কড়া পাহারা ও সিসিটিভি ক্যামেরা এড়িয়ে লালন আখড়ায় কে রেখে গেল ‘টাইম বোমা’

ফকির লালন শাহের আখড়াবাড়ি পর্যবেক্ষণে ছিল দেড়শ ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন ক্যামেরা (সিসিটিভি)। ছিল পর্যাপ্ত ওয়াচ টাওয়ারের ব্যবস্থা এবং পুলিশ, এসআরবি, সাদা পোশাকের গোয়েন্দাদের টহল আর নজরদারিও। 

তারপরও কে, কখন, কীভাবে ‘টাইম বোমা’ রেখে গেল সেই রহস্য উন্মোচন হয়নি। তবে সন্দেহের তীর নব্য জেএমবি নেতা নাজমুল হাসান মামুন ওরফে বোমারু মামুনের দিকে। 

এর আগে একাধিক জায়গায় উদ্ধার হওয়া ইম্প্রোভাইস এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) পর্যালোচনার পর এমনটাই ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের তিনদিনের অনুষ্ঠান শুরু হয় শনিবার থেকে। ওইদিন বিকেলে উৎসবের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। 

অত্যন্ত উৎসবমুখর ও জমজমাট হয়ে ওঠে লালন উৎসব। দূর-দূরান্ত থেকে ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়ায় জড়ো হন বাউল, ফকির, সাধু ও দর্শনার্থীরা। হাজার হাজার মানুষের উপচে পড়া ভিড়ে মুখরিত হয়ে ওঠে আখড়াবাড়ির ভেতর ও বাইরের প্রাঙ্গণ। 

অনুষ্ঠান যখন জমজমাট, তখন রবিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে আখড়াবাড়ির ভেতরে একটি ব্যাগে বোমা থাকার খবর পেয়ে দ্রুত এলাকাটি ঘিরে ফেলে পুলিশ।

ছেঁউরিয়ার বোমা নিয়ে পুলিশ যা ভাবছে

উৎসবের দ্বিতীয় দিন রবিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে আখড়াবাড়ির প্রধান প্রবেশদ্বারের কাছে পানির ট্যাংক ও পুলিশ বক্স সংলগ্ন এলাকায় একটি পলিব্যাগ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় এক চায়ের দোকানদার। 

কৌতূহলবশত ব্যাগটি খুলে তিনি দেখতে পান, ভেতরে রয়েছে কালো স্কচটেপ জড়ানো বোমাসদৃশ একটি বস্তু, বৈদ্যুতিক সার্কিট এবং দুটি প্লাস্টিকের বোতলে প্রায় দুই লিটার পেট্রল। 

দোকানদার তাৎক্ষণিকভাবে খবর দেন মেলা আয়োজক কমিটি এবং পুলিশ কন্ট্রোল রুমে। দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। 

পুরো এলাকাটি কর্ডন করে হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় মাজারের প্রধান ফটক। নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয় আখড়াপ্রাঙ্গণে থাকা মানুষদের। 

পরে জানা যায়, বোমাটি ছিল একটা ‘টাইম ইনিশিয়েটেড বোম্ব’। বোমের সাথে একটা টাইমার ও ব্যাটারি ছিল।

ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় দুটি ছোট বোতলে ভরা পেট্রোল, আধা ইঞ্চি চওড়া ও চার ইঞ্চি লম্বা দুটি ধাতব ক্যানিস্টার এবং বিদ্যুতের তার যুক্ত একটি ডিভাইস। 

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার বিষয়টি জানান ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এবং সহায়তা চাওয়া হয় ঢাকার থেকে বিশেষায়িত বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের। 

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল পৌঁছে যায় কুষ্টিয়ায়। 

বিশেষজ্ঞ দলটি উদ্ধার হওয়া বস্তুটিকে শনাক্ত করে 'টাইম বোমা' বা আইইডি হিসাবে। প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রটোকল মেনে সোমবার ডিভাইসটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। 

“বোমাটি বিস্ফোরিত হলে আগুন ছড়িয়ে পড়তো। কারণ, সেখানে ছিল পেট্রল,” আলাপ-কে বলেছেন কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ।

কুষ্টিয়ার সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদি হাসান রিফাত জানিয়েছেন, আখড়াবাড়ির অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে ১৫০টা সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছিল। আরো ছিল ‘ওয়াচ টাওয়ার’।

ওই ঘটনায় কুমরাখালী থানায় দায়ের করা হয়েছে মামলা। এজাহারে লেখা হয়েছে, টাইম বোমাটি মেহেরপুরের ঐতিহ্যবাহী গিয়াস মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের পলিব্যাগে বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। 

তবে এজাহারে উল্লেখ করা হয়নি বহনকারীর কোনো পরিচয়। সংখ্যায় তারা কতজন ছিল সে বিষয়েও তথ্য নেই সেখানে। 

মামলায় বলা হয়েছে, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত করতে বোমাটি রাখা হয় আখড়াবাড়িতে। 

সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, ২৪এ জুলাই ঢাকার মতিঝিলে মেট্রো স্টেশনের কাছে একটি ছাতার ভেতর থেকে আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) উদ্ধার হয়। আখড়াবাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া ‘টাইম বোমা’টিতেও প্রায় একইরকম প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।

সিটিটিসির স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের (এসএজি) এক কর্মকর্তা জানান, “আখড়াবাড়ির প্রবেশপথে ডিভাইসটি রাখার পেছনে কারা রয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। নব্য জেএমবি নেতা নাজমুল হাসান মামুন ওরফে বোমারু মামুন এ বিষয়ে অভিজ্ঞ। ঢাকা ও আশপাশের কয়েকটি ঘটনায় নাম আসার কারণে মফস্বলে ঘাঁটি করতে পারে মামুন ও তার সহযোগীরা।” 

বাংলাদেশের জঙ্গি নেটওয়ার্কের অন্যতম আলোচিত নাম নাজমুল হাসান মামুন, যিনি পরিচিত ‘বোমারু মামুন’ নামে। তিনি প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন দেশের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ বোমা-প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে, যাদের একজন ছিলেন ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী। 

'মাদার অব সেইটান' নামে পরিচিত ট্রাইঅ্যাসিটোন ট্রাইপারঅক্সাইড (টিএটিপি) বিস্ফোরক দিয়ে বোমা তৈরিতে পারদর্শী তিনি। 

নব্য জেমবি’র তখনকার শীর্ষ নেতা হিসাবে ২০১৭ সালের ৩১এ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো মামুনকে। তার বিরুদ্ধে মামলা চলছিল। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কারাগারে থাকা মামুন ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের পর জামিনে বের হয়ে আসেন। 

গত ৫ই জানুয়ারি সাক্ষী ও প্রমাণের অভাব দেখিয়ে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামুনসহ ১১ আসামির সবাইকে বেকসুর খালাস দেন। তবে তার আগেই জামিনে মুক্ত হওয়ার পর ফের নতুন করে তার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 

 যে দশ ঘটনার সাথে আখড়াবাড়ির মিল দেখছে পুলিশ

গত বছরের ২৬এ ডিসেম্বর দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের হাসনাবাদ হাউজিংয়ে উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় আইইডি তৈরির সময় বিস্ফোরণ হয়। পরে সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করে পুলিশ। 

সেসবের মধ্যে ছিল হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, এসিটোন, নাইট্রিক অ্যাসিড এবং প্রায় ৪০০ লিটার তরল রাসায়নিক দ্রব্য। এ ছাড়া কালো প্লাস্টিকে মোড়ানো নয়টি তাজা বোমাও উদ্ধার করা হয়।

এই বছরের ১০ই জানুয়ারি সকালে ফরিদপুরের আলীমুজ্জামান ব্রিজের দক্ষিণ অংশে একটি ব্যাগের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় রিমোট নিয়ন্ত্রিত শক্তিশালী ইম্প্রোভাইস এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি)। 

তার পরদিন, ১১ই জানুয়ারি সকাল ১০টার দিকে কুমার নদের পাড়ে এন্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা আইইডিটি নিষ্ক্রিয় করেন। এ সময় বিস্ফোরণস্থলের আশেপাশের এলাকা কেঁপে উঠে। প্রায় ৪০ ফুট উচ্চতায় উঠে যায় আইইডির স্প্লিন্টার।

২১এ ফেব্রুয়ারি ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী পকেট গেটে তল্লাশি চৌকিতে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে আহত হন কনস্টেবল মো. শাহ আলম। পালানোর সময় তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। পরে ফেলে যাওয়া ব্যাগ থেকে হাতবোমা উদ্ধার করা হয়। সেই বোমার সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে কেরানীগঞ্জে উদ্ধার করা বোমার।

৭ই মার্চ কুমিল্লার দক্ষিণ ঠাকুরপাড়ায় বাগানবাড়ি কালী গাছতলা শিবমন্দির এবং ব্র্যাক অফিসের সামনে হাতবোমার বিস্ফোরণে কয়েকজন আহত হন। 

২৫এ মার্চ বিস্ফোরণ ঘটে ঢাকার সায়েদাবাদের জনপথ মোড়ে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন এক ব্যক্তি মেরুন রঙের একটি ব্যাগ ফেলে পালিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আরেক ব্যক্তি ব্যাগ থেকে পাইপবোমাসদৃশ বস্তু বের করে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালায়। 

পরে ব্যাগ থেকে দুটি বোমা উদ্ধার করে নিষ্ক্রিয় করা হয়। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে পলাতক দুজনসহ আরও চারজনকে দেখা যায়। তাদের সবার সঙ্গে ব্যাগ ছিল এবং তারা একই দলের সদস্য বলে ধারণা করছে পুলিশ।

২২এ জুন ঢাকার উত্তরার দক্ষিণখানে একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের ওপর বোমা হামলা করে দুর্বৃত্তরা।

২৪এ জুলাই ঢাকার মতিঝিলে মেট্রো স্টেশনের কাছে একটি ছাতার ভেতর থেকে আইইডি উদ্ধার হয়। পরে সেটি নিষ্ক্রিয় করে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোমা উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয়কারী দল।

৩০এ জুলাই ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদিদোকানে ফেলে যাওয়া ভ্রমণব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় প্রেশার কুকারের ভেতরে তৈরি একটি আইইডি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল নিষ্ক্রিয় করে।

১১ই অগাস্ট সাভারের হেমায়েতপুর থেকে নব্য জেএমবির সদস্য মোহাম্মদ আরিফকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই রাতেই সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি তিনতলা ভবনের কক্ষে অভিযান চালায় সিটিটিসি ও সাভার থানা-পুলিশ।

আরিফকে গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে একটি ব্যাগে রাখা পাঁচটি বোমা, ছুরিসদৃশ তিনটি বোমা এবং বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার হয়। পরে ওই কক্ষ থেকে আরও ছয়টি বোমা ও বোমা তৈরির বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। জব্দ তালিকা অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া সরঞ্জামের মধ্যে রাসায়নিক পদার্থ, বারুদ, গানপাউডার, বৈদ্যুতিক তার, বিয়ারিং বল, নাইট্রিক অ্যাসিড ও প্লাস্টিকের কনটেইনার আছে।

১১ই অগাস্ট দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ঢাকার সাভারের সাধাপুর গোপের বাড়ি লালটেক ঘোড়া মসজিদের মাঠে স্থানীয় লোকজন একটি নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রাম দেখতে পান। ড্রামের ভেতরে কালো স্কচটেপে মোড়ানো একটি প্রেশারকুকার ছিল। পরে স্থানীয় লোকজন ড্রাম থেকে প্রেশারকুকারটি বের করে মসজিদের মাঠে রেখে পুলিশকে খবর দেন। পরদিন ১২ই অগাস্ট বেলা বেলা ৩টার দিকে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট।

এসব ঘটনার প্রতিটির সাথেই বোমারু মামুনের নামে এসেছে। তবে কোনো ঘটনারই তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। এভাবে একটি ঘটনার পর আরেকটি ঘটনা ঘটতে থাকলে এবং তদন্তে সময়ক্ষেপণ হলে উগ্রবাদী তৎপরতা কমবে কীভাবে, প্রশ্ন সবার।