সেদিনটার কথা মনে পড়লে এখনো একটু অবাক লাগে।
পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের গন্ধ তখন ঢাকার হাওয়ায়। শহরজুড়ে একটা উৎসবের আমেজ। আর ঠিক এই সময়টায় আমার কাছে খবর এলো, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন একটা ফুড ভ্লগ করতে চান। বাংলার খাবার খাবেন, বাংলার মানুষের সঙ্গে বসবেন, এই দেশের স্বাদ-সংস্কৃতিটা একটু গায়ে মেখে দেখবেন।
আর সেই ভ্লগটা হবে আমার সাথে।
আমি রায়হান। রায়হানিজম ট্র্যাভেল অ্যান্ড ফুড পেইজ চালাই। ঘুরি, খাই, ক্যামেরায় ধরে রাখি এই দেশের স্বাদ-গন্ধ। কাজটা করি ভালোবাসা থেকে। কিন্তু এই একটা দিন সত্যিই অন্যরকম ছিল।
ছুটির দিন, শহরের ব্যস্ত অলিগলি সেদিন কিছুটা ফাঁকা, তুলনামূলক নীরব। পহেলা বৈশাখ মানে বাঙালির প্রাণের একটা উদযাপন। আর সেই উদযাপনের ভেতরে ঢুকতে চেয়েছিলেন ক্রিস্টেনসেন সাহেব নিজেই। খাবারের টেবিলে বসে, মানুষের সাথে কথা বলে, এই দেশটাকে আরেকটু কাছ থেকে চেনার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। এটা নিছক একটা ফুড ভ্লগ ছিল না। এর পেছনে ছিল একটা সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের আকাঙ্ক্ষা।
সেটা টের পেলাম যখন দেখলাম, তিনি বেশ প্রস্তুতি নিয়েই এসেছেন।
পান্থপথে হাঁটতে হাঁটতে আমাকে রীতিমতো চমকে দিলেন। পথের ধারের চায়ের দোকানির দিকে ঘুরে ভাঙা ভাঙা বাংলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছেন?”
দোকানি প্রথমে হতবাক, তারপর মুখে এক চওড়া হাসি। ভাষা সবসময় পুরোটা বলতে পারে না, কিন্তু একটু চেষ্টা করলে মানুষ বোঝে। সেই মুহূর্তে বুঝলাম, আজকের দিনটা ভালোই জমবে।
এর পর পান্থপথের কুকার্স সেভেনের নতুন শাখা। ভেতরে ঢুকতেই একটা আরামের গন্ধ। রান্নাঘরের উষ্ণতা যেন মিশে আছে পুরো পরিবেশে।
জায়গাটা এত সুন্দরভাবে গুছিয়ে রেখেছেন কুকার্স সেভেনের মালিক মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন। মানুষটা অসম্ভব অমায়িক, কথা বলেন আপন মানুষের মতো করে। তার আতিথেয়তা দেখে মনে হয়, এই রেস্তোরাঁয় শুধু খাবার না, একটা অনুভূতি পরিবেশন করা হয়।
কেনো কুকার্স সেভেন! এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের আলোচনায় এলো ইলিশের কথা, কারণ কুকার্স সেভেনে ইলিশ খিচুড়ি পাওয়া যায় সারা বছর, সঙ্গে তাদের মেনুটা বৈচিত্র্যময়, সুপারহিট খিচুড়ি বাদেও আছে থাই, চাইনিজ প্ল্যাটার।
ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্র কারওয়ান বাজারে এই দোকানটা ১৯৯১ সাল থেকে চলছে, অনেকের প্রথম চাকরির টাকায় খাওয়া, প্রেম, বন্ধুত্ব ও আড্ডার নস্টালজিয়া এই কুকার্স সেভেন ঘিরে।
তবে সাধারণভাবে কুকার্স সেভেন মানেই ঢাকাবাসীর কাছে খিচুড়ি। সেই খিচুড়ির গল্পটাই ছিল আমাদের আয়োজনের মূলে।
আর সেই খিচুড়ির পাশে সাজানো ছিল রুই, চিংড়ি, রূপচাঁদা আর ইলিশ। চার পদের মাছ। সঙ্গে চিংড়ি ভর্তা, রুই মাছের ভর্তা আর চিকেন কাটলেট। টেবিলে খাবার সাজানো দেখে মনে মনে বললাম, আজকে অ্যাম্বাসেডর সাহেব পুরোদস্তুর বাঙালি হয়ে যাবেন। আমরা বলি না, মাছে-ভাতে বাঙালি? সেদিন থেকে মনে হচ্ছে, ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন হয়ে উঠেছেন একজন মাছে-ভাতে অ্যাম্বাসেডর।
কথা বলতে বলতে একটা ব্যাপার আগেই জেনেছিলাম। ঝাল খেতে ভালোবাসেন তিনি। বাঙালির ঝাল, মানে শুধু মরিচের আগুন না, মসলার গভীরতা, রান্নার একটা জটিল স্তর। সেই স্তরে তিনি বেশ আগ্রহ নিয়েই ঢুকলেন। ভর্তার ঝাঁজ মুখে নিয়ে একটু থামলেন, তারপর হাসলেন। সেই হাসিতে পরিতৃপ্তি ছিল, আর ছিল একটু বিস্ময়ও।
ইলিশ নিয়ে কথা না বললে বাঙালির খাবারের গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়। রাষ্ট্রদূত সাহেবও সেটা বুঝলেন। ইলিশের স্বাদ মুখে নিয়ে তিনি যে চোখ বন্ধ করলেন, সেই মুহূর্তটা ক্যামেরায় ধরতে পেরেছিলাম বলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয়েছে। তবে ইলিশের দাম নিয়ে আলোচনাটাও কম জমেনি। এই মাছটা যতটা সুস্বাদু, ততটাই যেন আজকাল নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের।
আলোচনা গড়াল বাঙালির রসনাবিলাসের দিকে। এই দেশের একেক জেলার রান্না একেক রকম। বরিশালের ইলিশ রান্না আর পদ্মাপাড়ের ইলিশ রান্নায় যে ফারাক, সেটা যে একবার টের পেয়েছে, সে কখনো ভোলে না।
ক্রিস্টেনসেন সাহেব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। জিজ্ঞেস করলেন বাঙালির রান্নার মূল বৈশিষ্ট্য কী। আমি বললাম, তিনটা জিনিস। মাছ রান্নার ধরন, মিষ্টির ব্যবহার আর মসলার সঙ্গে রান্নার সম্পর্ক। এই তিনটা জিনিস যে বোঝে, সে বাঙালির রান্নাঘরের ভেতরটা বোঝে।
তিনি মাথা নাড়লেন। বললেন, প্রতিটা খাবারেই আলাদা একটা গল্প আছে।
এর চেয়ে সুন্দর করে বাঙালির খাবারকে আর কীভাবে বলা যায়, আমি জানি না।
চিকেন কাটলেট যখন এলো, আমি একটু হাসলাম। পুরো বাঙালি পাতের মাঝে এই একটু ইউরোপীয় স্পর্শ। কিন্তু এটাই তো বাংলাদেশ। এখানে ইলিশের পাশে কাটলেট বেমানান না। এখানে সব মিলেমিশে একটা অদ্ভুত সুন্দর স্বাদ তৈরি হয়।
কাটলেটের প্রসঙ্গ থেকে উঠে এলো ট্রেনের কাটলেটের কথা, কমলা রকেট স্টিমারের কথা। মিস্টার অ্যাম্বাসেডর উৎসাহিত হয়ে বললেন, তিনিও একদিন স্টিমারে উঠতে চান। এই একটা কথায় বুঝলাম, মানুষটা সত্যিই এই দেশটাকে ভেতর থেকে চিনতে চান।
বিদায়ের আগে একটা কাজ বাকি ছিল।
এত বিশেষ একজন মানুষ বাংলার গল্প জানতে এসেছেন, তাকে কিছু একটা দেওয়া দরকার। অনেক ভেবে দিলাম একখানা লুঙ্গি। লুঙ্গি পেয়ে বেশ আহ্লাদিত হলেন তিনি, পেঁচিয়েও পরলেন। বিনিময়ে আমাকে দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর উদযাপনের কিছু স্মারক উপহার, সুন্দর একটা ব্যাগে করে। দুই দেশের দুজন মানুষ, উপহার বিনিময় করছেন একটা রেস্তোরাঁয়। দৃশ্যটা ছোট, কিন্তু এর ভেতরে একটা বড় কথা লুকিয়ে ছিল।
বিদায়ের সময় রেস্তোরাঁর স্টাফ থেকে শুরু করে মালিক, সবাইকে নিয়ে ছবি তুললেন অ্যাম্বাসেডর সাহেব। তার গল্পে, সারল্যে মুখরিত ছিল গোটা পরিবেশ। মনে হচ্ছিল, কূটনীতির আনুষ্ঠানিকতা সেদিন কিছুটা সরে গিয়েছিল, আর তার জায়গায় ছিল শুধু মানুষ। সাধারণ, উষ্ণ মানুষ।
ভ্লগটা শেষ হলো। কিন্তু মনে হলো, গল্পটা শেষ হয়নি।
এই ধরনের কাজ করতে গেলে অনেকের সহযোগিতা লাগে। আমেরিকান অ্যাম্বাসির কনটেন্ট টিমকে আলাদাভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারা না থাকলে এই দিনটা এভাবে সম্ভব হতো না। আর কামাল উদ্দিন ভাইকে তো ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নেই। তিনি শুধু খাবার দেননি, একটা পরিবেশ দিয়েছেন, যেখানে দুই দেশের দুই মানুষ এক পাতে বসে গল্প করতে পেরেছে।
শেষমেশ এটুকুই বলব, খাবার হলো সবচেয়ে সহজ ভাষা। রাষ্ট্রের সীমানা থাকে, পাসপোর্টের রং আলাদা হয়, কিন্তু ভালো খাবারের সামনে সবাই এক। সেই ভাষাটা অ্যাম্বাসেডরও বোঝেন, আমিও বুঝি। এই একটা বিকেল আমাকে মনে করিয়ে দিল, সংস্কৃতির সেতু তৈরি হয় অনেক সময় একটা খাবারের পাত থেকেও।