বাংলাদেশের বিচার বিভাগে মাসদার হোসেন অত্যন্ত পরিচিত নাম। মাসদার হোসেন ১৯৮৩ সালে মুনসেফ হিসেবে বিচার বিভাগে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সেই মাসদার হোসেন আবারও আলোচনায়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগসংক্রান্ত একটি দৈনিকের ১২ এপ্রিলের প্রতিবেদন বার কাউন্সিলের নজরে এসেছে বলে জানায় বার কাউন্সিল।
সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আইনজীবী মাসদার হোসেন তার মক্কেলের কাছ থেকে সোয়া এক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। উল্লিখিত সংবাদমতে, আইনজীবী মাসদার হোসেন বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন।
বার কাউন্সিলের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাময়িকভাবে তার সনদ স্থগিত করা হলো৷ তার সনদ কেন স্থায়ীভাবে বাতিল করা হবে না, সে বিষয়ে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মাসদার হোসেনের ‘আসল গল্প’
২০২৪ সালে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন তিনি।
তবে মাসদার হোসেনের ‘আসল গল্প’ শুরু ১৯৯৪ সালে। তখন বিচার বিভাগের কর্মপরিবেশ এবং বেতন কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছিল। সে সময়ের অবস্থা এমন ছিল যে, বিচার বিভাগের বিচারকরা প্রশাসনের অধীন থাকতেন, তাদের কোনো স্বাধীনতা ছিল না।
সে বছরই মাসদার হোসেন এবং তার সহকর্মীরা সরকার ও আইনমন্ত্রীর কাছে সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। তবে আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘‘সবকিছু আমাদের হাতে নেই”।
আইনমন্ত্রীর কথা শুনে মাসদার হোসেন এবং তার সহকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েন। এরপর তারা ঠিক করেন, এখন আর শুধু কথায় নয়, তারা আইনি পথে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবেন।
সে অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন মাসদার হোসেন ও সহকর্মীরা। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং বিচারকদের স্বতন্ত্রতার দাবি নিয়েই ছিল রিটটি।
সেখানে দাবি করা হয়, বিচার বিভাগকে প্রশাসন থেকে পৃথক করা জরুরি, কারণ বিচার বিভাগের সদস্যদের নিয়ে যে বেতন কাঠামো ও কাজের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই তাদের মর্যাদা অনুযায়ী নয়।
“এটা শুধু বেতন বা চাকরির বিষয় ছিল না” উল্লেখ করে এক সাক্ষাতকারে মাসদার হোসেন বলেন, “আমরা বিশ্বাস করতাম যে, বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের একটি স্বতন্ত্র অঙ্গ হওয়া উচিত। তবে তখন সেটা ছিল না। সবকিছু নিয়ন্ত্রণ হচ্ছিল প্রশাসন দ্বারা।”
তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি মাসদার হোসেনের জন্য সুবিধাজনক ছিল না। তবে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, একদিন বিচার বিভাগ স্বাধীন হবে।
তার নেতৃত্বে, বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের ৪৪১ জন বিচারক এক হয়ে সেই মামলাটি দায়ের করেন, যা পরবর্তীতে ‘‘মাসদার হোসেন মামলা’’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের মামলাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মামলায় বলা ছিল;
(১) জুডিসিয়াল সার্ভিসকে ১৯৮০সালের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস আদেশ এর অধীনে অন্তর্ভুকিকরণ সংবিধান বহির্ভূত।
(২) সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগের দ্বিতীয় অধ্যায়ে অধস্তন বিচার আদালত সম্পর্কিত বিধান আছে সেখানে সংবিধানের দ্বারাই অধস্তন আদালতগুলো পৃথক হয়েছে । শুধুমাত্র সংবিধান ১১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিধি প্রণয়ন করে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ কার্যকর করা সাংবিধানিকভাবে আবশ্যক।
(৩) অধস্তন আদালতের বিচারকরা বিচারক থাকাবস্থায় তারা কোন ট্রাইব্যুনালের অধীন হতে পারে না এবং এই ধরনের বিচার বিভাগীয় অফিসাররা প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত নন।
মাসদার হোসেন মামলার রায়
১৯৯৭ সালে হাইকোর্ট ওই মামলার রায় দেয়। ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ১২ দফা নির্দেশনা দেয়। সেই নির্দেশনাকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে বিবেচনা করা হয়।
মাসদার হোসেন মনে করেন, এই রায়ের অষ্টম দফাটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে বলা হয়েছিল যে বিচার বিভাগকে সংসদ ও নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত রাখা হবে।
রায়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ-সবকিছু সুপ্রিম কোর্ট দেখবেন।
বিষয়টির উপর ১৯৯৬ সালের ১৩ই জুন থেকে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ শুনানির পর হাইকোর্ট বিভাগ ১৯৯৭ সালের ৭ই মে রায় দেন । এই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার আপিল করে ।
হাইকোর্টের রায় নিরীক্ষণ আপিল বিভাগ ১৯৯৯ সালের ২রা ডিসেম্বর রায় প্রদান করে। রায়ে অন্যান্যের মধ্যে সরকারকে পাঁচটি নির্দেশনা প্রদান করা হয়;
১. সরকার অবিলম্বে সংবিধানের ১১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে বিঁধিমালা প্রণয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের সদস্য হিসাবে পরিচিত এবং সুপ্রিমকোর্ট এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের সমন্বয়ে জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
২. সংবিধানের ১৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে জুডিসিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের পোস্টিং, পদোন্নতি, ছুটি, শৃঙ্খলা, ছুটি ভাতা এবং সার্ভিসের অন্যান্য যেসব শর্ত থাকে সে সংক্রান্ত আইন বা বিধিমালা সংবিধানের ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ প্রণয়ন করতে হবে।
৩. সংবিধানের ১১৫ নং অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে জুডিশিয়াল পে কমিশন প্রতিষ্ঠা করতে হবে ।
৪. ১১৬ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে বিচারবিভাগীয় স্বাধীনতার শর্তাবলী যেমন, চাকরির মেয়াদের নিরাপত্তা, বেতন ও অন্যান্য সুবিধাদি এবং পেনশনের নিরাপত্তা পার্লামেন্ট ও নির্বাহী বিভাগ থেকে সাংবিধানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করে সংবিধানের ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে আইন বা বিধিমালা প্রনয়ন করার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে ।
(৫) সুপ্রিমকোর্টের ফান্ডে যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে তা থেকে খরচ করতে হলে সুপ্রিমকোর্টকে নির্বাহী সরকার হতে সে বিষয়ে কোন অনুমোদন নেয়ার আবশ্যকতা নেই ।
মামলার রায় বাস্তবায়ন
১৯৯৯ সালে মাসদার হোসেন মামলার রায় ঘোষণা হওয়ার পর তা ২০০০ সাল পর্যন্ত কার্যকর করা হয়নি। ২০০১ সালে সরকার তিনটি আইন ও বিধিমালা খসড়া তৈরি করলেও সেগুলিও বাস্তবায়িত হয়নি।
সুপ্রিমকোর্টের বার বার চাপের মুখে সরকার চারটি বিধিমালা তৈরি করে।
২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের কাঠামোগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে ‘দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিওর (অ্যামেন্ডমেন্ট) অর্ডিন্যান্স ২০০৭’ জারি করা হয়। এর ফলে ফৌজদারি আদালত ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করা হয়।
কী পরিবর্তন হলো
২০০৯ সালে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে ২০০৭ সালের অধ্যাদেশের আলোকে ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধনী) আইন, ২০০৯ পাশ করে। এর মাধ্যমে মাসদার হোসেন মামলার রায় কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে ধরা হয়। তবে আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোতে এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে নির্দেশনাগুলো এখনও কার্যকর করা হয়নি।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, গত বছর ৩১এ ডিসেম্বর পর্যন্ত অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪টি। তিনি জানান, বিশাল সংখ্যক মামলা দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সরকার বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
ফলে বিচার বিভাগ আলাদা হলেও মামলা নিষ্পত্তির সেই গতি আসছে না।
আদালতের রায়ের ২৬ বছর পর করা এক মন্তব্যে মাসদার হোসেন বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, জাপানসহ অন্যান্য দেশে বিচার বিভাগ বিচার বিভাগ কর্তৃক শাসিত হয়। বাংলাদেশেও বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ সংক্রান্ত মামলার রায়ের বেশ কিছু দফা বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে অষ্টম দফাটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
২০২৫ সালে দৈনিক প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে মাসদার হোসেন বলেছিলেন, “অধস্তন জুডিশিয়ারির কিছু কাজ প্রশাসন তথা আইন মন্ত্রণালয়ে নিয়ন্ত্রণে আগে যা ছিল, এখনো তাই রয়েছে। আমি বলব যে বিচার বিভাগ পৃথককরণের আসল কাজটাই হয়নি।”
মাসদার হোসেনের আক্ষেপ, এটা স্রেফ একটি পদক্ষেপ, কিন্তু বাস্তবতা তেমন হয়নি।
তিনি বলেন, “বিচার বিভাগ পৃথক করার কাজ আসলে হয়নি। এখনো প্রশাসনের প্রভাব বিচার বিভাগের ওপর রয়েছে। কিছু অদৃশ্য শক্তি আছে, যারা এই স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হতে দিচ্ছে না।”
মাসদার হোসেনের কথায়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু একটি আইনি বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের ভিত্তি।
মাসদার হোসেন বলেন, “এটা শুধু আইনি সমস্যা নয়, এটা একটি মানসিকতার সমস্যা। যে শক্তি এটি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তারা কখনোই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দেখতে চায় না।”