‘যৌন হয়রানির’ জন্য মাদ্রাসা শিক্ষককে চড়: যে প্রশ্ন সামনে আনছে 

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের সোশাল মিডিয়াতে একটি চড়ের ভিডিও কয়েক মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। চড় খেয়েছেন এক মাদ্রাসা শিক্ষক, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ একটি মেয়ে শিশুকে যৌন হয়রানির। শিশুটির পরিবারের করা মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষককে সেদিন রাতেই গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো  হয়েছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গাজীপুরের টঙ্গীতে ‘ক্বরীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা’র উপাধ্যক্ষ মুসলেউদ্দিনের বিরুদ্ধে ৭ বছরের শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে।

শিশুটির পরিবার গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার। কাউকে বললে মারধর করা হবে বলেও শিশুটিকে হুমকি দেওয়া হয়। আতঙ্কিত হয়ে সে মাদ্রাসায় যায়নি। কারণ খুঁজতে গিয়ে পরিবারে সদস্যরা জানতে পারেন ঘটনাটি।

বুধবার দুপুরে শিশুটির বাবা মাদ্রাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের কাছে জবাব চান। খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে শিক্ষককে মারধর করেন।

শুক্রবার দ্য ডেইলি স্টারকে টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফ হোসেন জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে যৌন হয়রানির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। শিশুটির বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। বৃহস্পতিবার অভিযুক্তকে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

তবে ঘটনার পর মাদ্রাসার পক্ষ থেকেও পাল্টা অভিযোগ তোলা হয়েছে। 

মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা এবং অধ্যক্ষ বারীজুল আলমগীর হোসেনের দাবি, এক অভিভাবকের নেতৃত্বে ১৫ জনের একটি দল মাদ্রাসায় ঢুকে হামলা, ভাঙচুর, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মারধর, শ্লীলতাহানি এবং প্রায় ১৭ লাখ টাকা লুট করেছে। তবে টাকা লুটের অভিযোগের সত্যতা পুলিশ বা নিরপেক্ষ কোনো সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে একটি পক্ষ একে “মাদ্রাসায় সন্ত্রাসী হামলা” হিসেবে প্রচার করছে। তাদের দাবি, এর উদ্দেশ্য মূল ঘটনাকে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়া।

সোশাল মিডিয়াতে উচ্ছ্বাস, উদ্বেগ, সতর্কতা  

চড় মারার এই ভাইরাল ভিডিওতে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া এসেছে তিন রকমের। অনেকেই চড় মারার দৃশ্য দেখে উচ্ছ্বসিত। তারা বলছেন, এমন সামাজিক প্রতিরোধ এলে নিপীড়করা আতঙ্কে থাকবে।

গণমাধ্যমকর্মী আরিফুজ্জামান তুহিন ভিডিওটি ফেইসবুকে শেয়ার দিয়ে ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, “টঙ্গিতে এক মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের পর হাল্কা হাদিয়া। তবে দেশবাসী হাল্কা থেকে ভারি হাদিয়া দিক। বাবা মায়ের বেহেশতে যাবার শখ মন্দ না থাকতেই পারে। তবে নিজেরা আমল করুন, দান খয়রাত করুন। নিজে বেহেশতে যাবার জন্য আপনার বাচ্চাকে দোযকে [দোযখে] পাঠিয়ে ছেলেটির জীবন নস্ট [নষ্ট] করার মানে নেই।” 

অভিযুক্ত শিক্ষকের মুখোমুখি অভিভাবক

সাংবাদিক নাজনীন মুন্নী যিনি চড় মেরেছেন তাকে অভিহিত করেছেন “নায়ক” হিসাবে।

“অনেকদিন, অনেকবছর, অনেক যুগ পর একজন সত‍্যি[কারের] নায়ক দেখলাম। একজন পুরুষ হয়ে অন‍্য এক পুরুষ(?!!) এর প্রতি যে রাগ, ঘৃনা [ঘৃণা] ঠিকরে বেরুচ্ছে তার চোখে মুখে। আমরা তা বছরের পর বছর ধারন [ধারণ] করে এমন একটা দাঁত ফেলে দেয়া চড় দিতে পারি নাই। আমাদের কোটি মা_মেয়ে _বোনের পক্ষ থেকে তোমাকে শত কোটি সালাম ভাই। তোমার মতো হাজার পুরুষ জন্মাক এই দেশের ঘরে ঘরে,” ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন তিনি।

আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে আঘাত করা নিয়েও আপত্তি করেছেন অনেকে। 

ফেইসবুক ব্যবহারকারী মুজাহিদুল হক প্রশ্ন তুলেছেন, “...এভাবে একজন হুজুরকে পেটাতে পারে কিনা? এটা কি মবের মধ্যে পড়ে না? হুজুররা কোনো অপরাধ করলে সবাই মারার জন্য তেড়ে আসে। মানে দেশে অপরাধ শুধু হুজুররাই করে।”  

তার অভিযোগ, যিনি চড় মেরেছেন তাকে গণমাধ্যম “হুজুর পেটানোর কারণে বীর হিসেবে প্রচার করছে।” 

মুজাহিদুল আশঙ্কা করেছেন, এভাবে চললে একসময় সামান্য কারণেও মানুষ হুজুরদের গায়ে হাত তুলতে দ্বিধা করবে না। “এখানে হুজুরদের দোষ অবশ্য আছে। এখন সমাজে মুটামুটি [মোটামুটি] এমন একটা বয়ান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে কওমি হুজুর মানেই হয়ত বলাৎকার নাহয় ছাত্রী ধর্ষণকারী,” ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন তিনি।

শিশু নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষকদের মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষগুলো নিজ উদ্যোগে পুলিশের হাতে তুলে না দিলে ভবিষ্যতে “মব করে” পিটিয়ে মেরে ফেলার মতো ঘটনা বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন লেখক ও গবেষক মীর হুযাইফা আল মামদূহ।

“…মবের সমস্যা হইল, মব দোষী-নির্দোষ দেখে না। বরং ঝোঁকের উপর যা হওয়ার হয়ে যায়। আর মব ঘটা শুরু হইলে নির্দোষ হুজুররাই বেশি আক্রান্ত হবে। একজনের উপর অন্যের রাগ-ক্ষোভ এসব মব দিয়ে মেটাতে চাইবে,” ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন তিনি।

মাদ্রাসায় নির্যাতনের ব্যাপকতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা এবং এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান জানাতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মামদূহ লিখেছেন, “নিজেরাই প্রত্যেকটা দোষীরে ধরে মামলা দিয়ে থানায় দিয়ে আসেন।” 

এ বিষয়ে সরকারের সহায়তা নেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি। তা না হলে সামনে আরও খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন এই গবেষক ও লেখক।

টঙ্গীর ঘটনা একটি উদাহরণ মাত্র

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে এই বছরের প্রথম ছয় মাসে ঘটা ৩১৯টি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে ১৬৮ জনই ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু, যেই সংখ্যাটি ২০২৫ সালের ১২ মাসে ছিল ৩৭০ জন।

এই সংখ্যা সব ধরনের ঘটনার, কেবল মাদ্রাসার নয়। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আলাদা হিসাব না থাকায় মাদ্রাসার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানও নেই। 

তবে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটে মাদ্রাসাগুলোতে।

“আমরা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আলাদা হিসাব রাখি না৷ ফলে মাদ্রাসার আলাদা কোনো হিসাব নেই৷ তবে আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অধিকাংশই হচ্ছে মাদ্রাসায়৷”

“অন্য মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে হয় না, তা নয়৷ কিন্তু মাদ্রাসায় বেশি হয়৷ আর মাদ্রাসায় ছেলে শিক্ষার্থীদের ধর্ষণ বা বলাৎকার উদ্বেগজনক হারে দেখতে পাচ্ছি,’’ ডয়েচে ভেলে-কে অগাস্ট মাসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন আসক-এর সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর আবু আহমেদ ফয়জুল কবির। 

আসক-এর পর্যবেক্ষণে যে প্রবণতাগুলো দেখা যাচ্ছে, তা হলো, ভুক্তভোগীরা প্রায় সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক; অভিযোগ মূলত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে; ছেলে ও মেয়ে, দুই ধরনের শিক্ষার্থীই শিকার হচ্ছে; কেউ কেউ নির্যাতিত হচ্ছেন দীর্ঘ সময় ধরে এবং বেশিরভাগ সময়ই ভয় দেখিয়ে অথবা ধর্মের দোহাই দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়।      

‘‘আসলে মাদ্রাসাগুলোতে কোনো মনিটরিং নেই, তাই এই অবস্থা। মাদ্রাসাগুলোর বড় একটি অংশ আবাসিক। অভিভাবকরাও তেমন খোঁজ খবর রাখেন না। আর সেখানে ধর্মের নামে ভয়ও দেখানো হয়। ভয় দেখিয়ে যৌন হয়রানি করা হয়। আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি পবিত্র কোরান হাতে দিয়েও ঘটনা গোপন রাখার শপথ করানো হয়েছে,’’ আসক-এর ফয়জুল কবির বলেন।

টঙ্গীর সেই শিশুটির পরিবারও অভিযোগ করেছে, মুখ খুললে মারধরের হুমকি দেওয়া হয়েছিল আর সেই ভয়ে সে তিন দিন মাদ্রাসায় যায়নি। শিশুটি শেষপর্যন্ত বলতে পেরেছে আর তার পরিবারও আইনের আশ্রয় নিয়েছে। 

কিন্তু যেসব শিশু মুখ খোলে না তাদের কথা কেউ জানতে পারে না। যেখানে নজরদারি নেই, যেখানে ভয়ই নীরবতার পাহারাদার, সেখানে অপরাধ ধরে পড়ে কদাচিৎ আর ধরা পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়ে জনতা। মবের বিচার ঠেকাতে তাই জনতাকে দোষারোপ নয়, বরং এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে শিশুরা নির্ভয়ে মুখ খুলতে পারে এবং অভিযোগ জমে উঠার আগেই আদালত পর্যন্ত পৌঁছায়।