছি।”

ঘটনার কথা জানতে পেরে অনুষ্ঠানস্থলেই সাংবাদিকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

পরে এক ফেইসবুক পোস্টে সালেহ উদ্দিন বলেন ঐ ঘটনার জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে ঐ সাংবাদিকের দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে আহমেদ সালেহীন বলেছেন তাদের মধ্যে কোনও কথা হয়নি।

সালেহ উদ্দিনের দাবি, অনুষ্ঠানের আগেই সাংবাদিকদের সাথে এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে বিটিভি অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করবে। আর বিটিভির ফিড নিয়ে অন্যান্য টিভি চ্যানেলগুলো সম্প্রচার করবে।

“বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৪টি টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। এ ধরনের অতিরিক্ত ভিড় অনেক সময় শোকসভার মতো সংবেদনশীল ও গাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করতে পারে,” ফেইসবুক পোস্টে বলেছেন সালেহ উদ্দিন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভা। ছবি: বিএনপি মিডিয়া সেল

‘দুঃখ প্রকাশ’

সালেহীনকে ‘বিনীতভাবে সরে যেতে অনুরোধ’ করেছেন দাবি করে, সালেহ উদ্দিন লিখেছেন, “পরবর্তীতে আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি এবং বিষয়টি নিয়ে দুঃখও প্রকাশ করেছি।”

আর আহমেদ সালেহীন জানিয়েছেন সালেহ উদ্দিনের ফোন থেকে শুক্রবার সন্ধ্যায় তার কাছে কল এসেছিল কিন্তু তখন ব্যস্ততা থাকায় কল ধরতে পারেন নাই।

“উনি যে দাবি করেছেন উনার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, উনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন, এটা সত্য নয়,” শনিবার সকালে আলাপ-কে বলেন তিনি।

দৈনিক ইত্তেফাক-এর নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিনের বক্তব্য জানতে তাকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি; টেক্সট ম্যাসেজেরও জবাব দেননি।

শুক্রবারের নাগরিক শোকসভার সঙ্গে বিএনপি বা কোনো রাজনৈতিক দলের কোনো সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা ছিল না বলে তার পোস্টে দাবি করেন সালেহ উদ্দিন।

তবে বিএনপি’র সম্পৃক্ততা না থাকলেও, আয়োজকদের ‘অতি উৎসাহী’ আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকরা বলেছেন এই ব্যাপারে দলটির আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া উচিৎ ছিল। 

‘অপেশাদার এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ’

সালেহ উদ্দিনের আচরণকে অপেশাদার ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আখ্যা দিয়ে একে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবৃতি দিয়েছেন বিএনপি বিটে কাজ করা বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা।

“এই ধরনের উগ্র মস্তিষ্কের লোকদের এত বড় আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া ঠিক কি না, সেটিও বিএনপিকে ভেবে দেখা প্রয়োজন,” বিবৃতিতে বলা হয়েছে।

তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসা কভার করার জন্য মিডিয়া পাস নেওয়া, সাংবাদিকদের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যানের মতবিনিময় অনুষ্ঠানসহ দলের নানা অনুষ্ঠানের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নানা প্রতিবন্ধকতাসহ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বলেও বিবৃতিতে বলা হয়েছে।

“আমি আমার চোখকে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারি নি। একজন সাংবাদিক তার পেশাদারি দায়িত্ব পালনের সময় এমন আচরণের শিকার হবেন কেন?” সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক আরশাদ মাহমুদ আলাপ-কে শনিবার বলেছেন।

এটাকে ‘অতি উৎসাহী চামচা বা মোসাহেবি করতে চাওয়া’ কিছু মানুষের কাজ মন্তব্য করে তিনি বলেন ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই বিএনপির ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার ছিল।

যে এই কাজ করেছে তাকে বিএনপির সব ধরনের দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়া প্রয়োজন বলে মত দিয়ে আরশাদ মাহমুদ বলেন, “এটা করা না গেলে এ ধরনের কাজ বাড়তেই থাকবে। যেমনটা আমরা আওয়ামী লীগের আমলে দেখেছি। নতুন বন্দোবস্ত বলে পুরানো ধারা অব্যাহত রাখলে হবে না।”

এসব বিষয়ে তারেক রহমানকে নজর দিতে হবে মন্তব্য করে গার্ডিয়ান, ওয়াশিংটন পোস্ট ও নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো বিদেশি গণমাধ্যমে কাজ করা এই সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, “নয়তো যারা রুটি-রুজির লোভে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছেন তারা ফিরতে থাকবে এবং দল হিসেবে বিএনপিকে বিতর্কিত করতে থাকবে।”

সাবেক সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট সাহেদ আলম পুরো ব্যাপারটাতে ‘সম্মানসুলভ আচরণের ঘাটতি’ ছিল বলে মন্তব্য করেছেন।

“আমার মনে হয়েছে, সাংবাদিকদের সাথে বিশেষত জুনিয়র ভাই ব্রাদারদের সাথে সম্মানসুলভ আচরণের ঘাটতি ছিল যেটা আমার সাথে হলেও আমি প্রতিবাদ করতাম,” সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লিখেছেন তিনি।

ঘটনাস্থলে তিনি উপস্থিত ছিলেন জানিয়ে সাহেদ লিখেছেন,“তারেক রহমানের নিরাপত্তা্র শঙ্কা থেকেই নিরাপত্তা দল সামনের জায়গা পরিষ্কার রাখার জন্যে আয়োজকদের চাপ দিচ্ছিলেন। উনি সেটা হয়ত আরও ভালো ভাবে করতে পারতেন!”

সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এই ঘটনাকে নজিরবিহীন ও অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন।

আল-জাজিরাতে কাজ করা এই সাংবাদিক ফেইসবুক লাইভে বলেছেন, “আশা করছি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের চাটুকার বলয়মুক্ত রাখবেন এবং চাটুকারদের থেকে নিজেরা দূরে থাকবেন।”