খুন করার জন্য পারিশ্রমিক ছিলো মাত্র দুই লাখ টাকা। ভাড়াটে খুনি মো. ফারুক হোসেন ফয়সাল ও রবিন আহম্মেদ পিয়াসের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল পাঁচ লাখ টাকায় কেনা দুটি বিদেশি পিস্তল। তাদের গুলিতেই নিহত হন শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন। মামুনের মাথায় বিদ্ধ হয়েছিল ১০ রাউন্ড গুলি।
গত বছরের ১০ই নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে হত্যা করা হয় মামুনকে।
পুলিশ বলছে, ঘটনার প্রায় ছয় মাস আগে মামুন হত্যাকাণ্ডের ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ নিয়ে মাঠে নামেন কাফরুল এলাকার সন্ত্রাসী রনি ওরফে রাজ্জাক। শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের ডান হাত হিসাবে পরিচিতি আছে তার। দুবাই থেকে এই খুনের নির্দেশ দেন ইমন, যিনি অপরাধ জগতে পরিচিত ক্যাপ্টেন ইমন নামে।
সম্প্রতি ঢাকায় সংঘটিত পাঁচটি ‘হাইপ্রোফাইল’ হত্যাকাণ্ড পর্যালোচনা ও তদন্তে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততা এবং তাদের অনুসারী ভাড়াটে খুনি ও পেশাদার শুটারদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একজন কর্মকর্তা।
স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে হত্যার নির্দেশ মালয়েশিয়া থেকে এসেছিল বলে পুলিশ সূত্রগুলো নিশ্চিত করছে।
নির্দেশদাতার নাম দীলিপ ওরফে দাদা বিনাশ। মিরপুর, মহাখালী, কারওয়ান বাজার ও মগবাজার এলাকায় চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে আছে বিনাশের নাম। তার নির্দেশে মুছাব্বিরকে খুন করা হলেও নেপথ্যে ছিলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী শেখ মোহাম্মদ আসলাম, ঢাকার অপরাধ জগতে তিনি পরিচিত সুইডেন আসলাম নামে।
পনেরো লাখ টাকার চুক্তি। জিন্নাত ও রহিম নামে দুই পেশাদার শুটার মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করেন বলে জানাচ্ছে পুলিশ।
গত ৭ই জানুয়ারি পশ্চিম তেজতুরী পাড়ায় গুলি করে হত্যা করা হয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুছাব্বিরকে। তিনি একসময় ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব এবং কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক।
এরপর ২৮এ এপ্রিল রাত পৌনে আটটার দিকে নিউমার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
২০০৪ সাল থেকে কারাগারে ছিলেন টিটন। ২০২৪ সালে ১৩ই অগাস্ট তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন। এ ঘটনায় টিটনের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন নিউমার্কেট থানায় হত্যা মামলা করেন।
এজাহারে সন্দেহভাজন হিসেবে শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল, শাহজাহান, রনি ওরফে ভাঙারি রনির নাম উল্লেখ করা হয়।
বছিলায় কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে টিটনের সাথে পিচ্চি হেলালের বিরোধ চলছিল বলে এজাহারে বলা হয়েছে।
আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের শ্যালক ছিলেন টিটন। অস্ত্র ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুজনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। টিটন হত্যা মামলার তদন্তে ইমনের সম্পৃক্তাতা আছে কিনা, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) রমনা বিভাগের একজন কর্মকর্তা।
শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে কাইল্যা পলাশের খুনের নির্দেশও এসেছিল সংযুক্ত আরব আমীরাতের দুবাই থেকে। পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ মন্টি এই নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
গত ১২ই জুন রামপুরা টিভি সেন্টার এলাকার নিজ বাসভবনের কাছে নামাজ শেষে ফেরার পথে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন কাইল্যা পলাশ। ২০এ জুন রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার একমাস আগে ৭ই মে জামিনে মুক্ত হয়েছিলেন তিনি।
কাইল্যা পলাশের খুনিরা এসেছিলেন হেলমেট ও মাস্ক পরে। কাছেই প্রস্তুত রাখা ছিলো দুটি মোটরসাইকেল। চালকসহ মোট ছয়জনের টিম। দুই অস্ত্রধারী পলাশের মাথায় গুলি করে পালিয়ে যান। ঘটনার পর পুলিশ ও র্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ইমাম হোসেন ও মারুফ সুলতান ফেরদৌসকে জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্যই পান তদন্তকারী কর্মকর্তা।
পলাশকে গুলি ছোড়া ব্যক্তি যে বাইকে পালিয়ে যান, সেটির চালক ছিলেন ইমাম। আর ফেরদৌস ঘটনাস্থল ও আশপাশে অবস্থান করে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন।
কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবু ওরফে ডিশ বাবুকে হত্যার জন্য ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে মাগুরা ও ঝিনাইদহ থেকে চার পেশাদার শুটার ভাড়া করা হয়েছিল।
চঞ্চল, জিহাদ মোল্লা, জিয়ারুল মোল্লা ও হাসান নামের চার শুটারকে ভাড়া করেন কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান হাফিজ ওরফে সিএনজি হাফিজ।
হামলা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নিহত হন যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ আলী পারভেজ। চার শুটারসহ আট ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য পেয়েছে পুলিশ। ২৪এ জুলাই রাত ১১টার দিকে মিরপুরের ১৩ নম্বর সেকশনের শেরেবাংলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে অস্ত্রধারীদের গুলিতে প্রাণ হারান ইউসুফ।
এ ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার আব্বাস ওরফে আব্বাস আলীর নামও এসেছে।
ভাড়াটের খুনি ও শুটারদের তালিকা হালনাগাদ হচ্ছে
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভাড়াটে খুনি ও শুটারদের তালিকা হালনাগাদ করে ডিএমপি। তালিকায় রয়েছে ৪০১ জনের নাম।
পরে এই তালিকায় যুক্ত করা হয় আরো ১৭ জনকে। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের নাম তালিকায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির আরেক কর্মকর্তা।
তথ্য অনুযায়ী, মতিঝিলে ১১৪ জন, ওয়ারীতে ৭৬ জন, তেজগাঁওয়ে ৬৫ জন, মিরপুরে ৬৪ জন, রমনায় ৩৬ জন, লালবাগে ২৪ জন, গুলশানে ২১ জন ও উত্তরায় ১৮ জন ভাড়াটে খুনি ও শুটার সক্রিয় রয়েছেন।
শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান, ইমন, সুইডেন আসলাম, খোরশেদ আলম রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু, কিলার আব্বাস ও ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল ও সোহেল রানা চৌধুরী ওরফে ফ্রিডম সোহেলের অনুসারী তারা।
এদের মধ্যে জিসান বসবাস করেন দুবাইয়ে। ইমন কখনো অবস্থান করেন মালয়েশিয়া, কখনো দুবাই বা থাইল্যান্ডে। কিলার আব্বাস মালয়েশিয়ায় আস্তানা গেড়েছেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও যাতায়াত আছে তার।
ফ্রিডম রাসু ও ফ্রিডম সোহেল আছেন ভারতে। সুইডেন আসলাম ও পিচ্চি হেলাল এখনও দেশেই আছেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য আছে।
সুইডেন আসলাম এরই মধ্যে মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ একাধিক দেশ ঘুরে এসেছেন।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম আলাপ-কে বলেন, “পেশাদার বা ভাড়াটে খুনি ও শুটারদের তালিকা হালনাগাদের বিষয়টি চলমান প্রক্রিয়া। কে কার অনুসারী, কোথা থেকে কী নির্দেশ আসে, কারা কতটুকু জড়িত- সব বিষয়েই কাজ করছে পুলিশ।”
জুলাই অভ্যুত্থানের পর জামিনে বেরিয়ে আসেন শীর্ষ সন্ত্রাসীরা
জামিন পেয়ে ২০২৪ সালের ১২ই অগাস্ট কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন কিলার আব্বাস। ২০০৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি।
১৩ই অগাস্ট মুক্তি পান ফ্রিডম রাসু। ২০২৩ সালের ২৯এ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি।
১৪ই অগাস্ট মুক্তি পান ইমন। ২০০৭ সালের ৮ই ডিসেম্বর কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি ফ্ল্যাট থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ২০০৮ সালের ৭ই মার্চ ইমনকে বাংলাদেশ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। সেই থেকে কারাগারে ছিলেন তিনি।
১৫ই অগাস্ট মুক্তি পান পিচ্চি হেলাল। ২০০০ সালের ১২ই জানুয়ারি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি।
৩রা সেপ্টেম্বর মুক্তি পান সুইডেন আসলাম। ১৯৯৭ সালের ২৬শে মে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি।
১৯শে ডিসেম্বর মুক্তি পান ফ্রিডম সোহেল। ২০০৪ সালে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি।
কারামুক্তির দিনই আলোচনায় আসেন সোহেল। বাড্ডার আলাতুন্নেসা স্কুল এলাকায় তার অনুসারীদের চালানো গুলিতে গুরুতর আহত হন স্থানীয় বাসিন্দা ফারহান ফয়সাল। মায়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন সোহেল। স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে বাকবিতণ্ডায় তার অনুসারীরা ওই ঘটনা ঘটায়। তবে এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি।
এই শীর্ষ সন্ত্রাসীরা বন্দি ছিলেন কেরাণীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এবং গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে জিসান ২০০৩ সাল থেকেই দেশের বাইরে আছেন।
এলাকাভিত্তিক আধিপত্য শীর্ষ সন্ত্রাসীদের
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে কিলার আব্বাসের আধিপত্য কাফরুল, কচুক্ষেত ও ইব্রাহিমপুরে। জামিনে বেরিয়ে এসে একটি স্কুলভবন নির্মাণের ঠিকাদারের কাছে ৪ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আলোচিত হন আব্বাস।
সিদ্বেশ্বরীর আনারকলি মাকের্ট, লিলি প্লাজার মাকের্ট ও শাহাজাদপুর প্রিমিয়ার শপিংমলে আছে ফ্রিডম রাসুর প্রভাব।
মালিবাগ-মৌচাক এলাকায়ও প্রভাব আছে তার। রাসুর বিরুদ্ধে গুলশান-বাড্ডা এলাকায় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ আছে।
ক্যাপ্টেন ইমন-পিচ্চি হেলাল দ্বন্দ্ব
ধানমণ্ডি, পশ্চিম ধানমণ্ডি, রায়েরবাজার, হাজারীবাগ, টালি অফিস, জিগাতলা, এলিফ্যান্ট রোড, নিউমার্কেট এলাকার ভবন নির্মাণ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ময়লার সিন্ডিকেট, ডিশ ব্যবসা, ইন্টারনেটের ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তার করেছে ইমন বাহিনী।
নিউমার্কেট, মোহাম্মদপুর, আদাবর, ধানমন্ডি, এলিফ্যান্ট রোড, হাজারীবাগ ও সাভারের একাংশে রয়েছে পিচ্চি হেলালের আধিপত্য। টিটন হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন আসামি ছাড়াও রায়েরবাজার বেড়িবাঁধ এলাকায় সংঘটিত জোড়া খুনের মামলার আসামি হেলাল।
২০২৪ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর, মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বধ্যভূমি সংলগ্ন বেড়িবাঁধে মুন্না হাওলাদার ও নাসির বিশ্বাস নামে দু’জনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় যে মামলা হয় সেখানে হেলালকে আসামি করা হয়েছে।
এছাড়া শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের সাথে বিরোধে জড়িয়েও আলোচনায় এসেছেন হেলাল।
গত বছরের ১০ই জানুয়ারি রাতে এলিফ্যান্ট রোডে মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে এক দল সন্ত্রাসী এলিফ্যান্ট রোড কম্পিউটার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি ওয়াহেদুল হাসান দীপু ও ইপিএস কম্পিউটার সিটির (মাল্টিপ্ল্যান) যুগ্ম সদস্য সচিব এহতেসামুল হককে কুপিয়ে আহত করে।
ওই ঘটনার ১০ থেকে ১২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তোলপাড় শুরু হয়। ব্যবসায়ী দীপু শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের বড় ভাই। এ ঘটনায় ইমন জড়িত বলে প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।
তবে ইমন জড়িত না বলে দাবি করেছেন তার মা ডা. সুলাতানা জাহান। সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই দাবি করেন বলেন, তার ছেলে চিকিৎসার জন্য বিদেশে আছেন।
এ বিষয়ে ইমনের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তবে পিচ্চি হেলাল আলাপ-কে বলেন, “টিটন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাকে হত্যার ঘটনায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমাকে আসামি করা হয়েছে।”
তিনি পালটা অভিযোগ করে বলেন, “টিটনের বোন জামাই ইমন এই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড। তার কারণেই ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।”
“দুই যুগ কারাগারে থেকে ৫ই অগাষ্টের পর মুক্ত হয়েছি। বন্দি থাকা অবস্থায় আমার নাম শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় যুক্ত হয়। সেটা ছিলো ষড়যন্ত্রের অংশ। এখনো ষড়যন্ত্র করেই বিভিন্ন ঘটনায় আমার নাম জড়ানো হচ্ছে,” দাবি করেন হেলাল।
সুইডেন আসলাম ও সোহেলের রাজত্ব যেখানে
কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, রাজাবাজার, তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, শেরেবাংলা নগর, গ্রিন রোড ও পান্থপথ এলাকায় একক আধিপত্য সুইডেন আসলামের।
কারামুক্তির পর বাড্ডা, রামপুরা, খিলগাঁও, শাহজাহানপুর, মতিঝিল, পল্টন, কমলাপুর এলাকায় ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, মাদক কারবারসহ টেন্ডারবাজিতে জড়িয়ে পড়েছেন ফ্রিডম সোহেল।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে আসলাম ও সোহেলের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
কে এই জিসান
তবে বিদেশ অবস্থান করা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ও বিত্তশালী হচ্ছেন জিসান। দুবাইয়ে রেস্টুরেন্ট, রিয়েল এস্টেট ও গাড়ির ব্যবসা আছে তার।
রাজউক থেকে শুরু করে রেলভবন, গণপূর্ত, ক্রীড়া পরিষদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, যুব ভবন, কৃষি ভবন, ওয়াসার বিভিন্ন অঞ্চলের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন জিসান। ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লায় প্রভাব আছে জিসানের।
জিসানের সমসাময়িক মগবাজারের এক বাসিন্দা আলাপ-কে বলেন, “জিসান তখন উঠতি সন্ত্রাসী। আগ্নেয়াস্ত্র দেখেছে, বহনও করে। তবে ব্যবহার তখনো শুরু করেনি। মগবাজারের রফিক ছিলো তার ‘গুরু’। জিসান, স্বপন, আরমান ও রনি-এই চারজনের জুটি সবে পরিচিতি পাচ্ছে।”
“১৯৯৩ সালের মধ্য এপ্রিলের এক বিকেলে রফিককে মগবাজার বাজার গলির বাসা থেকে ডেকে টিঅ্যান্ডটি কলোনিতে নিয়ে যান জিসান। সেখানে মহল্লাকেন্দ্রীক সালিশ শেষ করে সন্ধ্যায় ফিরছিলেন রফিক। সাথে জিসানও ছিলেন। ১২ নম্বর বস্তির কাছে আসতেই শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদ গুলি করে হত্যা করেন রফিককে।”
মগবাজারের ওই বাসিন্দা আরও বলেন, “ঘটনার পর রফিককে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রফিকের মা ও ভাই উপস্থিত ছিলেন। রফিকের ভাই হারুন তার মা’র কাছে জানতে চান, কার ডাকে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন রফিক। মা জানান, জিসান ডেকে নিয়ে যায়। এ সময় হারুন খুর দিয়ে জিসানের গলায় আঘাত করেন।”
আঘাতে গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান জিসান। বিদেশে চিকিৎসা নিতে হয়। গলায় খুরের সেই কাটা দাগ এখনো বহন করছেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মগবাজারের ওই বাসিন্দা জানান, দেশে থাকা অবস্থায় ১৯৯৮ সালে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন জিসান। দেড়-দুই বছর কারাবন্দি ছিলেন। এরপর থেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে তিনি।
ইন্টারপোলের রেড নোটিশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনামও হয়েছেন জিসান।
ঢাকার অপরাধ জগতের সবচেয়ে আলোচিত নাম জিসানের জন্ম ১৯৭০ সালে ঢাকার খিলগাঁওয়ে। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। মা ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। পুলিশ হত্যা মামলার আসামি হয়ে ২০০৩ সালের শেষের দিকে তিনি দেশ ছাড়েন।
পরে ভারত হয়ে দুবাই যান। ভারতে যাওয়ার পর নাম বদলে আলী আকবর চৌধুরী নামে ভারতীয় পাসপোর্ট করেন। আসামের সারদা পল্লির ঠিকানা এবং বাবার নাম হাবিবুর রহমান চৌধুরী ও মায়ের নাম শাফিতুন্নেছা চৌধুরী উল্লেখ করা হয় পাসপোর্টে। স্ত্রীর নাম রিনাজ বেগম চৌধুরী। সবশেষ পাসপোর্ট নবায়নের স্থান দুবাই।
জিসানের হাতে ভারত ছাড়াও ডমিনিকান রিপাবলিকের পাসপোর্ট রয়েছে রয়েছে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
দুবাইয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের দুটি রেস্টুরেন্ট, রিয়েল এস্টেট ও গাড়ির ব্যবসা আছে। এসব দেখভাল করেন তার ছোট ভাই শামীম।
দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েও জামিন পেয়ে যান জিসান
২০১৯ সালের ৩রা অক্টোবর দুবাইয়ে জিসানের গ্রেপ্তার হওয়ার খবর সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছিল বাংলাদেশ পুলিশ। ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ার আশ্বাস দেওয়া হয় তখন।
তবে শেষ পর্যন্ত জিসানকে ফিরিয়ে আনা যায়নি। একজন বড় ব্যবসায়ীর জিম্মায় ওই দেশের একটি আদালত তাকে জামিন দেন।
জামিনে বের হওয়ার পর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পুরোনো নেটওয়ার্ক সচল হওয়া ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক আলাপ-কে বলেন, “জামিনে বের হয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কি করছে, কোথায় যাচ্ছে- তা জানতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলেও মনে করেন তিনি।