মন্তব্য প্রতিবেদন

পুলিশ যখন আক্রান্ত: ‘মব জাস্টিসের’ অন্ধকার ভবিষ্যত

ঘটনা দুটি একদম সাম্প্রতিক, কিন্তু এর ভেতরের বার্তাটা পুরো দেশের জন্য এক অশনি সংকেত। ঢাকার আদাবরে এক ছিনতাইকারী চক্রকে ধরতে গিয়ে ধারালো অস্ত্রের কোপে রক্তাক্ত হলেন থানার ওসি ও একজন এসআই। আর তার ঠিক পরপরই লালমনিরহাটে এক শিশুর লাশ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে ক্ষিপ্ত জনতার ইটের আঘাতে অবরুদ্ধ হলেন খোদ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার।

যখন একটা দেশের রাজধানী কিংবা জেলা শহরের বড় বড় পুলিশ কর্মকর্তারাই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এভাবে হামলার শিকার হয় তখন এটা সাধারণ কোনো মারামারি না, পুরো সিস্টেমের ভেতরে এক মস্ত বড় ফাটল।

রাষ্ট্র চলে একটা অলিখিত বিশ্বাস বা ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্টের’ উপর। আমরা সরকারকে ট্যাক্স দিই, আইন মেনে চলি এই আশায় যে, তারা আমাদের নিরাপত্তা দেবে। আর এই নিরাপত্তার প্রতীক হলো ইউনিফর্ম পরা পুলিশ। কিন্তু গত প্রায় দুই বছরের (২২ মাসের) হিসাব বলছে, আদাবর বা লালমনিরহাটের ঘটনাগুলো হুট করে ঘটা কোনো বিষয় নয়। মানুষের মনের ভেতরের জমে থাকা ক্ষোভ আর অপরাধীদের দুঃসাহস এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গেল দুই বছরে (২২ মাস) পুলিশের ওপর দেশজুড়ে ১,০৬১ বার হামলার ঘটনা ঘটেছে।

পরিসংখ্যানের আড়ালে থাকা বার্তা

গত দুই বছরের গল্পটাকে যদি আমরা একটু সহজ করে তিনটি ভাগে ভাগ করি, তবে পুরো ছবিটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

প্রথম ধাক্কা (অগাস্ট ২০২৪): রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ওই উত্তাল সময়ে দেশের ৬৩৯টি থানার মধ্যে ৪৫০টিরও বেশি থানা ভাঙচুর আর আগুনের শিকার হয়। মারা যান ৪৪ জনেরও বেশি পুলিশ সদস্য। অপরাধবিজ্ঞানীরা বলেন, এটা ছিল মানুষের ভেতরের ‘জমে থাকা ক্ষোভের’ বিস্ফোরণ। সাধারণ মানুষ পুলিশকে ভয় পায় ঠিকই, কিন্তু মন থেকে শ্রদ্ধা করে তখন, যখন পুলিশ নিরপেক্ষ থাকে। কিন্তু গত বছরগুলোতে পুলিশকে যখন কোনো দল বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হয়ে কাজ করতে হয়েছে, তখন মানুষের চোখ থেকে সেই শ্রদ্ধা পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে। তাই সুযোগ পেতেই সেই ইউনিফর্মটাই হয়ে উঠলো মানুষের ক্ষোভ ঝাড়ার প্রথম টার্গেট।

দ্বিতীয় ধাক্কা (অক্টোবর ২০২৪ - মে ২০২৫): এর পরের ১০ মাস ছিল এক অদ্ভুত সময়। সরাসরি থানা ভাঙচুর না হলেও রাস্তাঘাটে উচ্ছেদ অভিযান, ট্রাফিক আইন মানাতে যাওয়া কিংবা পাড়া-মহল্লার ছোটখাটো মারামারি থামাতে গিয়ে অন্তত ২০ বার বড় ধরনের হামলার শিকার হতে হয়েছে পুলিশকে।

তৃতীয় ধাক্কা (সাম্প্রতিক সময়): আর এখনকার ট্রেন্ড হলো, পেশাদার অপরাধী আর উত্তেজিত জনতা, দুই পক্ষই পুলিশের ওপর চড়াও হচ্ছে। হিসাব কষলে দেখা যায়, পুলিশের ওপর হওয়া হামলার ৫০ শতাংশ ঘটেছে রাজনৈতিক ক্ষোভে, ২০ শতাংশ উত্তেজিত জনতার ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণপিটুনি দিতে গিয়ে, ২০ শতাংশ আদাবরের মতো পেশাদার অপরাধীদের ধরতে গিয়ে এবং বাকি ১০ শতাংশ রাস্তাঘাটের সাধারণ ঝামেলার কারণে।

আদাবর আর লালমনিরহাট: দুই ভিন্ন গল্প, এক চিত্র

ঢাকার আদাবরের ঘটনা আমাদের দেখায় যে আন্ডারওয়ার্ল্ডের গ্যাং আর ছিনতাইকারীরা এখন কতটা বেপরোয়া। ‘কবজি কাটা গ্রুপ’-এর মতো অপরাধীরা এখন খোদ ওসির মাথায় কোপ মারতেও দ্বিধা করছে না! অর্থাৎ পুলিশের প্রতি অপরাধীদের যে ভয়টা থাকার কথা ছিল, তা এখন আর নেই।

অন্যদিকে, লালমনিরহাটের ঘটনাটি আমাদের এক অন্ধকার সামাজিক মনস্তত্ত্বের কথা বলে। একটা বাচ্চার নির্মম খুনের পর মানুষ এতটাই ক্ষিপ্ত ছিল যে তারা খুনিকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেরাই ‘বিচার’ অর্থাৎ পিটিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। যখনই মানুষ মনে করে আইনের ‘লম্বা হাত’ দিয়ে আসল বিচার হতে দেরি হবে, তখনই তারা নিজেরা ‘মব’ বা জনতা সেজে বিচারক হয়ে যেতে চায়। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, যখন পুরোনো নিয়মকানুন ভেঙে পড়ে কিন্তু নতুন কোনো ভালো নিয়ম তার জায়গা নিতে পারে না, সমাজ তখন এক অন্ধকার আদিম যুগের দিকে হাঁটতে শুরু করে।

‘ধুর, ঝামেলায় গিয়ে লাভ কী?’

যখন বড় বড় পুলিশ কর্মকর্তারা হামলার শিকার হন, তখন এর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লাগে সাধারণ পুলিশ কনস্টেবল বা সাব-ইন্সপেক্টরদের মনে। তাদের মনোবল ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। পুলিশ তখন নিজের অজান্তেই অলিখিত এক ‘নিষ্ক্রিয়তার’ পথ বেছে নেয়। তারা ভাবে, ‘ধুর, ঝামেলায় গিয়ে লাভ কী? যেখানে স্যারেরাই নিরাপদ না, সেখানে আমাদের তো কোনো দামই নেই। চুপচাপ ডিউটি শেষ করে বাড়ি ফিরে যাই।’

এর ফলে দেখা যায়, কোথাও কোনো অপরাধ হলে পুলিশ পৌঁছায় দেরিতে, কিংবা বড় বড় অপারেশনগুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আর পুলিশ যখন এভাবে ঘরের কোনায় গুটিয়ে যায়, তখন ফাঁকা মাঠে গোল দেয় অপরাধীরা। মাঝখান থেকে কপাল পুড়ে সাধারণ নাগরিকদের।

পুলিশ যখন দেখে চারপাশের সবাই তাদের শত্রু ভাবছে, তখন তাদের ভেতরেও একটা ‘অবরোধ মানসিকতা’ তৈরি হয়। তারা ভাবে, ‘এই সমাজের কেউ আমাদের আপন না, নিজেদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তাই নিজেদের বাঁচানোর দায়িত্ব আমাদেরই।’ এর ফলে পুলিশ সাধারণ মানুষের থেকে আরও দূরে সরে যায়, আরও বেশি খিটখিটে আর অনমনীয় হয়ে ওঠে।

কিন্তু এই ‘মব জাস্টিস’ বা জনতার বিচারের কোনো নিয়ম থাকে না। আজ যে উত্তেজিত জনতা কোনো খুনিকে পিটিয়ে মারতে পুলিশের ওপর চড়াও হচ্ছে, আগামীকাল সেই একই জনতা স্রেফ একটা গুজবের ওপর ভিত্তি করে কোনো নির্দোষ মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারে। আইনের শাসন না থাকলে সমাজটা শেষ পর্যন্ত একটা জঙ্গল হয়ে যায়।

তাহলে উপায়?

এখন রাষ্ট্র কি আরও বেশি কঠোর হয়ে, আরও বেশি লাঠিপেটা বা গুলি চালিয়ে এই পরিস্থিতি শান্ত করবে? দুনিয়ার সব বড় বড় গবেষকেরা এক বাক্যে বলেছেন—না! ভয় দেখিয়ে সাময়িকভাবে রাস্তা ফাঁকা করা যায়, কিন্তু মানুষের মনের ভেতরের রাগ কমানো যায় না। উল্টা পুলিশ যত বেশি বলপ্রয়োগ করবে, সাধারণ মানুষের পাল্টা আঘাত করার প্রবণতাও তত বাড়বে।

সমাধান একটাই, পুলিশের প্রতি মানুষের বিশ্বাস আনা। যাকে বলা হয় ‘পুনর্গঠনমূলক জবাবদিহিতা’।

প্রথমত, পুলিশকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। পুলিশ যেন কোনো নেতার কথায় না চলে, দেশের সাধারণ আইনের কথায় চলে—সেই স্বাধীনতা তাদের দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, লালমনিরহাটের মতো ঘটনা কেন ঘটল তা খুঁজে বের করে দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। আর আদাবরের মতো ঘটনা রুখতে অপরাধীদের দমনে পুলিশকে আধুনিক লজিস্টিকস ও পূর্ণ অ্যাকশন নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে।

জনগণকে এই বিশ্বাসটা দিতে হবে যে—আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ কোনো দলের নয়, তারা সাধারণ মানুষের প্রকৃত বন্ধু।

বিগত ২২ মাসের গল্পটা এটাই বলে যে, পুলিশ আজ নিজে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে, আর আমরা সাধারণ মানুষেরা ভুগছি তীব্র নিরাপত্তাহীনতায়। পুলিশের ওপর হামলা আমাদের পুরো সিস্টেমের ব্যর্থতার এক করুণ দলিল। এখনই পুলিশ বাহিনীকে গোড়া থেকে সংস্কার না করা হলে এই ‘মব কালচার’ আর অপরাধীদের দাপট একদিন পুরো সমাজটাকেই গিলে খাবে।