ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় রায় হলো শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার। অপরাধে যুক্ত থাকার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের।
মামলাটির বিচারকাজ চলেছে কার্যত পাঁচ কার্যদিবস। পহেলা জুন অভিযোগ গঠন হয় মামলার। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন ও জেরা, রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের পর ৪ই জুন রায় ঘোষণার তারিখ ঠিক হয়।
এর আগে ২০এ মে আদালতের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় দুই আসামি।
এমন আরো অনেক মামলার রায় হয়েছে অল্প সময়ের মধ্যে। কিন্তু বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ন্যায়বিচার অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
তবে রামিসা হত্যায় নিম্ন আদালতের রায়ের পর তা হাইকোর্টেও দ্রুত শুনানির উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী। তিন মাসের মধ্যে রায় কার্যকর সম্ভব বলেও আশাবাদী তিনি।
তবে জনরোষ ও জনচাহিদার মুখে নিম্ন আদালতে দ্রুত বিচার শেষ হলেও উচ্চ আদালতে গিয়ে অধিকাংশ মামলার বিচারকাজ থমকে থাকে বছরের পর বছর।
২০২৫ সালে মাগুরায় আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা মনে করা যায়। মাত্র ১৩ কার্যদিবসে এই মামলার বিচারকাজ শেষ হয়ে রায় ঘোষণা হয়েছিলো। হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় আছে মামলাটি।
ফেনীর রাফি হত্যা মামলার পরিণতিও এক। ২০১৯ সালে তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার দায়ে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। কিন্তু আটকে আছে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গলে উদ্ধার হওয়া ও পরে হাসপাতালে শিশু ইরা মারা যাওয়ার ঘটনায় বিচার শুরু হয়নি এখনও।
হাইকোর্টেও দ্রুত বিচারের উদ্যোগ
কোনো মামলায় নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলে কার্যকর করতে হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে। তাই মামলার পেপারবুক তৈরি করে দাখিল করতে হয় হাইকোর্টে।
মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর আসামিকে আপিল করতে হয় সাত দিনের মধ্যে। এই আপিল নিষ্পত্তির আগে ডেথ রেফারেন্সের শুনানিও হয় না। তবে আপিল শুনানির জন্যও লাগে পেপারবুক।
পেপারবুক হলো একটি মামলার যাবতীয় নথির সংকলন। এফআইআর থেকে শুরু করে তদন্ত প্রতিবেদন, অভিযোগপত্র, সাক্ষ্য, প্রমাণাদি, জবানবন্দি প্রতিটি নথি একত্র করে হাইকোর্টে দাখিল করতে হয়। এ পেপারবুক তৈরি করতেই সাধারণত ৫ থেকে ১০ বছর লেগে যায়।
ডেথ রেফারেন্সের শুনানির পর রায় বহাল থাকলে, আসামিপক্ষ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপিল করলে তা আপিল বিভাগে যায় শুনানির জন্য। সেখানেও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে, রিভিউ পিটিশন করা যায়।
তারপর রাষ্ট্রপতির কাছে ‘প্রাণভিক্ষার আবেদন’ নাকচ হলে রায় কার্যকর করা যায়।
পেপারবুক দাখিলের কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বাধ্যবাধকতা নেই। আর মামলাজটতো আছেই। এ জন্য সর্বোচ্চ আদালতের অংশেই মূলত থমকে থাকে বিচার কার্যক্রমের অগ্রগতি।
তবে রামিসা হত্যাকাণ্ডের পর হাইকোর্টের বিচার কার্যক্রমও তাড়াতাড়ি করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, “শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণের পর হত্যার মামলায় রাষ্ট্রের সব যন্ত্র সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে বলে এত দ্রুত বিচার করা সম্ভব হয়েছে।”
অগ্রাধিকার দিয়ে শুনানি করলে এই মামলার রায় তিন মাসের মধ্যে কার্যকর সম্ভব বলে মনে করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, “মাত্র ছয় কার্যদিবসের মধ্যে এমন একটি জঘন্য ঘটনার বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে, যা দেশের বিচারিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।”
পুরোনো মামলাগুলোর বিচারকাজও যেন দ্রুত শেষ করা যায় সেই উদ্যোগ প্রধান বিচারপতি নিচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।
তিনি জানান, আছিয়া, রাজন, রাকিব ও রামিসার মতো মামলাগুলোর ডেথ রেফারেন্স দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি আরও ফোকাসড উদ্যোগ নেয়ার কথা বলেছেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল দ্রুত শুনানির জন্য আগামী রবিবার থেকে হাইকোর্টে একটি বিশেষ বেঞ্চের কার্যক্রম শুরু হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী মনে করেন, এ ধরনের অপরাধ কমাতে হলে বিচারকাজের দীর্ঘসূত্রিতা কমানো জরুরি। সেজন্যই হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।” তবে শুধু উদ্যোগ নিলে হবে না। এর বাস্তবায়নও জরুরি বলে মনে করেন এই সিনিয়র আইনজীবী।
বিশেষ বেঞ্চের উদ্যোগকে বিচার বিভাগের সদিচ্ছা হিসাবেই দেখতে চান ‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার। তিনি বলছেন, “যেসব কারণে বিচার বা বিচারের পর রায় কার্যকরে দেরি হয় সেসব কারণ অ্যাড্রেস করতে পারতে হবে।”
লায়লা খন্দকার মনে করেন, বিচারব্যবস্থাকে শিশুদের প্রতি, তাদের পরিবারের প্রতি আরো সংবেদনশীল হতে হবে।
তিনি বলেন, “শুধু কোনো মামলা নিয়ে হৈচৈ হলে সেটার বিচার হবে বাকি অপরাধের বিচার থমকে থাকবে তা হওয়া উচিত নয়।”
সব মামলাই এমন গুরুত্ব দিয়ে আমলে নেওয়া উচিত বলেন মনে করেন লেখক ও উন্নয়নকর্মী নিশাত সুলতানা। তিনি বলেন, “প্রতিবাদ হচ্ছে সেটা ভালো। কিন্তু সব ঘটনা যদি একইভাবে গুরুত্ব না পায়, তবে অপরাধীরা কিন্তু এর সুযোগ নেবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই ধরনের ঘটনাগুলোকে ভাইরাল করতে ঠিক-ভুল আর ন্যায় আর অন্যায়ের মধ্যে বাছবিচার করবে না।”
বাকি মামলার কী হবে
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০এ মে পর্যন্ত অন্তত ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে অন্তত ৪৬জন শিশু। এর মধ্যে ১৭জন শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে।
২০১৬ সাল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ১১ হাজার ৯৩৪টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা করা হয়েছে ছয় হাজার ১৩৫টি।
এই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ছয় হাজার ৩১ জন শিশু। যার মধ্যে পাঁচ হাজার ৬৩১ জন মেয়ে এবং ৪০০ জন ছেলে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ৩১০ জন শিশুকে।
এর মধ্যে বিচার কার্যক্রম শেষ হয়েছে কিয়দাংশই। আর নথিভুক্ত হয়নি এমন ঘটনার সংখ্যাও কম নয়।
যেসব মামলা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় আলাপ হয়, সেসবের দিকে সরকারও যেমন বিশেষ নজর দেয়, আদালতও বাড়তি যত্ন নেয়। কিন্তু বাকি এমন অসংখ্য অপরাধের বিচার রয়ে যায় অধরাই।
শিশুরাই সব-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, “একটা দুটো ঘটনার বিচার করে ফেললেতো হবে না। সব অপরাধের বিচার হতে হবে। দ্রুত হতে হবে একইসাথে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।”
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতে, এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং সামাজিক জবাবদিহিতার সংকটের প্রতিফলন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী মনে করেন, রামিসা হত্যাকাণ্ডের রায়ে নির্বাহী বিভাগের ‘চাওয়ার’ প্রতিফলন ছিলো।
তিনি বলেন, “আদালত নিশ্চয়ই সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে রায় দিয়েছেন। কিন্তু এও সত্য যে এখানে নির্বাহী বিভাগের প্রত্যাশার প্রতিফলন ছিলো।”
রামিসার বাবাও বলেছেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সময়ের মধ্যে আমরা কাঙ্ক্ষিত রায় পেয়েছি।”
আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী মনে করেন রামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো অন্যসব মামলায়ও এভাবে সময় বেঁধে দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, “রামিসার ঘটনায় একটা সেন্টিমেন্ট তৈরি হয়েছিলো, সেটা সরকার পলিটিক্যালি ট্যাকল করেছে।”
তবে অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী মনে করেন, এই দ্রুত বিচার উদাহরণ তৈরি করেছে। উচ্চ আদালতেও বাকি কার্যক্রম শেষ করে রায় কার্যকর করলে দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।
এনসিপি নেতা সারজিস আলম ফেইসবুকে লিখেছেন, “এই ধারা যেন ইস্যুভিত্তিক না হয়ে আগামীতেও অব্যাহত থাকে সেই প্রত্যাশা থাকবে। পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থার উপর জনগণের দীর্ঘ সময়ের আস্থাহীনতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য স্বাধীন বিচার বিভাগ, পৃথক সচিবালয় ও দলীয় প্রভাব মুক্ত বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।”
অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকীও মনে করেন বিচার কার্যক্রম নিয়ে যেন প্রশ্ন তোলা না যায় সেজন্য নির্বাহী বিভাগ থেকে ‘কার্যত’ পৃথক থাকা উচিত।
লেখক ও উন্নয়নকর্মী নিশাত সুলতানা বলেন, “ন্যায়বিচার তো শুধু ভাইরাল কেসের জন্য প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়। বরং প্রতিটি কেইসই ন্যায়বিচার পাওয়ারর দাবি রাখে। কেসের ব্যাপকতা ভয়াবহতা কিংবা গুরুত্বতো লাইক, কমেন্ট, শেয়ার কিংবা হ্যাশট্যাগ দিয়ে হয় না।”
“আমরা আসলে ওই সমাজ চাই, যেখানে আইনের শাসন থাকবে এবং বিচার নিশ্চিত করার জন্য কোনো ট্র্যাজেডিকে ভাইরাল করার প্রয়োজন হবে না”, যোগ করেন নিশাত সুলতানা।
শিশুদের নিরাপদ রাখা ও সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সংবিধানের ২৮ ও ৩২ অনুচ্ছেদে শিশুদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
জাতীয় শিশু নীতি ২০১১ অনুযায়ী শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ, সুরক্ষা ও বৈষম্যহীন বিকাশকে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
বাংলাদেশ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের স্বাক্ষরকারী দেশ হিসাবে শিশুদের প্রতি সব ধরনের সহিংসতা, যৌন নির্যাতন ও শোষণ প্রতিরোধে বাধ্যবাধকতার মধ্যে রয়েছে।