আলাপ-এর এক বছর হলো।
ডিজিটাল গণমাধ্যম আলাপ-এর জন্ম হয়েছিলো একটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস থেকে, সেটা হলো ‘কথা চলুক’। মানে আমরা চাই সবাই তার কথাটা বলুক। আলাপ হবে সবার প্ল্যাটফর্ম।
আমরা চাই, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সব বিষয়ে আলাপ হোক। সবাই সবার মতটা প্রকাশ করুক নির্দ্বিধায়, নিসংকোচে।
এই ভাবনা থেকেই আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম। ভিন্নমত প্রকাশের জায়গা থাকা ও জায়গা রাখা সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে জরুরি। আমরা চাই প্রশ্ন করার সাহসও অটুট থাকুক।
অন্যদিকে, তথ্য জানার অধিকারও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। সেই অধিকার নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমরা প্রবলভাবে চাই মানুষের সেই অধিকার কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ না হোক।
গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। পাঠক-দর্শকের বিশ্বাস না থাকলে কোনো গণমাধ্যমই দীর্ঘ লড়াইয়ে টেকে না। টিকে থাকতে পারে না। পৃথিবীতে এমন কোনো উদাহরণ নেই।
ডিজিটাল গণমাধ্যমের জন্য বিশ্বাস ধরে রাখাটা আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং। কারণ, ডিজিটাল দুনিয়া অন্য একটি জগত। তাই আমরা শুরু থেকেই চেষ্টা করেছি, দেশীয় বা আন্তর্জাতিক তথ্যের সত্যতা, দায়িত্বশীলতা এবং সাংবাদিকতার নৈতিকতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে।
আমরা আলাপ-কে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দাঁড় করাতে চেষ্টা করছি যেখানে মানুষ প্রয়োজনীয় তথ্য পাবে, প্রশ্ন করতে শিখবে, চিন্তা করতে পারবে। সর্বোপরি নিজেদের শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু উদযাপনের নয় বরং নিজেদের দুর্বলতা অনুসন্ধানেরও সুযোগ। আমরা জানি, আরো অনেক পথ যেতে হবে। জনকল্যাণ, রাষ্ট্র ও সমাজের মঙ্গলের জন্য আরো ভালো সাংবাদিকতা করতে হবে। আরো গভীরভাবে মানুষের কথা তুলে আনতে হবে। দৃঢ়তার সাথে সত্য ও দায়িত্বশীলতার পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
আমরা এই ভাবনা ও প্রত্যাশার কাছেও যেতে পারিনি এখনো। আলাপ-এর যাত্রার শুরুতে সামনে কোনো পরীক্ষিত মডেল ছিলো না। তাই প্রথম দিন থেকে ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’-এর মধ্য দিয়েই চলছি আমরা। এ প্রক্রিয়া হয়তো আরো অনেকদিন চালিয়ে যেতে হবে। সময়ের সাথে সাথে আলাপ নিজেই একটি মডেল হিসেবে দাঁড়াবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
আলাপ-এর মতো বাংলাদেশও একটা ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’-বা ট্রানজিশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বছর দুয়েক আগে একটি গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। যার প্রভাব রাজনীতির ময়দান থেকে রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোর সর্বত্র দৃশ্যমান।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বৈশ্বিক বলয়েও স্পষ্ট ট্রান্সফর্মেশন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ছে পৃথিবীজুড়ে, যা থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। তাই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মতাদর্শিক- সবভাবেই বাংলাদেশের জন্য সময়টা ভীষণ কঠিন।
কীভাবে সংকটময় এই পথ আমরা পাড়ি দেবো তার ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের ভবিষ্যত। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ কি মুক্ত আর উদার গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে নিজের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখবে? নাকি রক্ষণশীলতা আর প্রতিক্রিয়াশীলতা দেশটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকাবে? সামনের দিনে এই প্রশ্নের ফয়সালা হবে। এ মুহুর্তে যার ট্রায়াল চলছে বলে অনেকেই মনে করেন।
ঠিক এখানেই প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আলাপ সব মতাদর্শের মানুষের জন্য সেতু হয়ে উঠতে চায়। সব মতের জন্য 'ব্রিদিং স্পেস' হতে চায়। একটি সমাজে নানা মতের, আদর্শের আর ভাবনার মানুষ থাকবে। আর এসব মিলেই দেশ।
আলাপ একটি ছোট মিডিয়া আউটলেট। কিন্তু চিন্তার জায়গায় আমরা নিজেদের ছোট ভাবি না। বরং আমরা বিশ্বাস করি, যদি সকল মতের মানুষের জন্য অভিন্ন একটি কথা বলার জায়গা তৈরি করতে পারি তবে দেশের ও গণতন্ত্রের জন্য সেটি হবে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
আমরা এ জায়গাটাতেই ফোকাস করতে চাই। দ্বিতীয় বছরে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য, বিশ্লেষণ, চিন্তা ও সংলাপের একটি শক্তিশালী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসাবে আলাপ-কে তুলে ধরা।
আমাদের সামনে প্রযুক্তিগত অপার সম্ভাবনা, নতুন পুরাতন প্রজন্মের বিপুল প্রত্যাশা আর ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তির এড়ানোর চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় আমাদের অঙ্গীকার স্পষ্ট।
স্বচ্ছতার সাথে সত্য,
তথ্যের সাথে প্রেক্ষাপট,
মতের সাথে যুক্তি,
আর সাংবাদিকতার সাথে দায়িত্ববোধ।
এই বিশেষ দিনে আমি আলাপ পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দিতে চাই, আমরা শিখবো, নিজেদের ভুল সংশোধন করব এবং প্রতিদিন আরও ভালো সাংবাদিকতার চেষ্টা করবো।
আমাদের কাছে আলাপ শুধু একটি নাম নয়, এটি একটি বিশ্বাস।
গত এক বছরে আলাপ-এর কর্মীরা নিরলস পরিশ্রম করেছেন ভালো কনটেন্ট ও সংবাদ তৈরিতে, তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
যারা আলাপ-এর সংবাদ পড়েছেন, দেখেছেন, সমালোচনা করেছেন, ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন, প্রশংসা করেছেন তাদের প্রতিও আমরা কৃতজ্ঞ।
আলাপ-এর প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।
আমাদের সঙ্গে থাকুন।
কথা চলুক।
ধন্যবাদ ও শুভকামনা।
লেখক এডিটর-ইন-চিফ ও প্রকাশক, আলাপ