বাংলাদেশে দুই হাজার শিশু এখনো নিখোঁজ: পুলিশের নীতি কী?

শুক্রবার জুমার নামাজের পর মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলো ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। উদ্দেশ্য, আইফোন দিয়ে বন্ধুদের সাথে ছবি তুলবে। তারপর আর ফিরে আসেনি। বিকাল সাড়ে তিনটায় বেরোনোর পর সন্ধ্যা নাগাদও না ফিরলে মা-বাবা খোঁজ শুরু করেন। সেই দুপুরের পর যখন পরদিন দুপুরবেলা তাকে খুঁজে পাওয়া গেল, ততক্ষণে অপ্রতিম সব হিসাব-নিকাশের বাইরে চলে গেছে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

শুক্রবার পরিবারের পাশাপাশি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও অপ্রতিমকে দল বেঁধে খুঁজতে নেমে পড়েন। শুক্রবার রাতে জিডি করা হয়। কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার গণমাধ্যমকে জানান, নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর থেকেই পুলিশের একাধিক টিম মাঠে ছিলো। সোশ্যাল মিডিয়াতেও তার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। সব শেষে অপ্রতিমের মৃত্যুর খবরই সেখানে পরিণতি হিসেবে সবার কাছে উঠে আসে। 

গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়া ও মৃত্যুর ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও, দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই ধরনের ঘটনা নতুন না। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অগাস্ট মাস পর্যন্ত ২৫৪  শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৩৬টি ঘটনায় নিখোঁজ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ শিশুদের অর্ধেকের বেশিই ১৩ বছরের কম বয়সী।

পুলিশ সদরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়, এর মধ্যে উদ্ধার হয় ১৩ হাজারের বেশি। মানে এই বছর বাংলাদেশে এখনো 

২ হাজারের বেশি শিশু এখনো নিখোঁজ অবস্থায় আছে।

অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার প্রেক্ষিতে এবং অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রেও পুলিশের বক্তব্য, তাদের দিক থেকে কাজ শুরু করতে এতটুকুও বিলম্ব হয়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুলিশের দাবি, শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়। শিশু নিখোঁজের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন মূলধারার গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং তাদেরকে দেওয়া পুলিশের ভাষ্য খতিয়ে দেখলে, পুলিশ কীভাবে শিশু নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে কাজ করে, তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়, এবং একটা চিত্র দাঁড় করানো যায়।

পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তা বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমকে বলেছেন, শিশু নিখোঁজের ঘটনা বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখার নির্দেশনা দেওয়া আছে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের। এমনকি, কিছু সময় ধরে নিখোঁজ না থাকলে জিডি না নেওয়ার বিষয়টিও শিশুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, এক্ষেত্রে সাথে সাথেই জিডি করা যায়।

পাশাপাশি, শিশু নিখোঁজ হবার তথ্য দ্রুত ছড়ানোর জন্য পুলিশ ‘মুন অ্যালার্ট’ বা ‘মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন অ্যালার্ট’ নামের একটি সার্ভিস ব্যবহার করে, যা এই বছর জানুয়ারিতে চালু হয়েছে সিআইডি ও ‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশ’ এর যৌথ উদ্যোগে। এছাড়া, পুলিশের অনলাইন জিডির পোর্টালেও জিডি করা যায়, এবং সেখানে অগ্রগতিও কতটুকু হয়েছে তাও দেখা যায়।

এগুলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমকে পুলিশেরই দেওয়া তথ্য। এখন প্রশ্ন হলো, পুলিশ যদি আসলেই শিশু নিখোঁজের ঘটনার ওপর বাড়তি জোর দিয়ে কাজ করে এবং জিডি হওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ ব্যবস্থা গ্রহণ করা শুরু করে দেয়, তাহলে এত শিশু কেন নিখোঁজ হয় থেকে যায়? 

সংখ্যাগুলো উপরেই বলা হয়েছে;  আট মাসে ২৪৫ শিশুর মৃত্যু এবং এর মধ্যে ৩৬টি ঘটনায় নিখোঁজ হবার পর লাশ উদ্ধার। পাশাপাশি, শুধু ২০২৬ সালে নিখোঁজ হওয়া ১৫ হাজারের বেশি শিশুর মধ্যে এখনো দুই হাজারের বেশির সন্ধান মেলেনি। 

এ বছর ৬ই  সেপ্টেম্বর রবিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে মুন অ্যালার্ট কর্তৃপক্ষ ‘আমার সন্তান কোথায়?’ শীর্ষক একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সেখানে বক্তব্য দেন বিভিন্ন নিখোঁজ শিশুর পরিবারের সদস্যরা। 

পঁয়ত্রিশটি ভুক্তোভোগী পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য থেকে যেসব অভিজ্ঞতার কথা জানা যায়, তার সাথে পুলিশের বক্তব্যের ব্যবধান অনেকটাই। সেখানে শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর জিডি করা বা মামলা নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের গড়িমসির অভিযোগ তোলেন অনেকে। জিডি করার আগে নিজেদেরই খুঁজে দেখতে বলা, ধমক দিয়ে থানা থেকে বের করে দেওয়া, ‘শিশুকে খোঁজা পুলিশের কাজ নয়’ - এমন কথা বলা, অভিযুক্তদের ঠিকমতো জিজ্ঞাসাবাদ না করে ছেড়ে দেওয়া, বারবার ভুক্তভোগীকে হয়রানি করা; এইসব অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন একাধিক পরিবারের সদস্য।

তাহলে একটি শিশু নিখোঁজ হলে পুলিশের অ্যাকশন নেওয়ার নীতিমালা, এবং বাস্তবে অ্যাকশন নেওয়ার কাঠামোর মধ্যে এই পার্থক্য কেন? পুলিশের কার্যবিধির ফাঁকফোকরগুলো কোথায়?
“একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো প্রথম চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। অপহরণের ক্ষেত্রে, এই সময়ের মধ্যেই ভুক্তভোগী শিশুকে নিয়ে অপরাধীরা গোপন স্থানে আটক করে বা লুকিয়ে রাখে,” আলাপ-কে বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক তৌহিদুল হক। 

অভিভাবকদের দিক থেকে কিছু ঘাটতি থাকার কথাও বলেছেন তিনি। 

অনেক ক্ষেত্রে, শিশু নিখোঁজ হবার পর পুলিশকে জানাতে দেরি করা, পুলিশকে জানানোর পর শিশুকে পাওয়া গেলে বা নিজে থেকেই সে ফিরে এলা সেটা পুলিশকে না জানানো, এবং তার কারণে পুলিশের সময় ও লোকবল অপচয় হওয়া একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, মুন অ্যালার্ট ব্যবহার করে নিখোঁজ শিশুকে খোঁজার ক্ষেত্রে তিনটি ফ্যাক্টর কাজ করে।
“প্রথম ফ্যাক্টর হলো, কত দ্রুত পুলিশকে জানানো হয়েছে, বা শিশু নিখোঁজ হবার পর এবং পুলিশকে জানানোর আগে কতখানি সময় অতিবাহিত হয়েছে। এরপর আসে, পুলিশ কতটা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা শুরু করেছে, বা খবর পাওয়ার কতক্ষণ পর পুলিশের সদস্যরা সক্রিয় হয়েছেন। এবং তৃতীয়ত, যে এলাকায় শিশু নিখোঁজ হয়েছে, তাকে খুঁজতে শুধু সেই থানার পুলিশ কাজ করছে, নাকি আশেপাশের এলাকার থানা এবং পুলিশের একাধিক দল বা বিভাগ সমন্বয়ে কাজ করেছে। পুলিশ কিংবা অভিভাবকদের দিক থেকে যেকোনো বিলম্ব এই পুরো প্রক্রিয়ার দ্রুততা কমিয়ে দেয়।”

তবে অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, শিশু নিখোঁজের ক্ষেত্রে পুলিশের যে নীতিমালা বা নির্দেশনাগুলো আছে, সেটা সব ঘটনায় বা সব মানুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হয় না। তার মতে, এক্ষেত্রে প্রভাব রাখে ভুক্তভোগী বাবা মার সামাজিক অবস্থান। তিনি বলেন, “পরিবারের স্ট্যাটাসের ওপর নির্ভর করে তারা তাদের সমস্যা সমাধানে কতখানি চাপ সৃষ্টি করতে পারবে, এবং তার ওপর নির্ভর করে পুলিশ কতটা অগ্রাধিকার দিবে ব্যাপারটাকে।”

একইরকম ভাষ্য ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদেরও। তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী না হলে তাদেরকে ঘোরানো, জিডি করতে গড়িমসি, এবং থানা থেকে ধমক দিয়ে চলে যেতে বলা হয়।

অধ্যাপক তৌহিদুল হকের মতে, আরেকটি বিষয় এখানে প্রভাব রাখে, তা হলো, ঘটনা কতটা জানাজানি হয়েছে। তিনি বলেন, “যখন কোনো ঘটনা সংবাদ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় কতখানি জানাজানি হলো, বা কতটা ভাইরাল হলো, তার ওপরও অনেক সময় নির্ভর করে, পুলিশ এটিকে কতখানি গুরুত্ব দেবে।”

তিনি বলেন, কোনো একটি ঘটনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে গেলে, সেটি নিয়ে নানা মহলে আলোচনা হতে থাকলে, পুলিশের ওপর বেশি চাপ আসে নিখোঁজ শিশুকে উদ্ধার করার। তেরো বছর বয়সী অপ্রতিমের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, খুবই অল্প সময়ের মধ্যে ঘটনাটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়।বাংলাদেশে দুই হাজার শিশু এখনো নিখোঁজ: পুলিশের নীতি কী?

আমরা শিরোনাম দেখি, পরিসংখ্যান দেখি, মতামত ও বক্তব্য শুনি। তারপর নতুন ঘটনা ঘটে, আবার কেউ নিখোঁজ হয়, এবং আমরা ভুলে যাই। তবে যেই শিশুরা আর কখনো ফিরে আসেনি, তাদের বাবা মা, তাদের পরিবার কখনো ভুলতে পারে না।