যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ফের সক্রিয় ‘মাদক বিজ্ঞানী’, অতপর গ্রেপ্তার

গত জানুয়ারিতে যখন তৌসিফের বাসায় অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, তার কয়েকদিন আগেই দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। তার বাসা থেকে ‘কুশ’ চাষের ল্যাবসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য উদ্ধার করলেও পার পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

এ বছরের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশে ফিরে আবারো একই কাজ শুরু করেন তৌসিফ। তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নজর ছিল। শেষমেষ আর রেহাই পেলেন না।

আলাপে সংবাদ প্রকাশ হওয়া আলোচিত সেই ‘মাদক বিজ্ঞানী’ তৌসিফ হাসানকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। পহেলা নভেম্বর রবিবার সকালে রাজধানী ঢাকার ওয়ারীর নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বসে অ্যাপের মাধ্যমে ঢাকার বাসায় প্রযুক্তিনির্ভর ‘কুশ’ চাষের ল্যাব নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। ঢাকায় ফিরে সেই কাজই চালিয়ে যাচ্ছিলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের এই নাগরিক।

রবিবারের অভিযানে তৌসিফের কাছ থেকে ১০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১০০ গ্রাম গাঁজা এবং ইয়াবা ও গাঁজা সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তার ডোপ টেস্ট করা তার শরীরে মেথামফিটামিন ও ক্যানাবিনয়েড (গাঁজা) দুই উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তৌসিফ ঢাকার বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ীর কাছে ইয়াবা ও কুশ সরবরাহের কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান।

আলাপ-কে মো. মেহেদী হাসান বলেন, “ক্যালিফোর্নিয়ায় বাস করা আমেরিকান নাগরিক তৌসিফ দেশে এসে নিজ বাসায় বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন করেছিলেন এবং বিদেশে থাকা অবস্থায়ও অ্যাপের মাধ্যমে সার্বিক প্রক্রিয়া তদারকি করতেন।”

তিনি আরও জানান, গ্রেপ্তারকৃত তৌসিফের বিরুদ্ধে উদ্ধারকৃত ইয়াবা ও গাঁজা নিজ হেফাজতে সংরক্ষণের অভিযোগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী ওয়ারী থানায় নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর পাশাপাশি আগের আলোচিত ‘কুশ ল্যাব’ মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো এবং রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া চলছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে ইয়াবা পাচারের ঘটনা নজরে আসে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের। এর সূত্র ধরে তৌসিফের বাসায় অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ।

ওই অভিযানে তৌসিফের ওয়ারীর ঘরের ভেতর অপ্রচলিত মাদক ‘কুশ’ চাষের জন্য বিশেষভাবে তৈরি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এক ল্যাবের সন্ধান মেলে।

উদ্ধার করা হয় ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আনা কুশের বীজ, চাষ করা কুশ গাছ, সদ্য সংগ্রহ করা কুশ, চাষের বিভিন্ন উপকরণ, সিসা সেবনের সরঞ্জাম ও বিদেশি মদ। একইসঙ্গে বাসার ছাদে টিন ও ফয়েল পেপার দিয়ে তৈরি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত বিশেষ কক্ষে একাধিক টবে কুশ চাষের প্রমাণ মেলে।

ওই সময় বাসার তত্ত্বাবধায়ককে গ্রেপ্তার করা হলেও মার্কিন নাগরিক তৌসিফ ধরা পড়েননি। তার বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

তৌসিফ ছিলেন মেধাবী ছাত্র ও সচ্ছল পরিবারের সন্তান। বাবা মারা যাওয়ার পর দাদা-দাদির কাছেই বেড়ে ওঠেন। ‘ও’ লেভেল শেষ করে তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকার সময় কুশ চাষের কৌশল রপ্ত করেন বাইশ বছর বয়সি এই তরুণ।

যুক্তরাষ্ট্রে বিনোদনমূলক ব্যবহারের জন্য ক্যালিফোর্নিয়াসহ প্রায় ২৪টি অঙ্গরাজ্যে ‘কুশ’ কেনাবেচা আইনি বৈধতা পেলেও বাংলাদেশে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তৌসিফ মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার পর বছরে অন্তত একবার দেশে আসতেন। দেশে ফিরেই নিজ বাসায় অত্যাধুনিক ল্যাব বানিয়ে উচ্চ মাত্রার এই ক্যানাবিস উৎপাদন ও সরবরাহ শুরু করেন তিনি।

জানা গেছে গত অগাস্টে দেশে ফেরেন তিনি। এসে একই কাজ শুরু করেন। তাকে দীর্ঘদিন ধরেই নজরে রেখেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার পর রবিবার তার বাসায় অভিযান চালানো হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান আলাপ-কে জানান, মাদক সরবরাহের আন্তর্জাতিক রুট উন্মোচনে তৌসিফকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।