ইউক্রেইন যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন বিশ্ব রাজনীতির রেখাগুলো স্পষ্ট ছিল। একদিকে কিয়িভের পাশে দাঁড়ানো পশ্চিমা জোট, অন্যদিকে রাশিয়া।
তবে চার বছরের মাথায় সেই সরল সমীকরণ আর নেই। ইরান যুদ্ধ নতুন করে নাড়া দিয়েছে বৈশ্বিক শক্তির হিসাবকে। এখন প্রশ্ন শুধু কে কার মিত্র, তা নয়; বরং কোন দেশ কোন যুদ্ধে কত দূর যাবে, কোথায় থামবে, আর নিজের স্বার্থ রক্ষায় কাকে কাছে টানবে সেই হিসাবও দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
ইউক্রেইন ও ইরান আলাদা দুটি যুদ্ধ যেন এখন এক নতুন বৈশ্বিক মেরুকরণের ভেতরে এসে মিশছে।
ইরান যুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি ইউক্রেইন থেকে অনেকটাই সরে গেছে। ২০২২ সালের ২৪এ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর এখনো তা থামার কোনো লক্ষ্মণ নেই। আমেরিকা, নেটো, ইউরোপ, রাশিয়া সবগুলো বিশ্বশক্তিই এই যুদ্ধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। চার বছরে ক্রমশই পাল্টে যেতে থাকে শত্রু-মিত্রের হিসাব। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধ বিশ্ব মানচিত্রের নতুন হিসাব নিয়ে হাজির হয়।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমা দেশ, উপসাগরীয় রাষ্ট্র, রাশিয়া আর চীনের প্রতিক্রিয়া দেখলে একটা বিষয় পরিষ্কার যে, এই সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পড়ছে পুরো বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে।
এই যুদ্ধ শুধু সামরিক লড়াই নয়। এটা আসলে আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যেরও একটা পরীক্ষা। কে কার পাশে দাঁড়াচ্ছে, বড় শক্তিগুলোর সীমাবদ্ধতা কোথায়, আর কোন দেশ কীভাবে নিজের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও দেশের ভেতরের রাজনৈতিক বাস্তবতা সামলাচ্ছে সেই বিষয়গুলোও পরিস্কার হয়ে উঠছে।
তবে এটাকে সরলভাবে দুই শিবিরের লড়াই বললে ভুল হবে। বরং পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। একেকটি দেশ একই সঙ্গে নিজের নিরাপত্তা বাড়াতে চাইছে, ঝুঁকি কমাতে চাইছে, আবার বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়াও এড়িয়ে চলতে চাইছে।
যুদ্ধের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন ভূ-রাজনীতি
ইরান যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, এখন কোনো বড় যুদ্ধ আর একক ভূখণ্ডের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি সংঘাত শুরু হলেও তার প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে জ্বালানি, কূটনীতি, নিরাপত্তা, জোট-রাজনীতি সবখানে। ইউক্রেইন যুদ্ধের মধ্যেই ইরান সংকট ঢুকে পড়ায় বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে মিত্রতা, দূরত্ব আর কৌশলগত অবস্থান বদলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে
ইউক্রেইন যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন নেটো ও আমেরিকা পাশে ছিল কিয়িভের।
তবে এখন এটা খুব সরল কোনো চিত্র না। বরং পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল, অনিশ্চিত এবং বহুস্তরবিশিষ্ট।
গত শতকের দুই বিশ্বযুদ্ধের পর বড় শক্তিগুলোর মধ্যে এমন যুদ্ধ দেখা এই প্রথম। আর এই কারণেই ইউক্রেইন যুদ্ধ শুধু একটি সংঘাত নয়; এটি একই সঙ্গে বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থার ফলও, আবার সেই পরিবর্তনের চালিকাশক্তিও।
এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও অস্থির করে তুলেছে। বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বেড়েছে আর দুর্বল হয়েছে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা।
সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে চলা এই যুদ্ধ নিজেই এমন এক আন্তর্জাতিক বাস্তবতার ফল, যেখানে আগের মতো শক্তির ভারসাম্য আর কাজ করছে না।
স্নায়ুযুদ্ধের সময় বিশ্ব ছিল দ্বিমেরুকেন্দ্রিক। তখন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে এমন এক শক্তির ভারসাম্য ছিল, যা একে অন্যের কৌশলগত বলয়ের ভেতরে সরাসরি সামরিক আগ্রাসনকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছিল।
তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সেই কাঠামো ভেঙে যায়। জন্ম নেয় নতুন নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র, যারা কোনো শক্ত জোটের ভেতরে ছিল না, আবার পুরোপুরি নিরাপদও ছিল না। দেশগুলো রাশিয়া ও নেটো, দুই পক্ষের কাছেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স এর ন্যাশনাল সিকউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো ম্যাক্স বুট বলেন, ইউক্রেইন যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে নতুন বাস্তবতায় বড় কোনো শক্তি নিজের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের পথেও যেতে পারে। আগে যা অকল্পনীয় ছিল, এখন তা বাস্তব হয়ে উঠেছে।
এ কারণেই তাইওয়ান ইস্যুকেও এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক বলে মনে করেন তিনি।
“তাইওয়ানের অবস্থানও অনেকটা একই ধরনের। এর কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। শুধু চীনের জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও।”
ইউক্রেইন যুদ্ধ: বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থার আয়না
ইউক্রেইন যুদ্ধকে শুধু রাশিয়া-নেটো টানাপোড়েন দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। এই যুদ্ধ আসলে এমন এক বিশ্বব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি, যেখানে পুরোনো শক্তির ভারসাম্য ভেঙে গেছে, তবে নতুন কোনো স্থিতিশীল কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। ফলে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা আরও অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইউক্রেইনের জন্য পশ্চিমা ঐক্যের পুরোনো ছবি আর আগের মতো নেই। যুদ্ধের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যে দৃঢ় ও একতাবদ্ধ অবস্থান নিয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা অনেকটাই বদলে গেছে।
বিশেষ করে ২০২৫ সালে ডনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকারেও পরিবর্তন এসেছে। ‘যতদিন লাগে’ ধরনের প্রতিশ্রুতির জায়গায় এখন এসেছে সীমিত সম্পৃক্ততার প্রবণতা।
যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগের বড় অংশ এখন ইরানকে ঠেকানো, নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা এবং অর্থনৈতিক হিসাব মেলানোর দিকে সরে গেছে। ফলে কিয়িভের দৃষ্টিতে আমেরিকা এখন আর আগের মতো নিরঙ্কুশ ভরসার জায়গা নয়।
নেটো ইস্যুতেও ইউক্রেইনের হতাশা স্পষ্ট। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে ইউরোপের সবচেয়ে যুদ্ধ-অভিজ্ঞ বাহিনীতে পরিণত হলেও সদস্যপদের দরজা এখনো তাদের জন্য খোলেনি। নেটো ইউক্রেইনকে নানা সহায়তা, উদ্ভাবন কর্মসূচি ও অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও, সদস্যপদ পাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেয়নি।
এর অর্থ, ইউক্রেইনকে সমর্থন দেওয়া হচ্ছে ঠিকই, তবে জোটের ভেতরে নেওয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।
পাশাপাশি পোল্যান্ডের সঙ্গেও ইউক্রেইনের সম্পর্ক আগের মতো উষ্ণ নেই। একসময় ওয়ারশ ছিল কিয়িভের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সমর্থকদের একটি। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, কৃষকদের অসন্তোষ এবং শরণার্থী ক্লান্তির কারণে পার্শ্ববর্তী দেশ পোল্যান্ড এখন অনেক বেশি ‘নিজস্ব স্বার্থ আগে’ নীতিতে ঝুঁকেছে।
ইউক্রেইনীয়দের জন্য বিশেষ কিছু সুবিধা প্রত্যাহার করে পোল্যান্ড বুঝিয়ে দিয়েছে যে এখন বাস্তববাদী, স্বার্থনির্ভর প্রতিবেশী সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সামনে এখন এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। পশ্চিমা ঐক্য আগের মতো অটুট নেই, নেটোর দরজা এখনো বন্ধ, আর ইউরোপের ভেতরেও সমর্থনের তীব্রতা একরকম নয়।
যেখানে এক ইরান-ইউক্রেইন যুদ্ধ
চার বছর পর সেই ফেব্রুয়ারি মাসেই আবার একটি বড় যুদ্ধের মুখোমুখি বিশ্ব। ২০২৬ সালের ২৮এ ফেব্রুয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু হয়। ইউক্রেইন ও ইরানের যুদ্ধ এখন আর আলাদা দুইটি সংকট হিসেবে দেখা যাচ্ছে না; বরং দুই ফ্রন্ট যেন একই বৈশ্বিক মেরুকরণের অংশ হয়ে উঠেছে।
একসময় পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের কাছে ইউক্রেইন ছিল ইউরোপের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রশ্ন, আর ইরান ছিল মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ন্ত্রণ ও পারমাণবিক ঝুঁকির বিষয়। কিন্তু এখন সেই পুরোনো বিভাজন ভেঙে গেছে। তেহরান থেকে ডনবাস, দুই যুদ্ধক্ষেত্রের ধোঁয়া যেন মিশে একটাই বড় ভূ-রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
ইরান যুদ্ধও নেটোর মধ্যে ভাঙন ঘটিয়েছে। দূরত্ব বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও এই সামরিক জোটের। আমেরিকার দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সও তার পাশে নেই।
নেটোর ভেতরের পুরোনো বিভাজনগুলোও সামনে চলে এসেছে। একটা যৌথ অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা থাকলেও, সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তা সহজ হচ্ছে না।
পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশের কাছে এখনো সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি রাশিয়া। তাদের কাছে ইউক্রেইন যুদ্ধই অগ্রাধিকার। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে তারা তুলনামূলকভাবে দ্বিতীয় পর্যায়ের সমস্যা হিসেবে দেখছে।
কিন্তু দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোর হিসাব আলাদা।
তাদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাব অনেক বেশি সরাসরি। বিশেষ করে অভিবাসন সংকট এবং জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি তাদের জন্য তাৎক্ষণিক উদ্বেগ তৈরি করছে।
শত্রু-মিত্রের হিসাব
ইরান যুদ্ধে ওয়াশিংটনের পথে হাঁটতে রাজি হয়নি ইউরোপে তাদের মিত্র দেশগুলো। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একক অবস্থান নেওয়া ইউরোপের জন্য সহজ ছিল না।
৮ই এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো স্বাগত জানিয়েছে। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে গঠিত জোটেও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ যুক্ত আছে।
তবে তারপরও ইউরোপের অবস্থান পরিষ্কার। তারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধে সরাসরি জড়াবে না। এর পেছনে শুধু কৌশলগত হিসাব নয়, রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষোভও।
২০২৫ সালে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ডনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় রপ্তানিতে শুল্ক চাপিয়েছেন, ইউরোপ ও ইউক্রেনকে বাদ দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেছেন, এমনকি ইউক্রেনের ওপর রুশ আগ্রাসনের দায়ও উল্টো কিয়িভের ওপর চাপিয়েছেন।
এর সঙ্গে ছিল গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির মতো বক্তব্য। ফলে ইউরোপের অনেক দেশ এখন স্পষ্টভাবে দেখাতে চাইছে, তারা আর অন্ধভাবে আমেরিকার যুদ্ধ অনুসরণ করবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এর পেছনে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের তিক্ত স্মৃতিও কাজ করছে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক যুদ্ধে ইউরোপের ভেতর যে বিভাজন তৈরি হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা এখনো ভুলে যায়নি ইউরোপ। তাই আজ তারা আরেকটি মার্কিন-নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে টেনে নেওয়া হোক, তা চায় না।
এই অবস্থার সবচেয়ে বড় পরোক্ষ ভুক্তভোগী হয়ে উঠছে ইউক্রেইন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক প্রতিনিধি শীর্ষ প্রতিনিধি কাজা কালাস বলেছেন, “এটি ইউরোপের যুদ্ধ নয়, ইউরোপের যুদ্ধ হলো ইউক্রেন।”
কারণ ইরান যুদ্ধের প্রভাবে তেলের দাম বেড়েছে, রুশ তেল থেকে নিষেধাজ্ঞার চাপ কমেছে, আর এতে রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হয়েছে।
বলা হচ্ছে, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়া প্রতিদিন অতিরিক্ত ১৫ কোটি ডলারের বেশি আয় করছে তেল বিক্রি থেকে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেইনকে সরাসরি নিরাপত্তা সহায়তা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়া-ইরান-উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহযোগিতা এখন অনেক গভীর ও সংগঠিত রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পর ইরানের পাশে মস্কো আরও স্পষ্টভাবে দাঁড়িয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
একই সময়ে ইউক্রেইনের যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার বিশেষ বাহিনীও অংশ নিয়েছে।
অন্যদিকে, এই জটিল হিসাবের মধ্যে ইউক্রেইনও নিজের অবস্থান বদলাতে শুরু করেছে। একসময় পশ্চিমা বিশ্বের চোখে কিয়িভ ছিল নিরাপত্তা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল একটি রাষ্ট্র।
তবে এখন দীর্ঘ ড্রোন যুদ্ধ ইউক্রেইনকে নতুন অভিজ্ঞতা দিয়েছে। কম খরচে, অসম যুদ্ধ কীভাবে চালাতে হয়- সেই বাস্তব জ্ঞান এখন ইউক্রেইনের বড় সম্পদ।
সে কারণেই কিয়িভ এখন মধ্যপ্রাচ্যের কিছু রাষ্ট্রের কাছেও নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেষ্টা করছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল স্থাপনা ও অবকাঠামোকে ইরানি শাহেদ ড্রোনের হামলা থেকে রক্ষায় ইউক্রেইনীয় ড্রোন বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা এই নতুন বাস্তবতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই অবস্থায় ইউক্রেইন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নতুন নিরাপত্তা কূটনীতি চালু করেছে, নতুন অংশীদার খুঁজছে, নতুন সমীকরণ গড়ছে।
কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এটি শক্তির জায়গা থেকে নেওয়া সিদ্ধান্তের চেয়ে বরং এক ধরনের কৌশলগত প্রয়োজন। কারণ বদলে যাওয়া বিশ্ব রাজনীতিতে ইউক্রেইন এখন শুধু যুদ্ধ করছে না; বরং টিকে থাকার জন্য নতুন মিত্র, নতুন বাজার এবং নতুন নিরাপত্তা ভূমিকা খুঁজছে।
নেটোর ভবিষ্যত
নেটোর ভবিষ্যত নিয়ে এখন নতুন করে বড় প্রশ্ন উঠছে। ইউরোপের দেশগুলো যখন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে আরও একসুরে অবস্থান নিতে শুরু করেছে, তখন ট্রাম্প প্রকাশ্যেই নেটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন।
এমন সিদ্ধান্ত বাস্তব হলে সেটি হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও সফল সামরিক জোটের জন্য বড় ধাক্কা। এতে ইউরোপ যেমন নিরাপত্তার দিক থেকে গভীর সংকটে পড়বে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ ইউরোপজুড়ে থাকা সামরিক ঘাঁটি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং কূটনৈতিক সমর্থনের ওপর ওয়াশিংটনের নির্ভরতা এখনও অনেক।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী নেটো থেকে বের হতে কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে, তবু কংগ্রেসে রিপাবলিকান প্রভাব থাকায় সেটিকে পুরোপুরি নিশ্চয়তার জায়গা হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা।
এরই মধ্যে মার্কিন কর্মকর্তারা ইউরোপকে জানিয়ে দিয়েছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে নিজেদের নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে প্রস্তুত হতে হবে। অর্থাৎ ইউরোপ চাইলে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার নিচ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে।
কিন্তু সেই পথে হাঁটতে হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে প্রতিরক্ষা ব্যয় অনেক বাড়াতে হবে, যাতে মার্কিন সুরক্ষার ঘাটতি তারা নিজেরাই পূরণ করতে পারে।
ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইউরোপের প্রতিরক্ষা বাজেট অনেক বেড়েছে। আরও বড় সামরিকীকরণের খরচ গেলে কম প্রবৃদ্ধি আর বেশি ঋণে জর্জরিত দেশগুলো চাপে পড়বে।
প্রতিরক্ষা ইস্যুতে ইউরোপের সমন্বয়ের ইতিহাসও খুব শক্ত নয়। এখনও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামরিক সিদ্ধান্তে সর্বসম্মতি দরকার হয়, যা দ্রুত ও একক পদক্ষেপ নেওয়াকে কঠিন করে তোলে। ফলে ভবিষ্যতের ইউরোপীয় নিরাপত্তা হয়তো নির্ভর করবে হাতে গোনা কয়েকটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের ওপর। জার্মানি, পোল্যান্ড, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের ওপর; যাদের সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক শক্তি এবং পারমাণবিক প্রতিরোধ রয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক সামি ওমারি বলেন, ইরান যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পশ্চিমা জোটগুলোর ওপর কী হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে নেটোর ভেতরের এই টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায় তার ওপর।
এই যুদ্ধ নেটো সদস্যদের মধ্যে নতুন করে ঐক্যের তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, তাতে নেটোর বৈধতা ও কার্যকারিতা বাড়তে পারে। আবার এমনও হতে পারে জোট টিকে থাকবে কিন্তু সহযোগিতা হবে আরও বেশি শর্তসাপেক্ষ।
নেটোর সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, ধীরে ধীরে ভাঙনও হতে পারে নেটোর। অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য আরও বাড়ে, তাহলে ভবিষ্যতের সংকটে নেটো হয়তো একক জোট হিসেবে দ্রুত ও শক্ত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবে না। এতে জোট ভেঙে পড়বে এমনটা না হলেও, এর কৌশলগত ঐক্য ও প্রভাব অনেকটাই কমে যেতে পারে।
এই যুদ্ধ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে প্রচলিত জোটনৈতিক নিয়মের চেয়ে শক্তি, দর-কষাকষি ও তাৎক্ষণিক লাভের রাজনীতি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ফলে নেটোর সামনে চ্যালেঞ্জ এখন শুধু ইরান সংকট সামলানো নয়; বরং একই সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকি, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক মতবিরোধের মধ্যেও নিজেদের যৌথ প্রতিরক্ষা জোট হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য রাখা।
শেষ পর্যন্ত, ইরান যুদ্ধের গুরুত্ব হয়তো তাৎক্ষণিক ফলাফলে নয়, বরং এতে বেশি বোঝা যাবে ভবিষ্যতের জোটরাজনীতি কোন দিকে যাচ্ছে।
(গ্লোবাল নিউজ, কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স, জেনোসাই ওয়াচ অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউব অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স, ইউনিভার্সিটি কনসোর্টিয়াম, ইসরায়েল আলমা অবলম্বনে)