হত্যা করা হয়েছে তাহসিফ সাউরিকে, প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত পুলিশ

সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরিকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। এই হত্যাকাণ্ডে তাহসিফের জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ জড়িত বলেও প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে তারা। 

শনিবার আদালতে দীপকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ‘ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার’ কারণে তাহসিফকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।   

হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারদিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দীপের সাথেই ঢাকার উত্তরার বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। এরপর থেকে নিখোঁজ ছিলেন বিমান বাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তা।

গভীর রাতেও বাসায় না ফেরায় উদ্বিগ্ন মা কয়েকবার ফোন করেছিলেন তাহসিফকে। কিন্তু তাকে পাচ্ছিলেন না। 

রাত দেড়টার দিকে মায়ের কাছে একটি ভয়েস মেসেজ আসে, যেখানে তাহসিফ বলেছিলেন ‘রওনা দিয়েছি, আসছি’।

কিন্তু রাত গড়িয়ে ভোর হয়, ছেলে বাসায় না ফেরায় দুপুরে তুরাগ থানায় গিয়ে খোঁজ করেন তাহসিফের বাবা। বিকেলেই উত্তরখান থেকে পুলিশ তাকে ফোন করে জানায়, তাহসিফের মরদেহ পাওয়া গেছে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায়। 

বিমান বাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই ব্যাপক আলোচনার শুরু হয় দেশে-বিদেশে। নানা অ্যাঙ্গেল থেকে ঘটনার বর্ণনা ও কারণ খুঁজছেন নেটিজেনরা।  

বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ছায়া তদন্তের অংশ হিসাবে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল তাকে। 

বৃহস্পতিবার রাতেই দীপকে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় পিবিআই। ওই অভিযানে টঙ্গীর মাজার বস্তি থেকে উদ্ধার করা হয় তাহসিফের ব্যবহার করা মোটরসাইকেল। ওই এলাকাটি মাদকের স্পট হিসাবে পরিচিত। 

শুক্রবার দীপকে সাথে নিয়ে উত্তরা, রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা, টঙ্গীর হোন্ডা রোড এবং হাজী মাজার বস্তি সংলগ্ন ইজতেমার মাঠ পরিদর্শন করে পিবিআইয়ের তদন্ত দল। পরে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় দীপকে।

তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের দু’দিন পর শুক্রবার দিবাগত রাতে উত্তরখান থানায় মামলা করেন তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। মামলায় সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে আসামি করা হয়নি।

মামলার তদন্ত এবং রিমান্ডে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে নৌ পুলিশ।

মরদেহ উদ্ধারের দু’দিন পর মামলা

উত্তরখান থানায় দায়ের করা হত্যা মামলার এজাহারে এনায়েতুল করিম উল্লেখ করেন, “২৭এ অক্টোবর আমার ছেলে কে এম তাহসিফ সাউরি আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টার পর দীপ নামে তার এক জুনিয়রের ডাকে বাসা থেকে বাইরে যায়। রাত বেশি হলেও ছেলে ফিরে না আসায় তার মা বারবার ফোনে যোগাযোগ করলে সে জানায়, কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরবে। পরে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তার ফোন থেকে মায়ের ফোনে ভয়েজ মেসেজ পাঠায়, ‘রওনা দিয়েছি, আসছি’। কিন্তু রাত পেরিয়ে পরের দিন বিকেল হলেও সে ফিরে আসেনি।” 

‎এজাহারে তিনি লিখেছেন, “২৮এ অক্টোবর বিকেল আনুমানিক ৫টা ২০ মিনিটে উত্তরখান থেকে নৌ পুলিশ ফোনের মাধ্যমে আমাকে জানায়, রাজাবাড়ি ঘাট উত্তরখান এলাকাতে তুরাগ নদ থেকে আমার সন্তানের মরদের উদ্ধার হয়েছে। এরপর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক কার্যক্রম শেষে ২৯এ অক্টোবর দুপুরে নৌ পুলিশ আমার কাছে আমার সন্তানের মরদেহ হস্তান্তর করে। প্রয়োজনীয় ধর্মীয় রীতি সম্পন্ন করে ২৯এ অক্টোবর বিকেলে তাহসিফের মরদেহ উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়।”

তাহসিফের মরদেহ পাওয়ার পর থেকেই এনায়েতুল করিম বলে আসছিলেন, তার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। 

শনিবার বেলা সোয়া ২টার দিকে দীপকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাইলে, শুনানি শেষে ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক।

চার দিনের রিমান্ডে দীপ

শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালতে তাহসিফের জুনিয়র বন্ধু দীপকে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন।

আবেদনে বলা হয়, “প্রাথমিক তদন্তে তাহসিফ হত্যাকাণ্ডে দীপের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।”

রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়, “মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাহসিফকে ডেকে নিয়ে বাইরে যান দীপ। বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে, উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশ ভাসছে। পরে সুরতহাল তৈরির সময় নিহতের ট্রাউজারের পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়, তিনি বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরি।”

আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, “তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও সোর্সের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীপ তাহসিফকে নিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে দীপ জানান, তাহসিফ তার সিনিয়র বড় ভাই। প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।”

রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, “মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে কারাগারে রাখা প্রয়োজন। জামিনে মুক্তি পেলে তিনি পলাতক হয়ে তদন্তে বিঘ্ন ঘটাতে পারেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং মোটরসাইকেলসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধারে তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।”

শনিবার বেলা সোয়া ২টার দিকে দীপকে আদালতে হাজির করে ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। পরে তোলা হয় এজলাসে। 

আদালত শুনানি শেষে ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

শুক্রবার পিবিআই ঢাকা উত্তরের হেফাজত থেকে দীপকে নিজেদের হেফাজতে নেয় নৌ পুলিশ। পরে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর সাত দিনের রিমান্ড আবেদনসহ আদালতে পাঠানো হয়।

'হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও করে ছড়িয়ে দেওয়ার কারণেই খুন'

রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল হক দিদার বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ‘ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার’ কারণে তাহসিফকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

তিনি বলেন, “ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও করেছিলেন তাহসিফ সাউরি। পরবর্তীতে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছাড়া হয়। এ কারণে ভিকটিমকে খুন করা হতে পারে। সে তথ্য উদঘাটনের জন্য, এ ঘটনার সাথে আর কারা জড়িত তা জানান জন্য আসামির রিমান্ড প্রয়োজন।”

শুনানির পর রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী গণমাধ্যমকে বলেন, দীপের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন, অপরাধের আলামত নষ্ট করা বা অপরাধীকে শাস্তি থেকে বাঁচানো ও যৌথ দায়বদ্ধতা অভিযোগ আনা হয়েছে দণ্ডবিধির ২০৩, ২০১ ও ৩৪ ধারায়।

তিনি বলেন, “যিনি হত্যা হয়েছেন, ভিকটিম হয়েছেন, গত স্বৈরাচার হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার সময় যে ভিডিওটা আপনারা দেখেছেন…পলাতক শেখ হাসিনা পালিয়ে যাচ্ছেন, এই যে ভিডিওটা হয়েছে, উনি এই ভিডিওটা করেছিলেন এবং মিডিয়াতে দিয়েছিলেন। যার দরুন চব্বিশে এ আন্দোলন সফল হয়েছিল, এ কারণে হয়তো, আজকের এই ভিকটিমকে মারার পরিকল্পনা হয়েছে এবং মৃত্যুবরণ করেছেন।”

যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ

তাহসিফের মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে বেশ কয়েকটি প্রশ্নের জবাব খুঁজছে তদন্তকারীরা। 

কেন তিনি গিয়েছিলেন রাজাবাড়ি ঘাটে, টঙ্গীর মাজার বস্তি, ইজতেমার মাঠ এলাকায়? কেনইবা তার সঙ্গী হয়েছিলেন দীপ? দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাকে ও তাহসিফকে ধাওয়া দিয়েছিল পুলিশের পোশাক পরা কারা? দীপ কীভাবে পালিয়ে গেলেন আর কেনইবা নদীতে ঝাঁপ দিলেন তাহসিফ? 

পুলিশ মনে করছে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাহসিফের মৃত্যুরহস্য।

পুলিশ বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী উত্তরার রেস্টুরেন্ট, বার, মোটরসাইকেলের ওয়ার্কশপসহ আরো যেসব জায়গায় গেছেন তাহসিফ, সেসব জায়গার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। দীপের দেওয়া তথ্যের সাথে পুলিশের পাওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। 

‘আসল সত্য’ উদঘাটন চায় রাওয়া

তাহসিফ সাউরির লাশ উদ্ধারের ঘটনায় ‘আসল সত্য’ উদঘাটনের আহ্বান জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তাদের কল্যাণ সংস্থা (রাওয়া)।

শনিবার উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের 'করবী' ভবনের তৃতীয় তলায় তাহসিফের বাসায় তার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রাওয়ার নেতৃবৃন্দ।

দুপুরে সেখান থেকে বেরিয়ে রাওয়ার যুগ্ম সম্পাদক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবু নওরোজ খুরশিদ আলম বলেন, “পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি, এ ঘটনায় করণীয়ের বিষয়ে তাদের কোন সহায়তা লাগবে কি-না জানতে চেয়েছেন তারা।”

অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর অফিসারদের কাছে তাহসিফের মৃত্যুকে ‘কষ্টকর’ মন্তব্য করে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, “আমরা আশা করছি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খুব তাড়াতাড়ি আসল সত্য উদঘাটন করবে।”

আরেক সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) আল আমিন বলেন, “এ ঘটনাকে আমরা ছেড়ে দেব না। আমরা দেখব কীভাবে বিচার হয় এবং ‘ফ্যাক্ট’ উদঘাটন হয়।”