“শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার আব্বাসের ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ কাভার করতে এসেছিল তারা। সঙ্গে ছিলো গুলি ভর্তি রিভলবার। টার্গেট ছিলেন কাফরুল থানা বিএনপির সদস্যসচিব মো. হাফিজুল ইসলাম বাবু। মাত্র এক মিনিটের মিশন। কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলি বিদ্ধ হয়ে মারা যান বাবুর সহযোগী ইউসুফ আলী ওরফে পারভেজ। ইউসুফ নিজেও বিএনপি কর্মী।”
গত ২৪এ জুলাই রাত ১১টার দিকে ১৩ নম্বর সেকশনের শেরেবাংলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের ওই হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা এভাবেই আলাপ-এর কাছে তুলে ধরেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, “হত্যা মিশনে ছিলো চারজন। মিরপুরের কেউ তাদের চেনে না। কিলার আব্বাসের পাঠানো এই চার খুনির দু’জন ঝিনাইদহ ও দু’জন মাগুড়ার বাসিন্দা।”
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী মামুন মিয়া আলাপ-কে বলেন, “শুনেছি চঞ্চল মোল্লা ও তার সহযোগীদের ঝিনাইদহ থেকে ভাড়া করে ঢাকায় নিয়ে আসেন কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সিএনজিচালক হাফিজ। হাফিজ কিলার আব্বাসের হয়ে কাজ করে বলে প্রচারণা আছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা আকবর হোসেন বলেন, “কাফরুল ও ভাসানটেকের ফুটপাতে দোকান বসানো নিয়ে বিরোধের জেরে খুন হন ইউসুফ। দোকানের অবস্থান ও আকারভেদে এক লাখ থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা দিতে হয়।”
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ১২ই অগাস্ট জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন কিলার আব্বাস ওরফে আব্বাস আলী। ২০০৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি। আকবর হোসেন বলেন, “সবকিছু আব্বাসের নিয়ন্ত্রণেই চলছিল। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পর নিয়ন্ত্রণ হারান আব্বাস। এ নিয়ে বিরোধের জেরে চলছে হামলা পালটা হামলা।”
ইউসুফের বড়ভাই মাসুদ রানা আলাপ-কে বলেন, “খুনি চঞ্চল মোল্লার গুলিতে নিহত হন ইউসুফ। ঘটনার সময় চঞ্চলের সঙ্গী জিহাদ মোল্লা, জিয়ারুল মোল্লা ও হাসান এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে আতংক সৃষ্টি করে।”
ওই সময় স্থানীয় জনতা চঞ্চলকে ধরে ফেলে। এরপর দেওয়া হয় গণপিটুনি। একটি রিভলবার ও চার রাউন্ড গুলিসহ তাকে সোপর্দ করা হয় পুলিশে।
পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে ধরা পড়ে জিয়ারুল। আর জিহাদ ও হাসান এখনো পলাতক।
আলোচিত তিন হত্যাকাণ্ড
শুধু ইউসুফ নন, ১৮ থেকে ২৪এ জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় খুন হয়েছেন আরও তিনজন। ভাসানটেক এলাকায় কাউসার মোল্লা নামে এক যুবককে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার নেপথ্যে ছিল পুরোনো বিরোধের জের। ১৮ই জুলাই খুন হন কাউসার। ভাসানটেক থানা যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা রবিউল ইসলাম সুমন এই খুনের সাথে জড়িত বলে আলাপ-এর কাছে দাবি করেছেন কাউসারের স্ত্রী মোছা. সুমা।
নিহত কাউসারের বিরুদ্ধে মাদক কারবার, চুরিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১০টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। স্বজনদের দাবি, শত্রুতামূলকভাবে তাকে এসব মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
২১এ জুলাই সবুজবাগে ওয়ার্ড বিএনপির কর্মী ইব্রাহীম পলাশকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তবে কেউ গ্রেপ্তার হননি।
হত্যাকারীরা ইব্রাহীমের দুই হাতের বিচ্ছিন্ন কবজি নিয়ে পালিয়ে যান। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধই ওই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ বলে আলাপ-কে জানিয়েছেন সবুজবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম।
একই দিন আরেকটি হত্যাকাণ্ড ঘটে হাজারীবাগ পার্ক–সংলগ্ন সড়কে। রাত দেড়টার দিকে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে নিহত হন সাগর আহমেদ ওরফে বুলেট নামে এক যুবক।
হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন আলাপ-কে জানান, নিহত সাগরের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনা কত ও কেন?
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ঢাকায় ১২২টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। সবচেয়ে বেশি হয়েছে মার্চ ও জুন মাসে। জুলাই মাসের হালনাগাদ তথ্য জানাতে পারেনি ডিএমপি।
এই সময় প্রতি মাসে গড়ে ঘটেছে প্রায় ২০টি হত্যাকাণ্ড।
গত বছর প্রথম ছয় মাসে হত্যাকাণ্ড ঘটেছিলো এর থেকেও বেশি ২১৭টি। তবে তার আগের দুই বছরে এই হার ছিলো কম। ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসে হত্যাকাণ্ড ছিলো ৮৬টি এবং ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসে হত্যাকাণ্ড ঘটে ৯৮টি।
তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৭টি, মার্চে ২৪টি, এপ্রিলে ১৭টি, মে মাসে ১৮টি ও জুনে ২৫টি হত্যাকাণ্ড হয়। এরমধ্যে পারিবারিক কলহে খুন হয়েছেন ৩০ জন এবং রাজনৈতিক কারণে খুনের সংখ্যা ৯।
জানুয়ারিতে পূর্বশত্রুতার জেরে ৫ জন, রাজনৈতিক কারণে ৫ জন, পারিবারিক কলহে ৩ জন, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে ২ জন, চুরির ঘটনায় ১ জন, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ২ জন এবং অন্যান্য কারণে আরও ৩ জন নিহত হন।
ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব শত্রুতার জেরে ৪ জন, পারিবারিক কলহে ৩ জন, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে ২ জন, রাজনৈতিক কারণে ১ জন, চুরির ঘটনায় ১ জন, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ১ জন, ধর্ষণের কারণে ১ জন ও অন্যান্য ঘটনায় ৪ জন নিহত হন।
মার্চ মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পূর্বশত্রুতার জেরে ৬ জন, পারিবারিক কলহে ৩ জন, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ২ জন, চুরির ঘটনায় ১ জন, ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১ জন, যৌতুকের কারণে ১ জন, কথাকাটাকাটির জেরে ১ জন, ধর্ষণের কারণে ১ জন, আত্মহত্যার ঘটনায় ১ জন এবং অন্যান্য ঘটনায় ৫ জন নিহত হয়েছেন।
এপ্রিলে পূর্বশত্রুতার কারণে ৬ জন, পারিবারিক কলহে ৩ জন, রাজনৈতিক কারণে ২ জন এবং অন্যান্য ঘটনায় ৪ জন নিহত হন। এপ্রিলে পৃথক ঘটনায় ২ শিশুও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।
মে মাসে পারিবারিক কলহে ৫ জন, পূর্বশত্রুতার জেরে ২ জন, পরকীয়ার কারণে ১ জন, ধর্ষণের কারণে ১ জন, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ১ জন এবং অন্যান্য কারণে ৪ জন নিহত হন।
জুনে পূর্বশত্রুতার জেরে ৭ জন, পারিবারিক কলহে ৬ জন, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে ৩ জন, রাজনৈতিক কারণে ১ জন, ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১ জন, মলম পার্টির কারণে ১ জন, গণপিটুনিতে ১ জন, যৌতুকের কারণে ১ জন এবং অন্যান্য কারণে ৫ জন নিহত হন।
তবে সার্বিক পরিস্থিতিকে ‘স্থিতিশীল’ বলছে পুলিশ।
ডিএমপির এডিসি (মিডিয়া) নিয়াজ মেহেদী বলেন, “মার্ডারের কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, পূর্বশত্রুতার জেরেই সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। আমার কাছে যে পরিসংখ্যান আছে, সেখানে রাজনৈতিক কারণে খুনের ঘটনা স্থিতিশীল আছে। আসামি গ্রেফতার ও সুষ্ঠ্যু তদন্ত করতে পুলিশ তার সাধ্যমতো চেষ্টা করছে।”
অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, পুলিশ সাধারণত মামলার হিসাব দিয়ে পরিসংখ্যান তৈরি করে। এই পরিসংখ্যান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। পুলিশ মামলা নিতে অনীহা দেখালে পরিসংখ্যানেও অপরাধের সংখ্যা কম দেখায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক আলাপ-কে বলেন, “শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। খুন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো ব্যাপকভাবে সামনে আসছে। মানুষের মধ্যে ভয় ও শঙ্কা বেড়েছে।”
তিনি বলেন, মানুষ নিরাপদ বোধ করছে কি না, “সেটি বিবেচনায় নিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”