‘গডফাদারের’ রোষানলেই কি প্রাণ গেল সাংবাদিক আলিফের

আততায়ীর বুলেটে নিহত হওয়ার একদিন আগে মৃত্যু নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন সাবেক সেনা সদস্য ও সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ। যার প্রথম দুই লাইন ছিল, “আমি হারিয়ে গেলেও ভালোবাসার সৌরভটুকু মনে রেখো/নীরব রাতের তারার মাঝে আমার অস্তিত্ব খুঁজে দেখো।”

কবিতাটি ফেইসবুকে পোস্ট করেন ১৪ই অক্টোবর। পরেরদিন ঘাতকের বুলেটে প্রাণ হারান সাংবাদিক আলিফ।

মৃত্যু নিয়ে কবিতা পোস্টের একদিন পর নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন ‍উঠছে, আলিফ কি আগেই টের পেয়েছিলেন যে, যমদূত তার খুব কাছে চলে এসেছে? কীসের এত শঙ্কা ছিলো তার? কোনো ‘গডফাদার’ কি কোনো কারণে ক্ষুব্ধ হয়েছিলো তার উপর?

নেত্রকোনার পাহাড়ি এলাকা, দুর্গম পথ, পাথর লুট, ইটভাটা মালিকদের হাতে ফসলি জমির মাটি লুট, রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্ম নিবন্ধন নিয়ে জালিয়াতি, ইয়াবা ব্যবসা, সীমান্ত চোরাচালানসহ অপরাধ জগতের নানা বিষয়ে লিখতেন আলিফ। 

ওইসব লেখনীই কি কাল হয়েছে তার জন্য? তিনি কি এমন কোনো তথ্য জেনে ফেলেছিলেন, যা কাল হয়েছিলো অপরাধচক্রের জন্য? নাকি তার মৃত্যুর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো কারণ? 

যেভাবে হত্যা করা হয় আলিফকে

১৫ই অক্টোবর রাত আটটার দিকে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া বাজারের একটি দোকান থেকে চা খেয়ে বের হচ্ছিলেন আলিফ। এ সময় দুই যুবক এসে তাকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি গুলি চালায়। ছোড়া হয় পাঁচ রাউন্ড গুলি। পাঁচটি গুলিই বিদ্ধ হয় তার শরীরে।

গুলির শব্দে স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে ওই যুবকেরা দৌড়ে কিছুটা দূরে রাখা মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে। 

আলিফকে উদ্ধার করে নেওয়া হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করে আলামত। উদ্ধার হওয়া আলামতের মধ্যে রয়েছে নাইন এমএম বোরের পিস্তলের একটি তাজা গুলি।

গত বছরের ১০ই নভেম্বর দুপুরে সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় আরো একবার হামলার শিকার হয়েছিলেন আলিফ।

সে সময় গুরুতর জখম হলেও প্রাণে বেঁচে যান। তবে আগায়নি তদন্ত। কেন আগায়নি সেই প্রশ্নের উত্তর নেই স্থানীয় থানা-পুলিশের কাছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে আলিফের খুনিরা অচেনা। এলাকায় কেউ কখনো তাদের দেখেনি। তবে খুনিদের ‘অপারেশন’ পরিচালনার ধরণ দেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিশ্চিত হয়েছে, তারা ছিলো ‘পেশাদার কিলার’।

‘অজ্ঞাত’ দুই হত্যাকারী মোটরসাইকেলে চড়ে তেলনজিয়া বাজারের কোন পথে এসেছিলেন, কোন পথে পালিয়ে গেলেন, হত্যাকারীদের সহযোগিতায় আরো কেউ ছিলো কি-না, এমন আরো কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। 

কে এই আলিফ, কেন তিনি টার্গেট

আলিফের ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ ফেইসবুক পেইজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেশিরভাগ পোস্টই বিপক্ষে গেছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের।

সাবেক সেনাসদস্য আলিফ ছিলেন বেসরকারি আইপিটিভি (ইন্টারনেট প্রটোকল টেলিভিশন) চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি। 

‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের একটি ফেইসবুক পেইজ চালাতেন তিনি। সেখানে তিনি অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখি করতেন।

হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টা আগেও ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’-এ স্থানীয় এক মাদককারবারিকে নিয়ে লিখেছিলেন আলিফ।

এর আগেও বারবার ঝুঁকি এসেছিলো আলিফের জীবনে। একাধিকবার নিজেই বলেছিলেন সেসব কথা। 

তিনি একবার বলেছিলেন, দুর্বৃত্তরা অস্ত্র নিয়ে বসে আছে গুলি করার জন্য। 

বছরখানেক আগে নেত্রকোনার সাংবাদিকদের সাথে জেলা পুলিশ সুপারের মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তার জীবনের ঝুঁকির কথাও জানান তিনি। 

সেসময় স্থানীয় সন্ত্রাসী ও চোরাকারবারের সাথে জড়িত ৮টি গ্রুপের কথাও উল্লেখ করেছিলেন।  

‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ ও আলিফের প্রতিবেদন

আলিফের ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ ফেইসবুক পেইজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেশিরভাগ পোস্টই বিপক্ষে গেছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের।

বিশেষ করে রোহিঙ্গা ইস্যু, পাথর ও মাটির ব্যবসা এবং মাদক কারবার নিয়ে বিরামহীনভাবে কনটেন্ট পোস্ট করেছিলেন আলিফ।

‘তথ্য, বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানে সত্য প্রকাশ’, ডিটেকটিভ আর্টিকেল পেইজে রাখা ওই স্লোগানই কি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তিনি?

পেইজটির ফলোয়ারের সংখ্যা ৪০ হাজার। গত বছরের ১৭ই মে থেকে এই পেইজে পোস্ট করা হচ্ছিলো আলিফের টেক্সট ও ভিডিও কনটেন্ট।

হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টা আগে ১৫ই অক্টোবর সন্ধ্যায় ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’-এ ‘নেত্রকোনায় রোহিঙ্গাদের গডফাদার বাবুল’ শিরোনামে একটি কনটেন্ট (টেক্সট ও ভিডিও) পোস্ট করেন আলিফ।

ওই পোস্টে তিনি নেত্রকোনায় রোহিঙ্গাদের বসবাস, জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্ম নিবন্ধনসহ নানা বিষয় উল্লেখ করেন। একই দিন পোস্ট করেন ‘ভারতীয় গরু পাচার এবং মামলা বাণিজ্যের টাকা আর ক্ষমতার গরম’ শিরোনামের কনটেন্ট। 

১৪ই অক্টোবর ‘‘নেত্রকোনা সীমান্ত দিয়ে মাদক, স্বর্ণ এবং রুপি পাচারে ড্রোন করছে কি’, ‘অবৈধভাবে বালু এবং পাথর উত্তোলনে গত চার মাসে নেত্রকোনায় দুই শ্রমিক জীবন দিয়েছেন’ এবং ‘দুর্গাপুর ছাত্রদলের সদস্য সচিব আলমগীরের ২৫টি বক পাখি জবাই করে উৎসবের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল’ শিরোনামের কনটেন্ট পোস্ট করেন আলিফ। 

১৩ই অক্টোবর পোস্ট করা হয় ‘মদনে মাদক সেবনের সময় ছাত্রদল নেতাসহ ৪ জন আটক’ এবং ‘ইট ভাটার জন্য কৃষি জমির মাটি পাচার’ শিরোনামের কনটেন্ট। 

১২ই অক্টোবর পোস্টগুলোর শিরোনাম ছিলো- ‘আত্রারাখালীতে অবৈধ বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে নীরব চাঁদাবাজি’, ‘নেত্রকোনার রোহিঙ্গাদের এনআইডি এবং জন্ম নিবন্ধনে ভুয়া তথ্যের মামলা, গভীর অনুসন্ধানে’ এবং ‘পাথর লুটের চিত্র, পরিবেশের দোহাই দিয়ে প্রশাসন কি পরিবেশ সুরক্ষা রাখতে পারছে’। 

১১ই অক্টোবর পোস্ট করা হয় ‘রাজনীতিবিদের বিচার হয় জনতার আদালতে’, ‘কলমাকান্দায় জাতীয় পরিচয়পত্রের কাণ্ডের পর এবার বেরিয়ে এলো রোহিঙ্গার বাড়ি’ শিরোনামের কনটেন্ট। 

‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ পর্যালোচনায় এরকম আরো শিরোনামের সন্ধান পাওয়া যায়। স্বাভাবিকভাবেই এটা পরিষ্কার যে, ঝুঁকি নিয়েই কনটেন্ট বানাচ্ছিলেন সাংবাদিক আলিফ। 

সাংবাদিকদের ওপর হামলার চলছেই

আলিফকে হত্যার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে সাংবাদিকদের বৈশ্বিক সংগঠন দ্য ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (আইএফজে)। একইসঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত এবং বিশদ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে ব্রাসেলসভিত্তিক সংগঠনটি। 

১৬ই অক্টোবর আইএফজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নিজেদের সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) সঙ্গে মিলে আলিফ হত্যার নিন্দা ও তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে আইএফজে।

আলিফ হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের শিগগিরই গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ‘সাধারণ সাংবাদিকবৃন্দ’-এর ব্যানারে অনুষ্ঠিত হয়েছে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ। সংবাদমাধ্যমেও আলিফের মৃত্যুর ঘটনা পেয়েছে গুরুত্ব।

১৫ই অক্টোবর যে রাতে নেত্রকোনার সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, ওইদিনই বিকালে মাগুরার শালিখায় বিএনপির দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ভিডিও ধারণ করার সময় হামলা হয় সাংবাদিক জসীম উদ্দীন-এর ওপর। দৈনিক গ্রামের কাগজ ও দৈনিক প্রতিদিনের কাগজে কর্মরত আছেন তিনি।

এর আগে ৪ঠা অক্টোবর রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। আহত সাংবাদিকরা হলেন, দ্য ডেইলি স্টারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল, দৈনিক সমকালের মাঈনুল ইসলাম রাজু, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আরিফ-উজ-জামান কোরবান এবং আগামীর সময়ের জাহিদুল ইসলাম।

দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার এ ঘটনায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন আহত সাংবাদিকরা।

এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও ছবি বিশ্লেষণ করে জড়িত কয়েকজনকে শনাক্তের দাবি করেছে পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি তারা।

বাংলাদেশ জার্নালিস্ট প্রটেক্ট কমিটির (বিজেপিসি) তথ্য অনুযায়ী শুধু গত মাসেই সারাদেশে ৪১ জন সাংবাদিক নির্যাতন, হামলা, গ্রেপ্তার ও হুমকির শিকার হয়েছেন।

ক্রমবর্ধমান হারে যখন সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে তখন সাংবাদিকরা প্রতিকার পাবে কার কাছ থেকে? 

নিরাপত্তাহীনতায় আলিফের স্ত্রী সন্তান

ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পর ১৬ই অক্টোবর রাতে আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা রাংসা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। তবে মামলায় কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি।

অজ্ঞাতনামা ৭-৮ জনকে আসামি করে দায়ের হওয়া ওই মামলা প্রসঙ্গে আনন্দিতা আলাপ-কে বলেন, “যারা তার স্বামীকে হত্যা করেছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।”

হত্যাকারীদের ফাঁসি দাবি করে আনন্দিতা জানান, তার ছোট দুটি সন্তান রয়েছে। এখন তিনি সন্তানদের ও নিজেকে নিরাপদ মনে করছেন না।

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ আলাপ-কে বলেন, “ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। কেন এই সাংবাদিককে হত্যা করা হলো এবং এতে কারা জড়িত, তা তদন্ত করছে পুলিশের একাধিক ইউনিট।”

যাদের নিয়ে আলিফ লিখেছেন, তারাই কি খুনি? নাকি নেপথ্যে আছে অন্য কেউ? 

এসব প্রশ্ন করা হলে শাকের আহমেদ বলেন, “কথিত সেই গডফাদারকে শনাক্তের চেষ্টা চলছে।”

সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফের রক্ত আরো একবার চোখে আঙুল তুলে দিয়ে দেখাচ্ছে সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতার নির্মম বাস্তবতা এবং সত্য বলার খেসারত কত ভয়ানক। 

নিজের জীবনের ঝুঁকি জেনেও যিনি মাদক, চোরাচালান ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে অবিরাম লিখে গেছেন, তাকেই থামাতে শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নেওয়া হলো বুলেটের। 

আলিফ হত্যার পর তদন্তের প্রতিশ্রুতি এসেছে, মামলাও হয়েছে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বেশিরভাগ সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যা মামলার বিচার আলোর মুখ দেখে না।

আলিফের মৃত্যুতে আবারও উঠছে পুরোনো প্রশ্ন, সত্য প্রকাশের এই মাশুল আর কতদিন দিয়ে যেতে হবে? 

তেলনজিয়া বাজারের পিস্তলের গুলির খোসা কি কেবল একটি অপরাধের আলামত, নাকি বাকস্বাধীনতার ওপর চেপে বসা এক চিরন্তন ভীতির প্রতীক? 

তদন্তের বেড়াজালে কি ধরা পড়বে আড়ালের আসল ‘গডফাদার’, নাকি অন্যান্য সাংবাদিক হত্যার মতো এটিও হারিয়ে যাবে বিচারহীনতার অতল গহ্বরে?