বাইরে থেকে দেখতে একেবারেই সাধারণ একটি আবাসিক ভবন, কোন নামফলকও নেই। চট্টগ্রামের খুলশীর কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ঐ ভবনের আট তলার ফ্ল্যাটে ঢুকলেই একেবারেই অন্যরকম দৃশ্য; সারি সারি ল্যাপটপ, শতাধিক মোবাইল ফোন দিয়ে বানানো এক বিশাল ডিজিটাল স্ক্যামের কারখানা। আর সেখানে কাজ করছিলো পাঁচটি দেশের নাগরিকরা।
বৃহস্পতিবার রাতে এই ‘সাইবার ল্যাবে’ চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সিটিইউ) অভিযানে বের হয়ে আসে চীন, পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের নাগরিকদের নিয়ে গড়া এক আন্তর্জাতিক প্রতারণার নেটওয়ার্ক। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬৩ বিদেশি নাগরিককে। তাদের মধ্যে পুরুষ ৪১ জন, নারী ২১ জন এবং রয়েছে এক শিশু।
তদন্তকারী কর্মকতাদের ভাষ্যমতে, ভিন্ন ভিন্ন দেশের এই নাগরিকদের পরিচয় হয়েছিলো সামাজিক মাধ্যমে অনলাইন প্রতারণার সূত্র ধরে। ভার্চুয়াল সেই পরিচয় একসময় গড়ায় সরাসরি সাক্ষাতে এরপর একসাথে কাজ করা। ধীরে ধীরে তারা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায়, খুলশীর এই ভবনটি ছিলো তাদের সাম্প্রতিকতম ঘাঁটি।
প্রায় দেড় মাস আগে দুবাই প্রবাসী এক ব্যক্তির এই ভবনের অষ্টম তলা ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হয় এই ‘সাইবার ল্যাব’। সেখান থেকে চলছিলো অনলাইন জুয়া পরিচালনা এবং ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাচার।
রাতে অভিযানে গ্রেপ্তার ৬৩ জন
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতে সিটিইউ’র একটি টিম অভিযান চালায় ভবনটিতে। গ্রেপ্তার করা হয় ৬৩জন বিদেশিকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দলটি লাওসের, ৩৫ জন। এরপর পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের পাঁচ জন এবং নেপাল ও ভিয়েতনামের একজন করে।
সেখানে পাওয়া গিয়েছে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, একটি ট্যাব, ৫৭টি ল্যাপটপ, দুটি মনিটর, একটি কি-বোর্ড, একটি মাউস, একটি প্রিন্টার, পাঁচটি পেন ড্রাইভ, বিভিন্ন কোম্পানির চারটি সিমকার্ড, তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একটি কম্বোডিয়ান কর্মসংস্থান কার্ড।
খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিম আলাপ-কে জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতেই অভিযানটি চালানো হয়। তার ভাষ্যমতে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা রাতে ওই ভবনেই অবস্থান করছিলেন, সকালে তাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
তদন্তের সূত্র কক্সবাজার
সিএমপি’র এক শীর্ষ কর্মকর্তার তথ্যমতে, চট্টগ্রামের এই অভিযানের নেপথ্যে ছিলো সম্প্রতি কক্সবাজারে চালানো একটি অভিযানের সূত্র।
তেসরা সেপ্টেম্বর কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকার দুটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগে ছয়জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছিলো পুলিশ। যাদের পাঁচজন ছিলো চীনের নাগরিক এবং আরেকজন তাইওয়ানের।
তার আগে, ২৫এ অগাস্ট হিমছড়ির একটি রিসোর্টে আরেকটি সাইবার ল্যাবে অভিযান চালিয়ে জব্দ করা হয়েছিল প্রায় ১,৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি কম্পিউটার, ৩০টি কি-বোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, চল্লিশটি মাউস, চীনের দুটি জাতীয় পতাকা, চীনা পুলিশের ব্যাজ এবং একটি ডায়েরি। সেই অভিযানের পর চীনা দূতাবাসের দুটি প্রতিনিধি দল জায়গাটি পরিদর্শন করে যায়।
শুক্রবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, প্রতারক চক্রের দেশীয় সহযোগীদের সন্ধান করছেন তদন্তকারীরা। সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, “প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বাসা ভাড়া নিয়ে ডিজিটাল প্রতারণা করে আসছিল। তাদের এ দেশীয় সহযোগীদের খোঁজা হচ্ছে।”
কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ধারাবাহিক অভিযানে একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা বলেন, হিমছড়ির রিসোর্টে প্রথম অভিযান চালানোর পরপরই এই চক্রের একাংশ কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন হোটেলে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেই সূত্র ধরেই পরবর্তী সময়ে চলে একের পর এক অভিযান।
তদন্তকারীদের ভাষ্যমতে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বরং একাধিক দেশ ও শহর জুড়ে বিস্তৃত একটি সংগঠিত আন্তর্জাতিক স্ক্যাম নেটওয়ার্কের অংশ, যা প্রয়োজনে দ্রুত ঘাঁটি বদলাতে সক্ষম।