“তমাল আমাদের হোটেলে নিয়মিত আসে। সে একজন গাইড, তাকে আমরা পরিবারের একজন সদস্য মনে করতাম। সে কেন এমন কাজ করলো আমরা জানি না।”
সম্প্রতি মালয়েশিয়ার এক নারীর ভিডিও গোপনে ধারণ করার অভিযোগে নেপালে আটক বাংলাদেশি ট্রেকার তৌফিক আহমেদ তমালকে নিয়ে এমনটাই আলাপ-কে বলছিলেন বাদল ডাডায় অবস্থিত হোটেল কর্তৃপক্ষ।
নিরাপত্তার কারণে হোটেল এবং নাম প্রকাশ না করার শর্তেই প্রত্যক্ষদর্শী পুরো ঘটনা তুলে ধরেন।
যা হয়েছিল সেদিন
বাংলায় ‘বাদল ধারা’। নেপালের একজন সাংবাদিক জানালেন নেপালি ভাষায় জায়গার নাম ‘বাদল ডাডা’।
পর্বতের চূড়ায় ওঠার নেশায় বুঁদ তৌফিক আহমেদ তমাল নেপাল গেলে নিয়মিতভাবেই থাকতেন বাদল ডাডার সেই হোটেলে। কিন্তু ৪ই জুন তমালের বিরুদ্ধে ওঠে এক গুরুতর অভিযোগ।
তমাল দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলো পাড়ি দেওয়ায় অভিজ্ঞ একজন গাইড। একইসঙ্গে বাংলাদেশের অ্যাডভেঞ্চার ট্রাভেল কমিউনিটির অন্যতম পরিচিত মুখ। সেই তমালের বিরুদ্ধেই অভিযোগ মালয়েশিয়ান নারীর গোপন ভিডিও করেছেন। আর সেখান থেকেই শুরু ঘটনার সূত্রপাত।
‘অলটিটিউড হান্টার বিডি মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাব’-এর সদস্য এবং গাইড হিসেবে তমাল গিয়েছিলেন নেপাল। এর সূত্র ধরেই আলাপ যোগাযোগ করে অলটিটিউডের প্রতিষ্ঠাতা ফজলুর রহমান শামীমের সঙ্গে।
তিনি বলেন, ঘটনার পূর্ণ তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে সমস্ত কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তদন্তে প্রমাণিত হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে ঘটনার বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি আলাপ-কে বলেন, “তমালের সঙ্গে এখনও আমাদের কথা হয়নি। তাই বিস্তারিত কিছুই বলতে পারবো না। গণমাধ্যমে কিংবা অন্যান্যদের ফেসবুক স্ট্যাটাসে যা এসেছে আমিও ততটুকু জানি”।
তমালের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন একজন মালয়েশিয়ান নারী। এ বিষয়ে নিশ্চিত করেছে নেপালের হোটেল কর্তৃপক্ষ।
প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তিনি আলাপ-কে বলেন, “মালয়েশিয়ান অতিথি গোসল করছিলেন। বাথরুমের পাশে আরও দুটি টয়লেট ছিল। সেখানে একটু ফাঁকা জায়গা আছে, খুবই ছোট। সেখান থেকেই ভিডিও করেছিল তমাল।”
এত অতিথির ভীড়ে কী করে তমালকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে হোটেল কর্তৃপক্ষ বলেন, ওই নারী ফোন দেখতে পেয়েছিলেন। এ বিষয়ে তিনি গাইডকে জানান। তখনই আমাদের কাছে প্রথম অভিযোগ আসে। ওই মুহূর্তে হোটেলে অনেক অতিথি অবস্থান করছিলেন। সব অতিথির ফোন চেক করা হলেও কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
যে ফোন দিয়ে ভিডিও করা হয়েছিল সেটার রং ছিল সাদা এবং আইফোন। এই বিষয়টি সামনে এলে তমাল নিজে থেকেই তার ফোনের কথা জানান। প্রথমে তমাল তার ফটো গ্যালারি খুলে দেখান। কিন্তু যখন অনুরোধ করা হয় ‘রিসেন্টলি ডিলিটেড ফটোস’ অপশনে যেতে। তখন তমাল উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি বারবার বলতে থাকেন ওখানে তার স্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত ছবি আছে, তাই সেটা দেখাতে পারবেন না। এ বিষয়টি নিয়ে অন্যান্য অতিথিরা চাপ দিলে তিনি ‘রিসেন্টলি ডিলিটেড’ অপশন খোলেন। তখনই আমাদের নজরে আসে বেশ কয়েকটি ভিডিও।
হোটেলের কর্তৃপক্ষ আলাপ-এর কাছে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, তার এমন ঘটনায় আমরা বিস্মিত। কারণ তিনি শুধু আমাদের হোটেলে এমন ঘটনা ঘটায়নি। তিনি আরও অন্য হোটেলেও ভিডিও করেছেন।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ, ভারত কিংবা নেপালের নারীদের ভিডিও করতেন না। পশ্চিমা বিশ্বের নারীদের ভিডিও বেশি পাওয়া গেছে মোবাইলে।
অন্যদিকে মেলোডি সপ্তকা নামের একটি ফেইসবুক প্রোফাইল থেকে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরা হয়। সপ্তকা ছিলেন ট্রেকার গ্রুপেরই একজন সদস্য। তিনি নিজের প্রোফাইলে বলেন, “আমরা বাদল ডাডায় যেই লজে ছিলাম, সেখানে একটা গ্রুপ আসে দুপুরের পর পর বা বিকালের দিকে। সন্ধ্যার দিকে হই-হট্টগোল শুনে আমরা ডাইনিং এ গিয়ে দেখি তৌফিক তমাল এবং ওই গ্রুপের হোস্টদের মধ্যে গ্যাঞ্জাম হচ্ছে। আমাদের কাছে কোন কন্টেক্সট ছিল না।
পরে ওই গ্রুপের লিডার দুইজন এসে আমাদেরকে বললো যে ওদের একজন মালয়েশিয়ান ক্লায়েন্ট (মেয়ে, মুসলিম, সম্ভবত হিজাব পরেন) লজের ওয়াশরুমে শাওয়ার নেয়ার সময় খেয়াল করসেন যে উপরে একটা মোবাইল দিয়ে ভিডিও করা হচ্ছে। উনি মোবাইল দেখে তখনই ডিটেক্ট করসেন যে 17 pro max (কারণ এই ফোনের ক্যামেরার সেকশনটা উঁচু এবং একটু আলাদা দেখতে)। ওই সময় ওই লজে সম্ভবত ৪টা এরকম ডিভাইস ছিল। কিন্তু কালার ম্যাচ করেছিল তমালেরটাই।
মেয়েটা গ্রুপ লিডারকে ইনফর্ম করার পরে, তারা এসে ফোন দেখতে চায় এবং কিছু সন্দেহজনক ভিডিও থাম্বনেইল দেখতে পায়। তারা আনলক করতে বললে উনি ফোন আনলক করতে চান না এবং বলেন এখানে তার পার্সোনাল ভিডিও আছে। ভিক্টিম এবং লজের দিদি শুধু দেখতে চাইলেও সেটা কোনভাবেই দেখাতে রাজি হন না উনি। ফোনটা ওই গ্রুপের লিডাররা রেখে দেয়। লজের দিদি আমাদেরকে বলেছিলেন যে তমাল ড্রাংক ছিল।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “ইভেনচুয়ালি, রাতের বেলা তমাল উনার পাসওয়ার্ড দিসেন চাপের মুখে এবং ফোনে অসংখ্য আপত্তিকর রেকর্ডিং পাওয়া গেছে। ভিক্টিম নিজেরটা পেয়েছেন বলে শুনেছি ওদের লিডারদের কাছে।“
নেপাল পুলিশ যা জানালো
ঘটনার বিষয়ে আলাপ-কে নিশ্চিত করেছে নেপাল পুলিশ।
নেপাল কাসকি জেলার সুপারইনটেনডেন্ট অব পুলিশ নাবিন কার্কি আলাপ-কে বলেন, অভিযুক্ত এখনও আমাদের কাস্টাডিতে আছেন। তার বিষয়ে তদন্ত চলছে।
এখন পর্যন্ত অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে কার্কি বলেন, যেহেতু তদন্ত চলছে, তাই এই বিষয়ে আর কোনো তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে তিনি জানান দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে তাকে কোর্টে নেওয়া হবে। তখন জামিন পেতে পারেন।
এছাড়াও বাংলাদেশ থেকে কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কেউ যোগাযোগ করেনি এবং এর প্রয়োজনও নেই।
এদিকে হোটেল কর্তৃপক্ষও আলাপকে বলেছেন, তমালের বিষয়ে তারা খোঁজখবর রাখছেন এবং আশা করছেন খুব দ্রুত জামিন পাবেন।
যদিও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন হয়তো তার ভিসা লম্বা সময়ের জন্য ব্যান হতে পারে।
নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাস যা জানালো
এদিকে নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শফিকুর রহমান এ বিষয়ে এখনও কিছু জানেন না বলে আলাপকে বলেছেন।
তিনি বলেন, “আমি অন্য কাজে দশ/এগারো দিন দেশে ছিলাম ছুটিতে। এখনও ইনফরমেশন পেতে পারিনি।”
তবে তিনি বলেন, এই দেশের (নেপাল) পুলিশ মানুষকে হয়রানি করতে চায় না। অন এরাইভাল ভিসার কারণে অনেকেই এদেশে এসে অপরাধ করছে। এগুলোর আমাদের জন্য এবং দেশের জন্য বিব্রতকর।
এদিকে এ ধরনের ঘটনায় দুই দেশের ট্যুরিজম খাতে প্রভাব পড়বে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব)-এর পরিচালক সাব্বির আহমেদ আলাপ-কে বলেন, এ ধরনের ঘটনা তো বিব্রতকর। তবে ট্যুরিজমে তেমন প্রভাব পড়বে না। কারণ নেপালের পুলিশ এবং প্রশাসন সবসময়ই বন্ধুসুলভ। তবে দেশের একটা বদনাম হয়।