বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসান আহমেদ প্রধান অপহরণ হয়েছেন, এমন দাবি তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান।
শুক্রবার নিজের ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেন, “গতকাল রাতে (১১ জুন) বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির কুমিল্লা জেলা পশ্চিম শাখার সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক সম্পাদক জিসান আহমেদ অপহৃত হয়েছেন। ১৮ ঘণ্টা অতিক্রম হওয়ার পরও তিনি এখন পর্যন্ত উদ্ধার না হওয়ায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী করছে?"
একই দিনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ফেইসবুক পেইজ থেকেও জিসান আহমেদ প্রধান অপহরণ হয়েছেন, এমন দাবির পাশাপাশি তাকে উদ্ধারের দাবি জানানো হয়।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে লিখা হয়, “গতকাল (১১ জুন) রাতে কুমিল্লার দাউদকান্দি মডেল মসজিদে এশার নামাজ শেষে বের হওয়ার পর থেকে জিসান আহমেদ প্রধান নিখোঁজ রয়েছেন। ঘটনার পরপরই পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশকে অবহিত করা হয়। তবে কোনো ফল না পাওয়ায় আজ ভোরে পরিবারের সদস্যরা পুনরায় থানায় যান। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর সকাল ৯টায় তারা পুলিশের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান। উদ্ধারের বিষয়ে প্রশাসনের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলেও পুলিশ দায়সারা আচরণ করে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে কালক্ষেপণ করতে থাকে।”
সেখানে আরও লিখা হয়, “স্বৈরাচার-উত্তর বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা ও পুলিশের রহস্যজনক আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।”
তবে জিসান অপহৃত হননি, বরং বিয়ে এড়াতে আত্মগোপনে গিয়েছিলেন, এবং ধর্ষণের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কুমিল্লা পুলিশ। শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লা জেলার এসপি মো. আনিসুজ্জামান জানান, ১১ই জুন বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটায় নিখোঁজ হন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক।
এ বিষয়ে ১২ই জুন কুমিল্লার দাউদকান্দি থানায় জিডি করেন মোহাম্মদ রাসেল আহমেদ নামের এক ব্যক্তি।
কুমিল্লার এসপি জানান, জিডি দায়ের হওয়ার পর জিসান আহমেদ প্রধানকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে থানা ও গোয়েন্দা শাখার একাধিক দল মোতায়েন করা হয়।
তিনি আরও বলেন, তদন্তের এক পর্যায়ে জিসানের চাচাত ভাই সজীবের কাছ থেকে তথ্য পান যে, জিসান ফেইসবুকের মাধ্যমে দাউদকান্দির এক নারীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলেন ও এক পর্যায়ে তাকে ধর্ষণ করেন।
"পাঁচ ছয় মাস পূর্বে ফেইসবুকের মাধ্যমে দাউদকান্দি এলাকায় একটি মেয়ের সাথে জিসান মিয়া প্রধানের পরিচয় হয়। এই পরিচয়ের সূত্র ধরে তাদের মধ্যে মোবাইল ফোনে কথাবার্তা শুরু হয়, একটা পর্যায়ে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমরা আরও জানতে পারি যে, গত ২০/৫/২০২৬ তারিখে দাউদকান্দি থানাধীন জিসান, যিনি নিখোঁজ ছিলেন, তার ভাড়া বাসায় ভিক্টিম মেয়েটিকে ধর্ষণ করে।"
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান আরও বলেন, পরবর্তীতে জিসান উক্ত নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তার সাথে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্কে জড়িত হন ও এক পর্যায়ে উক্ত নারী অন্তঃসত্ত্বা হলে তাকে গর্ভপাত করতে চাপ দেন জিসান। পুলিশের ভাষ্য, গর্ভপাত না করলেও হত্যা করার হুমকিও দিয়েছিলেন জিসান।
"এক পর্যায়ে মেয়েটি জানের ভয়ে বাচ্চা নষ্ট করতে রাজি হন। এরপরে জিসান তার পূর্বপরিচিত ঘনিষ্ঠ জনৈক সেকান্দার আলির ফার্মাসির দোকান থেকে বাচ্চা নষ্ট করার ট্যাবলেট মেয়েটিকে খাওয়ায়।"
এক পর্যায়ে উক্ত নারী বিয়ের জন্য চাপ দিলে জিসান ১২ই জুন বিয়ে করবেন বলে আশ্বাস দেন, এবং ১২ই জুন তিনি বিয়ে এড়াতে আত্মগোপনে চলে যান, মোবাইলের মেসেজ থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এসপি মো. আনিসুজ্জামান বলেন, নতুন করে পাওয়া তথ্য জানাতে জিসানের পরিবারকে থানায় ডাকা হলে জিসানের ভাই নিজেই দাবি করেন যে তাকে লাকসামে পাওয়া গেছে। সেখানে গিয়ে কুমিল্লা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা অচেতন অবস্থায় জিসান আহমেদ প্রধানকে খুঁজে পেলে তাকে চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
পুলিশ জানায়, হাসপাতালের মেডিকেল রিপোর্ট থেকে বিদ্যমান হয় যে জিসানের কোনোরকম শারীরিক ক্ষতি হয়নি, তিনি আত্মগোপনেই ছিলেন।
উদ্ধারের খবর পাওয়ার পরই উপরিউক্ত নারী দাউদকান্দি মডেল থানায় জিসানের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ভ্রুণ নষ্টের মামলা দায়ের করেন।
জিসান আহমেদ প্রধান অপহরণ হয়েছেন, এমন দাবিতে ইসলামী ছাত্রশিবির ও জামায়াতে ইসলামীর ফেইসবুক পেইজ থেকে উদ্ধারের দাবি তোলার পাশাপাশি ১২ই জুন বিকেলে দাউদকান্দি মডেল মসজিদ প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ ও মিছিল করে ছাত্রশিবিরের কুমিল্লা জেলা উত্তর শাখা।
এ ছাড়া, নিজস্ব ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে জিসান অপহরণ হওয়ার দাবি তোলেন শিবিরের বিভিন্ন পদের নেতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের কার্যনির্বাহী সদস্য ও ছাত্রশিবিরের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মেফতাহুল হোসেন আল মারুফ তার নিজস্ব ফেইসবুক প্রোফাইলে জিসান আহমেদ প্রধানের ছবি দিয়ে লিখেন, "জিসান ভাইকে পাওয়া যাচ্ছে না।"
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদন এস এম ফরহাদ এক পোস্টে লিখেন,"স্থানীয় জনশক্তিদের ভাষ্যমতে, জিসান দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট থানার ওসির বিতর্কিত ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে আসছিলেন। তাদের আশঙ্কা , সেই রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকেই পরিকল্পিতভাবে জিসানকে তুলে নিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে।"
তবে পুলিশের ভাষ্য সামনে আসার পর ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে জিসানকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে এস এম ফরহাদের ফেইসবুক থেকে। তবে তা ধর্ষণের অভিযোগের কারণে নয়, প্রেমের সম্পর্কের জের ধরেই বহিষ্কার করা হয়। ফেইসবুক পোস্টে ফরহাদ লিখেন, "সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে না পারায় এখন পর্যন্ত আমরা নিখোঁজ ঘটনার প্রকৃত রহস্য বা বাস্তবতা উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হইনি। তবে প্রেমের সম্পর্ক প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো ধরণের অপরাধ প্রমাণিত হলে ভুক্তভোগীকে সকল প্রকার আইনি সহায়তা প্রদান করা হবে।"
এদিকে, কোনো ধরণের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গুমের অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সংগঠনটির ফেইসবুক পেইজের এক পোস্টে লিখা হয়, "শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসান নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশের পর জামায়াতের আমির থেকে শুরু করে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়েছিল। অনেকেই এ ঘটনাকে “গুম” আখ্যা দিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার চেষ্টা করেছে এবং বিএনপির আমলে গুমের রাজনীতি ফিরে এসেছে বলেও প্রচার করেছে কিন্তু প্রাথমিক তদন্ত শেষে পুলিশ জানিয়েছে, জিসান অপহরণ বা গুমের শিকার হননি।"
পোস্টে আরও লিখা হয়, "এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এত স্পর্শকাতর একটি বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক দল বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বক্তব্য দেওয়ার আগে ন্যূনতম যাচাই-বাছাই করেন কি না? বিশেষ করে এমন অভিযোগ, যা সহজেই ‘গুম’-এর মতো গুরুতর মানবাধিকার ইস্যু হিসেবে প্রচারিত হতে পারে।"