মাদকাসক্তদের প্রায় ৭০ শতাংশই তরুণ: ডিএনসি

কেন্দ্রীয় মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি ব্যক্তিদের প্রায় ৭০ শতাংশই ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী। এমন তথ্যই উঠে এসেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) বার্ষিক প্রতিবেদনে।

‘বার্ষিক মাদক প্রতিবেদন ২০২৫’ থেকে জানা যায়, ঢাকার কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি ব্যক্তিদের ৬৯ দশমিক ৪১ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে ১৫ বছর বয়সী ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী ২০ দশমিক ৪৯ শতাংশ, ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী ২৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী ১৮ দশমিক ৩১ শতাংশ 

প্রতিবেদনে দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা ছিলো ৫৯ দশমিক ২৮ শতাংশ।

মাদক যে পথে আসছে  

ডিএনসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ নিজে মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও ভৌগলিক অবস্থানের কারণে ঝুঁকিতে আছে। 

বাংলাদেশের অবস্থান তিনটি প্রধান মাদক উৎপাদনকারী অঞ্চলের মধ্যে। এই তিনটি অঞ্চল হলো- গোল্ডেন ট্রায়েঙ্গেল (মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওসের পাহাড়ি অঞ্চল), গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (পাকিস্তান ও আফগানিস্তান, ও ইরানের পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি অঞ্চল) এবং গোল্ডেন ওয়েজ (ভারতের হিমাচল প্রদেশ ও উত্তর প্রদেশ এবং নেপাল ও ভুটানের কিছু অঞ্চল)। এর কারণে ভারত ও মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত মাদক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে অ্যামফেটামিন, ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথের মতো মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ আছে, সীমান্তবর্তী ৩২টি জেলা ঝুঁকিতে আছে, এবং গ্রামাঞ্চলে মাদক সেবনের অস্তিত্বও পাওয়া গেছে। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী মাদক জব্দের হারের ভিত্তিতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলো হলো- কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, ফরিদপুর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মন্সিংহ, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা। 

মাদক নিয়ন্ত্রণে যত অভিযান 

দেশজুড়ে ২০২৫ সালে প্রায় ১ লাখ কেজি গাঁজা জব্দ হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি সেবন করা মাদক হলো গাঁজা। ২০২৫ সালে সারাদেশে ৯৬,৩৫৭.৫৮ কেজি গাঁজা জব্দ করা হয়েছে।

মাদকরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমের কথাও জানা যায় ডিএনসির প্রতিবেদন থেকে। ২০২৫ সালে ডিএনসির ভ্রাম্যমাণ আদালত রেকর্ড ৪২ হাজার ৩৪৩টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২০ হাজার ২৮৬টি মামলা দায়ের করেছে এবং ২০ হাজার ২৯৪ জন আসামিকে তাৎক্ষণিক সাজা দিয়েছে।

এছাড়া, ঢাকার একটি গোপন ল্যাবে সিন্থেটিক মাদক ‘কুশ’ তৈরির কারখানা আবিষ্কার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, এমন তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ৯০ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি ইয়াবা জব্দ হয়েছে। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সারাদেশে ২ কোটি ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫১ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়, যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয় ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ৮১১ পিস। 

বাংলাদেশে নতুন ‘সাইকোঅ্যাক্টিভ’ মাদক ও ‘ডিজাইনার ড্রাগস’ ছড়িয়ে পড়ার আশংকার কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। এছাড়াও এলএসডি, ড্যান্ডি ও ম্যাজিক মাশরুমের মতো মাদক শহরের তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এমডিএমবি জব্দ করা হয়, এবং মালয়েশিয়া থেকে আসা ৪ জন পাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়। 

এর আগে ২৫এ জুন বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস উপলক্ষে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশে ৮২ লাখ মানুষ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত। মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের অস্ত্র দেওয়ার পাশাপাশি মাদক মামলার বিচারে বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠনের কথা বলেন তিনি।

মাদক সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “মাদকচক্র গুলো অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করছে, আর আমাদের কর্মকর্তাদের কাছে কোনো অস্ত্র নাই। অনেকটা ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার’ এর মতো। এজন্য আমরা মাদক আইনটা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছি।”

এছাড়া, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় ১৪১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সাতটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যা বিশিষ্ট মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ৭৩টি বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্রকে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।